হাম নিয়ে যে ১০টি প্রশ্নের উত্তর অভিভাবকেরা জানতে চান
· Prothom Alo
দেশে হামে মৃত্যুর সংখ্যা ৯০০ ছাড়িয়েছে। সেরে ওঠা শিশুদের অনেকেও হাম-পরবর্তী নানা জটিলতায় ভুগছে। এখনো থামেনি হামের সংক্রমণ ও জটিলতা। শিশুকে সুস্থ ও নিরাপদ রাখতে অভিভাবকদের সচেতনতার বিকল্প নেই। হাম নিয়ে ১০টি প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন স্কয়ার হাসপাতাল লিমিটেডের শিশু বিভাগের অ্যাসোসিয়েট কনসালট্যান্ট ডা. লায়লা বিলকিস
১. কীভাবে বুঝব হাম হয়েছে?
হামের প্রাথমিক উপসর্গ অন্যান্য সাধারণ ভাইরাসজনিত রোগের মতোই। জ্বর, কাশি, সর্দি, শারীরিক দুর্বলতা, চোখ লালচে হয়ে যাওয়া বা চোখ থেকে পানি পড়া। জ্বরের তিন থেকে পাঁচ দিন পর র্যাশ দেখা দেয়। এই র্যাশ সাধারণত শুরু হয় শরীরের ওপরের অংশ থেকে। কানের পেছনের ত্বক, চুল আর ত্বকের সংযোগস্থল এবং মুখ থেকে শুরু হয়ে পেট, পিঠ ও হাত-পায়েও ছড়ায় র্যাশ। চুলকানিও থাকে। হাম হলে মুখের ভেতর একটি বিশেষ দাগ দেখা যায়, যা একজন চিকিৎসক তাঁর রোগীকে পরীক্ষার সময় দেখে থাকেন। এই দাগের নাম কপলিক স্পট।
Visit syntagm.co.za for more information.
২. হাম কতটা ছোঁয়াচে? পরিবারের একজনের হলে কি অন্যদেরও হবে?
হাম অত্যন্ত ছোঁয়াচে রোগ। বাতাসের মাধ্যমে এই রোগের জীবাণু ছড়ায়। আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি-কাশির মাধ্যমে এই জীবাণু অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে যেতে পারে। তাই একই বাড়িতে থাকা অন্যদের মাঝে খুব সহজেই হামের জীবাণু ছড়িয়ে পড়তে পারে। তবে বাড়ির অন্য সদস্যরা হামে আক্রান্ত হবেন কি না, তা তাঁর রোগ প্রতিরোধক্ষমতার ওপর নির্ভর করে।
৩. আগে হাম হয়ে থাকলে কিংবা হামের টিকা নেওয়া থাকলেও কি হাম হতে পারে?
একবার হামের সংক্রমণ হয়ে থাকলে শরীরে হামের বিরুদ্ধে কার্যকর অ্যান্টিবডি তৈরি হয়। এই অ্যান্টিবডি সারা জীবন হামের বিরুদ্ধে সুরক্ষা দিতে পারে। কিন্তু হামের টিকার ডোজ সম্পন্ন করে থাকলেও হাম হতে পারে, কিন্তু টিকা দেওয়া থাকলে হাম-পরবর্তী জটিলতাগুলো থেকে সুরক্ষা পাওয়া যায়।
তবে খুব অল্প কিছু ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম দেখা যেতে পারে। কোনো কারণে যাঁদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা মারাত্মকভাবে কমে যায়, তাঁদের ক্ষেত্রে একবার সংক্রমণ হওয়ার পরও কিংবা টিকার ডোজ সম্পন্ন করার পরও পুনরায় হামের সংক্রমণ হতে পারে।
৪. শিশুর হাম হলে কি তাকে বাড়িতে রাখা যাবে, নাকি হাসপাতালে নিতেই হবে?
মারাত্মক কোনো জটিলতা যদি না হয়, তাহলে বাড়িতে রেখেই শিশুকে হামের চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব। তবে চিকিৎসার নির্দেশনার জন্য একজন চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে থাকা উচিত। কোন ধরনের উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে, তা-ও জানা থাকতে হবে।
৫. হামের সময় গোসল করানো যাবে কি?
হাম হলে গোসল করাতে কোনো বাধা নেই। গোসলের সময় প্রয়োজন অনুযায়ী শিশুর উপযোগী সাবান-শ্যাম্পুও ব্যবহার করা যাবে। তাতে কোনো ক্ষতি নেই।
৬. হাম হলে কি অ্যান্টিবায়োটিক–জাতীয় ওষুধ প্রয়োজন হয়?
