কিনে জিততে না পারলে বিক্রি করে লাভ করা যায় না: মাহমুদুন্নবী সোহাগ
· Prothom Alo

তরুণ উদ্যোক্তাদের হাত ধরেই তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন ব্যবসা ও সম্ভাবনার গল্প। তবে একটি উদ্যোগ শুরু করা থেকে সেটিকে টিকিয়ে রাখা এবং এগিয়ে নেওয়ার পথ সহজ নয়। নানা চ্যালেঞ্জ, সিদ্ধান্ত ও শেখার অভিজ্ঞতা পেরিয়ে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা কীভাবে গড়ে তুলছেন নিজেদের স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান—সেই সব গল্প নিয়েই প্রথম আলো ডটকম ও প্রাইম ব্যাংকের যৌথ উদ্যোগে বিশেষ পডকাস্ট শো ‘লিগ্যাসি উইথ এমআরএইচ: সিজন–৩’। এই পর্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ রিদওয়ানুল হকের সঞ্চালনায় অতিথি ছিলেন শতমূল অ্যাগ্রোর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাহমুদুন্নবী সোহাগ।
‘আপনি যদি ব্যবসা করতে চান, আপনাকে হয় সময় লস দিয়ে শিখতে হবে অথবা টাকা লস করে শিখতে হবে। রাস্তায় যদি ফকিরও কোনো কিছু শেখায়, আমি তার কাছে বসে, তার পা ধরে শিখতে রাজি আছি!’
পডকাস্টে অংশ নিয়ে কথাগুলো বলেন মো. মাহমুদুন্নবী সোহাগ। পর্বটি প্রচারিত হয় শনিবার প্রথম আলোর ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোতে।
Visit freshyourfeel.com for more information.
পডকাস্টের শুরুতেই সঞ্চালক জানতে চান, শৈশব থেকে কীভাবে তাঁর প্রাণী পালনের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়েছিল এবং কবুতর পালনের শুরুটা কীভাবে?
উত্তরে মো. মাহমুদুন্নবী সোহাগ বলেন, ‘আমার শৈশব কেটেছে নাটোরে। ছোটবেলায় আমার একটি টিয়া পাখি পালনের ইচ্ছা ছিল। একসময় রংপুর থেকে আমার এক চাচা আমাকে একটি টিয়া পাখি এনে দেন। পরে নানাভাই আমাকে বোঝান, পাখিকে খাঁচায় আটকে রাখা মানে তাকে কষ্ট দেওয়া। সেই ঘটনা আমার মনে প্রভাব ফেলে। এরপর আমি আর পাখি পালন করিনি। ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময় থেকে কবুতর পালনের দিকে আমার আগ্রহ তৈরি হয়। কারণ, কবুতর খোলা পরিবেশে পালন করা যায়।’ তিনি আরও বলেন, ‘নাটোরে বিভিন্ন ধরনের কবুতরের খামার ছিল। আমি সেসব খামারে যেতাম, কবুতর দেখতাম এবং ধীরে ধীরে বিভিন্ন জাতের কবুতর সম্পর্কে জানতে শুরু করলাম। ২০০৯-১০ সালের দিকে নিয়মিত কবুতর কেনা শুরু করি। শখের এ কাজটাই একসময় আমার আয়ের একটি উৎস হয়ে ওঠে।’
প্রসঙ্গক্রমে সঞ্চালক জানতে চান, কবুতর পালন থেকে আয়ের সুযোগ কীভাবে তৈরি হয়েছিল?
মো. মাহমুদুন্নবী সোহাগ বলেন, ‘২০১২ সালের দিকে হলুদমুখো এক জোড়া কবুতরের বাজারমূল্য ছিল দুই লাখ টাকার বেশি। এর বাচ্চাও বিক্রি হতো ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা। একপর্যায়ে এক জোড়া কবুতর কেনার পর সেগুলো থেকে দুটি ডিম পাই। সেই ডিম থেকে পরবর্তী সময়ে কয়েকটি বাচ্চা উৎপাদন করে প্রায় দুই লাখ আট হাজার টাকায় বিক্রি করি। ২০১৪ সালের দিকে আমার কবুতরের মোট বাজারমূল্য দাঁড়ায় প্রায় ২৭ লাখ টাকা।’
তখন কবুতর পালন তাঁর কাছে শুধু শখ ছিল না, এটি বড় ধরনের অর্থ উপার্জনের সম্ভাবনাও তৈরি করেছিল বলে জানান সোহাগ। পরবর্তী সময়ে কীভাবে পরিস্থিতি বদলাল এবং ব্যবসায় বড় ধরনের ক্ষতি কী প্রভাব ফেলেছিল—সে সম্পর্কে মো. মাহমুদুন্নবী সোহাগ বলেন, ‘কবুতর পালন একধরনের শখের ব্যবসা। নতুন করে কবুতর পালা নিয়ে শৌখিন মানুষের আনাগোনা না থাকলে মার্কেটে কবুতরের মূল্য কমে যায়। তাই কবুতরের বাজারে ওই সময় হঠাৎ বড় ধরনের ধাক্কা আসে। একসময় যে কবুতরগুলোর বাজারমূল্য প্রায় ২৭ লাখ টাকা ছিল, সেগুলো শেষ পর্যন্ত মাত্র ২২ হাজার টাকায় বিক্রি করতে হয়েছিল আমাকে। এত বড় ক্ষতি আমার উদ্যোক্তা জীবনের অন্যতম বড় অভিজ্ঞতা হয়ে থাকবে।’
প্রসঙ্গক্রমে সঞ্চালক জানতে চান, কবুতরের পর কীভাবে ছাগল, ভেড়া ও গরুর খামার শুরু করলেন এবং সেখানে কী ধরনের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছিলেন?
