কাঠগড়ায় যখন ‘প্রেমের গল্প’

· Prothom Alo

ধরুন, গভীর রাতে একজন চিত্রনাট্যকার একটি দৃশ্য লিখছেন। দৃশ্যটি লিখতে লিখতে হঠাৎ তাঁর নিজের জীবনের কোনো স্মৃতি এসে মিশে গেল চরিত্রটির সঙ্গে। তিনি বুঝলেন, এতক্ষণ যে গল্পটি কাগজে লিখছিলেন, এই জায়গায় এসে সেটি সত্যি হয়ে উঠেছে। হয়তো একটু অস্বস্তিকর সত্য, হয়তো রাজনৈতিক, হয়তো সম্পর্কের এমন একটি দিক, যা আমরা প্রকাশ্যে খুব সহজে বলতে চাই না। তিনি লিখলেন। কয়েক দিন পর চিত্রনাট্যটি গেল প্রযোজকের কাছে। প্রযোজক পড়লেন, বললেন, গল্প ভালো, তবে এই জায়গাটা একটু বদলানো যায় কি না? ভুল–বোঝাবুঝি হতে পারে। তিনি বদলালেন। পরে অভিনয়শিল্পী এলেন। চরিত্রটি পড়ে তাঁরও অস্বস্তি হলো। বললেন, এই দৃশ্যটা করলে আমাকে নিয়ে অযথা আলোচনা হতে পারে। নির্মাতা আবার একটু বদলালেন। ছবির সম্পাদনার সময় মনে হলো, এই সংলাপটাও না হয় বাদ দেওয়া যাক। প্রদর্শনের আগে আরেকটি দৃশ্য ছোট হলো। শেষ পর্যন্ত চলচ্চিত্রটি তৈরি হলো, কিন্তু যে সত্যটি থেকে গল্পটির জন্ম হয়েছিল, সেটি পথে পথে একটু একটু করে সম্পাদিত হতে হতে অনেকটাই হারিয়ে গেল।

এই গল্পটি কাল্পনিক। কিন্তু একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে এর মনস্তত্ত্ব আমার কাছে খুবই পরিচিত। কারণ, আমরা এমনিতেই একটি বহুল সম্পাদিত সমাজে বাস করি। পরিবারে একধরনের সম্পাদনা, সামাজিক জীবনে আরেক ধরনের, রাজনীতিতে আরেক ধরনের, শিল্পে আরেক ধরনের। তার ওপর একজন সৃষ্টিশীল মানুষ যদি গল্প লেখার সময় থেকেই ভাবতে শুরু করেন কে মামলা করতে পারেন, কোন গোষ্ঠী আপত্তি তুলতে পারে, কোন দৃশ্য নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিচারসভা বসতে পারে, কোন বিষয় প্রযোজকের জন্য ঝুঁকি তৈরি করবে, তাহলে কোনো আনুষ্ঠানিক নিষেধাজ্ঞা ছাড়াই তাঁর মাথার মধ্যে একজন অদৃশ্য সম্পাদক বসে যান। আমার কাছে সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার সবচেয়ে বড় বিপদটি এখানেই।

Visit casino-promo.biz for more information.

এই প্রেক্ষাপটে ২৭ আগস্ট প্রেমভিত্তিক চলচ্চিত্র ও নাটক নির্মাণ এবং সম্প্রচারে কঠোর বিধিনিষেধ চেয়ে পাঠানো আইনি নোটিশ দেখতে পাই। নোটিশদাতার দাবি, আমাদের নাটক ও চলচ্চিত্রে প্রেমের আধিক্য সাংস্কৃতিক ভারসাম্য নষ্ট করছে, কিছু নির্মাণ পরকীয়া ও বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ককে স্বাভাবিক বা মহিমান্বিত করছে, তরুণদের পড়াশোনা ও পেশার প্রতি মনোযোগ কমাচ্ছে, এমনকি এর সঙ্গে পারিবারিক অবক্ষয়, পরকীয়া ও ধর্ষণের মতো অপরাধ বৃদ্ধিরও সম্পর্ক আছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ১০ দিনের মধ্যে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। এর পরপরই বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, শিল্পী ও কলাকুশলীরা প্রতিবাদ করেন এবং নাটকের সাতটি সংগঠন যৌথ বিবৃতি দেয়। একটি আইনি নোটিশ খুব দ্রুত জাতীয় সাংস্কৃতিক বিতর্কে পরিণত হয়।

