সিমেল, দূরত্ব-দর্শন অথবা ‘কেবলই এক সাঁকো’

· Prothom Alo

হেমন্তে, এক নির্জন পথে, বর্ষণাচ্ছন্ন ধূসর দিনে,

প্রথম দেখেছিলাম তোমায়, হাঁটছ তুমি

Visit betsport24.es for more information.

আপন সৌন্দর্য মেখে—নীরবে; যেন তোমার পদতল খুঁজছিল কোনো কুসুমিত হরিৎক্ষেত্র,

তোমার বসন চাইছিল, খেলে যাক, মৃদুমন্দ হাওয়া–বাতাসের মুহূর্ত,

আর তোমার শ্রবণ চাইছিল শুধু রৌদ্রস্নাত গ্রীষ্মের নীরবতা।

জগতের সৌন্দর্য সম্বন্ধে এক সুমহান প্রশ্নের মতো তুমি হেঁটে যাচ্ছিলে এমন এক পৃথিবীর মধ্য দিয়ে,

যে পৃথিবী কখনো কোনো প্রত্যুত্তর করে না;

আর তোমার পদক্ষেপ, তোমার দৃষ্টি, তোমার শ্বাসপ্রশ্বাস

যেন নিপতিত হচ্ছিল এক শূন্যতার অতলে।

সমগ্র অস্তিত্ব আর তোমার মাঝখানে

ছিল এক অতল খাদ—এমনই সেতুহীন,

যেমন পরস্পর থেকে সেতুহীন থাকে হ্যাঁ আর না;