উত্তরে মো. মাহমুদুন্নবী সোহাগ বলেন, ‘২০১২ সালে আমি ঢাকায় এসে ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে পড়াশোনা শুরু করেছিলাম। কবুতর পালন তখনো আমার শখ ও আয়ের একটি উৎস ছিল। তবে এই বড় ধরনের ক্ষতির পর ব্যবসা নিয়ে আমাকে নতুন করে ভাবতে হয়।’
নতুন ব্যবসা শুরুর প্রসঙ্গে মো. মাহমুদুন্নবী সোহাগ বলেন, ‘নাটোরে বাড়ির কাছেই আমি ছাগল, ভেড়া, দুম্বা ও ভারতীয় গরু নিয়ে খামার করার চেষ্টা করি। এ কাজে আমার কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না। ইউটিউবে বিভিন্ন ভিডিও দেখে নিজেই শেখার চেষ্টা করি। একসময় শুরু করি গবাদিপশু পালন। প্রায় দুই বছর পর রমজানের সময়ে পিপিআর ভাইরাসে এক রাতে প্রায় ৩২টি পশু মারা যায়। এ ঘটনায় বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি হয় আমার।’
একই সময়ে পরিবারের কাছ থেকেও বাধা আসা শুরু করে বলে জানান সোহাগ। তিনি বলেন, ‘পড়াশোনায় মনোযোগ না দিয়ে কেন আমি ব্যবসা নিয়ে ব্যস্ত, তা নিয়েও নানা প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়। ফলে একসময় প্রায় এক-দুই বছর ব্যবসা থেকে দূরেই ছিলাম।’
এরপর নতুন করে তাঁর ব্যবসায় ফেরার গল্প জানতে চান সঞ্চালক। তিনি জিজ্ঞেস করেন, কীভাবে আবার কৃষিভিত্তিক পণ্যের ব্যবসায় আসার চিন্তা হলো এবং গ্রামের খাঁটি পণ্য ঢাকার মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ধারণা তৈরি হলো?
জবাবে মো. মাহমুদুন্নবী সোহাগ বলেন, ‘ঢাকায় মেসে থাকার সময় খাবার ও পরিবেশের কারণে আমি প্রায়ই অসুস্থ বোধ করতাম। তখন গ্রামের খাঁটি খাবারের কথা মনে পড়ত। আমার পরিবারের কৃষির সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক ছিল। নানাভাইও কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সেখান থেকেই আমার মনে হয়, গ্রামের ভালো ও খাঁটি পণ্য ঢাকার মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব।’
সোহাগ আরও বলেন, ‘নাটোর থেকে আমি সারা দেশের বিভিন্ন স্থানে পরিচিতদের আম পাঠাতাম। অনেকেই সেই আম উপহার হিসেবে নিতে চাইত। ২০১৬-১৭ সালের দিকে অনলাইনে তাজা আমের বাজার এখনকার মতো বড় ছিল না। উপহার দেওয়ার সেই অভিজ্ঞতাকেই আমি ধীরে ধীরে ব্যবসায়িক উদ্যোগে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করি।’
‘শতমূল অ্যাগ্রো’র যাত্রা শুরুর প্রসঙ্গে জানতে চাইলে মো. মাহমুদুন্নবী সোহাগ বলেন, ‘ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট থেকে ডিপ্লোমা শেষ করে আমি গাজীপুরে বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরিতে ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাটাচমেন্টে যাই। ২০১৬ সালের শেষের দিকে গাজীপুর চৌরাস্তার কাছে এক ব্যক্তিকে রাস্তার পাশে মধু বিক্রি করতে দেখি। খোঁজ নিয়ে জানতে পারি, তিনি প্রতি কেজি মধু ৪০০ টাকায় কিনে ৮০০ টাকায় বিক্রি করছেন। তখন আমি তাঁকে প্রস্তাব দিই, বেশি পরিমাণে মধু দিলে তিনি ২৩০ টাকা দরে মধু সরবরাহ করতে পারবেন কি না। আমার প্রস্তাবে তিনি রাজি হন।’
সোহাগ বলেন, ‘এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বড় ভাই মাহমুদ ভাইয়ের মাধ্যমে আল মদিনা এন্টারপ্রাইজে নমুনা পাঠাই। পণ্য পছন্দ হওয়ায় তারা বেশি পরিমাণ মধু কিনে নেয় আমার কাছ থেকে। এ ঘটনা আমাকে ব্যবসা নিয়ে আরও আত্মবিশ্বাসী করে তোলে।’
আলোচনার শেষ পর্যায়ে সঞ্চালক জানতে চান, ব্যবসায় লাভ আসলে কেনার সময় নাকি বিক্রির সময়?
উত্তরে সোহাগ বলেন, ‘ব্যবসার মূল জায়গাটি হলো “কেনা”। আমার মতে, আপনাকে কিনে জিততে হবে। আপনি যদি কিনে জিততে না পারেন, তাহলে বিক্রি করে লাভ করতে পারবেন না।’