বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়োগপ্রক্রিয়ায় ‘পেছনে ফেরা’ নয়, দরকার সংস্কার
· Prothom Alo

বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়োগ ব্যবস্থায় সরকার কি আবার পেছনের দিকে হাঁটছে—সাম্প্রতিক কিছু সিদ্ধান্ত ও আলোচনার প্রেক্ষাপটে এমন প্রশ্ন উঠেছে।
কর্মচারী নিয়োগের ক্ষমতা ইতিমধ্যে আবার পরিচালনা কমিটির হাতে ফিরেছে। বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (এনটিআরসিএ) মাধ্যমে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান ও সহকারী প্রধান নিয়োগের লিখিত পরীক্ষা হয়েছে প্রায় চার মাস আগে। কিন্তু এখনো মৌখিক পরীক্ষা হয়নি।
Visit asg-reflektory.pl for more information.
এর মধ্যে সহকারী শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা এনটিআরসিএর কাছ থেকে পরিচালনা কমিটির হাতে দেওয়ার প্রাথমিক আলোচনা চলছে। যদিও শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেছেন, এ বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
তবে শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এনটিআরসিএর মাধ্যমে নিয়োগ ব্যবস্থায় সমস্যা থাকলে তা সংস্কার করে আরও স্বচ্ছ ও কার্যকর করা যায়। কিন্তু পুরোনো ব্যবস্থায় ফিরলে স্থানীয় প্রভাব, দলীয়করণ, স্বজনপ্রীতি ও অনিয়মের সুযোগ আবার বাড়তে পারে। এনটিআরসিএর বর্তমান ব্যবস্থায় যে সীমাবদ্ধতা আছে, তা দূর করে নিয়োগপ্রক্রিয়াকে আরও দ্রুত, স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক করা উচিত। কোনোভাবেই পেছনে ফিরে যাওয়া উচিত নয়।
এনটিআরসিএর মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে আলোচনার পেছনে রয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক একটি সভা। ৩ আগস্টের এই সভায় এনটিআরসিএকে শুধু নিবন্ধন ও প্রত্যয়নের কাজে রাখার এবং নিয়োগের সুপারিশ না করার বিষয়ে আলোচনা হয়।
তবে এ নিয়ে বিতর্কের মধ্যে ১০ আগস্ট রাতে শিক্ষামন্ত্রীর অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে এহছানুল হক মিলনের পক্ষে বলা হয়, এ ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
পরে ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, এ-সংক্রান্ত একটি অসম্পূর্ণ খসড়া ফেসবুক বা সংবাদমাধ্যমে দেখে আন্দোলন শুরু হয়েছে। এ পরিস্থিতিকে ‘অনভিপ্রেত’ বলে উল্লেখ করেন তিনি।
এনটিআরসিএর মাধ্যমে নিয়োগের মূল ধারণাটি হলো, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা ও মেধার ভিত্তিতে শিক্ষক নির্বাচনকর্মচারী নিয়োগের ক্ষমতা ফিরল কমিটির হাতে
এমপিওভুক্ত বেসরকারি স্কুল-কলেজে শিক্ষক ছাড়া অন্যান্য পদে নিয়োগের ক্ষমতা আবার পরিচালনা কমিটির হাতে ফিরেছে। গত বছরের সেপ্টেম্বরে এসব পদে নিয়োগের ক্ষমতা পরিচালনা কমিটির কাছ থেকে নিয়ে জেলা প্রশাসকের (ডিসি) নেতৃত্বে গঠিত একটি কমিটির হাতে দেওয়া হয়েছিল। এই কমিটির মাধ্যমে পরীক্ষা, মূল্যায়ন ও নিয়োগের জন্য সুপারিশের ব্যবস্থা ছিল। এখানে পরিচালনা কমিটির কাউকে রাখার সুযোগ ছিল না।
কিন্তু গত ২১ জুলাই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নতুন সিদ্ধান্তে ২০২৫ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর জারি করা পরিপত্র বাতিল করা হয়। আর পুনর্বহাল করা হয় ২০২৪ সালের ১০ জানুয়ারির নির্দেশনার সংশ্লিষ্ট অংশ। ফলে ট্রেড সহকারী, অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর, অফিস সহকারী কাম হিসাব সহকারী, কম্পিউটার ল্যাব অপারেটর, গবেষণা বা ল্যাব সহকারী, অফিস সহায়ক, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, নিরাপত্তাকর্মী, নৈশপ্রহরী, আয়াসহ বিভিন্ন পদে নিয়োগের দায়িত্ব আবার পরিচালনা কমিটির হাতে গেছে।
অতীতে এসব পদে নিয়োগে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি, আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ ছিল। এখন কর্মচারী নিয়োগের ক্ষমতা পরিচালনা কমিটির হাতে ফেরার পর নিয়োগপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা-জবাবদিহি কীভাবে নিশ্চিত হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