একজন নাগরিক বা আইনজীবী তাঁর বিবেচনায় আইনি নোটিশ পাঠাতেই পারেন। কর্তৃপক্ষ সেটি দেখবে। তিনি আদালতে গেলে আদালত ঠিক করবেন বিষয়টি বিচারযোগ্য কি না এবং কোনো নির্দেশনা দেওয়ার প্রয়োজন আছে কি না। আদালতের কাজ আদালতকেই করতে দেওয়া উচিত। আমার আপত্তি সেখানে নয়। আমার অস্বস্তি হলো, একটি ব্যক্তিগত আইনি উদ্যোগকে সংবাদ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমরা এমনভাবে বড় করে তুললাম যে হঠাৎ করেই বাংলা নাটক ও চলচ্চিত্রের প্রেমের গল্প সমাজের নৈতিক অবক্ষয়ের অন্যতম কারণ কি না, সেটিই যেন জাতীয় আলোচনার বিষয় হয়ে গেল।

নয়ন মণি সিনেমার দৃশ্য

নোটিশটির মূল কপি আমি সংগ্রহের চেষ্টা করেছি, পাইনি। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত বিবরণে যে বড় দাবিগুলো এসেছে, সেগুলোর পাশে কোনো পরিমাপ চোখে পড়েনি। বাংলাদেশে বছরে যত নাটক ও চলচ্চিত্র তৈরি হয়, তার কত শতাংশ প্রেমভিত্তিক? কোন সীমা পার করলে একটি গল্পকে ‘অতিরিক্ত রোমান্টিক’ বলা হবে? কত বছরের কতটি নির্মাণ বিশ্লেষণ করা হয়েছে? কোন উপাত্তে দেখা গেছে প্রেমের নাটক বেশি দেখলে শিক্ষার্থীর ফল খারাপ হয় বা ধর্ষণ বাড়ে? প্রকাশিত প্রতিবেদনে এসব প্রশ্নের উত্তর নেই। অথচ এই প্রশ্নগুলোর উত্তর ছাড়া একটি মতামত খুব সহজেই একটি সামাজিক সত্যের চেহারা পেয়ে যায়। এখানেই সংবাদমাধ্যমেরও দায়িত্ব আছে। কোনো বক্তব্য আলোচনার জন্য আকর্ষণীয় হলেই সেটি সমান গুরুত্বে বড় করে তোলা প্রয়োজন কি না, সেই বিচার সাংবাদিকতাকেও করতে হয়। কারণ, প্রচার শুধু একটি বিতর্ককে অনুসরণ করে না, অনেক সময় প্রচারই সেই বিতর্কের সামাজিক গুরুত্ব তৈরি করে।

গণমাধ্যম মানুষের আচরণে কোনো প্রভাবই ফেলে না, এমন কথা আমি বলছি না। যৌন বিষয়বস্তু নিয়ে গবেষণায় কিছু আচরণগত সম্পর্ক পাওয়া গেছে। কিন্তু ২০২৩ সালের একটি পদ্ধতিগত পর্যালোচনায় ১৯টি গবেষণা বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা বলেছেন, কিছু ক্ষেত্রে সম্পর্ক পাওয়া গেলেও অধিকাংশ গবেষণা ছিল এমন ধরনের, যেখান থেকে সরাসরি কারণ ও ফল নির্ধারণ করা যায় না। অন্যান্য ফলাফলের ক্ষেত্রেও প্রমাণ ছিল অসম্পূর্ণ বা পরস্পরবিরোধী। অর্থাৎ বিষয়টি জটিল। পরিবার, শিক্ষা, সামাজিক পরিবেশ, মানসিক স্বাস্থ্য, অর্থনীতি, সহিংসতার অভিজ্ঞতা এবং আরও বহু বিষয় মানুষের আচরণ তৈরি করে। প্রেমের নাটক থেকে সরাসরি ধর্ষণের দিকে একটি সোজা রেখা টানা তাই বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্ত নয়।

