ভারতের নাগরিককে ‘পুশ ইনের’ করুণ কাহিনি
· Prothom Alo

সাহিদা ফকির রাতে রুটি কিনতে বেরিয়েছিলেন। ছয়টা রুটি আর একটু তরকারি। বাড়িতে ছোট ছেলে একা। সাদাপোশাকের লোকজন এসে নিজেদের পুলিশ পরিচয় দিলেন। রুটি নিলেন, ফোন নিলেন, আধার কার্ডও নিলেন। নাগরিকত্ব পরে যাচাই করা যাবে। এখন সন্দেহটাই যথেষ্ট।
জন্মসনদ ছিল। ভোটার কার্ড ছিল। প্যান কার্ডও ছিল। বাবার নাম ভোটার তালিকায় ছিল। দাদার নাম আরও পুরোনো খাতায় ছিল। নিজের নামে জমিও ছিল। রাষ্ট্র বলল, এগুলো কাগজ মাত্র।
Visit asg-reflektory.pl for more information.
আসল পরিচয় মুখে। মুখে বাংলা। বাংলা মানে সন্দেহ। সন্দেহ মানে বাংলাদেশি। বাংলাদেশি মানে রাতের সীমান্ত। আর জোর করে ঠেলে দেওয়া।
টানা পাঁচ দিন আটকে রাখা হলো। ম্যাজিস্ট্রেট দেখলেন না। শুনানি হলো না। কোনো আদেশপত্রে সই হলো না যে এই নারীকে তাঁর নিজের দেশ থেকেই বের করে দেওয়া হচ্ছে। শুধু একটা নিঃশব্দ সিদ্ধান্ত—ঠেলে দাও।
তারপর বিমান, তারপর গাড়ি, তারপর কাদা। রাত একটা। আরও ২০ জনের সঙ্গে অন্ধকারে ধাক্কা। চলে যাও, তোমার দেশ এটা নয়, ওদিকে।
সাহিদা আট ঘণ্টা হেঁটেছিলেন। পায়ে ফাটা মাটি, পেটে খালি রাত। বাংলাদেশে এক কৃষক তাঁকে ঘরে তুললেন। রাষ্ট্র যেখানে নাগরিক চিনতে পারে না, সেখানে এক অচেনা মানুষ মানুষকে চিনে নেয়।
ছেলে শাহিন ফকির মামলা করেছেন। হেবিয়াস করপাস। অর্থাৎ রাষ্ট্রকে জিজ্ঞাসা করা—আমার মা কোথায়? সুপ্রিম কোর্ট শুনেছেন। কেন্দ্রীয় সরকারকে বলেছেন, কীভাবে একজন নারীকে বাজার থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হলো, সেটা বলো। মহারাষ্ট্র রাজ্য সরকারকে বলেছেন, বলো, কেন কাগজ থাকতেও তাঁকে বাংলাদেশি ঘোষণা করা হলো। বলো, কোন আইনে মানুষকে রাতের অন্ধকারে সীমান্তে ছেড়ে দেওয়া যায়।
রাষ্ট্র এখন উত্তর খুঁজবে, ফাইল খুলবে, সময় নেবে।
কিন্তু যে সময় রাষ্ট্র নোট লেখে, সেই সময় নারী ও শিশুরা নো ম্যানস ল্যান্ডে দাঁড়িয়ে থাকে। সেখানে কোনো ঠিকানা নেই, কোনো পতাকা নেই। শুধু কাদা, কাঁটাতার আর এক ফালি মাটি, যে মাটিতে কেউ দায় নেয় না।
ঠেলে দেওয়ার পর তারা কী খায়, রাষ্ট্র জানে না। কেউবা পকেটের শুকনো রুটির টুকরা চিবায়, কেউবা ক্ষেতের কচুরিপানা ধুয়ে মুখে দেয়, কেউবা সারা রাত খালি পেটে বসে থাকে। খেতে গেলেও যেন ধরা পড়ার ভয়। ধরা পড়লে আবার কোন দেশে ঠেলে দেবে, সেটার ভয়।
বাথরুম কোথায় করে—প্রশ্নটা কোনো দপ্তরে অশোভন শোনাতে পারে, মাঠে সেটা জীবন। নারীরা কাঁটাতারের আড়ালে বসেন। শিশুরা মায়ের আঁচল ধরে দাঁড়ায়। অন্ধকারকে পর্দা ভাবা হয়। বৃষ্টি হলে কাদাই পর্দা। সকাল হলে লজ্জাই পর্দা। কেউ ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে রাখে। খোলা মাঠে বসতেও সাহস লাগে। সাহস ফুরিয়ে গেলে মাটিই একমাত্র ভরসা।
সাহিদা এখন অন্য দেশের আঙিনায় বসে বলেন, ‘আমি ভারতীয়। কিন্তু আমার দেশ আমাকে চিনল না।’
ছেলেরা ওপারে। মা এপারে। মাঝখানে একটা সীমান্ত। একটা নীতি, যে নীতি কাগজ দেখে না, শুধু চেহারা আর ভাষা দেখে।
সুপ্রিম কোর্ট জানতে চেয়েছেন, এটা বড় কথা। কিন্তু নো ম্যানস ল্যান্ড জানতে চায় না। সে শুধু নেয় ক্ষুধা, নেয় লজ্জা, নেয় একজন মায়ের রাত। আর রাষ্ট্র তখন ফাইলে লেখে, বিষয়টি তদন্তাধীন।
লেখায় এআইয়ের সহায়তা নেওয়া হয়েছে।