জিমে যাচ্ছেন, ডায়েট করছেন, তবু পেটের মেদ কমছে না, কারন কি?

· Prothom Alo

স্বাস্থ্য সচেতন মানুষের কাছে খুব সকালে ঘুম থেকে উঠে দৌড়াতে যাওয়া যেন ভালো থাকার প্রতীক। ভোরের নরম আলো, কানে হেডফোন, পায়ে দৌড়ের জুতা শুরু হয়ে যায় দিনের প্রথম শরীরচর্চা। কেউ আবার সকাল সকাল জিমে গিয়ে ঘাম ঝরান।

আধুনিক ফিটনেস সংস্কৃতিতে এই সকালের ব্যস্ততা এখন বেশ জনপ্রিয়। দৌড় শেষ, ঘাম ঝরছে, আর সঙ্গে সঙ্গে স্ট্রাভা কিংবা স্মার্টওয়াচের পর্দায় চোখ আজ কত ক্যালরি পুড়ল?

Visit betsport.cv for more information.

শুধু ব্যায়ামেই নয়, খাবারের প্লেটেও এসেছে হিসাব-নিকাশ। ভাত একটু কম, মিষ্টি প্রায় বাদ, তেল-মসলায় লাগাম। সপ্তাহে কয়েক দিন জিমে গিয়ে ওজন তোলাও হচ্ছে। সব মিলিয়ে মনে হওয়ার কথা, শরীর এবার নিজের ছন্দে ফিরবেই। কিন্তু কয়েক মাস পর আয়নার সামনে দাঁড়াতেই সেই পরিচিত হতাশা। শরীরের অনেক জায়গায় হয়তো পরিবর্তন এসেছে, কিন্তু চোখ আটকে যায় সেই একই জায়গায় পেট। জামাটা একটু টেনে দেখেন। পাশ ফিরে দাঁড়ান। পেটটা ভেতরে টেনে আবার আয়নার দিকে তাকান।

তারপর মনে আসে সেই বিরক্তিকর প্রশ্ন, “আমি এত কিছু করছি, তবু এই মেদটা যাচ্ছে না কেন?” হতাশাটা আরও বাড়ে যখন আশপাশে এমন কাউকে দেখেন, যিনি নিয়মিত জিমে যান না, প্রতিদিন দৌড়ান না, খাবারের প্রতিটি গ্রামও মেপে খান না। অথচ তাকে দিব্যি ছিপছিপে ও ফিট দেখায়। তখন নিজের পরিশ্রমটাই যেন প্রশ্নের মুখে পড়ে। শুধু কতক্ষণ দৌড়ালেন, জিমে কতটা ঘাম ঝরালেন কিংবা আজ কত ক্যালরি পোড়ালেন শরীর তার সব হিসাব শুধু এভাবে করে না। দিনের বাকি সময়টাও তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ।

আপনি কতক্ষণ চেয়ারে বসে থাকেন, খাবারের পর কী করেন, সারাদিন কতটা নড়াচড়া করেন, কখন ঘুমাতে যান, ঘুমের মান কেমন এই আপাতদৃষ্টিতে ছোট ছোট অভ্যাসগুলোও দীর্ঘমেয়াদে আপনার ওজন, শরীরের গঠন এবং বিপাকীয় স্বাস্থ্যে ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে পেটের ভেতরের অঙ্গগুলোর আশপাশে জমা ভিসেরাল ফ্যাট নিয়ে সচেতন হওয়া জরুরি। বাইরে থেকে দেখা চর্বির পাশাপাশি শরীরের ভেতরের অতিরিক্ত এই চর্বিও বিপাকীয় স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।আমাদের প্রতিদিনের জীবনেই লুকিয়ে আছে এর রহস্য।