তারপরও তর্কের খাতিরে ধরে নেওয়া যাক, আমাদের নাটকে একই ধরনের প্রেমের গল্প অনেক বেশি হচ্ছে। সেটি নিয়ে আলোচনা হতেই পারে। প্রেম নিয়ে খারাপ নাটক হয়। নারীবিদ্বেষী গল্প হয়। সম্পর্কের নামে দায়িত্বহীন আচরণকে আকর্ষণীয় করে দেখানো হয়। একই গল্প ঘুরিয়ে–ফিরিয়ে বানানো হয়। একজন নির্মাতা হিসেবে এসব নিয়ে আমার নিজেরও অসংখ্য আপত্তি আছে। কিন্তু কোনো চলচ্চিত্রে একজন মানুষ খুন হলে আমরা তো বলি না, খুনের দৃশ্য দেখানোর কারণে খুন বাড়ছে বলে অপরাধভিত্তিক চলচ্চিত্র বন্ধ করতে হবে। পর্দায় একজন মানুষের মাথা কেটে হাতে নিয়ে চলে যাওয়ার দৃশ্য দেখে দর্শক শিস দিলে আমরা পুরো অপরাধ ধারার চলচ্চিত্র বন্ধের দাবি তুলি না। তাহলে প্রেমের ক্ষেত্রে এই সরল কার্যকারণ এত সহজে কেন তৈরি হয়? একটি খারাপ প্রেমের গল্পের সমাধান আরেকটি ভালো গল্প। একটি গোটা অনুভূতিকে নিষিদ্ধ বা সীমিত করা নয়।

‘গহীন বালুচর’ সিনেমার দৃশ্য

সংবিধানের ক্ষেত্রেও একই সতর্কতা প্রয়োজন। নোটিশে ২১, ২৩ ও ৩৯ অনুচ্ছেদের কথা এসেছে। কিন্তু সংবিধানকে একটি জানালার এক পাশ দিয়ে দেখলে পুরো ঘর দেখা যায় না। ২৩ অনুচ্ছেদ শুধু সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ করতে বলে না, ভাষা, সাহিত্য ও শিল্পকলার বিকাশ ঘটাতে এবং সমাজের সব অংশকে জাতীয় সংস্কৃতিতে অবদান রাখার সুযোগ দিতেও বলে। ৩৯ অনুচ্ছেদ চিন্তা, বিবেক ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করেছে। এই স্বাধীনতা অবশ্যই সীমাহীন নয়, কিন্তু বিধিনিষেধ হতে হবে আইন দ্বারা আরোপিত এবং যুক্তিসংগত। বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টও বলেছেন, মতপ্রকাশ সীমিত করতে হলে তার আইনগত ভিত্তি থাকতে হবে, সংবিধানে উল্লেখিত নির্দিষ্ট কারণের মধ্যে পড়তে হবে এবং সেই সীমাবদ্ধতা অতিরিক্ত বা অসামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারবে না।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের কথাটিও এই জায়গায় খুব সহজভাবে বোঝা যায়। বাংলাদেশ ২০০০ সালের ৬ সেপ্টেম্বর নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তিতে যোগ দেয়। জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিটির ৩৪ নম্বর সাধারণ মন্তব্য বলছে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার মধ্যে সাংস্কৃতিক ও শিল্পিত প্রকাশ, দৃশ্যশ্রাব্য মাধ্যম এবং ইন্টারনেটভিত্তিক প্রকাশও পড়ে। আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো, নৈতিকতার নামে কোনো প্রকাশ সীমিত করতে চাইলে নৈতিকতার ধারণা শুধু একটি সামাজিক, ধর্মীয় বা দার্শনিক ঐতিহ্য থেকে নেওয়া যাবে না। আর রাষ্ট্র যদি কোনো প্রকাশকে ক্ষতিকর বলে, তাকে দেখাতে হবে ক্ষতিটা কী এবং প্রকাশটির সঙ্গে সেই ক্ষতির সরাসরি ও তাৎক্ষণিক যোগ কোথায়। সহজ করে বললে, ‘এটি আমার পছন্দ নয়’ আর ‘এটি সমাজের জন্য প্রমাণিতভাবে ক্ষতিকর’ একই বক্তব্য নয়।

