প্রবাসীদের উদ্যোগকে পূর্ণ সমর্থন করা দেশের জন্য অপরিহার্য
· Prothom Alo

চার বছর ধরে বাংলাদেশ ইউএসএ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ মূলধারার গ্রেটার নিউইয়র্ক চেম্বার অব কমার্সের সঙ্গে যৌথভাবে বৃহৎ পরিসরে ট্রেড ফেয়ার ও রেমিট্যান্স ফেয়ারের আয়োজন করে আসছে। এই যৌথ উদ্যোগের বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য অর্জন রয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আমরা গ্রেটার নিউইয়র্ক চেম্বার অব কমার্সের আস্থা অর্জন করে একটি সম্মানিত অংশীদার প্রতিষ্ঠান হিসেবে নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ পেয়েছি। বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার বাণিজ্যিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সম্পর্ক উন্নয়নে এ উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বিশেষ করে বাংলাদেশি-আমেরিকান পেশাজীবী, উদ্যোক্তা ও বিশেষজ্ঞদের বাংলাদেশের উন্নয়ন কার্যক্রমে যুক্ত ও উৎসাহিত করার জন্য আমরা ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছি।
Visit sportbet.rodeo for more information.
২.
প্রথম দুই বছর মূল অনুষ্ঠান আয়োজনের আগে আমরা তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ, চিকিৎসক, শিক্ষক, গবেষক, ফার্মাসিউটিক্যাল পেশাজীবী ও বিভিন্ন খাতের অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের নিয়ে একাধিক অনলাইন সভা করেছি। নিজ নিজ দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার আলোকে বাংলাদেশের উন্নয়নে তাঁরা কীভাবে ভূমিকা রাখতে পারেন, সে বিষয়ে তাঁদের মতামত ও পরামর্শ গ্রহণ করা হয়। এসব আলোচনার ভিত্তিতে প্রস্তুত প্রতিবেদন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়েও পাঠানো হয়েছিল। বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রবাসী বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে আমরা ব্যাপক সহযোগিতার আশ্বাস পেয়েছিলাম। কিন্তু সরকারি পর্যায়ে প্রত্যাশিত উৎসাহ ও সমন্বয় না থাকায় তাঁদের অনেকেই হতাশ হয়েছেন। তবে কেউ কেউ ব্যক্তিগত উদ্যোগে দেশের বিভিন্ন উন্নয়ন কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন।
দুঃখজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশের মন্ত্রী, রাষ্ট্রদূত এবং অনেক সরকারি সংস্থা প্রবাসীদের উদ্যোগ ও সক্ষমতাকে প্রয়োজনীয় গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করে না। অথচ উন্নত দেশগুলোতে বসবাসকারী দ্বৈত নাগরিক ও প্রবাসী বাংলাদেশিদের অনেকেই নিজ নিজ পেশা ও কর্মক্ষেত্রে অত্যন্ত সম্মানিত। তাঁদের মেধা, অভিজ্ঞতা, যোগাযোগ ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাব বাংলাদেশের জন্য মূল্যবান সম্পদ হতে পারে।
৩.
