গ্রাফ পেপারের বিন্দু এবং ক্ষেত্রফলের ম্যাজিক (প্রথম পর্ব): বিন্দু গুনে ক্ষেত্রফল
· Prothom Alo
স্কুল থেকে ফেরার পরই রাতুল টেবিল ল্যাম্প জ্বালিয়ে মুখ গোমড়া করে বসে আছে। তার সামনে গ্রাফ খাতা, আর তাতে পেনসিল দিয়ে আঁকা এক অদ্ভুত জ্যামিতিক চিত্র। কোনো নির্দিষ্ট আকার নেই—চারপাশে অসংখ্য সূক্ষ্ম কাঁটার মতো কোণ তৈরি করে ছড়িয়ে আছে এক বিশাল বহুভুজ। রাতুল একটা স্কেল ও ক্যালকুলেটর নিয়ে অনবরত হিসাব কষছে, আর পরক্ষণেই বিরক্ত হয়ে রাবার দিয়ে সব মুছে ফেলছে।
Visit mwafrika.life for more information.
ঠিক তখনই ঘরে ঢুকলেন গণিত ভাইয়া। রাতুলের কপালের ভাঁজ দেখে তিনি হেসে বললেন, ‘কী রে রাতুল? গণিতের সমুদ্রে হাবুডুবু খাচ্ছিস মনে হচ্ছে?’
রাতুল চোখ কপালে তুলে বলল, ‘তুমি ইয়ার্কি করছ ভাইয়া! এত আঁকাবাঁকা ক্ষেত্রের ক্ষেত্রফল শুধু বিন্দু গুনে বের করা সম্ভব?’
রাতুল দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ‘ধুর ভাইয়া! স্কুল থেকে এই অদ্ভুত বহুভুজের একদম নিখুঁত ক্ষেত্রফল বের করতে দিয়েছে। আমি এটাকে ছোট ছোট ত্রিভুজে ভাগ করে ক্ষেত্রফল যোগ করার চেষ্টা করছি। কিন্তু কাঁটাগুলো গ্রাফ পেপারের ঘরগুলোকে এমনভাবে কেটেছে যে দশমিকের পর নিখুঁত মান মেলাতে পারছি না।’
গণিত ভাইয়া খাতাটা নিজের দিকে টেনে নিলেন। ‘আচ্ছা, এই বহুভুজের ক্ষেত্রফল বের করার জন্য তোকে যদি স্কেল বা ক্যালকুলেটর ব্যবহার করতে না বলি? শুধু কয়েকটি বিন্দু গুনে যদি ক্ষেত্রফল বের করা যায়, কেমন হবে?’
রাতুল চোখ কপালে তুলে বলল, ‘তুমি ইয়ার্কি করছ ভাইয়া! এত আঁকাবাঁকা ক্ষেত্রের ক্ষেত্রফল শুধু বিন্দু গুনে বের করা সম্ভব?’
‘একদম সম্ভব!’ গণিত ভাইয়া মুচকি হাসলেন। ‘১৮৯৯ সালে আলেকজান্ডার পিক নামের এক অস্ট্রিয়ান গণিতবিদ এই সূত্র আবিষ্কার করেছিলেন। সূত্রটি এখন পিকের সূত্র নামে পরিচিত। তবে সূত্রটি ব্যবহার করার আগে দেখতে হবে, বহুভুজের প্রতিটি কোনা গ্রাফ পেপারের বিন্দুর ওপর আছে কি না। গ্রাফের আড়াআড়ি ও লম্বালম্বি রেখা যেখানে একে অপরকে ছেদ করে, সেটাই গ্রাফের বিন্দু।’
গণিত ভাইয়া বললেন, ‘তুই শুধু আমাকে দুই ধরনের বিন্দু গুনে দে—’
১. আঁকাবাঁকা সীমানার একদম ভেতরে মোট কয়টি গ্রাফের বিন্দু আছে? এগুলো Inside Points; সংখ্যাটিকে বলব I.
২. বহুভুজের সীমানা ঠিক কয়টি গ্রাফের বিন্দুর ওপর দিয়ে গেছে? এগুলো Boundary Points; সংখ্যাটিকে বলব B.