আমার ভয় অবশ্য আইনের বইয়ের চেয়েও বেশি আমাদের সামাজিক মনস্তত্ত্বে। গত কয়েক বছরে আমরা দেখেছি, কখনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, কখনো নাটক, কখনো চলচ্চিত্র প্রদর্শন সামাজিক আপত্তি বা নিরাপত্তার আশঙ্কায় বাধার মুখে পড়েছে। ২০২৫ সালে মহিলা সমিতিতে রবীন্দ্রনাথের ‘শেষের কবিতা’ অবলম্বনে নাটকের একটি প্রদর্শনী নিজেদের ‘তৌহিদি জনতা’ পরিচয় দেওয়া ব্যক্তিদের চিঠির পর প্রথমে বাতিল হয়েছিল, পরে পুলিশের নিরাপত্তার আশ্বাসে সেটি অনুষ্ঠিত হয়। একই বছর টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে ‘তাণ্ডব’ চলচ্চিত্রের প্রদর্শনী স্থানীয় ওলামা পরিষদের প্রতিবাদ ও নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের মধ্যে বন্ধ হয়ে যায়। দুটি ঘটনার রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও স্থানীয় বাস্তবতা এক নয়। আমি সেগুলোকে এক করে দেখতেও চাই না। কিন্তু দুটো ঘটনাই আমাদের একটি জিনিস শেখায়। শিল্প বন্ধ করার জন্য সব সময় রাষ্ট্রের লিখিত নিষেধাজ্ঞা লাগে না। কোনো কোনো সময় একটি হুমকি, একটি সংঘবদ্ধ আপত্তি অথবা ঝামেলার আশঙ্কাই যথেষ্ট।ছবি: ফেসবুক থেকে

‘রকস্টার’ সিনেমার রোমান্টিক দৃশ্য

এই ভয়টি যখন আগে থেকেই সংকুচিত একটি শিল্পের ওপর এসে পড়ে, তখন সমস্যাটি আরও গভীর হয়। বাংলাদেশের নাটক ও চলচ্চিত্রে কাজের অনিশ্চয়তা এখন আর গোপন কিছু নয়। ২০২৫ সালে একটি নির্মাণ ব্যবস্থাপক সংগঠনের সভাপতি জানিয়েছিলেন, তাঁদের ৭১৫ সদস্যের মধ্যে তখন কাজ করছিলেন মাত্র প্রায় ৩০ জন। অন্যদিকে নব্বইয়ের দশকের শেষে প্রায় ১ হাজার ৪০০ প্রেক্ষাগৃহের দেশটিতে ২০২৬ সালের এক হিসাবে সংখ্যা নেমে এসেছে ৫০-এর ঘরে এবং ১৬টি জেলায় কোনো সিনেমা হল নেই। সরকারি চলচ্চিত্র অনুদানেও এমন হয়েছে যে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে নির্বাচিত ১২টি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র প্রথম কিস্তি পাওয়ার পর পরবর্তী অর্থের জন্য মাসের পর মাস অপেক্ষা করেছে, আর পরের অর্থবছরের অনুদান কমিটি গঠনই হয়েছে জুলাইয়ে। সব সংখ্যার পেছনে আলাদা আলাদা ব্যাখ্যা থাকতে পারে, কিন্তু ছবিটা এক করলে একটি কথাই বোঝা যায়। একজন মানুষ চলচ্চিত্রকে জীবিকা হিসেবে নিতে চাইলে তাঁর সামনে কাজ, অর্থ, প্রদর্শন এবং ভবিষ্যৎ—চারটিই অনিশ্চিত।

এই অভিজ্ঞতা থেকেই চলচ্চিত্রের সঙ্গে যুক্ত বন্ধু ও সহকর্মীদের সঙ্গে কথা বললে আমি একধরনের পেশাগত হীনম্মন্যতা ও আত্মবিশ্বাসহীনতা অনুভব করি। এটি কোনো জরিপ নয়, আমার ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ। একসময় অনেক তরুণ চলচ্চিত্র নির্মাতা, নাট্যকার, অভিনেতা বা আলোকচিত্রী হতে চাইতেন। এখন এই পেশায় থাকা মানুষই যখন নিশ্চিত নন আগামী মাসে কাজ থাকবে কি না, বিনিয়োগ আসবে কি না, ছবি দেখানোর জায়গা থাকবে কি না, আর তার ওপর কী বললে কে আপত্তি করবে, সেই হিসাবও করতে হয়, তখন পরবর্তী প্রজন্ম কেন এই পেশাকে নিরাপদ স্বপ্ন মনে করবে? সৃষ্টিশীল পেশা শুধু প্রতিভায় চলে না। আত্মবিশ্বাসও লাগে। একটি সমাজ যদি তার শিল্পীদের বারবার বোঝায়, তোমার কাজ প্রয়োজনের চেয়ে ঝামেলাই বেশি তৈরি করে, তাহলে একসময় শিল্পীরাও নিজেদের কাজকে ছোট করে দেখতে শুরু করেন।

অথচ একই সরকার ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সৃজনশীল অর্থনীতির জন্য ৮০০ কোটি টাকার উদ্যোগ ঘোষণা করেছে। এর মধ্যে ৩০০ কোটি টাকা সরাসরি বরাদ্দ এবং আরও ৫০০ কোটি টাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের সামাজিক দায়বদ্ধতা তহবিল থেকে সংগ্রহের কথা বলা হয়েছে। লক্ষ্য প্রায় পাঁচ লাখ নতুন কর্মসংস্থান। এটি অবশ্যই ইতিবাচক উদ্যোগ। কিন্তু সৃজনশীল অর্থনীতি কোনো একটি তহবিলের নাম নয়। একজন চিত্রনাট্যকার লিখে আয় করতে পারবেন কি না, একজন সহকারী পরিচালক নিয়মিত কাজ পাবেন কি না, একজন আলোকশিল্পী তাঁর সন্তানকে স্কুলে রাখতে পারবেন কি না, একজন প্রযোজক ভালো গল্পে বিনিয়োগ করে টাকা ফেরত পাওয়ার আশা করবেন কি না, সৃজনশীল অর্থনীতির আসল পরীক্ষা সেখানে।

“মালিক” সিনেমার রোমান্টিক দৃশ্য

এর ঠিক বিপরীত দিকে আমরা প্রতিদিন আরেকটি বিশাল অর্থনীতি তৈরি করছি, যার বড় অংশ আমাদের চোখেই পড়ে না। ধরুন, একজন মানুষ দিনে তিন ঘণ্টা মুঠোফোনে অবিরাম পর্দা টেনে টেনে নানা কিছু দেখেন। এটি তাঁর ব্যক্তিগত তিন ঘণ্টা। কিন্তু কেবল অঙ্কটি বোঝার জন্য ধরুন এমন মানুষ ১০ কোটি। তখন প্রতিদিন ৩০ কোটি মানবঘণ্টা চলে যাচ্ছে এই পর্দার মধ্যে। এটি বাংলাদেশের প্রকৃত ব্যবহারসংক্রান্ত কোনো পরিসংখ্যান নয়, একটি সাধারণ উদাহরণ মাত্র। কিন্তু অঙ্কটির অর্থ ভয়ংকর। লক্ষ-কোটি মানুষের মনোযোগই আজ একটি অর্থনৈতিক সম্পদ। সেই সময়ের বড় অংশে আমরা কখনো গুজব দেখি, কখনো উদ্দেশ্যহীন স্বল্পদৈর্ঘ্য ভিডিও, কখনো প্রতারণা, জুয়া, অশ্লীলতা বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় বানানো মিথ্যা ছবি দেখি, আবার বিশ্বের অসাধারণ শিল্পকর্মও দেখি। প্রযুক্তির এই বিশাল প্রবাহ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা কোনো রাষ্ট্রের পক্ষেই সহজ নয়।