এমন যে ব্যাকুলতা, সে নিজেও জানে না

কোন দিকে বাড়াবে সে, তার দুই হাত।

আর যখন তুমি তাকালে সেই আমারই দিকে,

যে আমি হাঁটছিলাম বিষণ্নতা মেখে,

আর তোমাকে যারপরনাই ভালোবেসে,

তখন তোমাকে ছেয়ে গেল এক সলাজ রক্তিমতা,

যেন তোমার হৃদয় বরাবর উঠে আসা

এক উষ্ণ তরঙ্গের আভা; সাথে থরোথরো কুণ্ঠা।

হায়, কত ভালো করেই না জানতাম আমি তা,

কত গভীরভাবেই না জানতাম: আচমকা কোনো এক আশা

তোমাকে দিয়েছিল নাড়া—স্রেফ এই তো ছিল হেতু,

হয়তো আমিই সেই সাঁকো; কেবলই এক সাঁকো।

মূল কবিতা: গিয়োর্গ সিমেল, ‘নুর আইনে ব্র্যুকে’, ১৯০১।

বাংলা তরজমা: নাসিফ আমিন।

‘সমাজতত্ত্বের শিক্ষার্থী মাত্রই গিয়োর্গ সিমেলের নাম শুনিয়া থাকিবেন’—বহু বছর আগে এই পদ্যখানি প্রথম তরজমা করতে গিয়ে টীকায় এই বাক্য দিয়েই শুরু করেছিলাম। তারপর খানিক মশকরা করে লিখেছিলাম, ‘জার্মান এই তত্ত্বজ্ঞানী সামাজিক জ্যামিতি, গোপনীয়তা, লটরপটরগিরি, কেতাদুরস্ততা ইত্যাকার বিষয় লইয়া তত্ত্ব করিয়াছেন।’ কথাটা নিতান্ত মিথ্যা ছিল না। বরং সিমেলের চিন্তাপ্রকৃতিকে প্রথম পরিচয়ে ধরতে চাওয়ার আভাসই এই বিচিত্র তালিকার ভেতরে আছে। প্রেম থেকে টাকা, ফ্যাশন থেকে গোপনীয়তা, আগন্তুক থেকে মহানগর, মুখমণ্ডল থেকে ছবির ফ্রেম, দরজা থেকে সাঁকো, দ্বন্দ্ব থেকে সামাজিকতা, এমনকি মানুষের একে অপরের দিকে তাকানোর ভঙ্গি পর্যন্ত—এমন কোনো বিষয় নেই যার ভেতর দিয়ে সিমেল সামাজিক অস্তিত্বের কোনো গভীরতর প্রশ্নে পৌঁছানোর চেষ্টা করেননি। তাঁর কাছে আপাত-তুচ্ছ দৈনন্দিনতা বা যেকোনো ঘটনা কেবলই তুচ্ছতার বিষয় ছিল না। জীবনের পৃষ্ঠতলের একটি সামান্য বিন্দুতেও তিনি এমনভাবে তত্ত্বের ভার নামিয়ে দিতেন যেন সেখান থেকে মানুষের অন্তর্জীবনের অতল পর্যন্ত একটি দড়ি ফেলে তা পরিমাপ করা সম্ভব হয়। গিয়োর্গ সিমেলের সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটিয়েছিল বন্ধুবর গুরুজন শ্রী মুজিবুর রহমান ওরফে কার্ল মুজিব। তাই কবিতাটির বাংলা তরজমা আমি তাকেই উৎসর্গ করেছিলাম। ১৮৫৮ সালে বার্লিনে জন্ম নেওয়া গিয়োর্গ সিমেল সমাজতত্ত্বের প্রতিষ্ঠাকালীন প্রধান চিন্তকদের একজন, কিন্তু তাঁকে শুধু ‘সোসিওলজিস্ট’ বললে তাঁর চিন্তার পরিসর অর্ধেকও ধরা পড়ে না। দর্শন, নন্দনতত্ত্ব, সংস্কৃতিতত্ত্ব, মনস্তত্ত্ব, অর্থনীতি, ধর্ম, শিল্প, নগরজীবন ও আধুনিকতার অভিজ্ঞতা তাঁর লেখায় পরস্পরের সঙ্গে অবিরাম মিশেছে। ১৮৭৬ থেকে ১৮৮১ পর্যন্ত বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস, দর্শন ও ফ্যোলকারসাইকোলজি বা লোকমনস্তত্ত্ব অধ্যয়ন করেছিলেন তিনি; তাঁর বৌদ্ধিক যাত্রার শুরুতে কান্ট যেমন গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন, পরবর্তী সময়ে গ্যেটে, নিৎশে, বার্গসন এবং জীবন-দর্শনের নানা প্রবাহ তাঁর ভাবনাকে ক্রমেই অন্যদিকে নিয়ে গেছে। সারা জীবন যে প্রধান দার্শনিক প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন সিমেল তা হলো, আধুনিক পৃথিবীতে ব্যক্তিস্বাধীনতার সীমা এবং সম্ভাবনা। এই স্বাধীনতা তাঁর কাছে নিছক রাজনৈতিক বা সামাজিক সমস্যা ছিল না। এটি তাঁর কাছে একই সঙ্গে ছিল নান্দনিক, নৈতিক, মনস্তাত্ত্বিক ও অধিবিদ্যাগত সমস্যা। সিমেলের সমাজতত্ত্বের গোড়াতেই আছে একটি মৌলিক স্থানান্তর। ‘সমাজ’ সেখানে মানুষের মাথার ওপর গেড়ে বসা অতিকায় কোনো স্থির সত্তা নয়; বরং সমাজ ক্রমাগত ঘটে ওঠে মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্যে। মানুষ পরস্পরের দিকে এগোয়, দূরে সরে যায়, অনুকরণ করে, প্রতিযোগিতা করে, গোপন করে, প্রকাশ করে, ভালোবাসে, ঘৃণা করে, আনুগত্য স্বীকার করে, বিদ্রোহ করে, বিনিময় করে, পরস্পরের সঙ্গে সংঘাতে জড়ায়। এই মিথস্ক্রিয়া বা ভেক্সেলভির্কুং-এর পৌনঃপুনিক ছকগুলোকেই তিনি সামাজিক ‘ফর্ম’ হিসেবে ভাবতে চেয়েছিলেন। ফলে একই সামাজিক ফর্ম সম্পূর্ণ ভিন্ন কোনো কনটেন্ট বহন করতে পারে। প্রতিযোগিতা প্রেমেও থাকতে পারে, ব্যবসায়ও; গোপনীয়তা রাষ্ট্রে থাকতে পারে, বন্ধুত্বে থাকতে পারে; কর্তৃত্ব পরিবারে যেমন দেখা যায়, রাজনীতিতেও দেখা যায়। তাঁর কথিত ফর্মাল সোসিওলজির মৌলিক কৌশল এখানেই: নির্দিষ্ট ঘটনার বিষয়বস্তু থেকে তার সম্পর্কগত আকারটিকে খানিক আলাদা করে দেখা।

