প্রিয় শিক্ষকের অশ্রুসজল ও বর্ণিল বিদায়

· Prothom Alo

দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনের সফল সমাপ্তি টেনে অবসরে গেলেন সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলার সোনাখাড়া ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী সোনাখাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হাফিজুর রহমান সরকার। তাঁর এই বিদায়লগ্নে ভালোবাসার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন সোনাখাড়া গ্রামের একঝাঁক উদ্যমী তরুণ ‘সোনার ছেলেরা’।

প্রথাগত বিদায় সংবর্ধনার নিয়ম ভেঙে প্রিয় শিক্ষককে তাঁরা বিদায় জানালেন এক ব্যতিক্রমী, বর্ণিল ও আড়ম্বরপূর্ণ আয়োজনের মধ্য দিয়ে। শুধু আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না এই আয়োজন; পুরো বিষয়টি রূপ নিয়েছিল সোনাখাড়া গ্রামের এক মিলনমেলা ও সামাজিক আনন্দ উৎসবে।

Visit newsbetting.cv for more information.

হাফিজুর রহমান সরকার সোনাখাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই এর সার্বিক কার্যক্রমের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত ছিলেন। এই অঞ্চলে শিক্ষা বিস্তারে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। পরম মমতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে বহু শিক্ষার্থীকে তিনি গড়ে তুলেছেন, দিয়েছেন আলোর দিশা। দাপ্তরিক হিসাব অনুযায়ী শিক্ষক হাফিজুর রহমান সরকারের শেষ কর্মদিবস ছিল ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬। তবে গ্রামের অনেক তরুণ ও বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী পড়াশোনার ও কর্মের তাগিদে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অবস্থান করায় কর্মদিবসে উপস্থিত হওয়া কঠিন ছিল। প্রিয় শিক্ষককে বিদায় জানানোর ঐতিহাসিক মুহূর্তে যেন সবাই থাকতে পারেন, তাই সাপ্তাহিক ছুটির দিনটিকে বেছে নেওয়া হয়। তরুণেরা নিজেদের উদ্যোগে চাঁদা তুলে এবং গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠ ও মুরব্বিদের সঙ্গে পরামর্শ করে বর্ণাঢ্য ও ব্যতিক্রমী এই সংবর্ধনার পরিকল্পনা ও আয়োজন করেন।

বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে আয়োজিত বিদায় অনুষ্ঠানে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। সাবেক ও বর্তমান সহকর্মী, শিক্ষার্থীরা প্রিয় শিক্ষকের সঙ্গে কাটানো স্মৃতি স্মরণ করে আবেগপ্লুত হয়ে পড়েন। সত্যিকার অর্থে হাফিজুর স্যার কেবল একজন শিক্ষক ছিলেন না, তিনি ছিলেন এই অঞ্চলের অভিভাবক ও আলোকবর্তিকা। তিনি সর্বদা শিক্ষার্থীদের অক্ষর জ্ঞানের পাশাপাশি সৎ ও আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠার শিক্ষা দিয়েছেন।

বিদায় অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ত্ব করেন সুলতান মাহমুদ, সাবেক প্রধান শিক্ষক সোনাখাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বক্তব্য দেন সোনাখাড়া ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান আব্দুল জাব্বার, আফরুনা খানম, প্রধান শিক্ষক, রুপাখাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, স্বপন কুমার সরকার, প্রধান শিক্ষক, সোনাখাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও আব্দুল হালিম সরকার।

আলোচনা সভা শেষে বিদায়ী শিক্ষকের হাতে সম্মাননা স্মারক (ক্রেস্ট) ও বিভিন্ন উপহারসামগ্রী তুলে দেওয়া হয়। উৎসবমুখর এই দিনে গ্রামের প্রায় ৫০০ মানুষের জন্য প্রীতিভোজের চমৎকার আয়োজন করা হয়।

তবে অনুষ্ঠানের মূল আকর্ষণ ছিল প্রিয় শিক্ষককে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার রাজকীয় কৌশল। সাধারণ কোনো যানবাহনে নয়, ফুল ও রংবেরঙের কাপড়ে সুন্দর করে সাজানো একটি ঘোড়ার গাড়িতে প্রিয় গুরুজিকে বসানো হয়। বাদ্যযন্ত্রের সুরে সুর মিলিয়ে আনন্দ শোভাযাত্রাসহকারে সোনাখাড়া গ্রাম ছাড়িয়ে পার্শ্ববর্তী রুপাখাড়া গ্রামে শিক্ষকের নিজ বাসভবনে তাঁকে পৌঁছে দেওয়া হয়। শোভাযাত্রার খবর পেয়ে রাস্তার দুই ধারে গ্রামের সর্বস্তরের মানুষ সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে প্রিয় শিক্ষককে হাত নেড়ে শুভেচ্ছা ও সম্মান জানান।

শিক্ষকতা জীবন থেকে বিদায় নিলেও এলাকাবাসী ও শিক্ষার্থীদের এমন স্বতঃস্ফূর্ত ভালোবাসায় গভীর আবেগপ্লুত হয়ে পড়েন শিক্ষক হাফিজুর রহমান সরকার। আবেগঘন কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘একজন শিক্ষকের জীবনে এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কিছু হতে পারে না। আমার সব শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও এলাকাবাসীর প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।’ তিনি তরুণদের এই ঐক্যবদ্ধ ও ব্যতিক্রমী উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং তাঁদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কামনা করেন।

লেখক: অধ্যাপক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ ও অতিরিক্ত পরিচালক, উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট, খুলনা-৯২০৩।

নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

Read full story at source