আর তখনই দৃশ্যটি অদ্ভুত হয়ে ওঠে। নিজের ঘরে বসে একজন বাংলাদেশি দর্শক পৃথিবীর প্রায় সব ধরনের বিষয়বস্তু দেখতে পারবেন। যৌনতা দেখবেন, সহিংসতা দেখবেন, অপরাধ দেখবেন, এমন সব সম্পর্কের গল্প দেখবেন, যার সঙ্গে তাঁর সামাজিক বাস্তবতার কোনো মিলই নেই। কিন্তু নিজেদের ভাষায় তৈরি একটি নাটক বা চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে আমরা বলতে শুরু করব, প্রেম একটু বেশি হয়ে যাচ্ছে। যেন বাংলা ভাষা এতটাই পূতপবিত্র যে এই ভাষায় মানুষের আকাঙ্ক্ষা, শরীর, ব্যর্থ সম্পর্ক, নৈতিক দ্বন্দ্ব কিংবা প্রেম নিয়ে বেশি কথা বলা বিপজ্জনক। এই বৈপরীত্যকে আমি সংস্কৃতি রক্ষা বলতে পারি না। বরং এতে নিজেদের সাংস্কৃতিক উৎপাদনকেই ধীরে ধীরে দুর্বল করার ঝুঁকি আছে।

সংস্কৃতি তো মানুষের জীবনেরই ভাষা। জীবনে ইতিহাস আছে, ধর্ম আছে, রাজনীতি আছে, যুদ্ধ আছে, বিজ্ঞান আছে, অন্যায় আছে, হাসি আছে, যৌনতা আছে এবং প্রেমও আছে। একজন নির্মাতার কাজ সেই জীবন থেকে গল্প খুঁজে নেওয়া। তাঁর গল্প আমার ভালো না লাগতে পারে। আমি কঠোর সমালোচনা করতে পারি। দর্শক সেটি প্রত্যাখ্যান করতে পারেন। কোনো নির্মাণ আইন ভাঙলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। বয়সভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাস থাকতে পারে। কিন্তু ব্যক্তিগত অস্বস্তিকে সামাজিক সত্য এবং সামাজিক সত্যকে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে পরিণত করার মাঝখানে যে দূরত্ব থাকা প্রয়োজন, আমরা সেই দূরত্বটিই ক্রমে কমিয়ে ফেলছি।

‘মন ফড়িং’ নাটকের দৃশ্য

এই জায়গায় শিল্পী সংগঠনগুলোর প্রতিবাদ যেমন দরকার, সংবাদমাধ্যমের আত্মপর্যালোচনাও দরকার, রাষ্ট্রেরও দরকার। সব উচ্চকণ্ঠ বক্তব্য সমান গুরুত্বপূর্ণ নয়। সব আইনি নোটিশ জাতীয় সংকট নয়। সব সামাজিক বিরক্তি রাষ্ট্রীয় নীতির বিষয় নয়। একটি দাবির পেছনে গবেষণা আছে কি না, পরিমাপ আছে কি না, বাস্তব ক্ষতির প্রমাণ আছে কি না, সেটি না দেখে শুধু বক্তব্যটি আকর্ষণীয় বলে আমরা যদি তাকে বড় করতে থাকি, তাহলে শেষ পর্যন্ত উচ্চকণ্ঠ মতামতই নীতির জায়গা দখল করবে। আর তখন সবচেয়ে নীরব হয়ে যাবেন সেই মানুষটি, যাঁর কাজই নতুন কথা বলা।

রাজনৈতিক সচেতনতা অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু একটি সমাজের প্রতিটি বিষয় যদি রাজনৈতিক বা নৈতিক আনুগত্যের পরীক্ষায় পরিণত হয়, তাহলে শিল্পের শ্বাস নেওয়ার জায়গা থাকে না। কে কোন চরিত্রে অভিনয় করলেন, নির্মাতা কী বিশ্বাস করেন, একটি গানে কার পোশাক কেমন, একটি নাটকে কে কাকে ভালোবাসল, কোথায় প্রদর্শনী হচ্ছে, কে আপত্তি করছে, সবকিছু নিয়েই যদি প্রতিদিন বিচারসভা বসে, তাহলে আমরা ধীরে ধীরে একটি শ্বাসরুদ্ধকর সমাজে ঢুকে পড়ি। সবাই যদি বিচারক হয়ে যাই, গল্প বলবে কে? সবাই যদি সংস্কৃতিকে শোধরানোর দায়িত্ব নিই, সংস্কৃতি সৃষ্টি করবে কে?