এ কারণেই পরবর্তী সমাজতত্ত্বের পাঠ্যবইয়ে যাকে অনেক সময় সিমেলের ‘সোশ্যাল জিওমেট্রি’ বলা হয়, সেটি নিছক চটকদার অভিধা নয়। দুজনের সম্পর্ক এবং তৃতীয় একজনের প্রবেশে সেই সম্পর্কের প্রকৃতি কীভাবে বদলে যায়; কতটা কাছে এলে একজন অন্তরঙ্গ, কতটা দূরে গেলে অপরিচিত; আর এমন কোনো অবস্থান সম্ভব কি না যেখানে একজন একই সঙ্গে কাছের ও দূরের, আপন ও পর; এসব তাঁর কাছে সামাজিক জীবনের মৌলিক জ্যামিতি। তাঁর বিখ্যাত ‘আগন্তুক’ বা ‘স্ট্রেঞ্জার’ সেই কারণেই এক প্যারাডক্সিক্যাল সোশ্যাল টাইপ: যে পুরোপুরি বাইরের নয়, আবার পুরোপুরি ভেতরেরও নয়। ফ্যাশনের ক্ষেত্রেও একই দ্বৈততা: মানুষ একই সঙ্গে অন্যদের মতো হতে চায় এবং অন্যদের থেকে পৃথক হতে চায়। গোপনীয়তায় একই সঙ্গে আছে সম্পর্ক এবং প্রত্যাহার। ফ্লার্টেশনে যেমন আছে দেওয়া এবং না-দেওয়া, তেমনি আছে সম্মতি ও প্রত্যাখ্যানের খেলা। এমনকি দ্বন্দ্বও তাঁর কাছে সম্পর্কের বিপরীত নয়; সংঘর্ষ নিজেই একধরনের সম্পর্ক। সিমেলীয় জগতে ‘ছেদ’ ও ‘সংযোগ’ পরস্পরকে বাতিল করে না; বরং একে অপরকে সম্ভব করে তোলে।

এই শেষ কথাটি ‘কেবলই এক সাঁকো’ কবিতাটির মূল প্রতিপাদ্য বোঝার জন্য বিশেষ জরুরি। সিমেলের চিন্তায় দূরত্ব কোনো সম্পর্কের নিছক ব্যর্থতা নয়। অনেক ক্ষেত্রে দূরত্বই সম্পর্কের শর্ত। ‘অর্থের দর্শন’ বা ‘দ্য ফিলোসফি অব মানি’-তে তিনি বস্তুগত ভ্যালু বা অর্থের সূত্র খুঁজতে গিয়েও ডিসট্যান্স বা দূরত্বের ধারণার কাছে পৌঁছেছিলেন। কোনো কিছু যদি এত কাছে থাকে যে পেতে কোনো আকাঙ্ক্ষা, শ্রম বা অতিক্রমের প্রয়োজনই নেই, সেটি বিশেষ মূল্য অর্জন করে না; আবার এমন দূরে থাকলেও চলে না যে তাকে পাওয়ার কোনো সম্ভাবনাই নেই। ডিজায়ার বা বাসনা নিজেই সাবজেক্ট ও অবজেক্টের মধ্যকার একটি দূরত্বের মনস্তাত্ত্বিক প্রকাশ। অর্থাৎ আমাদের চাওয়া বস্তুটিকে আমাদের থেকে পৃথকও করে, আবার তার দিকেই নিয়ে যায়। আকাঙ্ক্ষা একই সঙ্গে ফাঁক এবং সেই ফাঁক অতিক্রমের চেষ্টা।

