সুরসম্রাট আলাউদ্দিন খাঁ

· Prothom Alo

সাঈদ আহমদের নিবন্ধ ‘বাংলাদেশের সুরস্রস্টারা– সুরসম্রাট আলাউদ্দিন খাঁ’ ২০০১ সালের ২১ ডিসেম্বর প্রথম আলোর সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়। এত দিন লেখাটি শুধু কাগজের পাতাজুড়ে ছিল, আজ অন্য আলোর অনলাইন পাঠকের জন্য তুলে ধরা হলো।

ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ-র জন্ম ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার শিবপুর গ্রামে। বড় ভাইদের মতো তিনিও এই গ্রামে গানবাজনার চর্চা শুরু করেন। ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ-র বংশের ঐতিহ্যই বলা যায় একে। তাঁদের উৎপাদন পুরুষ সম্মত হোসেন খাঁ বিখ্যাত ছিলেন। তাঁর বাবার নাম ছিল সদোর হোসেন। সাফদার হোসেন খাঁ-র ডাকনাম ছিল সাদু। তিনি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের পরিবেশেই মানুষ হয়েছিলেন। সাফদার হোসেন খাঁ বিখ্যাত "রাধার বন্দনা" গুঞ্জাল আখা এবং ধামারের পদ তৈরি করেন এবং রাধাকান্তের নামেও বিখ্যাত হয়ে ওঠেন। ওস্তাদ কাশেম আলী খান ত্রিপুরার রাজার সভাগায়ক ছিলেন। সাফদার হোসেন খাঁ-ও ত্রিপুরার রাজার সভাগায়ক হিসেবে বিখ্যাত হয়েছিলেন।

Visit rouesnews.click for more information.

সাফদার হোসেন খাঁ-র ছিল পাঁচ ছেলে—সোলাউদ্দিন খাঁ, আফতাব উদ্দিন খাঁ, আলাউদ্দিন খাঁ, নায়েব আলী খাঁ এবং আয়েত আলী খাঁ। এই পাঁচ ছেলের মধ্যে তিন ছেলে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে বিশেষ খ্যাতিমান হয়েছিলেন। আফতাবউদ্দিন খাঁ, আলাউদ্দিন খাঁ এবং নায়েব আলী খাঁ। বঙ্গীয় রাজাদের তাঁকে কোনো সুন্দর গ্রামে দেখা যেত আবার হয়তো তাঁকে কুমিল্লা বা কলকাতা শহরে দেখা যেত। আফতাব উদ্দিন খাঁ বাঁশি, তবলা, হারমোনিয়াম বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র বাজাতেন।

একটি সুন্দর গল্প শোনা যায় যে, একদিন সকালে আফতাবউদ্দিন খাঁ কলকাতার ভবানীপুরে নাটোরের মহারাজা যোগীন্দ্রনাথের প্রসাদে বেহালা বাজাচ্ছিলেন। মহারাজা ভালো সুরেই আফতাবউদ্দিন খাঁ সাহেবকে অভ্যর্থনা জানান। বাঁ সাথেই তাঁর অসামান্য পকেট থেকে বাঁশি বের করে এক বিশেষ সুর বাজাতে শুরু করেন। দেখা গেল, ধীরে ধীরে পাখিরা ওই ঘরে ঢুকতে আরম্ভ করেছে। কেউ ল্যাম্পের ওপর, কেউ জানালার তাদের ওপর চুপচাপ বসে থাকল। একটা টু শব্দও করল না। মন্ত্রমুগ্ধের মতো তারা বাজনা শুনল। বাজনা শেষ হওয়ার পর তারা ধীরে ধীরে উড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। মহারাজা যোগীন্দ্রনাথ নিজ চোখে দেখা এই ঘটনার কথা জানিয়ে গেছেন। তিনি আফতাবউদ্দিন খাঁকে সঙ্গীত ও আধ্যাত্মিকতার সিদ্ধপুরুষ বলে বর্ণনা করেছেন।