খাবারের পর একটু হাঁটুন

দুপুরের খাবার শেষ। পেটটা বেশ ভরা। সামনে কম্পিউটার, পাশে ফোন। এই সময়টায় সবচেয়ে বেশি ইচ্ছা করে একটু গা এলিয়ে বসতে। কেউ হয়তো চেয়ারটা একটু পেছনে ঠেলে চোখ বন্ধ করেন, কেউ আবার খাবার শেষ করেই ফোনের পর্দায় ডুবে যান। আর বাড়িতে হলে সোফাটাই যেন হাতছানি দিয়ে ডাকতে থাকে। কিন্তু খাবারের পরের এই সময়টুকুই একটু অন্যভাবে কাটানো যায়। খুব বেশি কিছু নয়, শুধু মিনিট দশেকের হাঁটা। খাওয়ার পর শরীরে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বাড়ে। তখন ইনসুলিন সেই গ্লুকোজকে শরীরের বিভিন্ন কোষে ব্যবহারের জন্য পৌঁছে দিতে কাজ করে। আর আপনি যখন হাঁটছেন, তখন পেশিগুলোও গ্লুকোজ ব্যবহার করতে শুরু করে। ফলে খাবারের পর হালকা হাঁটা রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়ক হতে পারে। তাই দুপুরের খাবারের পর সরাসরি চেয়ারে বসে না গিয়ে একটু হাঁটুন। অফিসে হলে করিডর ধরে কয়েকবার এদিক-ওদিক। লিফটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকার বদলে সম্ভব হলে এক-দুই তলা সিঁড়ি। আর বাড়িতে থাকলে ছাদে একটু পায়চারি। রাতের খাবারের পরের হাঁটাটা আবার হতে পারে অন্যরকম। দিনের কাজ শেষ, চারপাশ একটু শান্ত। পরিবারের কাউকে সঙ্গে নিয়ে বাড়ির সামনের লন কিংবা আশপাশে কয়েক মিনিট হাঁটতে বেরিয়ে পড়তে পারেন। দিনের ব্যস্ততার মধ্যে এই ছোট্ট সময়টুকু শরীরের পাশাপাশি মনকেও একটু হালকা করে দিতে পারে। এখানে কোনো কঠিন নিয়ম নেই। দৌড়াতে হবে না, ঘাম ঝরাতেও হবে না। শুধু বসে থাকার বদলে একটু হাঁটা। আর এই হাঁটাকে ‘দ্রুত মেদ কমানোর কৌশল’ হিসেবে দেখারও দরকার নেই। বরং ভাবুন, প্রতিদিনের জীবনে নিজের শরীরকে একটু বেশি নড়াচড়া করার সুযোগ করে দিচ্ছেন। অনেক সময় সুস্থ থাকার অভ্যাসগুলো এমনই হয় আলাদা করে সময় বের করতে হয় না, জীবনযাপনের ভেতরেই একটু জায়গা করে দিতে হয়।

জিমের বাইরেও পেশিকে কাজে লাগান

আমাদের জীবন যত আধুনিক হচ্ছে, শরীরের স্বাভাবিক নড়াচড়ার সুযোগ যেন তত কমছে। সকাল থেকে অফিস ঘণ্টার পর ঘণ্টা কম্পিউটারের সামনে বসে থাকা। এক মিটিং থেকে আরেক মিটিং। অফিস শেষে গাড়ি। বাড়ি ফিরে সোফা তারপর আবার ফোন বা ল্যাপটপ। দিনের শেষে মনে হয়, “ছুটির জিমে গিয়ে সব পুষিয়ে দেব।” কিন্তু শরীরকে শুধু দিনের এক ঘণ্টার জন্য সক্রিয় রাখলেই তো হয় না। পেশিকে নিয়মিত কাজে লাগানো জরুরি। শক্তিবর্ধক ব্যায়াম পেশি ধরে রাখতে এবং শারীরিক সক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। পাশাপাশি দৈনন্দিন জীবনেও শরীরকে ব্যবহার করার সুযোগ তৈরি করা যায়। বাজারের ব্যাগ নিজে বহন করা, নিরাপদ হলে সিঁড়ি ব্যবহার করা, ঘরের কাজে অংশ নেওয়া, দীর্ঘক্ষণ বসে থাকার মাঝখানে উঠে দাঁড়ানো এসব ছোট ছোট কাজ শরীরকে সচল রাখে। অবশ্য বাজারের ব্যাগ বহন করলেই জিমের প্রয়োজন শেষ হয়ে যায় না। বরং নিয়মিত শক্তিবর্ধক ব্যায়ামের পাশাপাশি দৈনন্দিন জীবনে শরীরকে যতটা সম্ভব ব্যবহার করাই ভালো। কারণ শক্তিশালী পেশি শুধু শরীরকে দেখতে সুন্দর করে না। দৈনন্দিন কাজ সহজ করে, চলাফেরার সক্ষমতা বাড়ায় এবং বয়স বাড়ার সঙ্গে শরীরকে কার্যকর রাখতেও সাহায্য করে।