কোভিড-১৯ মহামারির সময় প্রবাসী বাংলাদেশিদের কার্যকর ভূমিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত আমরা দেখেছি। সে সময় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিউইয়র্কে এসে বলেছিলেন, বাংলাদেশে সংক্রমণ তুলনামূলক কম থাকায় যুক্তরাষ্ট্র হয়তো বাংলাদেশকে টিকা দেবে না। কিন্তু তাঁর বক্তব্যের কয়েক দিনের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে ৫০ লাখ ডোজ টিকা দেওয়ার মাধ্যমে সহযোগিতা শুরু করে। এই উদ্যোগের পেছনে প্রভাবশালী বাংলাদেশি-আমেরিকান চিকিৎসক ও পেশাজীবীদের প্রচেষ্টাও গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
ডা. মাসুদের সঙ্গে আলোচনার পর আমি নেভাদার বিশিষ্ট কার্ডিওলজিস্ট ডা. চৌধুরী হাফিজ আহসানের সঙ্গে যোগাযোগ করি। যুক্তরাষ্ট্রের মূলধারায় তাঁর গ্রহণযোগ্যতা ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে পেশাগত যোগাযোগ ছিল। তিনি হোয়াইট হাউসের কোভিড-সংক্রান্ত আলোচনায় একজন আমেরিকান চিকিৎসাবিশেষজ্ঞ হিসেবে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পান। অনলাইন সভাগুলোতে আমাদের নিয়মিত পরামর্শের ভিত্তিতে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বোঝাতে সক্ষম হন যে বাংলাদেশের হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা অত্যন্ত চাপের মধ্যে রয়েছে। দেশে ব্যাপকভাবে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়লে মৃত্যুর হার ভয়াবহ হতে পারে। ধারাবাহিকভাবে বিষয়টি তুলে ধরার পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশের বাস্তব অবস্থা বিবেচনায় নেয়।
সে সময় যুক্তরাষ্ট্র যুক্তরাজ্য ও ভারতের মতো দেশকেও পর্যাপ্ত টিকা দিতে পারেনি। বাংলাদেশের সরকার ও সাধারণ মানুষ যখন টিকা পাওয়া নিয়ে গভীর উদ্বেগে ছিলেন, তখন সম্মানিত বাংলাদেশি-আমেরিকানদের অনুরোধ ও প্রচেষ্টায় সহযোগিতার পথ উন্মুক্ত হয়। এ অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, যুক্তরাষ্ট্রের মূলধারায় সম্মানিত ও প্রভাবশালী বহু প্রবাসী বাংলাদেশি রয়েছেন। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও স্বজনপ্রীতির ঊর্ধ্বে উঠে তাঁদের যথাযথ সম্মান দিয়ে দেশের উন্নয়ন কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করা গেলে রাষ্ট্র ও জনগণ—উভয়েই উপকৃত হবে।
৪.
২০২৫ সালের নিউইয়র্ক রেমিট্যান্স ফেয়ার বাংলাদেশি সম্প্রদায়ের জন্য একটি তাৎপর্যপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ছিলেন ট্রাম্প প্রশাসনের স্মল বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের প্রধান কেলি লোফলার। তাঁর বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্রে দেশীয় ও বিদেশি কোম্পানিগুলোর জন্য সৃষ্ট নতুন ব্যবসায়িক সুযোগের বিষয়টি উঠে আসে। দিনব্যাপী আয়োজনে আন্তর্জাতিক মানের বক্তারা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বক্তব্য দেন। আলোচ্য বিষয়গুলোর মধ্যে ছিল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির নৈতিক ব্যবহার; যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্কনীতির প্রভাব মোকাবিলার কৌশল; বৈশ্বিক ব্যবসা সম্প্রসারণ; বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পের জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা; বিনিয়োগ ও বাণিজ্যের নতুন সম্ভাবনা; বাংলাদেশের আর্থিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন।
প্রথমবারের মতো যুক্তরাজ্য, ইতালি, পোল্যান্ড ও কানাডার বাংলাদেশি এনআরবি বিজনেস চেম্বারের নেতারা এই আয়োজনে অংশ নেন। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর চেম্বার অব কমার্সের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে কোরিয়ান, লাতিন আমেরিকান, ইতালিয়ান ও নেপালিজ-আমেরিকান চেম্বারের নেতারা আমাদের এই আন্তর্জাতিক জোটে যুক্ত হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন। লাতিন আমেরিকান ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা বাংলাদেশে বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় সহযোগিতা ও সুযোগ প্রদানের আগ্রহ জানান। অনেক ফ্যাশন গ্রুপের নেতারাও অনুষ্ঠানে অংশ নেন। বিখ্যাত ফ্যাশন ডিজাইনার গ্লোরিয়া স্টার কিন বাংলাদেশের ফ্যাশন ও তৈরি পোশাককে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলে ধরার জন্য তাঁর সঙ্গে আসা ডিজাইনারদের প্রতি আহ্বান জানান।
৫.
