গ্রাফ পেপারের বিন্দু ও ক্ষেত্রফলের ম্যাজিক দ্বিতীয় পর্ব: পিকের সূত্রের রহস্য
· Prothom Alo

আগের পর্বে রাতুল শিখেছিল, গ্রাফের বিন্দুর ওপর কোনা থাকা একটি বহুভুজের ক্ষেত্রফল A = I + B _ 2 −1 সূত্রে পাওয়া যায়। এখানে I ভেতরের ও B সীমানার ওপর থাকা গ্রাফের বিন্দুর সংখ্যা। আয়তক্ষেত্রের উদাহরণে উত্তর মিলে গেলেও রাতুলের প্রশ্ন রয়ে গেল: সূত্রটি কাজ করে কেন?
গণিত ভাইয়া বললেন, ‘গ্রাফ পেপারের পাশাপাশি চারটি বিন্দু মিলে একটি ছোট বর্গ তৈরি করে। তার ক্ষেত্রফল ১ বর্গ একক। সেই বর্গকে কোনাকুনি কাটলে সমান দুটি ত্রিভুজ পাওয়া যায়। তাই প্রতিটি ত্রিভুজের ক্ষেত্রফল 1 _ 2 বর্গ একক।’
Visit sport-tr.bet for more information.
তিনি ছবির 1 নম্বর চিহ্নিত ত্রিভুজটি দেখিয়ে বললেন, ‘গ্রাফ পেপারে আঁকা একটি বহুভুজকে এমন অনেক ছোট ত্রিভুজে ভাগ করা যায়। তখন সব ছোট অংশের ক্ষেত্রফল যোগ করলে পুরো বহুভুজের ক্ষেত্রফল পাওয়া যায়। পাশাপাশি দুটি ত্রিভুজের মাঝখানের রেখাটি বহুভুজের ভেতরে থাকে। সব কটি অংশ যোগ করলে ভেতরের রেখাগুলো একে অপরের সঙ্গে মিলে যায়।’
রাতুল জিজ্ঞাসা করল, ‘তাহলে I সরাসরি যোগ হয় কেন?’
গণিত ভাইয়া বললেন, ‘ভেতরের একটি গ্রাফের বিন্দুর চারপাশের পুরো জায়গাই বহুভুজের মধ্যে থাকে। ছোট ত্রিভুজগুলো সেই বিন্দুর চারদিকে পূর্ণ এক চক্কর তৈরি করে। তাই ভেতরের প্রতিটি বিন্দুর জন্য আমরা পুরো ১ করে ক্ষেত্রফল পাই। সে জন্যই সূত্রে সরাসরি I বসেছে।’
‘সীমানার বিন্দুগুলো কিন্তু বহুভুজের ভেতরে পুরোপুরি থাকে না। একটি সোজা রেখা কোনো গ্রাফের বিন্দুর ওপর দিয়ে গেলে তার চারপাশের জায়গার প্রায় অর্ধেক ভেতরে পড়ে, আর বাকি অর্ধেক বাইরে থাকে। তাই সীমানার প্রতিটি বিন্দু অর্ধেক করে জায়গা দেয়। সে জন্য সীমানার বিন্দুর সংখ্যাকে ২ দিয়ে ভাগ করা হয়, অর্থাৎ B / 2। আর শেষের − 1 বহুভুজের সব কোণ ও সীমানার হিসাব ঠিকভাবে মিলিয়ে দেয়।’
রাতুল আরও ভালোভাবে বুঝতে চাইল। গণিত ভাইয়া খাতায় কয়েকটি দাগ টেনে বললেন, ‘বড় বহুভুজটিকে ছোট ত্রিভুজে ভাগ করলে কোনো জায়গা বাদ পড়ে না বা দুবার আসে না। প্রতিটি ত্রিভুজের ক্ষেত্রফল বের করে সব কটি যোগ করলে বড় চিত্রটির ক্ষেত্রফল পাওয়া যায়।’
রাতুল বলল, ‘তাহলে সূত্রটি কি সব ধরনের আঁকাবাঁকা চিত্রে খাটবে?’