এই সাধকপুরুষের হাতেই ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ-র সঙ্গীত শিক্ষার হাতেখড়ি হয়। আলাউদ্দিন খাঁকে তাঁর বাবা আদর করে ডাকতেন, ''আলম''—আর অর্থ পৃথিবী। সঙ্গীত দিয়ে আলাউদ্দিন খাঁ পৃথিবী জয় করেছিলেন।

একদিন আলাউদ্দিন খাঁ কাউকে না জানিয়ে বাড়ি থেকে পালিয়ে গেলেন। ঢাকায় এসে থিয়েটারে কিছু দিন কাটালেন। তিনি হামখাম থিয়েটারেও যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু এ জীবন তার বেশিদিন ভালো লাগল না। কলকাতার সঙ্গীত জগৎ তাঁকে হাতছানি দিয়ে ডাকছিল। কলকাতার নাদু গোপাল নামে এক বিখ্যাত গায়ক, যার আসল নাম ছিল গোপাল কৃষ্ণ ভট্টাচার্য তাঁর আস্তানায় গিয়ে উঠলেন। নাদু গোপালের ওই সময় অনেক সাগরেদ ছিল। আলাউদ্দিন খাঁ নাদু গোপালের সাগরেদ হওয়ার জন্য অনেক পীড়াপীড়ি করে তার শিষ্য হলেন। গুরু তাঁকে এক নিমেষে শতেক শাস্ত্র বানাতে রাজি হলেন। শর্ত ছিল তিনি ১২ বছর গুরুকে ছেড়ে কোথাও যাবেন না। আলাউদ্দিন খাঁ তা-ই মেনে নিয়ে গুরুচরণ সেবা এবং তাঁর সমস্ত নির্দেশ মেনে চললেন। এভাবে সাত বছর কাটাবার পর হঠাৎ গুরুর মৃত্যু হলো। এই জ্যৈষ্ঠে আলাউদ্দিন খাঁকে ভীষণভাবে আঘাত করল। তিনি গান গাওয়াটা ছেড়ে দিলেন এবং বাদ্যযন্ত্র বাজাতে শুরু করলেন। সেই যুগে সঙ্গীতশিক্ষার জন্য গুরুও সাধনা করাটাই একমাত্র পথ ছিল। গুরুর দয়া হলেই শিষ্য সঙ্গীতের মর্মে গিয়ে পৌঁছাতে পারতেন।

আলাউদ্দিন খাঁ গান ছেড়ে বাজনা বাজাতে শুরু করলেন। কলকাতার মিনার্ভা থিয়েটারে একটা চাকরি জুটে গেল। সঙ্গীত পাগল আলাউদ্দিন খাঁ এই সুযোগে "মিনার্ভা লোকো" নামে এক বিখ্যাত বেহালাবাদকের কাছে পাত্তাপাড়ি চড়েন এবং অমর দাস বাবুর কাছে ভারতীয় ঢংয়ে বেহালা বাজানো শিখতে আরম্ভ করেন। এই সময় তিনি নন্দলাল নামের এক মৃদঙ্গবাদকের কাছে পাখোয়াজ বাজানো শিখলেন। এভাবে কিছুদিনের মধ্যেই নাটকের সাথে চার্বিন্যাট এবং ঢোলক বাজনার সাথে সানাই বাজানো শিখলেন। মোট কথা, কিছুদিনের মধ্যেই তিনি বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র বাজাতে পারদর্শী হয়ে উঠলেন। এ সময় একদিন তিনি রাজা জগৎকিশোরের রাজসভায় বাজনা শোনানোর সুযোগ পেলেন। রাজা জগৎকিশোরও তাকে যথেষ্ট সম্মান দেখালেন। এই সভাতেই আলাউদ্দিন খাঁ ওস্তাদ আহমাদ আলী খানের সুরের বানান শুনলেন। মুগ্ধ আলাউদ্দিন খাঁ ওস্তাদ আহমাদ আলীর কাছে সনদের শেখার জন্যে অনেক অনুরোধ জানালেন। রাজা জগৎকিশোরের আলাউদ্দিন খাঁ-র যোগ্যতা ও আগ্রহ দেখে ওস্তাদকে তাঁকে শীর্ষত্বে বরণ করার জন্য অনুরোধ করলেন। এরপর তার বহুল ওস্তাদ আহমাদ আলী খাঁয়ের সান্নিধ্যে তাকে বসে আলাউদ্দিন খাঁ সরোদ বাজনা শিখেছিলেন। আলাউদ্দিন খাঁ-র গভীর বাসনা ছিল রামপুর নবাব দরবারে ওস্তাদ ওয়াজির খাঁ সাহেবের কাছে আরো সঙ্গীত শেখার। রামপুরে তিনি গেলেন, কিন্তু দিনের পর দিন চেষ্টা করেও ওস্তাদের কাছে পৌঁছাতে পারলেন না। প্রাসাদের দারোয়ানরা তাঁকে ঢুকতেই দিল না। ক্রমে তাঁর অবস্থা এতই খারাপ হলো যে, তিনি আত্মহত্যা করার জন্যে প্রায় প্রস্তুত হয়ে গেলেন। দুটি পোলা আফিমও কিনে নিয়ে এলেন। ভাগ্যক্রমে তিনি যে বাসায় থাকতেন সেখানে এক মৌলভি সাহেবের থাকতেন। তিনি আলাউদ্দিন খাঁকে অনেক বুঝিয়ে আত্মহত্যা করা থেকে বিরত করলেন। তিনি রামপুরের নবাবের বরাবরে একটি আরজি লিখে দিলেন যেন নবাব সাহেব দয়া করে আলাউদ্দিন খাঁকে ওয়াজির আলী খান সাহেবের কাছে সরোদ শেখার সুযোগ করে দেন।