গত চার বছরে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই, তৈরি পোশাকশিল্পের সংগঠন বিজিএমইএ, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং সরকারি-বেসরকারি খাতের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ীরা এসব আয়োজনে অংশ নিয়েছেন। প্রতিবার ম্যানহাটানের ম্যারিয়ট বা হিলটন হোটেলে আয়োজিত বড় ট্রেড ফেয়ারে কয়েক শ আমেরিকান প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের স্টলও স্থান পেয়েছে। এর মাধ্যমে দুই দেশের ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের মধ্যে একটি বিশেষ যোগাযোগ সৃষ্টি হয়েছে। গ্রেটার নিউইয়র্ক চেম্বার অব কমার্সের প্রায় ৩৫ হাজার সদস্যের কাছে বাংলাদেশের ব্যবসা, পণ্য ও বিনিয়োগের সম্ভাবনা সম্পর্কিত তথ্য পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশের পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ এবং দুই দেশের ব্যবসায়ীদের মধ্যে নতুন অংশীদারত্ব গড়ে ওঠার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
৬.
রেমিট্যান্স ফেয়ারে বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি বড় ব্যাংক অংশ নিয়ে সেমিনারের আয়োজন করেছে। দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধির জন্য প্রবাসীদের হুন্ডির পরিবর্তে ব্যাংক ও অনুমোদিত মানি ট্রান্সফার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অর্থ পাঠানোর অনুরোধ জানানো হয়েছে। ব্যাংকগুলো তাদের বিশেষ সেবা, প্রণোদনা ও অর্থ স্থানান্তরের নিরাপত্তার বিষয়গুলো তুলে ধরেছে। কিছু প্রতিষ্ঠান নিউইয়র্কের বিভিন্ন এলাকায় রোড শোর আয়োজন করে বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠানোর অর্থনৈতিক গুরুত্ব প্রবাসীদের কাছে আরও ঘনিষ্ঠভাবে ব্যাখ্যা করেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশে রেমিট্যান্সপ্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। অনেক সময় মধ্যপ্রাচ্যের কোনো কোনো দেশের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে বেশি বৈদেশিক মুদ্রা বাংলাদেশে গেছে। দেশের ডলার-সংকট মোকাবিলায় এই রেমিট্যান্স গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বাংলাদেশ বর্তমানে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক মতপার্থক্য, আন্তর্জাতিক চাপ, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং নতুন বৈশ্বিক শুল্কনীতির প্রভাবের মুখোমুখি। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্কব্যবস্থার কারণে দেশের প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী তৈরি পোশাকশিল্প নতুন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে পারে। দেশের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, সামাজিক সেবা এবং সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমও অর্থনৈতিক চাপের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। দীর্ঘদিনের বিদেশি সাহায্যনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য এটি একটি কঠিন কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়।
৭.
বাংলাদেশের মানুষ পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকুন না কেন, দেশের এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তাঁদের এগিয়ে আসতে হবে। এর কোনো তাৎক্ষণিক বিকল্প নেই। মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত প্রবাসীরা কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে অর্জিত আয়ের বড় অংশ দেশে থাকা আত্মীয়স্বজনের জন্য পাঠান। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে প্রতিষ্ঠিত এবং তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থানে থাকা প্রবাসী বাংলাদেশিদের সামনে এখন দেশের জন্য আরও বিস্তৃতভাবে অবদান রাখার সুযোগ এসেছে। তাঁদের অনেকেই বাংলাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিনা খরচে বা অল্প খরচে পড়াশোনা করেছেন। মুক্তিযুদ্ধে অসংখ্য শহীদের আত্মত্যাগের মাধ্যমে অর্জিত একটি স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে বেড়ে উঠেছেন। শত ব্যস্ততার মধ্যেও তাঁরা মাতৃভূমির প্রতি নিজেদের নৈতিক দায়বদ্ধতার কথা স্মরণ করতে পারেন।
প্রবাসী বাংলাদেশিরা যদি প্রত্যেকে বছরে কমপক্ষে ২০০ ডলার করে দেশের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, মানবিক সহায়তা, সড়ক সংস্কার অথবা অন্য কোনো জনকল্যাণমূলক কাজে প্রদান করেন, তাহলে বিপদগ্রস্ত বহু প্রতিষ্ঠান ও মানুষ আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারবে। অনেকে নিয়মিত বা অনিয়মিতভাবে আত্মীয়স্বজনকে সহায়তা করেন, ব্যবসা সম্প্রসারণ ও বাড়িঘর নির্মাণে অর্থ পাঠান কিংবা মসজিদ, মন্দির, গির্জা, এতিমখানা ও দরিদ্র মানুষের জন্য দান করেন। এসব সহায়তার পাশাপাশি তাঁরা যদি দেশের সংকটে থাকা উন্নয়ন প্রকল্প ও মানবসেবামূলক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন, তাহলে সম্মিলিতভাবে অসাধ্যসাধন সম্ভব। জাতীয় পর্যায়ের এনজিও বা বড় প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি প্রবাসীরা নিজ নিজ এলাকার স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় উন্নয়ন প্রকল্পেও সহায়তা করতে পারেন।
৮.