অপ্রয়োজনীয় বিঞ্জিং বা অকারণে সারাক্ষন কিছু না কিছু খাওয়া কমান

আপনার একটি সাধারণ দিনের খাবারের হিসাব করুন তো। সকালে চা-বিস্কুট। অফিসে গিয়ে নাশতা। দুপুরে ভাত। বিকেলে চা আর সিঙ্গারা। সন্ধ্যায় আবার কিছু একটা। রাতে দেরিতে খাবার। তারপর টেলিভিশন বা মোবাইল দেখতে দেখতে চিপস কিংবা অন্য কোনো স্ন্যাকস। প্রতিবার খুব বেশি খাওয়া হচ্ছে না কিন্তু সারাদিনের এই ছোট ছোট খাওয়াগুলো যোগ হয়ে মোট ক্যালরি গ্রহণ প্রয়োজনের চেয়ে বেশি হয়ে যেতে পারে। তাই শুধু বড় খাবারের দিকে নজর না দিয়ে খাবারের মাঝের এই অপ্রয়োজনীয় খাওয়ার অভ্যাসটাও খেয়াল করুন তবে এর মানে না খেয়ে থাকা নয়। কারও জন্য তিন বেলা পরিমিত খাবার সবচেয়ে ভালো কাজ করে, আবার কেউ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে খাবার খান। কেউ রাতের খাবার ও সকালের খাবারের মাঝে ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টার বিরতি রাখেন। যে পদ্ধতিই অনুসরণ করুন, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো এমন একটি খাদ্যাভ্যাস তৈরি করা যা পুষ্টিকর, পরিমিত এবং দীর্ঘদিন ধরে বজায় রাখা সম্ভব।
কারণ ওজন কমানোর সবচেয়ে কার্যকর পরিকল্পনা সেটিই, যেটি আপনি কয়েক সপ্তাহ নয়, দীর্ঘদিন অনুসরণ করতে পারবেন।

রাতটা হোক শরীরের জন্য

রাতের বিছানায় শুয়ে ফোন হাতে নেওয়া এখন প্রায় আমাদের সবার অভ্যাস। “আর পাঁচ মিনিট।” এই পাঁচ মিনিট কখন যে আধঘণ্টা হয়ে যায়, অনেক সময় টেরই পাওয়া যায় না। পর্যাপ্ত ও ভালো মানের ঘুম আমাদের ক্ষুধা, মেজাজ, শক্তি এবং দৈনন্দিন কর্মক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্কিত। ঘুমের ঘাটতি হলে পরদিন ক্লান্তি বাড়তে পারে, ব্যায়াম করার আগ্রহ কমে যেতে পারে এবং অস্বাস্থ্যকর খাবারের প্রতি আকর্ষণও বাড়তে পারে। তাই ঘুমকে দিনের অবশিষ্ট সময় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনেরই একটি অংশ। ঘুমানোর আগে আলো কমিয়ে দিন। ফোনটা একটু দূরে রাখুন। সম্ভব হলে প্রতিদিন কাছাকাছি সময়ে ঘুমাতে যান। ঘর শান্ত, আরামদায়ক ও অন্ধকার রাখুন। সবচেয়ে বড় কথা, দিনের শেষ সময়টুকু একটু নিজের জন্য রাখুন। সারাদিন অন্যদের মেসেজের উত্তর দিতে দিতে, কাজের চাপ সামলাতে সামলাতে যে মানুষটি ক্লান্ত হয়ে বিছানায় যান, তারও তো একটু শান্তির প্রয়োজন আছে।