হাম-পরবর্তী জটিল সংক্রমণের চিকিৎসায় অ্যান্টিবায়োটিক–জাতীয় ওষুধ প্রয়োজন হয়। কিন্তু হামের চিকিৎসা অ্যান্টিবায়োটিক নয়। জটিলতা সৃষ্টি হওয়ার আগে অ্যান্টিবায়োটিক শুরু করেও জটিলতার ঝুঁকি এড়ানো যায় না। কেবল জটিলতা দেখা দিলেই পরিস্থিতি অনুযায়ী একজন চিকিৎসক অ্যান্টিবায়োটিক সেবনের নির্দেশনা দেন।
৭. হাম থেকে কী কী জটিলতা হতে পারে?
হামের কারণে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে যায়। তখন বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়া মারাত্মক সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি করে। অনেক শিশুর নিউমোনিয়া, এনকেফালাইটিস (মস্তিষ্কের প্রদাহ), মেনিনজাইটিস (মস্তিষ্কের পর্দার প্রদাহ), সেপটিসেমিয়া (রক্তে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া) মারাত্মক ডায়রিয়া, দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়া এবং কানের সংক্রমণ হতে পারে। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের জটিলতার ঝুঁকি বেশি। হাম-পরবর্তী জটিলতায় এ বছর বহু শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
৮. হামের কোন লক্ষণগুলো দেখলে বুঝব পরিস্থিতি গুরুতর?
হাম নিরাময়ের নির্দিষ্ট কোনো ওষুধ নেইশ্বাসকষ্ট, ঘন ঘন শ্বাসপ্রশ্বাস, শ্বাসপ্রশ্বাসের সময় বুকের নিচের অংশ দেবে যাওয়া, খাবার বা তরল খেতে না পারা, অতিরিক্ত ঘুম ভাব, নেতিয়ে পড়া, এলোমেলো কথা বলা, খিঁচুনি, জ্ঞান হারানো, প্রস্রাব কমে যাওয়া, একটানা অতিরিক্ত জ্বর কিংবা অতিরিক্ত ডায়রিয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিলে বুঝতে হবে পরিস্থিতি গুরুতর। এমন ক্ষেত্রে যত দ্রুত সম্ভব শিশুকে হাসপাতালে নিতে হবে।
৯. হাম হলে ঘরে শিশুর কী কী যত্ন নিতে হবে?
হাম নিরাময়ের নির্দিষ্ট কোনো ওষুধ নেই। উপসর্গ অনুযায়ী চিকিৎসক কিছু ওষুধ দেন, যাতে রোগীর কষ্ট উপশম হয়। শিশুর বয়স অনুযায়ী সুষম পুষ্টি ও পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়াতে ও দৃষ্টিশক্তিকে সুরক্ষা দিতে ভিটামিন এ ক্যাপসুলও খাওয়াতে হয়। জ্বর থাকলে কুসুম গরম পানি দিয়ে শরীর মোছানো যায়। এ সময় বিশ্রামও প্রয়োজন। অসুস্থ হলে শিশুর খেলাধুলা-দৌড়ঝাঁপের প্রবণতা অনেকটাই কমে যায়।
১০. পরিবারের শিশুদের হাম থেকে বাঁচাতে কী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত?
টিকা দেওয়ার বয়স হলেই শিশুকে হামের টিকা দিয়ে নিন। হামে আক্রান্ত শিশুকে অন্য শিশু থেকে আলাদা রাখা উচিত। র্যাশ দেখা দেওয়ার চার দিন আগে থেকে চার দিন পর পর্যন্ত আক্রান্ত ব্যক্তির মাধ্যমে হামের জীবাণু ছড়াতে পারে। তাই ভাইরাসজনিত সংক্রমণের উপসর্গ দেখা দিলে শিশুকে অন্য শিশুর কাছে যেতে না দেওয়াই ভালো। আক্রান্ত শিশু স্কুলে গেলে বা খেলার জায়গায়ও অন্য শিশুরা আক্রান্ত হতে পারে।
হামের টিকা দেওয়া হয়নি, এমন শিশু যদি হামে আক্রান্ত কারও সংস্পর্শে আসে, তাহলে সে হামের ঝুঁকিতে পড়ে। ঝুঁকিতে পড়া এই শিশুটির বয়স যদি ছয় মাস বা তার বেশি হয়, তাহলে ৭২ ঘণ্টার মধ্যেই তাকে হামের টিকা দিন। কিন্তু যদি তার বয়স ছয় মাসের কম হয়, তাহলে তাকে ইমিউনোগ্লোবিউলিন ইনজেকশন দিতে হবে। চিকিৎসকের কাছ থেকে এই ইনজেকশনের ডোজ জেনে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে দিতে হবে।
হাম কী, কেন ও কীভাবে ছড়ায় এবং শিশুর হাম হলে করণীয় জানাচ্ছেন শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