প্রবাসীদের অর্থ ও অনুদান বৈধ পথে দেশে পাঠানোর ক্ষেত্রে বিদ্যমান অপ্রয়োজনীয় প্রতিবন্ধকতা দূর করা সরকারের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। এনজিওবিষয়ক ব্যুরো, জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতা সহজ করতে হবে। হয়রানি বন্ধ করে একটি স্বচ্ছ, দ্রুত ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। বর্তমানে বিদেশ থেকে কোনো প্রতিষ্ঠানের পক্ষে দাতব্য কাজের জন্য অর্থ পাঠানো অনেক ক্ষেত্রেই অত্যন্ত কঠিন। দেশে অর্থ গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানকে এনজিও হিসেবে নিবন্ধনের কথা বলা হয়; কিন্তু সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর দীর্ঘসূত্রতা ও অনুমোদন-জটিলতার কারণে সেই নিবন্ধন পাওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে। আমি নিজেও এ ধরনের জটিলতার ভুক্তভোগী।
কোভিডের সময় সিলেট কিডনি হাসপাতালের পক্ষ থেকে সিলেটসংলগ্ন খাদিমপাড়া ও দক্ষিণ সুরমা উপজেলার দুটি নতুন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কোভিড আইসোলেশন সেন্টার ও চিকিৎসাসেবা চালু করা হয়েছিল। নিজস্ব অর্থায়নে অক্সিজেন, ওষুধ, বিছানাপত্র, খাবার এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রীর ব্যবস্থা করার পাশাপাশি ৪৫ জন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়। পরে অন্যান্য হাসপাতাল কোভিড রোগী গ্রহণ শুরু করলে প্রায় ছয় মাস পর আমরা কার্যক্রমটি বন্ধ করি। সরকারি কোনো অনুদান না থাকায় তখন আমাদের তহবিল প্রায় নিঃশেষ হয়ে যায়। সে সময় নিউইয়র্কে থাকা আমার বন্ধু, ফার্মাসিস্ট লিয়াকত, ৫০ হাজার ডলার অনুদান দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু কিডনি ফাউন্ডেশন এনজিওবিষয়ক ব্যুরোর নিবন্ধনভুক্ত না হওয়ায় অর্থটি পাঠানো সম্ভব হয়নি। প্রায় আট বছর ধরে দাতব্য হাসপাতাল হিসেবে কাজ করার পরও বহু চেষ্টা করেও প্রতিষ্ঠানটি প্রয়োজনীয় নিবন্ধন পায়নি। ফলে দরিদ্র রোগীদের বিনা মূল্যে ডায়ালাইসিস করানোর জন্য বিদেশ থেকে সরাসরি হাসপাতালের ব্যাংক হিসাবে অনুদান পাঠানো যাচ্ছে না। আমার বন্ধু শিহাবও জানিয়েছেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের উন্নয়নের জন্য বিদেশ থেকে অনুদান পাঠাতে গিয়ে একই ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হয়েছেন।
৯.