এই দ্বৈত গতিই সিমেলের প্রায় সব চিন্তার নিচে কোনো না কোনোভাবে কাজ করে। ব্যক্তিসমাজের ভেতরেই ব্যক্তি, অথচ সমাজের দ্বারা সম্পূর্ণ নিঃশেষিত নয়। আমি অন্যের সঙ্গে সম্পর্কিত বলেই ‘আমি’, কিন্তু আমার এমন একটি অংশও আছে, যা অপরের কাছে অনতিক্রম্য। স্বাধীনতা সম্পর্কের অনুপস্থিতি নয়, বরং সম্পর্কের ভেতর নিজের অবস্থান নির্মাণের ক্ষমতা। আধুনিক মানুষ যত বেশি সামাজিক বলয়ে প্রবেশ করে, তত বেশি মুক্তির সম্ভাবনা পায়। আবার সেই বিস্তৃত ও জটিল সমাজই তাকে ব্যক্তিনিরপেক্ষ ব্যবস্থা, অর্থ, প্রতিষ্ঠান এবং অবজেকটিভ কালচারের সামনে ক্ষুদ্র করে তোলে। আধুনিকতার এই যুগপৎ মুক্তি ও বিচ্ছিন্নতা বা ‘সিমালটেনিয়াস লিবারেশন অ্যান্ড এস্ট্রেঞ্জমেন্ট’-ই সিমেলীয় অভিজ্ঞতার একটি প্রধান সুর। এখানেই তাঁর সমাজতত্ত্ব ধীরে ধীরে জীবন-সম্পর্কিত দার্শনিকতা বা ফিলোসফি অব লাইফের সঙ্গে মিশে যায়। সিমেলের কাছে ‘লাইফ’ কোনো স্থির সাবস্ট্যান্স নয়; জীবন একটি প্রবাহ, যা নিজেকে প্রকাশ করতে গেলে ফর্ম তৈরি করে, আবার বেঁচে থাকার তাগিদেই সেই ফর্ম অতিক্রম করে। ভাষা, শিল্প, ধর্ম, প্রতিষ্ঠান, আইন, জ্ঞান, অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, সম্পর্কের নিয়ম, এমনকি ব্যক্তিসত্তাও জীবনের সৃষ্ট একেকটা ফর্ম। কিন্তু তৈরি হওয়ার পর ফর্ম নিজস্ব স্থায়িত্ব এবং যুক্তি অর্জন করে। জীবন তখন নিজেরই তৈরি রূপের মধ্যে আশ্রয় নেয় এবং নিজেরই তৈরি রূপের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। সিমেলের শেষ দিকের জীবন-দর্শনের এই চলনটি ‘অধিক জীবন’ বা ‘মোর লাইফ’ এবং ‘জীবন অধিক’ বা ‘মোর দ্যান লাইফ’-এর দিকে আত্ম-অতিক্রমের প্রচেষ্টা হিসেবে আসে। অর্থাৎ জীবিত সত্তা তার বর্তমান সীমা ছাপিয়ে যেতে চায়, অথচ সীমা ছাড়া তার কোনো নির্দিষ্ট অস্তিত্বও সম্ভব নয়।