প্রতিষ্ঠানপ্রধান নিয়োগে দীর্ঘসূত্রতা
বর্তমানে সহকারী শিক্ষক নিয়োগ হয় এনটিআরসিএর পরীক্ষা ও সুপারিশের ভিত্তিতে। আর অধ্যক্ষ-উপাধ্যক্ষ, প্রধান শিক্ষক-সহকারী প্রধান শিক্ষক নিয়োগ পরিচালনা কমিটির মাধ্যমে হয়ে আসছিল। আগে এসব নিয়োগের অধিকাংশ ক্ষেত্রে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ ছিল।
দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, এসব পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে অধিকাংশ সময় নিয়মবহির্ভূতভাবে সাড়ে ৩ লাখ থেকে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেন হয়। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ও পরিচালনা কমিটির সদস্যদের এই টাকা দিতে হতো বলে গবেষণায় উঠে এসেছিল।
নানা অভিযোগের পর প্রতিষ্ঠানপ্রধান ও সহকারী প্রধান পদেও এনটিআরসিএর মাধ্যমে নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এই লক্ষ্যে গত ১৮ এপ্রিল প্রতিষ্ঠানপ্রধান ও সহকারী প্রধান নিয়োগের পরীক্ষা হয়। ১১ হাজার ১৫১টি শূন্য পদের বিপরীতে ৫৩ হাজার ৬৯ জন আবেদন করেছিলেন। ২২ এপ্রিল পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয়। এতে ১৪ হাজার ৯৪২ জন উত্তীর্ণ হন।
লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রার্থীদের মৌখিক পরীক্ষা হবে। কিন্তু লিখিত পরীক্ষার ফল প্রকাশের প্রায় চার মাস পরও তা হয়নি।
এনটিআরসিএর একজন কর্মকর্তা গত মঙ্গলবার প্রথম আলোকে বলেন, ‘মৌখিক পরীক্ষার তারিখ এখনো ঠিক হয়নি। এই পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।’
এবারই প্রথম বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান পদগুলোয় (প্রধান ও সহকারী প্রধান) এনটিআরসিএর মাধ্যমে নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হলো। এর উদ্দেশ্য হলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে যোগ্য ব্যক্তিদের আনা। কিন্তু এখন পর্যন্ত মৌখিক পরীক্ষা না হওয়ায় নতুন ব্যবস্থায়ও দীর্ঘসূত্রতার বিষয়টি সামনে এসেছে।
ময়মনসিংহের একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রধান শিক্ষক প্রথম আলোকে বলেন, প্রধান ও সহকারী প্রধান নিয়োগের লিখিত পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর দ্রুত মৌখিক পরীক্ষা নিয়ে নিয়োগপ্রক্রিয়া শেষ করার কথা। কিন্তু কয়েক মাস পেরিয়ে গেলেও মৌখিক পরীক্ষা হয়নি। এর মধ্যে কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রে আগের নিয়ম ফিরিয়ে আনা হলো। আবার শিক্ষক নিয়োগ কমিটির হাতে দেওয়া হবে কি না, তা নিয়ে আলোচনা চলছে। ফলে প্রধান ও সহকারী প্রধান নিয়োগ নিয়ে সন্দেহ-সন্দিহান তৈরি হয়েছে। প্রধান ও সহকারী প্রধানসহ শিক্ষক নিয়োগ আবার কমিটির হাতে ফিরলে তা হবে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত।
বেসরকারি শিক্ষক নিয়োগ সুপারিশ নিয়ে শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্যের সঙ্গে সভার সিদ্ধান্তের ‘অমিল’পরিচালনা কমিটির হাতে কতটা ক্ষমতা
দেশে বর্তমানে মাধ্যমিক ও কলেজ পর্যায়ে ৩৫ হাজারের বেশি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আছে। এসব প্রতিষ্ঠানে তহবিল সংগ্রহ, নিয়োগ (আংশিক), বরখাস্ত, বাতিল, অপসারণ, নৈমিত্তিক ছুটি মঞ্জুরসহ পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ অনেক কাজই পরিচালনা কমিটির হাতে।
উন্নয়ন প্রকল্প-সম্পর্কিত বাজেট ও বার্ষিক বাজেট অনুমোদন, সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণ, সংরক্ষিত-সাধারণ-অন্যান্য তহবিল পরিচালনা, শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন বিলে সই করাসহ প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশ প্রশাসনিক কাজ পরিচালনা কমিটির মাধ্যমেই হয়।