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর এবং সরকারের অর্থবিষয়ক দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষের প্রতি আমার অনুরোধ—প্রবাসীদের বৈদেশিক মুদ্রা পাঠানোর সুযোগ শুধু ব্যক্তি বা এনজিওবিষয়ক ব্যুরোতে নিবন্ধিত সংস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখবেন না। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে নিবন্ধিত সামাজিক সংগঠন, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান, পরিবেশবাদী সংগঠন এবং বিভিন্ন দাতব্য প্রতিষ্ঠানকেও বৈধভাবে বিদেশি অনুদান গ্রহণের সুযোগ দিতে হবে। এসব প্রতিষ্ঠানকে স্বচ্ছ হিসাব সংরক্ষণ, নিরীক্ষা, অর্থের যথাযথ ব্যবহার এবং কর্তৃপক্ষের কাছে নিয়মিত প্রতিবেদন দেওয়ার আইনি বাধ্যবাধকতার আওতায় আনা যেতে পারে। তাতে একদিকে যেমন অর্থের অপব্যবহার রোধ হবে, অন্যদিকে দেশের প্রয়োজনীয় উন্নয়ন ও মানবিক কার্যক্রমে প্রবাসীদের অবদান রাখার পথও সহজ হবে।
১০.
ইতিপূর্বে অনুষ্ঠিত ধারাবাহিক আয়োজনগুলোর মাধ্যমে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়ী সম্প্রদায় এবং সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকদের মধ্যে একটি শক্তিশালী ও কার্যকর সংযোগ গড়ে উঠেছে। এরই ধারাবাহিকতায় আগামী ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ নিউইয়র্ক সিটিতে এবারের আয়োজন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে নিউইয়র্কের গভর্নরের উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা এবং যুক্তরাষ্ট্রের স্মল বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (SBA) জ্যেষ্ঠ প্রতিনিধিরা এতে অংশ নেবেন। ফলে এই আয়োজন বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা সম্প্রসারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ সৃষ্টি করবে।
আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, এই উদ্যোগের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের সক্রিয় সম্পৃক্ততা অত্যন্ত প্রয়োজন। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রাতিষ্ঠানিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে এটি দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করবে, নতুন বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি করবে এবং প্রবাসী বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের আন্তর্জাতিক পরিসরে এগিয়ে যেতে উৎসাহিত করবে। প্রবাসীদের প্রতিটি ইতিবাচক উদ্যোগকে যথাযথ সম্মান ও সহযোগিতা জানানো, দেশের ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে সঠিক নির্দেশনা দেওয়া এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা এখন সময়ের দাবি। বাংলাদেশ আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ যুগসন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। সরকার, ব্যবসায়ী, পেশাজীবী, সামাজিক প্রতিষ্ঠান এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসকারী বাংলাদেশিদের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই দেশকে বর্তমান চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করে উন্নয়নের নতুন পর্যায়ে পৌঁছে দিতে পারে।
প্রবাসীরা কেবল রেমিট্যান্স প্রেরণকারী নন; তাঁরা বাংলাদেশের আর্থিক শক্তি, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, প্রযুক্তি ও জ্ঞানভিত্তিক উন্নয়নের অন্যতম প্রধান অংশীদার। তাই তাঁদের দেশের উন্নয়ন-সহযোগী, বিনিয়োগকারী, নীতিপরামর্শক এবং বৈশ্বিক প্রতিনিধি হিসেবে যথাযথ মর্যাদা দিতে হবে। প্রবাসীদের উদ্যোগকে পূর্ণ সমর্থন করা কোনো অনুগ্রহ নয়; বরং এটি বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং টেকসই ভবিষ্যৎ নির্মাণের অপরিহার্য শর্ত।
অধ্যাপক ডা. জিয়াউদ্দিন আহমেদ, কনভেনর, রেমিট্যান্স ফেয়ার। সভাপতি, বাংলাদেশ ইউএসএ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ, নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র
মতামত লেখকের নিজস্ব