এই প্যারাডক্স থেকেই সিমেল সংস্কৃতির দুর্ভাগ্যজনক পরিণতি বা ‘ট্র্যাজেডি অব কালচার’-কে ব্যাখ্যা করেন। সাবজেক্টিভ লাইফ নিজের শক্তি দিয়ে অবজেক্টিভ ফর্ম তৈরি করে, যেমন শিল্পকর্ম, জ্ঞান, প্রযুক্তি, টাকা, প্রতিষ্ঠান, ভাষা, সাংস্কৃতিক সম্পদ ইত্যাদি। কিন্তু একসময় সেই অবজেক্টিভ কালচার এত বিপুল, এত স্বয়ংসম্পূর্ণ ও জটিল হয়ে ওঠে যে তার স্রষ্টা ব্যক্তি আর তাকে আত্মস্থ করতে পারে না। যা মানুষ নিজের বিকাশের জন্য সৃষ্টি করেছিল, সেটিই তার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে দাঁড়ায়। সিমেলের আধুনিকতা তাই কেবল বিচ্ছিন্নতা বা অ্যালিয়েনেশনের বিষণ্ন কাহিনি নয়; বরং সৃষ্টির নিজস্ব দ্বন্দ্বমূলক বাস্তবতা। মানুষ ফর্ম ছাড়া বাঁচতে পারে না, অথচ কোনো ফর্মেই চূড়ান্তভাবে বসবাস করতে পারে না। এসব তত্ত্বের কথা বলতে গিয়ে সিমেলের আরেকটি বৈশিষ্ট্য ভুলে গেলে চলে না। তিনি তত্ত্বকে কেবল কনসেপ্টের মাধ্যমে ভাবতেন না; ইমেজ দিয়েও ভাবতেন। তাঁর লেখায় তাই ওলনদড়ি, ছবির ফ্রেম, হাতল, দরজা, সাঁকোর মতো জিনিস হঠাৎ হয়ে ওঠে চিন্তার যন্ত্র। টমাস কেম্পল সিমেলের এই পদ্ধতিকে ‘থিত্তরি-ফিকশন’ বা ‘তত্ত্বকল্প’ নাম দিয়েছেন। তাঁর ভাষায়, সিমেলের সাদৃশ্যগত তুলনা ও রূপক ব্যবহার কোনো শাস্ত্রীয় যুক্তিবিন্যাসের গায়ে বসানো অলঙ্কার নয়। এগুলো নিজেরাই অনুসন্ধানের একেকটা পদ্ধতি। তাঁর ছাত্র সিগফ্রিড ক্রাকাউয়ারও বলেছিলেন, সিমেলের সাদৃশ্যগত তুলনা আসলে মূল অনুসন্ধান থেকে কোনো বুদ্ধিদীপ্ত বিচ্যুতি নয়। বরং অনেক সময় সেই সাদৃশ্যগত তুলনাই অনুসন্ধানের লক্ষ্য হয়ে ওঠে। দৃশ্যমান কোনো বস্তুকে অবলম্বন করে অদৃশ্য সম্পর্কের জটিলতা চিনে নেওয়াটাই সিমেলের লেখার একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য।

এই কারণেই সিমেলের কবিতা লেখা তাঁর ‘আসল’ সমাজতাত্ত্বিক কাজ থেকে কোনো কাব্যিক অবকাশমাত্র নয়। বরং তাঁর তত্ত্বের ভাষা ও কবিতার ভাষার মাঝখানে কখনোই কোনো কঠিন প্রাচীর ছিল না।

উনিশ শতকের শেষভাগ ও বিশ শতকের একেবারে শুরুতে মিউনিখ থেকে প্রকাশিত অ্যাভাঁ-গার্দ পত্রিকা ইয়ুগেন্ট সিমেলকে এই পরীক্ষার একটি ক্ষেত্র তৈরি করে দিয়েছিল। ইয়ুগেন্টসটিল-এর সঙ্গে যুক্ত এই পত্রিকায় শিল্পী, লেখক ও সাংস্কৃতিক পরীক্ষকদের পাশে সিমেলও উপাখ্যান, সূক্তি, রূপকথা, ক্ষুদ্র গদ্য এবং কবিতার মধ্য দিয়ে এমন কিছু ভাবনা পরীক্ষা করেছেন, যা প্রচলিত বিদ্যায়তনিক একক গ্রন্থে সহজে জায়গা পেত না। তাঁর ‘নুর আইনে ব্র্যুকে’ প্রকাশিত হয় ১৩ মার্চ ১৯০১ সালে। বহু পরে টমাস এম কেম্পল কবিতাটিকে ‘অনলি আ ব্রিজ’ নামে ইংরেজিতে অনুবাদ করেন; ২০১২ সালের থিওরি, কালচার অ্যান্ড সোসাইটির সিমেল-বিষয়ক বিশেষ সংখ্যায় সেই অনুবাদ প্রকাশিত হয়। কবিতাটি পড়লে বোঝা যায়, এই সংক্ষিপ্ত গীতিকবিতার মধ্যে আসলে সিমেলের পরবর্তী বহু তাত্ত্বিক প্রশ্ন বীজরূপে উপস্থিত আছে।

