পৃথিবীটাই ফিচারের রসদ: সুমনা শারমীনের গল্পদৃষ্টি

· