স্বাধীনতা আন্দোলনের চরিত্রগুলোকে সরিয়ে নতুন ইতিহাস সৃষ্টির চেষ্টা গ্রহণযোগ্য নয়: অধ্যাপক তানজীমউদ্দিন
· Prothom Alo

ডাকসু সংগ্রহশালা সংস্কারের নামে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র ও স্মারকগুলোকে সরিয়ে দিয়ে দলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে নতুন ইতিহাস তৈরি করার চেষ্টা করা হয়েছে। এটা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কেন এটা করা হলো তার ব্যাখ্যা চেয়েছেন অধ্যাপক তানজীমউদ্দিন খান।
Visit zeppelin.cool for more information.
ডাকসুর সংগ্রহশালায় স্বাধীনতাসংগ্রামে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভূমিকার কোনো ছবি স্থান পায়নি। সেখানে পাকিস্তানের তৎকালীন গভর্নর মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ এবং ছাত্রসংঘের নেতা আবদুল মালেকের ছবি রাখা হয়েছে। সেই সঙ্গে ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়, ১৯৬৬, ১৯৬৯, ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বরের বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড এবং রাজাকারদের তালিকার মতো বিষয়গুলো ডাকসু সংগ্রহশালা থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে।
কোন নীতিমালার ভিত্তিতে এটা করা হলো, সেই প্রশ্ন তুলেছেন অধ্যাপক তানজীমউদ্দিন খান। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও স্বাধীনতাসংগ্রামের স্মারকগুলো কোথায় রাখা হয়েছে, সেই ব্যাখ্যা দাবি করেছেন তিনি। আজ সোমবার রাতে প্রথম আলোর নিয়মিত অনুষ্ঠান ‘বার্তাকক্ষে’ অংশ নিয়ে এসব কথা বলেছেন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্কের সক্রিয় সদস্য অধ্যাপক তানজীমউদ্দিন খান।
সংস্কার শেষে গতকাল রোববার ডাকসু সংগ্রহশালা চালু করা হয়। সেখানে শেখ মুজিবুর রহমানের একক ছবি বাদ দিয়ে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি রাখার বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর এ নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়। আজ দুপুরে ডাকসু সংগ্রহশালায় গিয়ে জিন্নাহর তিনটি ছবি ছিঁড়ে ফেলে প্রতিবাদ জানান আবু তৈয়ব হাবিলদার নামের এক শিক্ষার্থী। পরে জিন্নাহর ছবির জায়গায় ১৯৮১ সালে বায়তুল মোকাররমে গোলাম আযমকে জুতাপেটা করার ছবি লাগিয়েছেন বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনের নেতা–কর্মীরা।
ডাকসুর সংগ্রহশালা থেকে জিন্নাহর ছবি ছিঁড়ে ফেললেন এক শিক্ষার্থীডাকসু সংগ্রহশালায় জিন্নাহর ছবি রাখার প্রতিবাদ জানিয়েছে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নসহ বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন। অনেক শিক্ষার্থীও এ ঘটনায় ক্ষোভ জানিয়ে ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ডাকসু সংগ্রহশালায় পাকিস্তানের তৎকালীন গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ এবং তৎকালীন ছাত্রসংঘের নেতা আবদুল মালেকের ছবি প্রদর্শনের বিষয়টি ভাষা আন্দোলন ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগ্রহশালায় এমন ছবি প্রদর্শন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত বিধিবিধান অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এই বিজ্ঞপ্তির কথা উল্লেখ করে প্রথম আলোর বার্তাকক্ষে অধ্যাপক তানজীমউদ্দিন খান বলেছেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞপ্তি থেকে বোঝা যাচ্ছে, এসব কর্মকাণ্ডে প্রশাসনের অনুমোদন ছিল না। ডাকসু বিশ্ববিদ্যালয়েরই অংশ এবং শিক্ষার্থীদের পক্ষে প্রশাসনকে সহায়তা করার কথা। প্রশাসনকে চ্যালেঞ্জ করে বা প্রশাসনের বিকল্প হিসেবে কাজ করা ডাকসুর দায়িত্ব নয়।’ এ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, ডাকসুর সংগ্রহশালা বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পদ এবং এর মালিকানা ডাকসুর নয়, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের। এ ধরনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ারও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের এবং সিন্ডিকেটের।
এ বিষয়ে প্রশ্নের জবাবে অধ্যাপক তানজীমউদ্দীন বলেন, এই ডাকসু নেতৃত্ব দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই নানা বিতর্ক তৈরি হচ্ছে। এর ধারাবাহিকতায় নতুন করে জিন্নাহর ছবি টাঙানোর বিষয়টিও বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।