এর পরের ঘটনা আরো চমকপ্রদ। রামপুরের নবাব বাড়িতে বসে থিয়েটার দেখতে যাচ্ছিলেন। আলাউদ্দিন খাঁ পথের মধ্যেই নবাব সাহেবের গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে পড়লেন। নবাব গাড়ি থামাতে বাধ্য হলেন। আলাউদ্দিন খাঁ কোনোমতে উর্দু-বাংলা মিশিয়ে তাঁর অবস্থার কথা বলে গেলেন। নবাবের হুকুমে লোকজন তাঁকে সরিয়ে দিলেন। নবাব গাড়ি চালাতে হুকুম দিলেন। আলাউদ্দিন খাঁ মরিয়া হয়ে পকেট থেকে আফিমের গুলি বার করে নবাবের সামনে ধরে বলতে লাগলেন, "আপনি যদি আমাকে না সাহায্য করেন আমি এখানে এই আফিম খেয়ে নিজের জান দিয়ে দেব। আপনি মেহেরবানি করে আমার আরজিটা পড়ুন।" এই বলে আরজিটি নবাবের হাতে দিলেন। নবাব বাধ্য হয়ে আরজিটি পড়লেন এবং বললেন, "ঠিক আছে আগামীকালে আমার সভায় এসো এবং তোমার বাজনা পরিবেশন করো। অন্যা তোমার বাজনা শুনব।"

পরের দিন নবাবের দরবারে আলাউদ্দিন খাঁ হাজির হলেন। যত ধরনের বাদ্যযন্ত্র তিনি বাজাতে শিখেছিলেন, সবগুলিই একে একে নিপুণতার সাথে পরিবেশন করলেন। উপস্থিত শ্রোতারা সবাই তাঁর প্রতিভা দেখে চমৎকার হলেন। নবাব বেশ খুশি হলেন এবং ওস্তাদ ওয়াজির খানকে অনুরোধ করলেন আলাউদ্দিন খাঁকে শিষ্যত্বে বরণ করে নিতে। ওয়াজির খান সাহেব আলাউদ্দিন খাঁকে মর্মে শিষ্যত্বের "নাক্তা" বেঁধে দিলেন। শুরু হলো আলাউদ্দিন খাঁ-র আর এক সাধনার পর্ব। একটানা ১২ বছর তিনি ওয়াজির খান সাহেবের কাছে তাঁর ঘরানার বাজনা শিখে যেতে লাগলেন। তাঁর এই একাগ্রতা ও নিষ্ঠা প্রবাহে পরিণত হলো।