প্রথম দৃশ্যটি আপাতদৃষ্টিতে নিছক একটি বিষণ্ন প্রান্তরের দৃশ্য। হেমন্ত, নির্জন পথ, বৃষ্টিধূসর আকাশ। সেই বিষণ্নতার ভেতর দিয়ে এক নারী হেঁটে যাচ্ছে, ‘আপন সৌন্দর্য মেখে নীরবে’। কিন্তু আশ্চর্য হলো, তার শরীরের প্রতিটি ইন্দ্রিয় যেন যে জগতে আছে, তার চেয়ে অন্য কোনো জগতের জন্য আকুল। তার পা চায় ফুলে-ভরা সবুজ তৃণভূমি, বসন চায় মৃদুমন্দ হাওয়ার খেলা, শ্রবণ চায় রৌদ্রস্নাত গ্রীষ্মের নীরবতা। বর্তমান বাস্তবতা এবং ইন্দ্রিয়ের আকাঙ্ক্ষিত বাস্তবতার মধ্যে প্রথম দূরত্বটি এখানেই তৈরি হয়। সে যে পৃথিবীতে হাঁটছে, তার দেহ যেন সেই পৃথিবীর সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে সহাবস্থান করতে পারছে না।

তারপর নারীটি নিজেই একটি প্রশ্নে রূপান্তরিত হয়:

‘জগতের সৌন্দর্য সম্বন্ধে এক সুমহান প্রশ্নের মতো’ এখানে সৌন্দর্য কোনো উত্তর নয়। সৌন্দর্যই প্রশ্ন। আর যে পৃথিবীর ভেতর দিয়ে এই প্রশ্নটি হেঁটে যায়, সেই পৃথিবী ‘কখনো কোনো প্রত্যুত্তর করে না’। পদক্ষেপ, দৃষ্টি, শ্বাসপ্রশ্বাস, অর্থাৎ পৃথিবীর দিকে শরীরের তিনটি আলাদা প্রসারণ, সবই যেন নিপতিত হয় শূন্যতার মধ্যে। কর্তা বা সাবজেক্ট পৃথিবীর দিকে নিজেকে নিক্ষেপ করছে, কিন্তু সারেজাহান বা ইহলৌকিকতা তার প্রত্যুত্তরে কোনো সাড়াই দিচ্ছে না। সিমেলের সমাজতত্ত্বের কেন্দ্রে যে ‘সাড়া’ বা ‘ভেক্সেলভির্কুং’, এখানে তার এক ভয়াবহ অনুপস্থিতি। সম্পর্কের সম্ভাবনা আছে, কিন্তু মিথস্ক্রিয়া ঘটছে না। একজন আছে; ইহজাগতিকতাও আছে; কিন্তু মাঝখানে কোনো সাড়া নেই।

এরপর কবিতা তার কেন্দ্রীয় অস্তিদার্শনিক চিত্রকল্প বা অন্টোলজিক্যাল ইমেজে পৌঁছে যায়:

‘সমগ্র অস্তিত্ব আর তোমার মাঝখানে ছিল এক অতল খাদ’

এটি প্রেমিক-প্রেমিকার সাধারণ দূরত্ব নয়। লক্ষ করার বিষয়, সিমেল বলেননি ‘আমার এবং তোমার মাঝে’। খাদটি ‘সমগ্র অস্তিত্ব’ এবং ‘তুমি’-এর মাঝে। অর্থাৎ নারীটির বিচ্ছিন্নতা বয়ানকারীর কাছ থেকে নয়, সত্তা বা বিইং-এর সামগ্রিকতা থেকেই। এখানে কবিতাটি রোমান্টিক গীতিকাব্য থেকে অস্তিত্ব-অতীত বিচ্ছিন্নতা বা মেটাফিজিক্যাল এস্ট্রেঞ্জমেন্টের কবিতায় পরিণত হয়।