‘ব্যস, এই দুটি সংখ্যা পেলেই ক্ষেত্রফলের হিসাব শুরু করা যাবে।’
রাতুল বিন্দু গুনতে শুরু করতেই গণিত ভাইয়া তাকে থামালেন। ‘এলোমেলোভাবে গুনলে একই বিন্দু দুবার ধরা পড়তে পারে। ভেতরের বিন্দুগুলো সারি ধরে গুনবি। সীমানার বিন্দু গোনার সময় একটি কোনা থেকে শুরু করে ঘড়ির কাঁটার দিকে এগোবি। শুরুর বিন্দুতে ফিরে এলে সেটিকে আবার ধরবি না। সীমানার বিন্দু মানে শুধু কোনাগুলো নয়। দুটি কোনার মাঝের রেখা অন্য কোনো গ্রাফের বিন্দুর ওপর দিয়ে গেলে সেটিকেও B-এর মধ্যে ধরতে হবে। একটি সোজা বাহু তিন ঘর লম্বা হলে দুই প্রান্তসহ চারটি গ্রাফের বিন্দু থাকতে পারে। তির্যক বাহুর মধ্যেও এমন বিন্দু থাকতে পারে। তাই রেখা ধরে ধীরে ধীরে গোনা ভালো।’
রাতুল বলল, ‘তাহলে সূত্র ব্যবহারের অর্ধেক কাজই হলো কোনটা ভেতরের আর কোনটা সীমানার বিন্দু, সেটা ঠিক করা।’ গণিত ভাইয়া বললেন, ‘ঠিক তা–ই। একটি বিন্দু হয় বহুভুজের সম্পূর্ণ ভেতরে থাকবে, নয়তো সীমানায় থাকবে, নয়তো বাইরে থাকবে। একই বিন্দুকে I ও B—দুই জায়গায় গোনা যাবে না।’
রাতুলের চোখে তখনো অবিশ্বাস। সে জিজ্ঞাসা করল, ‘ভেতরের বিন্দু আর সীমানার বিন্দু দিয়ে ক্ষেত্রফল কীভাবে বের হবে?’
গণিত ভাইয়া পেনসিল দিয়ে একটি সহজ আয়তক্ষেত্র আঁকলেন, যার দৈর্ঘ্য ৩ ঘর এবং প্রস্থ ২ ঘর।
তিনি বললেন, ‘বহুভুজে যাওয়ার আগে এই চিত্রটি দেখ। আয়তক্ষেত্রের একদম ভেতরে দুটি গ্রাফের বিন্দু আছে। তাই I = 2। এবার সীমানার ওপরের বিন্দুগুলো গুনে দেখ। ওপরের ও নিচের বাহুতে চারটি করে বিন্দু আছে; দুই পাশের মাঝখানে আরও একটি করে বিন্দু আছে। কোনার বিন্দুগুলো যেন দুবার গোনা না হয়। সব মিলিয়ে B = 10.’
এরপর গণিত ভাইয়া পিকের সূত্রটি লিখলেন:
এখানে A হলো ক্ষেত্রফল, I হলো ভেতরের গ্রাফের বিন্দুর সংখ্যা এবং B হলো সীমানার ওপর থাকা গ্রাফের বিন্দুর সংখ্যা।
রাতুল মানগুলো বসিয়ে হিসাব করল:
সে লাফিয়ে উঠে বলল, ‘আমাদের পরিচিত নিয়মেও আয়তক্ষেত্রের ক্ষেত্রফল=দৈর্ঘ্য × প্রস্থ, অর্থাৎ 3 × 2 = 6 বর্গ একক। দুই নিয়মের উত্তর একদম মিলে গেছে!’
গণিত ভাইয়া বললেন, ‘এটাই সূত্রটির সৌন্দর্য। চিত্রটি সোজা, তির্যক বা আঁকাবাঁকা হতে পারে, কিন্তু প্রতিটি কোনা গ্রাফের বিন্দুর ওপর থাকলে শুধু I ও B গুনেই ক্ষেত্রফল পাওয়া যায়। তবে কেন সীমানার বিন্দুর অর্ধেক নিতে হয় এবং শেষে ১ বিয়োগ করতে হয়, সেটিই আসল রহস্য। পরের পর্বে আমরা ছোট ত্রিভুজের সাহায্যে সেই রহস্য বুঝব, সূত্রের শর্ত জানব আর তোর বহুভুজের ক্ষেত্রফল বের করব।’
সহযোগিতায়: বাংলাদেশ গণিত, অলিম্পিয়াড কমিটি