১৯১৪ সালে রামপুরের নবাব আলাউদ্দিন খাঁকে মাইহারে রাজার কাছে পাঠিয়ে দিলেন। মাইহারের রাজা তাঁকে সসম্মানে গ্রহণ করে সভাগায়ক হিসেবে নিযুক্ত করলেন। মাইহার যদিও একটা ছোট রাজ্য ছিল কিন্তু মহারাজা তাঁর বদান্যতা ও শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের পৃষ্ঠপোষকতার কারণে তখন ভারতবর্ষে বিখ্যাত হয়ে উঠেছিলেন। ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ এবং মহারাজার মধ্যে গভীর শ্রদ্ধা ও বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল এবং এই সম্পর্ক আলাউদ্দিন খাঁ সাহেবের জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত অক্ষুণ্ন ছিল। সরোদবাদক হিসেবে তাঁর খ্যাতি চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল। বাজনার পাশাপাশি তিনি নিজেও অনেক নতুন রাগ ও রাগিণী সৃষ্টি করেছিলেন। তাঁর সৃষ্টি রাগের মধ্যে রয়েছে—হেমন্ত, প্রভাত কেলী, হেম বেহাগ এবং মদন মঞ্জরী।

ব্রিটিশ গভর্নমেন্ট তাঁকে খাঁ সাহেব উপাধি প্রদান করে। তিনি ভারত সরকারের কাছ থেকে "পদ্মভূষণ" এবং "পদ্মবিভূষণ" উপাধি পান। তিনি কোনো "ঘানা" থেকে আসেননি কিন্তু তিনি নিজেকে এক ঘরানা তৈরি করে দিয়ে যান। তাঁর শিষ্যদের মধ্যে তিমিরাবরণ, পান্না লাল ঘোষ, অন্নপূর্ণা দেবী, রবি শঙ্কর, তনয়া রেনুকারা বেগম উল্লেখযোগ্য।

১৯৫২ সালের কথা। আমার ইচ্ছা হলো ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁয়ের কাছে সেতার শেখার। রামপুর হোসেন খাঁ ছিলেন আলাউদ্দিন খাঁ-র ভাইপো। তাঁর সাথে আমার বন্ধুত্ব ছিল। একদিন সুযোগ বুঝে রামপুর হোসেন খাঁ ওস্তাদকে বললেন যে, ঢাকা রেডিও থেকে ওস্তাদ খাঁ-র ইন্টারভিউ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি শাহবাগ মাইহাকে ঢাকা আলাউদ্দিন খাঁ সাহেবের কাছে আমাকে বললেন, ''যাব কি না।'' আমি যেতে সম্মত হলাম। তবে আমরা আলাদা গেলাম। রামপুর হোসেন খাঁ প্রথমে কলকাতায় গেলেন তার মামা সেতারবাদক ওস্তাদ আলী আহমদ খানের বাড়িতে। সেখানে তাঁর সঙ্গে আমি মিলিত হলাম। আমরা কলকাতার জুনিয়র থেকু মাইহারে গেলাম। সেখানে প্রথম ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ-র সঙ্গে সাক্ষাৎ হলো। তাঁর কাছে দীক্ষা নেওয়ার আমার ইচ্ছার কথা বললাম। বাবা বললেন, ''তুমি কি বলছ! আমি তোমাকে নিয়ে এসেছি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার শিবপুর বাবা মার কবর জিয়াত করতে। সেখান থেকে ঢাকায় যাব। আমার ভাইপো কাশেম হোসেন খাঁ, অত্যন্ত প্রাক্স। তুমি তার কাছে চলে যাও এবং দীক্ষা নাও। আমি তো ঘরে দুবার ঢাকায় যাই। দেখা হবে।'' তাঁর নির্দেশ আমি ঢাকায় ফিরে আসি। তিনি ঢাকায় আমাকে ওস্তাদ কাশেম হোসেন খাঁ-র হাতে তুলে দিলেন। ওস্তাদ কাশেম হোসেন খাঁ তাঁর ভাইপোই নয়, প্রিয় শিষ্যও ছিলেন। দীর্ঘদিন ধরে আমাদের পরিবারের সঙ্গে বিশেষ করে আমার রাঙ্গা ও চাচার সঙ্গে ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ-র হৃদ্যতা থাকা সত্ত্বেও গুরুর ওস্তাদের পদের কাছে বসার সৌভাগ্য আমার হয়নি। আমার চাচা মির্জা আব্দুল কাদেরের বাড়িতে ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ-র ব্যবহারের জন্য একটা বেহালা সবসময়ে রাখা ছিল।

