গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি নবায়নের আগে বাংলাদেশের প্রয়োজন নির্ধারণের তাগিদ

· Prothom Alo

ভারতের সঙ্গে গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি নবায়নের আলোচনার আগে বাংলাদেশের যথেষ্ট প্রস্তুতি দরকার। পাশাপাশি বাংলাদেশের ঠিক কতটা পানি প্রয়োজন আর ন্যূনতম প্রবাহ কীভাবে নিশ্চিত হবে, তা আগে নির্ধারণ করা জরুরি। আলোচনায় দুই দেশের স্বার্থের পাশাপাশি শুষ্ক মৌসুমের পানিপ্রবাহ, জনসংখ্যা, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, জলবায়ু পরিবর্তনসহ বিভিন্ন অঞ্চলের ভিন্ন ভিন্ন চাহিদা বিবেচনায় নিতে হবে।

Visit turconews.click for more information.

আন্তসীমান্ত পানিবণ্টন ও পদ্মা ব্যারেজ নিয়ে বেসরকারি নর্থসাউথ ইউনিভার্সিটিতে (এনএসইউ) আয়োজিত এক সেমিনার আলোচকেরা এসব কথা বলেন। ‘ট্রান্সবাউন্ডারি ওয়াটার শেয়ারিং ইস্যুজ অ্যান্ড পদ্মা ব্যারেজ’ শীর্ষক এই সেমিনারের আয়োজক বিশ্ববিদ্যালয়ের সাউথ এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব পলিসি অ্যান্ড গভর্ন্যান্স (এসআইপিজি)। আজ রোববার বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট হলে সেমিনারটি হয়।

সেমিনারে একটি ধারণাপত্র তুলে ধরেন যুক্তরাষ্ট্রের টাফটস ইউনিভার্সিটির সিভিল অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের পানি কূটনীতির (ওয়াটার ডিপ্লোম্যাসি) অধ্যাপক শফিক ইসলাম। এতে বলা হয়, গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে বাংলাদেশকে নিজেদের প্রয়োজন ও ভারতের চাহিদা—দুটিই স্পষ্টভাবে বুঝে আলোচনায় যেতে হবে। এ ক্ষেত্রে শুষ্ক মৌসুমের পানিপ্রবাহ, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, জলবায়ু পরিবর্তনসহ বিভিন্ন অঞ্চলের ভিন্ন ভিন্ন স্বার্থ জড়িত। বাংলাদেশের প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য শুষ্ক মৌসুমের পানিপ্রবাহ। অন্যদিকে ভারতের বিহারের উদ্বেগ বন্যা ও পলি। পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম উদ্বেগ কলকাতা বন্দরের নাব্যতা। তাই আলোচনায় যাওয়ার আগে বাংলাদেশকে জানতে হবে, তার প্রকৃত পানির চাহিদা কত আর কোন ন্যূনতম প্রবাহ নিশ্চিত করা জরুরি।

গঙ্গার পানি নিয়ে সমাধানের নতুন পথ খোঁজার ওপর জোর দেন শফিক ইসলাম। তিনি বলেন, এমন একটি নতুন ও উদ্ভাবনী সমাধান খুঁজে বের করতে হবে, যা বাংলাদেশ ও ভারতের প্রয়োজনের মধ্যে সমন্বয় ঘটাতে পারে। তবে সেই সমাধানকে একই সঙ্গে বৈজ্ঞানিকভাবে গ্রহণযোগ্য, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর কাছে গ্রহণযোগ্য এবং কারিগরি, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে বাস্তবায়নযোগ্য হতে হবে। আলোচনায় যাওয়ার আগে বাংলাদেশকে তিনটি প্রশ্নের উত্তর বের করতে হবে—বাংলাদেশের প্রকৃত প্রয়োজন কী, ভারত আসলে কী চায় এবং দুই পক্ষের স্বার্থের সমন্বয় কীভাবে হতে পারে।

পৃথক ধারণাপত্রে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক মো. আতাউর রহমান বলেন, প্রস্তাবিত পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণ করা হলে শুকনা মৌসুমে গঙ্গার পানি সংরক্ষণ করে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদীব্যবস্থাকে সচল রাখা সম্ভব হতে পারে। এতে সংশ্লিষ্ট নদীগুলোতে পানির প্রবাহ বাড়ানোর পাশাপাশি সেচ, কৃষি, মৎস্য, নৌ চলাচল ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সুবিধা হবে।

মর্যাদার ভিত্তিতে সমাধানের প্রত্যাশা

গঙ্গার পানিবণ্টন নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা-মর্যাদার ভিত্তিতে সমাধানে পৌঁছানোর প্রত্যাশা জানান প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, উজান ও ভাটির স্বার্থ পরস্পরবিচ্ছিন্ন নয়। উজানের পানি ব্যবস্থাপনায় ভাটির দেশ যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি ভাটির দেশের নদীসহ পানিব্যবস্থাপনার বিষয়ও উজানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে পানিবণ্টন ও ব্যবস্থাপনায় উভয় পক্ষের মানুষের স্বার্থ বিবেচনায় নিতে হবে। এ লক্ষ্যে ভারত সরকারের সঙ্গে আলোচনার জন্য বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে বলা হয়েছে।

রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরের মতে, গঙ্গা-পদ্মা পানি ব্যবস্থাপনায় নিশ্চিত প্রবাহ, পানি সংরক্ষণ, উজান-ভাটির মানুষের স্বার্থের সমন্বয় ঘটাতে পারলেই টেকসই সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব।

প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা বলেন, পদ্মা ব্যারাজের নকশা এমনভাবে করা হবে, যাতে অতিরিক্ত পানি সংরক্ষণ করে শুষ্ক মৌসুমে তা ব্যবহার করা যায়। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পাঁচটি নদীর প্রবাহ সচল রাখা, লবণাক্ততা কমানো, কৃষি ও মানুষের জীবিকা রক্ষা এই প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য। এর সঙ্গে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার, জীবন-জীবিকার সমন্বিত উন্নয়নের বিষয়ও বিবেচনায় থাকবে। পানি শুধু প্রকৌশলগত বিষয় নয়, এটি মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।

প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী (পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক) মো. সাইমুম পারভেজ বলেন, গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তিকে শুধু বাংলাদেশ-ভারতের দ্বিপক্ষীয় বিষয় হিসেবে না দেখে পুরো অববাহিকাভিত্তিক পানিব্যবস্থাপনার আওতায় দেখতে হবে। পানির পরিমাণের পাশাপাশি গুণগত মান, নদীর প্রতিবেশ ও উজানের পানিপ্রবাহের তথ্যের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। জাতীয় স্বার্থ, খাদ্যনিরাপত্তা ও জলবায়ু ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক উদ্যোগসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের অভিন্ন অবস্থান প্রয়োজন।

সেমিনারে উদ্বোধনী বক্তব্য ও সেশন পরিচালনা করেন নর্থসাউথ ইউনিভার্সিটির সিভিল অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক মো. সিরাজুল ইসলাম। বিশ্ববিদ্যালয়টির উপাচার্য অধ্যাপক আবদুল হান্নান চৌধুরীর সভাপতিত্বে সেমিনারে আরও বক্তব্য দেন এসআইপিজির জ্যেষ্ঠ গবেষণা ফেলো সাবেক রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ সুফিউর রহমান, এসআইপিজির পরিচালক অধ্যাপক শেখ তৌফিক এম হক প্রমুখ।

Read full story at source