কোনটা জরুরি? শিক্ষিত নাকি আলোকিত হওয়া

· Prothom Alo

শিক্ষা এবং আলো—দুটিতে খুব বেশি তফাত নেই বলে মনে হলেও, এদের সূক্ষ্ম সীমার মধ্যবর্তী ব্যবধানটি বেশ গভীর। শিক্ষিত হওয়া আর আলোকিত হওয়া কি সত্যিই এক? শিক্ষাই কি মানুষকে আলোকিত করে তোলে, নাকি যে মানুষটি ভেতরের আলোয় উদ্ভাসিত, প্রকৃত অর্থে তিনিই শিক্ষিত?

সাধারণ অভিজ্ঞতার চোখেই এই পার্থক্য স্পষ্ট ধরা পড়ে। মনে করুন, একজন সম্মানিত মানুষ দেশের সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জন করেছেন। অথচ তাঁর আচার–আচরণে বা কথাবার্তায় স্পষ্ট ফুটে ওঠে যে তিনি জীবন নিয়ে চরম যন্ত্রণায় ভুগছেন। চারপাশের কে কী ভুল করল, কার কোথায় কী খামতি রয়ে গেল, এসব নিয়েই তাঁর দৈনিক আত্মদহন। দুঃখ প্রকাশ করা দোষের কিছু নয়, তবে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার শীর্ষ স্পর্শ করেও জীবন কিংবা অভিজ্ঞতার ভেতর থেকে একটি ইতিবাচক অর্থ খুঁজে নিতে না পারা এটাই প্রমাণ করে যে তিনি হয়তো বিদ্যা অর্জন করেছেন কিন্তু আলোকিত হতে পারেননি।

Visit newsbetting.club for more information.

প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক প্লেটোর সেই বিখ্যাত ‘অ্যালগরি অব দ্য কেভ’ রূপকের কথা ধরা যাক। অন্ধকার গুহায় বন্দী মানুষগুলোকে শৃঙ্খলিত অবস্থায় দেয়ালের ছায়াকেই পরম সত্য বলে ভেবে নিতে হয়। শিক্ষা যখন সেই শিকল খুলে দেয়, তখন মানুষ গুহার বাইরে এসে পরম সত্য অর্থাৎ সূর্যের আলোর মুখোমুখি হয়।

আলোকিত হওয়ার মূলমন্ত্র লুকিয়ে রয়েছে সান্নিধ্যের প্রেরণায়। একজন আলোকিত মানুষের স্পর্শে এলে অন্য একটি নিরুত্তাপ মানুষও পথ চলার সাহস পায়, প্রাণে খুঁজে পায় নতুন শক্তি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘শিক্ষার হেরফের’ প্রবন্ধে শিক্ষার এই জাগ্রত করার ক্ষমতা নিয়ে সরাসরি লিখেছেন—
‘যেমন দীপ হইতে দীপ জ্বালানো যায়, তেমনি মন হইতে মনকে জাগাইয়া দেওয়া যায়।’

আলোকিত মানুষ সর্বদাই চায় অন্যের মনের সুপ্ত মুকুলটিও সগৌরবে ফুটে উঠুক। ব্যর্থতার অনুযোগ করার চেয়ে তিনি বর্তমান মুহূর্তকে কর্মে রূপ দিতে ভালোবাসেন।
আমাদের এই মানবজীবন ক্ষণস্থায়ী হতে পারে, কিন্তু একে তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলতে পারলে তা অসীম বিশাল হয়ে ওঠে। সাহিত্যিক প্রমথ চৌধুরী তাঁর ‘বই পড়া’ প্রবন্ধে ডেমোক্রেসি ও শিক্ষার স্বতঃস্ফূর্ততা নিয়ে লিখেছেন—
‘ডেমোক্রেসি সাহিত্যের সার্থকতা বোঝে না, বোঝে শুধু তার ফল। ডেমোক্রেসি চায় সবাইকে সমান করতে, কিন্তু মনের দিক দিয়ে সবাইকে সমান করার ক্ষমতা তার নেই।’
তিনি আরও লিখেছেন—‘শিক্ষা কেউ কাউকে দিতে পারে না। স্বশিক্ষিত হওয়া ছাড়া উপায় নেই।’

মানুষকে দাসত্ব থেকে মুক্ত করে নিজের অসীম ক্ষমতাকে উপলব্ধি করতে শেখানোই বিদ্যার আসল কাজ। মানুষ চাইলে বিশ্ব এবং জীবনকে নতুন করে গড়ে তুলতে পারে। মানুষের অসাধ্য কি কিছু আছে? মানুষের ভেতরেই তো লুকিয়ে রয়েছে অনন্ত সম্ভাবনা। নিজের অস্তিত্ব, পৃথিবী এবং চারপাশের জীবন সম্পর্কে এই যে এক অভিনব জাগরণ, এটিই বিদ্যার মহত্তম দান। এই সুচেতনাকেই আমরা বলছি আলোকিত হওয়া। এই আলোর ছোঁয়ায় যাঁদের চৈতন্য জাগ্রত হবে, তাঁরাই পরবর্তী সময়ে সমাজকে পথ দেখাবেন। সুতরাং সর্বস্তরের সুধীজন, কেবল তথ্য সংগ্রাহক না হয়ে হৃদয়কে আলোকিত করে তুলুন।

শিক্ষার্থী, সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম বিভাগ, সোনারগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়

Read full story at source