প্রথাগত দলীয় রাজনীতিতে যাঁরা অন্ধ, তাঁরাই এমনটা করতে পারেন: জিন্নাহর ছবি ছেঁড়া নিয়ে গোলাম পরওয়ার‘শিক্ষকদের মূল্যায়ন ডাকসুর এখতিয়ারবহির্ভূত’
বার্তাকক্ষে ‘শিক্ষক মূল্যায়ন ও জিন্নাহর ছবি বিতর্কে ডাকসু’ বিষয়ে কথা বলেন অধ্যাপক তানজীমউদ্দিন। ডাকসুর উদ্যোগে শিক্ষকদের মূল্যায়ন ও রেটিং দেওয়ার ব্যবস্থা চালু করাকে এখতিয়ারবহির্ভূত ও ‘প্যারালাল প্রশাসন তৈরির চেষ্টা’ বলে উল্লেখ করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়টির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক তানজীমউদ্দিন। তাঁর মতে, শিক্ষক মূল্যায়নের ব্যবস্থা থাকা জরুরি হলেও সেটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাঠামোর মধ্যেই হওয়া উচিত। ডাকসু এ দায়িত্ব নিলে তা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হওয়ার সুযোগ তৈরি করে।
অধ্যাপক তানজীমউদ্দিন খান বলেন, শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে শিক্ষকদের মূল্যায়ন পৃথিবীর অনেক জায়গাতেই আছে, যেটিকে সাধারণত ‘স্টুডেন্টস ফিডব্যাক’ বলা হয়। শিক্ষকদের পেশাগত উৎকর্ষ নিশ্চিত করার জন্য এ ধরনের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। তবে শিক্ষককে এক ধাপ থেকে আরেক ধাপে পদোন্নতি দেওয়ার ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের যে নীতিমালা রয়েছে, তার সঙ্গে শিক্ষার্থীদের ফিডব্যাক যুক্ত করা জরুরি।
জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনশুধু কত বছর চাকরি করেছেন, কতটি প্রকাশনা আছে কিংবা পিএইচডি বা অন্য ডিগ্রি আছে—এসব দিয়ে একজন শিক্ষক তাঁর পেশাগত দায়িত্ব কতটা ভালোভাবে পালন করছেন, তা পুরোপুরি বোঝা যায় না বলে উল্লেখ করেন তানজীমউদ্দিন খান। তিনি বলেন, অনেক শিক্ষক ভালো গবেষক হলেও পাঠদানের ক্ষেত্রে অবহেলা করতে পারেন। আবার যিনি গবেষণা ও পাঠদান—দুই ক্ষেত্রেই দায়িত্ব পালন করছেন, তাঁকে মূল্যায়নের যথাযথ ব্যবস্থাও নেই।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০২২ সাল থেকে শিক্ষক মূল্যায়নের একটি ব্যবস্থা চালুর চেষ্টা করা হচ্ছে জানিয়ে অধ্যাপক তানজীমউদ্দিন বলেন, কিছু বিভাগে সেটি চালুও হয়েছে। আইবিএ ও আইআরসহ কিছু বিভাগে এ ধরনের ব্যবস্থা রয়েছে। তাঁর নিজের বিভাগেও এ বিষয়ে সম্মিলিতভাবে কাজ করার চেষ্টা চলছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও এ বিষয়ে তৎপর ছিল। তবে এখনো তা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।
ডাকসুর উদ্যোগের বিষয়ে এই অধ্যাপক বলেন, ডাকসুর সুনির্দিষ্ট গঠনকাঠামো ও কর্মকাণ্ডের পরিধি রয়েছে। শিক্ষকদের মূল্যায়ন করা সেই এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে কি না, সেটিই প্রথম প্রশ্ন। তাঁর মতে, ডাকসু প্রশাসন নয়। ফলে প্রশাসনের কাজ নিজেরা করতে গেলে একধরনের ‘প্যারালাল প্রশাসন’ তৈরি হয়।
ডাকসু সংগ্রহশালায় জিন্নাহর ছবি সংযুক্ত করার প্রতিবাদে গোলাম আযমকে অপমানের ছবি লাগাল ছাত্র ফেডারেশনঅধ্যাপক তানজীমউদ্দিন বলেন, ডাকসু নির্বাচিত প্রতিষ্ঠান হলেও এটি রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ কোনো প্রতিষ্ঠান নয়। ডাকসুর সদস্যদের মতাদর্শগত বৈশিষ্ট্য রয়েছে এবং তার প্রতিফলন তাঁদের কর্মকাণ্ডে পড়তে পারে। অন্যদিকে শিক্ষকদের মধ্যেও মতাদর্শগত ভিন্নতা রয়েছে। ফলে ডাকসুর করা মূল্যায়নে পক্ষপাতের আশঙ্কা থাকে।
এই অধ্যাপকের মতে, ডাকসুর উদ্যোগে শিক্ষকদের নম্বর শিক্ষার্থীরা দেখতে পাওয়ার সুযোগ তৈরি হওয়া এবং পরে তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ‘প্রাইভেসির লঙ্ঘন’। এর ফলে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সুস্থ সম্পর্ক জটিলতার মধ্যে পড়তে পারে। একজন শিক্ষক ক্লাসে গিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবেন না, এমন পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে।
ডাকসু নির্বাচন নিয়মিত হওয়া উচিত কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে অধ্যাপক তানজীমউদ্দীন বলেন, ডাকসু নেতৃত্ব তৈরির এবং ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব গড়ে তোলার একটি প্ল্যাটফর্ম। কিন্তু ডাকসু যদি রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন আনতে না পারে, তাহলে তা জাতীয় রাজনীতির জন্য বিপজ্জনক হতে পারে।