আমার মনে পড়ে একবার ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ কুমিল্লা এসেছিলেন পারিবারিক প্রয়োজনে। আমি এবং আমার শুভাকাঙ্ক্ষী সলিমুল্লাহ বলু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ হলের প্রভোস্ট ড. ওসমান গনি সাহেবকে অনুরোধ করে সলিমুল্লাহ হলে ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ-র বাজনা শোনার ব্যবস্থা করলাম। বিকেলের মধ্যেই সলিমুল্লাহ হলে ছাত্রদের অসামান্য ভিড় জমে উঠল। ভিড় হলো মেম্বার ওয়ান সে-ঐতিহাসিক, প্রামাণ্য, সিপাহি, বারান্দা সর্বত্রই। কৃষ্ণচন্দ্র ওস্তাদ সঙ্গীত খেলা ও উপযোগ করার মতো পরিবেশ রাজপ্রাসাদের মতো গড়ে উঠল। আমরা ভয় পাচ্ছিলাম হয়তো শেষ পর্যন্ত অনুষ্ঠানটি সুন্দরভাবে করাই যাবে না। হয়তো ভদ্রলোকটি রেগে উঠে যাবেন। কিন্তু এত বিখ্যাত বাদ্য সমঝদারী ব্যক্তিত্বকে বিচলিত না হয়ে ধীরে ধীরে দরবারে অবস্থান শুরু করলেন। তাঁর জাদুকরী হাতের ছোঁয়াতেই শুরু হলো সুরের মুর্ছনা এমন এক মায়াজাল সৃষ্টি করে চলল, মুহূর্তে গোটা হল নিস্তব্ধ হয়ে গেল। ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ-র সঙ্গে সরোদে ছিলেন ওস্তাদ করামত হোসেন খান। প্রায় দুঘণ্টা ধরে তিনি সরোদ বাজিয়ে শোনালেন। বাজনা শেষ হলে সমস্ত হল আনন্দে ফেটে পড়ল। এরপর ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ তাঁর বেহালা নিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। ''কসবাটের'' এই বাজনার তার সহবাদকদের নিয়ে তিনি ''তিলাক কামোদ'' রাগ পরিবেশন করলেন। ওটা তাঁর অত্যন্ত প্রিয় রাগ ছিল। সেদিনের বাজনার পর আর এ ধরনের বাজনা ঢাকায় শোনা যায়নি। গোটা হলের দর্শক-শ্রোতারা মুগ্ধ করারি আর হর্ষধ্বনির মাধ্যমে ওস্তাদজিকে সম্মান জানাল।

অনুষ্ঠান শেষে, ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ আমাদের ইসলামপুরের বাড়িতে খাওয়ার দাওয়াতে এলেন। তিনি নামাজ শেষ করে মজলিসে এসে বসলেন। বললেন, ''এসো, আমি তোমাদের সঙ্গে ঢাকার বিখ্যাত কাচ্চি পোলাও এবং জর্দা খাব।'' তিনি অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে বললেন, ''আমার কাছে কোনো সময় নেই। তবুও আমার যে আত্মা তা থেকে তোমাদের কিছু দিতে চাই। কালই ওস্তাদজী তাঁর বিখ্যাত রাগ ''হেমন্ত'' বাজিয়ে আমাদের আনন্দ দিলেন। রাত শেষটায় বাজে মন্ত্রমুগ্ধ শ্রোতারা তাঁর বাজনা শুনলেন।

পরের দিন ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁকে ঢাকার বলধা গার্ডেনে নাগরিক সংবর্ধনা দেওয়া হলো। সাজানো বাগানে দেওয়া সংবর্ধনায় অতিথিদের মধ্যে মঞ্চে ছিলেন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, সঙ্গীতজ্ঞ আশরাফ আহাদ, বিশিষ্ট সমাজসেবক নাজির আহমদ ও পৌর কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান কাজী রশীদ। রাজনীতির রাতে ফুলর তোড়া, উপহার তোড়া তুলে দেওয়া হয়।

