ঘুটঘুটে অন্ধকার, এক প্রান্তে আলোর রেখা—এমন গা ছমছমে সুড়ঙ্গ আছে বান্দরবানেই
· Prothom Alo
দুই পাশে পাথরের দেয়াল। ভেজা, স্যাঁতসেঁতে। গুমোট অন্ধকারে দেয়ালগুলো যেন চেপে ধরবে দুই পাশ থেকে। অজানা আশঙ্কা, ভয় আর রুদ্ধশ্বাস উত্তেজনার একটা মিশ্র অনুভূতি নিয়ে গুহায় চলতে চলতে এক প্রান্তে আলোর দেখা মিলবে। হলিউডের কোনো রোমাঞ্চকর চলচ্চিত্রের দৃশ্য নয়, বান্দরবানের আলীকদমের ‘আলী সুড়ঙ্গের’ বিবরণ এটি।
আলীকদমের ‘আলী সুড়ঙ্গ’, নামটার মধ্যেই আছে রহস্য। পাহাড়ের গভীর খাদে এই সুড়ঙ্গের সৃষ্টি। ভূতাত্ত্বিকদের মতে, হাজার বছরের পানির প্রবাহ আর বাতাসের ঘর্ষণ এ ধরনের প্রাকৃতিক বিস্ময়ের জন্ম দিয়ে থাকে। সম্ভবত আলী সুড়ঙ্গের জন্মও এমন প্রক্রিয়ায় হয়েছে। তবে দুর্গম এই সুড়ঙ্গে নাম কে আলী সুড়ঙ্গ রাখল? কীভাবে এর নামকরণ হলো, এর কিছুই সঠিক জানা যায় না। গুহার রহস্য এখনো কেউ উদ্ঘাটন করতে পারেনি। তবে যেখানে রহস্য, সেখানেই কৌতূহল। এই কৌতূহলের টানেই আলী সুড়ঙ্গ দেখতে পর্যটকের ঢল নামে।
Visit betsport.cv for more information.
গুহায় যাওয়ার পথটা মোটেও সহজ নয়। দুই পাশে উঁচু পাথুরে দেয়াল, মাঝে গড়িয়ে চলেছে পাহাড়ি ঝিরি। সেই ঝিরি ধরে গেলে দেখা মিলবে আলী সুড়ঙ্গেরগভীর জঙ্গলের মধ্য দিয়ে হাঁটাপথ। সেই পথে দেখা মিলবে রংরাং নামের পাহাড় থেকে নেমে আসা তৈনখালের। খালের তীরে দুটি পাহাড় দুই পাশে খাড়া দেয়াল তুলে দাঁড়িয়ে আছে। দেয়ালের সরু খাত ধরে বয়ে যাওয়া একটা ঝিরি দিয়ে ৪০০ মিটার গেলেই আলী সুড়ঙ্গ। এই পথে যেমন পদে পদে বিপদ রয়েছে, তেমনি রয়েছে তৈনখালের বন্য সৌন্দর্যের হাতছানি।
আলী সুড়ঙ্গে যাওয়ার পথটি মোটেও সহজ নয়। এ জন্য প্রথমে আলীকদম উপজেলা সদর থেকে তিন কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে তৈনখালের তীরে মারমা পাড়ায় (মং চ প্রু পাড়া) আসতে হবে। এই মারমা পাড়া পর্যন্ত সিএনজি অটোরিকশা ও মোটরসাইকেলে যাওয়া যায়। সেখান থেকে গভীর জঙ্গলের মধ্য দিয়ে হাঁটাপথ। সেই পথে দেখা মিলবে রংরাং নামের পাহাড় থেকে নেমে আসা তৈনখালের। খালের তীরে দুটি পাহাড় দুই পাশে খাড়া দেয়াল তুলে দাঁড়িয়ে আছে। দেয়ালের সরু খাত ধরে বয়ে যাওয়া একটা ঝিরি দিয়ে ৪০০ মিটার গেলেই আলী সুড়ঙ্গ। এই পথে যেমন পদে পদে বিপদ রয়েছে, তেমনি রয়েছে তৈনখালের বন্য সৌন্দর্যের হাতছানি।