‘না,’ গণিত ভাইয়া উত্তর দিলেন। ‘বহুভুজটি সরল হতে হবে। অর্থাৎ তার রেখাগুলো নিজেদের আড়াআড়িভাবে ছেদ করবে না, সীমানা বন্ধ থাকবে এবং প্রতিটি কোনা গ্রাফের বিন্দুর ওপর থাকবে। সাধারণ সূত্রে ভেতরে কোনো ছিদ্রও থাকবে না।’
গণিত ভাইয়া রাতুলের পিঠ চাপড়ে বললেন, ‘পিকের সূত্র আমাদের দেখায় যে জ্যামিতিতে কখনো আকারের জটিলতার চেয়ে সঠিকভাবে তথ্য গোনা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
‘যদি ভেতরে ডোনাটের মতো ফাঁকা জায়গা বা ছিদ্র থাকে, তাহলে প্রতিটি ছিদ্র আরেকটি সীমানা তৈরি করে। ছিদ্রের সংখ্যা H হলে সূত্রটি সামান্য বদলে যায়’
A = I + B _ 2 + H −1.
এখানে B গোনার সময় বাইরের সীমানা এবং ছিদ্রের সীমানায় থাকা সব গ্রাফের বিন্দু নিতে হবে। যেমন I = 2, B = 12 এবং H = 1 হলে
A = 2 + 12 _ 2 + 1 − 1 = 8.
গণিত ভাইয়া আরও সতর্ক করলেন, ‘কোনো রেখার ওপর দুই কোনার মাঝখানে অতিরিক্ত গ্রাফের বিন্দু থাকলে সেগুলোকেও B-এর মধ্যে ধরতে হবে। শুধু কোনাগুলো গুনলে চলবে না। আবার সীমানার বিন্দুকে ভুল করে ভেতরের বিন্দু হিসেবে গোনা যাবে না।’
সূত্র ব্যবহারের আগে গণিত ভাইয়া দেখতে বললেন: চিত্রটি বন্ধ কি না, রেখাগুলো নিজেদের ছেদ করেছে কি না, সব কোনা গ্রাফের বিন্দুর ওপর আছে কি না এবং ভেতরে ছিদ্র আছে কি না। প্রথম তিনটি শর্ত ঠিক থাকলে সূত্রটি চলবে। ছিদ্র থাকলে H যোগ করতে হবে।
রাতুল স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বলল, ‘আমার স্কুলের বহুভুজের ভেতরে কোনো ছিদ্র নেই, রেখাগুলোও পরস্পরকে ছেদ করেনি এবং সব কোনা গ্রাফের বিন্দুর ওপর। তার মানে, এটি একটি সরল বহুভুজ।’
সে প্রথমে সীমানা ধরে একদিকে এগিয়ে প্রতিটি গ্রাফের বিন্দু চিহ্নিত করল, যাতে কোনো বিন্দু বাদ না যায় বা দুবার গোনা না হয়। তারপর ভেতরের বিন্দুগুলো সারি ধরে গুনল। কিছুক্ষণ পর সে চিৎকার করে উঠল, ‘সীমানায় বিন্দু আছে ৯৬টি (মূল বিন্দু বাদে), তাই B = 96। একদম ভেতরে বা কেন্দ্রে বিন্দু আছে ১টি, তাই I = 1।’
এবার সূত্রে মান বসিয়ে সে লিখল:
A = I + B _ 2 − 1 = 1 + 96 _ 2 − 1 = 1 + 48 − 1 = 48.
‘অর্থাৎ বহুভুজের ক্ষেত্রফল ৪৮ বর্গ একক! স্কেল-কম্পাস ছাড়া এত বড় বহুভুজের নিখুঁত ক্ষেত্রফল মাত্র কয়েক মিনিটে বের হয়ে গেল।’
গণিত ভাইয়া রাতুলের পিঠ চাপড়ে বললেন, ‘পিকের সূত্র আমাদের দেখায় যে জ্যামিতিতে কখনো আকারের জটিলতার চেয়ে সঠিকভাবে তথ্য গোনা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। গ্রাফ পেপারে নিজের মতো সরল বহুভুজ আঁকI ও B গুনে সূত্রে বসা, তারপর পরিচিত জ্যামিতিক পদ্ধতিতে উত্তর মিলিয়ে দেখ। এভাবেই বিন্দু গণনা এক চমৎকার ক্ষেত্রফলের ম্যাজিকে পরিণত হয়।’
সহযোগিতায়: বাংলাদেশ গণিত, অলিম্পিয়াড কমিটি