গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটে হালকা প্রকৌশল শিল্পের উৎপাদন কমেছে, বেড়েছে খরচ

· Prothom Alo

এক যুগের বেশি সময় ধরে বিভিন্ন ধরনের পানির কল (ট্যাপ) তৈরি করছে ফয়সল পলিমার ইন্ডাস্ট্রিজ। রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকায় প্রতিষ্ঠানটির কারখানা। কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, পণ্যের চাহিদা কমাসহ নানা কারণে কয়েক মাস ধরেই কোম্পানিটি আশানুরূপ ব্যবসা করতে পারছিল না। সেই পরিস্থিতি আরও জটিল করেছে সাম্প্রতিক গ্যাস–সংকট। নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস না পাওয়ায় সাম্প্রতিক সময়ে প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন ৬০ শতাংশের বেশি কমে গেছে।

ফয়সল পলিমার ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. সোলায়মান পারসী প্রথম আলোকে জানান, পানির কল বানানোর জন্য পিতল গলাতে তাঁদের কারখানায় সার্বক্ষণিক গ্যাসের ফার্নেস (চুলা) চালাতে হয়। এ জন্য গ্যাস লাগে। কিন্তু সর্বশেষ চার-পাঁচ মাস ধরেই গ্যাসের চাপ কম ছিল; এখন তা প্রায় বন্ধ। বর্তমানে দিনে তিন-চার ঘণ্টার বেশি কারখানা চালু রাখা যাচ্ছে না।

Visit asg-reflektory.pl for more information.

সোলায়মান পারসী বলেন, ‘কারখানা চালু রাখতে আমার দৈনিক ১৮ হাজার টাকা খরচ করতেই হয়। এই টাকা তুলতে হলে দিনে ৭–৮ লাখ টাকার পণ্য উৎপাদন করতে হয়। কিন্তু বর্তমান গ্যাস–সংকটে উৎপাদন কমে দাঁড়িয়েছে ৩-৪ লাখ টাকায়। উৎপাদনের ঘাটতির কারণে আমাদের বড় ধরনের আর্থিক লোকসানের মুখে পড়তে হচ্ছে।’ উৎপাদন কমার প্রভাব পড়েছে কর্মসংস্থানেও। এক বছর আগেও ফয়সল পলিমার ইন্ডাস্ট্রিজে ৩০ জন কর্মী কাজ করতেন। এখন সেখানে কাজ করছেন মাত্র ১২ জন।

যাত্রাবাড়ী এলাকায় ফয়সল পলিমার ইন্ডাস্ট্রিজের মতো পানির ট্যাপ তৈরির আরও প্রায় সাড়ে তিন শ ছোট-বড় কারখানা রয়েছে। বড় কারখানার নিজস্ব পিতল গলানোর (কাস্টিং বা মেল্টিং) ব্যবস্থা আছে। আর ছোট উদ্যোক্তারা অন্য কাস্টিং কারখানা থেকে তাদের মোল্ড ব্যবহার করে পিতলের কলের প্রাথমিক আকার তৈরি করিয়ে নেয়। ফলে বর্তমান গ্যাসের সংকটে এই এলাকার প্রায় সব কারখানার উৎপাদনেই নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

চলমান গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটে সারা দেশেই হালকা প্রকৌশল খাতের ছোট ও মাঝারি (এসএমই) উদ্যোক্তারা বিপাকে পড়েছেন। হালকা প্রকৌশল পণ্য খাতের সংগঠন বাংলাদেশ ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প মালিক সমিতির তথ্য অনুসারে, সারা দেশে ছোট-বড় মিলিয়ে ৫০ হাজার হালকা প্রকৌশল কারখানা রয়েছে। আর এই খাতে যুক্ত রয়েছেন প্রায় সাড়ে ছয় লাখ মানুষ।

রাজধানীর কেরানীগঞ্জ, বগুড়া, নারায়ণগঞ্জ, বগুড়া, পাবনাসহ দেশের প্রধান কয়েকটি হালকা প্রকৌশল ক্লাস্টারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অনেক স্থানে দিনে ৬ থেকে ৮ ঘণ্টার বেশি সময় বিদ্যুৎ থাকছে না। আর যেখানে উৎপাদনের প্রক্রিয়ায় গ্যাসের ওপর নির্ভরতা রয়েছে, সেখানে লাইনে প্রয়োজনীয় গ্যাসের চাপ না থাকায় কাস্টিং ও হিট ট্রিটমেন্টের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো পুরোপুরি বন্ধ রাখতে হচ্ছে।