এমনকি এই বিচ্ছিন্নতার তুলনাও তিনি করেন ‘হ্যাঁ’ ও ‘না’-এর সঙ্গে। হ্যাঁ ও না একই প্রশ্নের সম্ভাব্য দুই উত্তর, অর্থাৎ গভীরভাবে পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত; অথচ তাদের লজিক্যাল অবস্থান সম্পূর্ণ বিপরীত। এই একটি দৃশ্যে সিমেলের দ্বান্দ্বিক পরিশীলন ধরা পড়ে। যে দুটি জিনিস সবচেয়ে তীব্রভাবে পৃথক, তারাই অনেক সময় একই সম্পর্কক্ষেত্রের দুই প্রান্ত।

এ কারণেই পরের ‘ব্যাকুলতা’ বা জেনজুখ্ট এত গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাকুলতা নিজেই জানে না কোন দিকে দুই হাত বাড়াবে। বাসনা আছে, কিন্তু আকাঙ্ক্ষাবস্তু নেই; সম্পর্কমুখী তাড়না আছে, কিন্তু অভিমুখ বা গন্তব্য নেই। ফিলোসফি অব মানির ‘দূরত্ব’ তত্ত্বের পাশে রাখলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়। আকাঙ্ক্ষা সাধারণত দূরত্বকে অনুভব করে বলেই কোনো কিছুর দিকে হাত বাড়ায়; এই কবিতায় বিচ্ছিন্নতা এত মৌলিক যে আকাঙ্ক্ষা তার অপর প্রান্তটিই আর শনাক্ত করতে পারে না। দূরত্ব এখানে বস্তুগত অর্থ উৎপাদনের স্বাভাবিক ব্যবধানকে ছাড়িয়ে অতল গহ্বর বা খাদে পরিণত হয়েছে।

ঠিক এখানেই আবির্ভূত হয় মানুষটি, কবিতার বয়ানকারী ‘আমি’। সে বিষণ্ন হয়ে হাঁটছে এবং ভালোবেসে যাচ্ছে। নারী তাকায় তার দিকে। শরীরে আসে এক উষ্ণ তরঙ্গ, সলাজ রক্তিমতা। সাধারণ প্রেমের কবিতা হলে এখানেই একটি সহজ স্বীকৃতি ঘটত। সিমেল এই প্রচলিত গীতিকাব্যিক প্রত্যাশা শেষ মুহূর্তে ভেঙে দেন। বয়ানকারী জানে, সেই রক্তিমতার কারণ সে নিজে নয়, অন্তত প্রেমের আকাঙ্ক্ষাবস্তু হিসেবে নয়।

নারীর মনে হঠাৎ যে আশা জেগেছে তা হলো:

‘হয়তো আমিই সেই সাঁকো; কেবলি এক সাঁকো’

এই ‘কেবলই’ শব্দটির মধ্যে কবিতার সব ট্র্যাজেডি ঘনীভূত হয়। প্রেমিক তার গন্তব্য নয়। সে কেবলই একটি প্যাসেজ বা পারাপার। নারী যে অতল ব্যবধানের এক পারে দাঁড়িয়ে আছে, তার বিপরীত পারে হয়তো কোনো নির্দিষ্ট প্রেমিক নেই; আছে ‘সমগ্র অস্তিত্ব’। ফলে বক্তার প্রেমের সবচেয়ে নির্মম সম্ভাবনা হলো, নারী তাকে চাইতে পারে, কিন্তু তাকে পাওয়ার জন্য নয়। তার ভেতর দিয়ে অন্য কোথাও পৌঁছানোর জন্য। যে ভালোবাসে, সে নিজেকে অপরের শেষ আশ্রয় ভেবেছিল; অথচ জানতে পারে, সে হয়তো কেবল একটি পারাপারের বিন্দু।