কেবল এক ঘণ্টার জিমে আসবেনা ফল

আপনি প্রতিদিন এক ঘণ্টা জিম করেন কিন্তু তারপর অফিসে আট ঘণ্টা বসে থাকেন। গাড়িতে যাতায়াত করেন। বাড়ি ফিরে আরও কয়েক ঘণ্টা সোফায় বসে থাকেন। তাহলে দিনের বড় একটি অংশ কেটে যাচ্ছে খুব কম নড়াচড়ায়। এখানেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে নিট - NEAT বা নন এক্সারসাইজ এক্টিভিটি থার্মোজেনেসিস( Non-Exercise Activity Thermogenesis) । সহজভাবে বললে, পরিকল্পিত ব্যায়ামের বাইরে সারাদিনে আমরা যে ছোট ছোট শারীরিক নড়াচড়া করি, সেগুলোই এর অংশ। প্রতি ৪৫ থেকে ৬০ মিনিট পর চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াতে পারেন। কয়েক মিনিট হাঁটতে পারেন। ফোনে কথা বলার সময় বসে না থেকে হাঁটতে পারেন। কাছের সহকর্মীকে মেসেজ না করে সম্ভব হলে তার ডেস্কে গিয়ে কথা বলে আসতে পারেন। এসব কোনো কঠিন ব্যায়াম নয়। কিন্তু দিনের শেষে এগুলো আপনার মোট শারীরিক সক্রিয়তা বাড়াতে পারে। তাই জিমের এক ঘণ্টাকে গুরুত্ব দিন, কিন্তু জিমের বাইরের ২৩ ঘণ্টাকেও ভুলে যাবেন না।

তাহলে কি দৌড়ানো বন্ধ করে দেবেন?

একদমই না। দৌড়ানো, হাঁটা, সাইক্লিং, সাঁতার কিংবা নিজের পছন্দের যেকোনো শারীরিক কার্যক্রম শরীর ও মনের জন্য উপকারী। নিয়মিত ব্যায়াম অবশ্যই স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। শুধু ব্যায়ামকে দিনের বাকি সময়ের নিষ্ক্রিয়তার ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেখবেন না। কারণ স্বাস্থ্যকর জীবন আসলে কোনো এক ঘণ্টার গল্প নয়। এটি পুরো একটি দিনের গল্প। সকালের ব্যায়াম থেকে দুপুরের খাবার, খাবারের পর কয়েক মিনিট হাঁটা থেকে অফিসের চেয়ার, সন্ধ্যার নড়াচড়া থেকে রাতের ঘুম সবকিছু মিলেই তৈরি হয় সেই গল্প। আর সেই গল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রটি আপনি নিজেই। আজ থেকেই শুরু হোক ছোট পরিবর্তন হয়তো আগামীকাল থেকেই জীবনের সবকিছু বদলে ফেলা সম্ভব নয় তবে, খাওয়ার পর ১০ মিনিট হাঁটা সম্ভব।

 একটানা বসে না থেকে ঘণ্টায় একবার উঠে দাঁড়ানো সম্ভব।

 লিফটের বদলে নিরাপদ হলে কয়েক তলা সিঁড়ি ব্যবহার করা সম্ভব ।

 অপ্রয়োজনীয় টুকটাক খাওয়ার অভ্যাসটা একটু কমানো সম্ভব।

 ঘুমানোর আগে ফোনটা দূরে রাখা সম্ভব।

এই ছোট ছোট পরিবর্তনগুলোই সময়ের সঙ্গে বড় অভ্যাসে পরিণত হয়।

পেটের মেদ এক রাতের মধ্যে কমবে না। কোনো একটি অভ্যাস দিয়েও শরীরকে রাতারাতি ‘ফ্যাট বার্নিং মেশিনে’ পরিণত করা সম্ভব নয়।

কিন্তু শরীরকে সুস্থ রাখার ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতার কোনো বিকল্প নেই।

ধারাবাহিকভাবে মেনে চললে একদিন দেখবেন, আয়নার সামনে নিজের পেটটা অনেকখানি ভেতরে চলে গেছে। খেয়াল করবেন, সিঁড়ি ভাঙতে আর আগের মতো হাঁপিয়ে যাচ্ছেন না। সকালে ঘুম থেকে খুব খুব চাঙ্গা অনুভব করছেন। রাতে ঘুমটাও ভালো হচ্ছে। নিজের শরীর নিয়ে অস্বস্তির বদলে তৈরি হচ্ছে এক ধরনের স্বস্তি আর সেটাই আমাদের আসল লক্ষ্য। ফিট থাকা মানে শুধু চিকন হওয়া নয় নিজের শরীরের সঙ্গে স্বস্তিতে থাকা।

তাই পেটের মেদের সঙ্গে প্রতিদিন যুদ্ধ করার বদলে নিজের শরীরের যত্ন নেওয়ার অভ্যাসটাই হোক নতুন শুরু।

তথ্য: হেলথ ডট কম

Read full story at source