চিরহরিৎ প্রাকৃতিক বনবেষ্টিত ৯০ ডিগ্রি খাড়া পাথুরের শতাধিক ফুট উঁচু পাহাড়ের খাদে আলী সুড়ঙ্গের ঝিরি। ঝিরির পানিপ্রবাহের ২০ থেকে ২৫ ফুট উঁচুতে সুড়ঙ্গের প্রবেশমুখ। আগে ঝিরি থেকে সুড়ঙ্গে ওঠা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। সেনাবাহিনীর আলীকদম জোন থেকে সাত-আট বছর আগে দুই ধাপে দুটি লোহার সিঁড়ি নির্মাণ করে দেওয়া হয়েছে। এতে দর্শনার্থীদের সুড়ঙ্গে যাতায়াত সহজ হয়েছে। দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমে গেছে।
আলীকদমের ট্যুর গাইডের সভাপতি মিন্টু কর্মকার জানিয়েছেন, প্রবেশমুখ থেকে সুড়ঙ্গটি ৮০ থেকে ৯০ ফুট দীর্ঘ হবে। প্রায় ১০ ফুট ভেতরে গেলে সম্পূর্ণ অন্ধকার।
আলো জ্বালিয়ে অন্ধকার ভেদ করে আনুমানিক ৬০ ফুট গেলে সুড়ঙ্গের পথ সংকীর্ণ হয়েছে। সংকীর্ণ অংশটি খুব সহজে অতিক্রম করা যায় না। কিন্তু সেই অংশটি অতিক্রম করা গেলে সুড়ঙ্গের পেছন মুখ দিয়ে বের হয়ে আসা সম্ভব। সুড়ঙ্গের অন্ধকার অংশে প্রচুর বাদুড়ের উপস্থিতি রয়েছে।
মিন্টু কর্মকার জানান, প্রতিদিন প্রচুর পর্যটক আলী সুড়ঙ্গে যান। তবে সাপ্তাহিক ছুটি শুক্র ও শনিবারে সবচেয়ে বেশি পর্যটকের সমাগম হয়।
এক সময় ঝুঁকি নিয়ে উঠতে হতো আলী সুড়ঙ্গে। কিন্তু এখন সেনাবাহিনী পর্যটকদের সুবিধার্থে সেখানে মইয়ের ব্যবস্থা করে দিয়েছেআলী সুড়ঙ্গ ও আলীকদম নিয়ে রহস্য ও কৌতূহলের শেষ নেই। পাথরের পাহাড়ে এই সুড়ঙ্গ বা গুহা কীভাবে হলো, নাম কোথা থেকে এল, এখনো রহস্যের উদ্ঘাটন হয়নি। এ জন্য পর্যটকদের আরও বেশি কৌতূহলী করে। আলীকদম মৌজার প্রবীণ হেডম্যান (মৌজাপ্রধান) অংহ্লাচিং মারমা মতে, আলেকোয়াতং থেকে আলী সুড়ঙ্গ ও আলীকদম নাম হয়েছে। আলী সুড়ঙ্গের পাহাড়ে একসময় বুনো কবুতর ছিল। পাড়ার শিশুদের অসুখ-বিসুখে কবুতরদের খাবার উৎসর্গের মানত করা হতো। এ জন্য পাহাড়ের নাম কবুতরকে খাবার উৎসর্গের পাহাড় বা আলেকোয়াতং। মারমা ভাষায় আলে অর্থ উৎসর্গ বা পূজা, কোয়া মানে কবুতর এবং তং হলো পাহাড়।
তবে গিরিনন্দিনী আলীকদম বইয়ের লেখক মমতাজ উদ্দিন আহমদ বলেছেন, সপ্তদশ শতকের মধ্যভাগে আরাকান ও মোগল শাসনের প্রভাবে টিকতে না পেরে চাকমা রাজপরিবার ও শাহ সুজার কিছু অনুসারী আলীকদমে বসতি স্থাপন করেছ। পরবর্তী সময়ে তঞ্চঙ্গ্যাদের অনেকে আরাকান থেকে এসেছে। তঞ্চঙ্গ্যা ভাষার আইলেংতং থেকে আলীকদম ও আলী সুড়ঙ্গের নাম হয়ে থাকতে পারে।