ব্যবসায়ীরা জানান, দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে এমনিতেই বাজারে হালকা প্রকৌশল পণ্যের চাহিদা কমে গেছে। এর সঙ্গে গ্যাস-বিদ্যুতের সমস্যা যুক্ত হওয়ায় প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখাই এখন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক কারখানায় উৎপাদন অর্ধেকের নিচে নেমে গেছে। এ অবস্থায় কর্মীদের বেতন-ভাতা দেওয়া এবং ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করা তাদের জন্য কঠিন হয়ে গেছে।

ঢাকার বাইরেও সমস্যা প্রকট

ঢাকার আশপাশের জেলার এসএমই উদ্যোক্তারাও তাঁদের ভোগান্তির কথা জানিয়েছেন। যেমন লোডশেডিংয়ের কারণে গাজীপুরের শালনায় অবস্থিত কৃষি যন্ত্রপাতি তৈরির প্রতিষ্ঠান অ্যাগ্রো মেশিনারি ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের উৎপাদন স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অর্ধেকের নিচে নেমে এসেছে। ফলে ক্রেতাদের অর্ডার অনুযায়ী পণ্য সরবরাহ করতে পারছে না প্রতিষ্ঠানটি।

অ্যাগ্রো মেশিনারি ইন্ডাস্ট্রিজের এমডি মো. শেখ সাদী জানান, দিনে চার-পাঁচবার বিদ্যুৎ যায়। প্রতিবার বিদ্যুৎ গেলে এক ঘণ্টার আগে আসে না। যে কাজ আধা ঘণ্টায় করা যেত, এখন সে কাজ করতে অর্ধেক দিন লেগে যাচ্ছে।

শেখ সাদী বলেন, ‘আমার বিশাল ক্ষতি হচ্ছে। এভাবে কত দিন চলতে পারব, জানি না। তাই শালনা থেকে কারখানা সরিয়ে অন্য কোথাও নেওয়ার কথাও মাঝেমধ্যে ভাবি। আমরা তো ছোট প্রতিষ্ঠান; ব্যাংকও আমাদের টাকা দেয় না। নিজেদের পকেটের টাকায় আর ধারদেনা করে ব্যবসা চালাতে হয়। আমার মনে হয় না এভাবে বেশি দিন আমরা টিকে থাকতে পারব।’

বেশি বিদ্যুৎ বিলের অভিযোগ

নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ না থাকলেও বিদ্যুৎ বিল আগের তুলনায় বেশি আসছে বলে অভিযোগ করেছেন অনেক উদ্যোক্তা। যেমন রাজধানীর কেরানীগঞ্জে প্লাস্টিক ডাইস (ছাঁচ) তৈরির প্রতিষ্ঠান ব্রাদার্স ইঞ্জিনিয়ারিং জানিয়েছে, গত মাসে তাদের বিদ্যুৎ বিল ৩০ শতাংশের বেশি বেড়েছে।

লোডশেডিং কতটা হয়, তা জানতে চাইলে ব্রাদার্স ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের এমডি মো. মফিজুল ইসলাম বলেন, ‘এখন জেনারেটর চালাতে দিনে ২০০ লিটার করে তেল খরচ লাগছে। গত এক মাসে জেনারেটর খরচ ৪০ শতাংশ, বিদ্যুৎ বিল ৩০ শতাংশ বেড়েছে। আর উৎপাদন কমেছে ৩০ শতাংশ। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে, যেকোনো সময় কারখানা বন্ধ করে দিতে হবে।’

এসএমই ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আনোয়ার হোসেন চৌধুরী বলেন, ১‘উদ্যোক্তারা প্রতিনিয়ত আমাদের কাছে গ্যাস-বিদ্যুৎ নিয়ে তাঁদের অসুবিধার কথা জানাচ্ছেন। সংকটের কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান অর্ডার পেয়েও যথাসময়ে ডেলিভারি দিতে পারছে না। ফলে তারা নাজুক অবস্থায় পড়েছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে ব্যাংকের ঋণের কিস্তি পরিশোধ করা তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে। আমরা উদ্যোক্তাদের এই সমস্যাগুলোর কথা সরকারকে জানাচ্ছি।’

Read full story at source