অভিযোগ আছে, অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার মানোন্নয়নের চেয়ে যেসব কাজে আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার সুযোগ রয়েছে, সেগুলো নিয়েই পরিচালনা কমিটির বেশি আগ্রহ থাকে।
বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালিত হয় ‘গভর্নিং বডি’ ও ‘ম্যানেজিং কমিটি’ প্রবিধিমালা অনুযায়ী। কলেজ পর্যায়ের পরিচালনা কমিটিকে গভর্নিং বডি বলে, মাধ্যমিক পর্যায়ে ম্যানেজিং কমিটি।
শিক্ষক নিয়োগ এনটিআরসিএ নাকি ম্যানেজিং কমিটির হাতে, বিতর্কের মধ্যে শিক্ষামন্ত্রী বললেন, সিদ্ধান্ত হয়নি২০০৯ সালের আগের প্রবিধানমালায় সংসদ সদস্যদের উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত কতগুলো বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটির সভাপতি হওয়া যাবে, তার কোনো সীমা ছিল না।
২০০৯ সালের প্রবিধানমালায় একজন সংসদ সদস্য তাঁর নির্বাচনী এলাকার সর্বোচ্চ চারটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সভাপতি হতে পারতেন। নানা অনিয়মের অভিযোগের পর ২০১৬ সালে উচ্চ আদালত এই প্রবিধানমালার কিছু অংশ অবৈধ ঘোষণা করেন। ফলে সংসদ সদস্যরা চাইলেও নিজ নির্বাচনী এলাকায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটির সভাপতি হতে পারেন না।
২০২০ সালে উচ্চ আদালতের আরেক রায়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত কলেজগুলোর পরিচালনা কমিটিতেও সংসদ সদস্যদের সভাপতি হওয়ার সুযোগ বন্ধ হয়।
তবে নতুন সরকার আসার পর সংসদ সদস্যের পরিচালনা কমিটির সভাপতি হওয়ার নজির তৈরি হয়েছে। এ ছাড়া ক্ষমতাসীন দলের সংসদ সদস্যদের কেউ কেউ শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা পরিচালনা কমিটির কাছে ফিরিয়ে নেওয়ার পক্ষে চেষ্টা করছেন বলে শিক্ষকদের মধ্যে আলোচনা আছে।
এনটিআরসিএর মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগের সুপারিশ বহাল রাখার দাবিকেন এনটিআরসিএর মাধ্যমে নিয়োগ
একসময় বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে পরিচালনা কমিটির বড় ধরনের ক্ষমতা ছিল। সেই ব্যবস্থায় অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির অভিযোগ ছিল দীর্ঘদিনের।
এমন পরিস্থিতিতে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যোগ্য ও দক্ষ শিক্ষক নিয়োগে সহায়তার লক্ষ্যে ২০০৫ সালে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ) প্রতিষ্ঠা করা হয়। এটি একটি সংবিধিবদ্ধ কর্তৃপক্ষ। পরীক্ষার মাধ্যমে যোগ্য প্রার্থীদের তালিকা প্রণয়ন, নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন করা এই প্রতিষ্ঠানের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।
এ জন্য ‘বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষা গ্রহণ ও প্রত্যয়ন বিধিমালা-২০০৬’ প্রণয়ন করা হয়। পরবর্তী সময় ২০১২ ও ২০১৫ সালে এই বিধিমালা সংশোধন করা হয়।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ২০১৫ সালের ৩০ ডিসেম্বরের পরিপত্রের মাধ্যমে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রথম প্রবেশ পর্যায়ের শিক্ষক পদে নিয়োগের জন্য প্রার্থী সুপারিশের দায়িত্ব এনটিআরসিএকে দেওয়া হয়।
কমিটির মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগের ‘প্রস্তাবের’ প্রতিবাদে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভপ্রতিষ্ঠানগুলোর শূন্য পদের চাহিদা নিয়ে নিবন্ধিত প্রার্থীদের মধ্য থেকে মেধা ও চাহিদার ভিত্তিতে অনলাইনে প্রার্থী নির্বাচন করে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করে এনটিআরসিএ।
২০১৬ সাল থেকে বেসরকারি স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগে সুপারিশ করে আসছে প্রতিষ্ঠানটি। প্রথম প্রবেশ পর্যায়ের শিক্ষক পদে আবেদনের সর্বোচ্চ বয়স ৩৫ বছর।
দেশের একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রধানশিক্ষক প্রথম আলোকে বলেন, এনটিআরসিএর মাধ্যমে মেধাবীরা নিয়োগ পাচ্ছেন। তাঁর বিদ্যালয়ের পাঁচজন শিক্ষক নিয়োগ পেয়েছেন। তাঁদের আবেদন ফি ছাড়া কোনো টাকা খরচ হয়নি। এর মধ্যে দুজন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা। এই নিয়োগের ইতিবাচব প্রভাব পড়াশোনায় পড়ছে।