এখানে ভালোবাসার এক গভীর সিমেলিয়ান বোঝাপড়া তৈরি হয়। সম্পর্ক দুই ব্যক্তিকে এক করে দেয় না; সম্পর্ক একটি ফর্ম নির্মাণ করে, যার মধ্য দিয়ে পৃথক দুই সত্তা পরস্পরের দিকে যেতে পারে। সেতু বা সাঁকো এই দুই পারকে ধ্বংস করে একটি ভূখণ্ড বানায় না। বরং দুই পার পৃথক আছে বলেই সেতুর প্রয়োজন। সুতরাং সংযোগের প্রাথমিক শর্তই হলো বিচ্ছিন্নতা।

এই কবিতা লেখার আট বছর পরে, ১৯০৯ সালে, সিমেল ‘ব্র্যুকে উন্ট ট্যুর’ অর্থাৎ ‘সাঁকো আর দরজা’ সাঁকোর এই চিত্রকল্পটিকেই পূর্ণাঙ্গ দার্শনিক রূপ দিয়েছেন। সেখানে প্রকৃতিতে বিচ্ছিন্ন বলে প্রতীয়মান দুটি তীরকে মানুষ সাঁকো দিয়ে যুক্ত করে। সাঁকো আমাদের স্থানিক বিচ্ছিন্নতা বা স্পেশিয়াল সেপারেশনকে একটি সম্পর্কব্যবস্থায় রূপান্তর করে। অন্যদিকে দরজা একই সঙ্গে সীমারেখা তৈরি করে এবং সীমা অতিক্রমের সম্ভাবনাও তৈরি করে রাখে। তাঁর ভাষায় জীবনের প্রতিটি মুহূর্তেই মানুষ অসংলগ্ন জিনিসের মধ্যে সেতু নির্মাণ করে। আবার দরজার মাধ্যমে আত্মনিষ্ঠ সত্তা বা বিইং-ফর-ইটসেলফ এবং ইহজগতের মধ্যে ভেতর-বাহির যাতায়াত করে।

কবিতার নারীটি আমাদের সামনে নিজে কথা বলে না। বয়ানকারী তার হাঁটা দেখে। তার ইন্দ্রিয়ের আকাঙ্ক্ষা অনুমান করে, তার অস্তিত্বগত বিচ্ছিন্নতা নির্ণয় করে। তার মুখের রক্তিমতার কারণও নিজেই জানে বলে দাবি করে। অর্থাৎ নারী এখানে একই সঙ্গে ফিলোসফিক্যাল ফিগার বা ভাবুক সত্তা। যদিও সিমেলের তত্ত্বগুলো বিষমকামী ও বাইনারি স্কিমার মধ্যে আটকে যায়; এবং সেখানে জীবিত নারীর বহুবিধ অভিজ্ঞতার বদলে কখনো ‘নারীত্বের’ তত্ত্বকল্প বেশি প্রাধান্য পায়; তাই কবিতাটিকে শুধু সম্পর্কের দর্শন হিসেবে উদ্‌যাপন করলেই পাঠ অসম্পূর্ণ থেকে যায়। প্রশ্ন করাও দরকার: যে পুরুষ নিজেকে ‘সাঁকো’ ভাবছে, সে কি সত্যিই নারীর ব্যাকুলতা জানে, নাকি নিজের দার্শনিক ভাবকল্প দিয়েই তার ব্যাকুলতার অর্থ নির্মাণ করছে?

কবিতাটি অবশ্যই আমাদের জানায় না যে আমরা একে অপরের চূড়ান্ত গন্তব্য হতে পারি কি না। সম্পূর্ণভাবে একে অপরের কাছে পৌঁছানো আদৌ হয়তো সম্ভব নয়। সমগ্র অস্তিত্ব এবং ব্যক্তিমানুষের মাঝের অতল খাদও হয়তো কোনোদিন ভরাট হওয়ার নয়। তবু মাঝেমধ্যে একটি মানুষ আরেকটি মানুষের কাছে সম্ভাবনা হয়ে ওঠে। এক পার থেকে অন্য পারে যাওয়ার একটা ক্ষণিক মুহূর্ত তৈরি হয়। তাই শেষ বিচারে সবই আসলে ‘কেবলই এক সাঁকো’!

Read full story at source