একটি রাষ্ট্র শুধু নির্বাচন, সরকার, বিরোধী দল আর রাজনৈতিক বক্তৃতায় বেঁচে থাকে না। তার স্মৃতি দরকার, কল্পনা দরকার, গল্প দরকার। সেই গল্প ধরে রাখেন লেখক, নির্মাতা, অভিনেতা, সংগীতশিল্পী, নাট্যকর্মী ও চিত্রশিল্পীরা। তাঁরা একটি সময়ের ভালোবাসা, ভয়, অন্যায়, আনন্দ, ব্যর্থতা, বিশ্বাস ও সংশয়কে ভবিষ্যতের জন্য রেখে যান। সেই মানুষগুলো যদি গল্প বলার আগে বারবার নিজেদের সম্পাদনা করতে করতে একসময় আর গল্পই বলতে না চান, তাহলে ক্ষতিটা শুধু তাঁদের হবে না। সমাজ নিজের গল্প বলার ক্ষমতা হারাবে।

একটি সিনেমার দৃশ্যে কবরী ও রাজ্জাক

এই কারণেই একটি আইনি নোটিশকে তার আইনগত গুরুত্বের চেয়ে বড় করে দেখার প্রয়োজন নেই, কিন্তু তার চারপাশে তৈরি হওয়া বয়ানকে হালকাভাবে নেওয়ারও সুযোগ নেই। কারণ, সংস্কৃতি এক দিনে সংকুচিত হয় না। প্রথমে একটি দৃশ্য বাদ যায়। তারপর একটি সংলাপ। এরপর একটি বিষয় নিয়ে আর কেউ ঝুঁকি নিতে চান না। পরে একটি অনুষ্ঠান করা কঠিন হয়। একসময় একজন তরুণ সিদ্ধান্ত নেন, চলচ্চিত্র নির্মাতা না হয়ে অন্য কিছু হওয়াই ভালো।

শেষ পর্যন্ত ছবিটি হয়তো তৈরি হয়। রাষ্ট্রের কোথাও কোনো নিষিদ্ধ তালিকাও থাকে না। কিন্তু আমরা খেয়াল করি না, ছবিটির ভেতর থেকে কতটা সত্য ইতিমধ্যে কেটে ফেলা হয়েছে।

বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক সংকট তাই প্রেমের গল্পের আধিক্যের চেয়ে অনেক বড়। খারাপ চলচ্চিত্রের সমাধান চলচ্চিত্র বন্ধ করা নয়, দুর্বল সাংবাদিকতার সমাধান সংবাদপত্র বন্ধ করা নয়, নিম্নমানের বইয়ের সমাধান উপন্যাস নিষিদ্ধ করা নয়। একইভাবে খারাপ বা পুনরাবৃত্ত প্রেমের নাটকের সমাধান প্রেমের গল্প সীমিত করা নয়।

একটি জাতির নৈতিক শক্তি প্রেমের গল্প কমিয়ে তৈরি হয় না। সেটি তৈরি হয় শিক্ষা, আইনের শাসন, নারীর নিরাপত্তা, সামাজিক ন্যায়বোধ, মানবিকতা এবং সুস্থ সাংস্কৃতিক চর্চার মধ্য দিয়ে। আর একটি জাতির সৃজনশীল শক্তি তৈরি হয় তখনই, যখন একজন লেখক গভীর রাতে একটি সত্যিকারের দৃশ্য লিখে শেষ করার পর অন্তত এই বিশ্বাসটি রাখতে পারেন যে পরদিন সকালে উঠে তাঁকে প্রথমেই ভাবতে হবে না, এই সত্যটুকু আবার কতটা কেটে ফেলতে হবে।

বাংলাদেশের এখন সেই জায়গাটিই বড় করা দরকার, যেখানে গল্প বলা যায়। গল্পকে পথে পথে সম্পাদনা করতে করতে তার প্রাণটুকু মেরে ফেলার নয়।

লেখক: চলচ্চিত্র নির্মাতা

Read full story at source