এনটিআরসিএর মাধ্যমে নিয়োগের মূল ধারণাটি হলো, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা ও মেধার ভিত্তিতে শিক্ষক নির্বাচন।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মচারী নিয়োগের ক্ষমতা আবারও পরিচালনা পর্ষদের হাতেসংস্কার, নাকি পেছনে ফেরা
শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মত হলো, এনটিআরসিএর মাধ্যমে বিদ্যমান নিয়োগব্যবস্থার সমস্যা-দুর্বলতা সংস্কার করে ঠিক করাটাই হলো যৌক্তিক পন্থা। এখানে শূন্য পদের চাহিদা সঠিকভাবে নিরূপণ, পরীক্ষা দ্রুত নেওয়া, মৌখিক পরীক্ষা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শেষ করা, নিয়োগ সুপারিশের প্রক্রিয়া আরও কার্যকর করাসহ নিয়োগের দীর্ঘসূত্রতা দূর করার সুযোগ রয়েছে।
কারণ হিসেবে শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, মেধাভিত্তিক নিয়োগ ব্যবস্থার উদ্দেশ্য হলো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক প্রভাব কমানো। প্রতিযোগিতার মাধ্যমে যোগ্য শিক্ষক নির্বাচন। নতুন ব্যবস্থার দুর্বলতা দূর করার বদলে পুরোনো ব্যবস্থায় ফিরে গেলে আগের সমস্যাগুলোর ফিরে আসার আশঙ্কা আছে। পরিচালনা কমিটির হাতে আবার নিয়োগের ক্ষমতা দেওয়া হলে অতীতে যে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ ছিল, সেগুলো ফিরে আসার ঝুঁকি তৈরি হবে। তাই দুর্বলতা দূর করে এনটিআরসিএর নিয়োগপ্রক্রিয়াকে আরও দ্রুত, স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও মেধাভিত্তিক করা যায় কি না, সেটিই বিবেচনা করা উচিত।
পরিচালনা কমিটির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন
সময়ের প্রেক্ষাপটে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিচালনা কমিটি রাখার প্রয়োজনীয়তা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন বাংলাদেশ অধ্যক্ষ পরিষদের সভাপতি ও প্রবীণ শিক্ষক নেতা মোহাম্মদ মাজহারুল হান্নান। তিনি আজ শুক্রবার প্রথম আলোকে বলেন, একসময় বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বেতন-ভাতার জন্য সরকারের কাছ থেকে কোনো আর্থিক সহায়তা পেত না। তখন গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে পরিচালনা কমিটি গঠন করে প্রতিষ্ঠানের জন্য আর্থিক সহায়তা সংগ্রহ করা হতো। পরিচালনা কমিটির সদস্যরা তখন আক্ষরিক অর্থেই প্রতিষ্ঠানের কল্যাণে কাজ করতেন। এখন এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরা মূল বেতনের শতভাগই সরকারের কাছ থেকে পান। এর সঙ্গে কম হলেও কিছু ভাতা দেওয়া হয়। ফলে বর্তমান বাস্তবতায় বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিচালনা কমিটির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে নতুন করে ভাবা দরকার।
পরিচালনা কমিটি ছাড়াই সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজ তুলনামূলকভাবে ভালো চলছে বলে মন্তব্য করেন মোহাম্মদ মাজহারুল হান্নান। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘তাহলে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিচালনা কমিটি আদৌ প্রয়োজনীয় কি না, তা পর্যালোচনা করা যেতে পারে।’
মোহাম্মদ মাজহারুল হান্নানের মতে, আপাতত পরিচালনা কমিটি রাখা হলেও তার মূল দায়িত্ব হওয়া উচিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার মানোন্নয়ন ও সার্বিক ব্যবস্থাপনায় নজর দেওয়া। শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগের দায়িত্ব পরিচালনা কমিটির হাতে থাকা উচিত নয়। এতে নিয়োগে বাণিজ্য হওয়ার আশঙ্কা থাকে। শিক্ষক নিয়োগপ্রক্রিয়াকে আরও গতিশীল, স্বচ্ছ ও যুগোপযোগী করতে এনটিআরসিএকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। পাশাপাশি পৃথক শিক্ষা সার্ভিস কমিশন গঠনের কথা ভাবতে হবে। একইসঙ্গে মেধাবীদের শিক্ষকতা পেশায় আকৃষ্ট করতে বেতন-ভাতাসহ সামাজিক মর্যাদা বাড়ানোর উদ্যোগ সরকারকে নিতে হবে।