আলাউদ্দিন খাঁ-র উদারতার কথা বলি। ১৯৫২ সালে ভারতের রাষ্ট্রপতি ভবনে দুই গুণী ব্যক্তি আলাউদ্দিন খাঁ ও মুস্তাক হোসেন রামপুরীতে সম্মানসূচক খেতাব দেওয়া হলো। আলাউদ্দিন খাঁ পেলেন "বংশীপ্রদীপ" এবং মুস্তাক হোসেন রামপুরী পেলেন "গান রত্ন"। অনুষ্ঠান শেষে স্যর প্রীতির বাড়িতে রাতের খাবার দাওয়াত ছিল। ''আমার বন্ধু স্যর প্রীতির সোঁইজু অরুণ রায়।'' তার বাবার নাম ছিল ভারত রায়। ভারত রায়ের স্ত্রী আমার মাতা আলাউদ্দিন খাঁ-র বাসাদেব ছিলেন। স্যর প্রীতির সেতার শেখাতেন অরুণ রায়কে। স্যর প্রীতম বেলভেডি ছিলেন। কিন্তু আলাউদ্দিন খাঁ সুরের জগতে পুজো ভারতবর্ষের শিরোমণি। হিন্দু ঘরাণার লোক গুণীদেরও কিছু বাজিয়ে শোনালেন। এবার বাজানোর পালা। আলাউদ্দিন খাঁ সুরটিকে মুক্ত উপকূলে ধরলেন। তাঁর সামনে রয়েছে একটা টুকটাক বাক্স। এতক্ষণ তখন ঢোলকটির প্রতিটি লয় করছিল, যে গুটিকেক নেওয়ার জন্য গোঁ পড়ল। ছেলের অবস্থা দেখে বাবা বিব্রত আর স্যর প্রীতম লজ্জিত। অলক, একবারে নাছোড়বান্দা, কত ছল-চাতুরী করে বাবা ওই মন মেলাতে চাইলেন। কিন্তু ছেলের ভুলটির বাজনা চলল। আলাউদ্দিন খাঁ পকেট থেকে একটা পকেটে ঘড়ি বের করে তাকে দেখালেন। ওটা রাষ্ট্রপতি ভবন থেকে এখনই উপহার পেয়েছি। আলাউদ্দিন খাঁ বললেন, ''এই টুকরোটি আমি বরু ভালোবাসি, বড় দামি মুকুট, রাষ্ট্রপতি ভবন থেকে এসেছি। এই ঘড়িটিও রাষ্ট্রপতি ভবন থেকে পেয়েছি। এটাই বাবা তুমি নাও। এটা তোমার পুরস্কার।'' তখন আমাকে ছেলেবেলার এই গল্পটা শোনাল। একথা অলকের কাছে পরিবেশ অত্যন্ত অদ্ভুত। ভালোবাসার নিদর্শন এখনো তার কাছে আছে। আলাউদ্দিন খাঁ-র উদারতা—কথা সর্বজনবিদিত। তিনি ছোট ছেলেমেয়েদের বড় ভালোবাসতেন।

তাঁর জীবনের শেষ দিকে তিনি কয়েক বছর পক্ষাঘাতে বিস্তার লাভ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। ১৯৭৩ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ১০৩ বছর বয়সে এই মহান শিল্পীর জীবনপ্রদীপ নিভে গেল। তাঁর গুরু ওস্তাদ ওয়াজির খাঁ সাহেবের ঘরানার সঙ্গীত রাতদিন গভীরতর এক মাত্রা বালকের সংবর্ধনা সাধনা ও প্রতিভার ফলে নির্ভরশীল হয়ে আছে এবং থাকবে। কুমিল্লা থেকে সুদূর মাইহার পর্যন্ত তাঁর সঙ্গীত সাধনা ও আত্মত্যাগ ঐকিক সঙ্গীত জগতের কিবদন্তিতে পরিণত হয়েছে।

Read full story at source