শেষ প্রহর

· Prothom Alo

এই বুঝি সময় ঘনিয়ে এল। মেদিনীপুর সদর হাসপাতালে, মেঝের এক কোণে অমল পড়ে আছে অনেক দিন হলো। অবশ্য এখানে এভাবে পড়ে থাকা তার এবারই প্রথম নয়। এর আগেও অনেকবার এখানে থাকতে হয়েছে তাকে। এবার পরিস্থিতি অনেকটাই ভিন্ন। সম্ভবত সে জীবনযাত্রার শেষ গন্তব্যে পৌঁছে গেছে। পরিবার-পরিজনের মুখের চাহনি দেখে তো তা-ই মনে হয়েছে।

Visit casino-promo.biz for more information.

হাসপাতালের বারান্দায় দিন দিন লোকসমাগম বাড়তে থাকল। কাছের কিংবা দূরের অনেকেই আসেন অমলকে দেখতে। অথচ অমল, এই মানুষটি দিনের পর দিন দিব্যি ওদের সামনে দিয়ে চলেছে। প্রেম, ভালোবাসার কথা চাইলেই ঘরের মধ্যে গোপন রাখা যায়। কিন্তু অভাবের সংসারে এই দীনতার কথা ঠিকই পাড়াপড়শির কানে চলে যায়। তার শুকিয়ে যাওয়া গড়াই নদের মতো সংসারের কথাও জানত ওরা।

মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় দুঃখ হলো, দুঃখের কথা ভেঙেচুরে বলার মতো কাউকে খুঁজে না পাওয়া। জীবনের প্রতিটি বাঁকে সঙ্গীর অপরিহার্যতা না থাকলেও, ঠুনকো এ জীবনে কারও না কারও সঙ্গ পাওয়াটা জরুরি হয়ে পড়ে। অমলের হিসেবে ‘সঙ্গী’ আর ‘সঙ্গ’ সম্পূর্ণ আলাদা দুটি বিষয়।

কখনো অন্যের দয়ার ওপর নির্ভর করেনি অমল; যতটা সম্ভব আত্মমর্যাদা সমুন্নত রেখে চলার চেষ্টা করেছে। কিন্তু সে ছিল বড়ই ক্লান্ত। আর পেরে উঠছিল না। সন্তানদের অসহায়ত্ব দেখে মনোবল একদম নিঃশেষ হয়ে গিয়েছিল তার।
চেয়েছিল—কেউ পাশে এসে বসুক, চায়ের কাপে ঝড় না উঠলেও অন্তত সুখ-দুঃখের আলাপ হোক। কেউ অন্তত জিজ্ঞেস করুক, সে ভালো আছে কি না!

দেহে স্যালাইনের সংখ্যা বাড়তে থাকল। একপর্যায়ে খাওয়াদাওয়া সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেল। এই মোটা সুইয়ের স্যালাইনেই ভরসা। বুঝল, হাতে একদম সময় নেই।
একদিন এমন একজন অমলকে হাসপাতালে দেখতে এল, যে একসময় তাকে ভিটেমাটিছাড়া করার সব বন্দোবস্ত করেছিল। কত দিন কোর্টের বারান্দায় ঘুরেছে অমল সেই ভিটে রক্ষার জন্য! এবার সেই মানুষ মাফ চাইতে এসেছে তার কৃতকর্মের জন্য।

শ্রাবণ মেঘের জল

কত ফলমূল জমে আছে বালিশটার পাশে। অথচ খাওয়ার উপায় নেই। শুধু স্যালাইন দিয়ে রেখেছে অমলকে।
নিধিরামবাবু অনেক কিছু নিয়ে এসেছেন আজ; এলাকার সবচেয়ে সচ্ছল ব্যক্তি। অথচ মেয়েটার বিয়ে দেওয়ার সময় ওনার কাছে কিছু সাহায্য চেয়েছিল অমল। শূন্য হাতে ফিরতে হয়েছিল সেবার। তবে এবার অমল শূন্য হাতে ফিরছে না। একরাশ অভিমান আর ঘৃণা নিয়ে সে বিদায় নিচ্ছে।
বিখ্যাত সাহিত্যিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় মৃত্যুবরণ করেছিলেন অন্নের অভাবে। চিকিৎসা ছাড়াই মারা গিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর কফিনে এত ফুলের স্তুপ জমেছিল যে তা দেখে সুভাষ মুখোপাধ্যায় লিখেছিলেন—
‘ফুলগুলো সরিয়ে নাও,
আমার লাগছে।
মালা জমে জমে পাহাড় হয়
ফুল জমতে জমতে পাথর।
পাথরটা সরিয়ে নাও,
আমার লাগছে।’

অমলকেও আক্ষেপ করে বলতে হচ্ছে—
‘স্মৃতির রোমন্থনে মনে হয় নিজেকেই চিনলুম না এত দিন, আমি যে বড়ই অভাগী। দোয়ার আশা করি না, একমুঠো মাটি দিস মুখে, শিগগিরই জমাব ওপারে পাড়ি।’
মানুষের মনের অসুখ বড়ই অদ্ভুত! নিজে ভালো থাকার চেষ্টা করি, অন্যকে ভালো রাখার চেষ্টা করি। অন্তত জিজ্ঞেস করি, কিরে! নিখিলেশ, কেমন আছিস তুই?

শিক্ষার্থী, বস্তু ও ধাতব কৌশল বিভাগ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়

Read full story at source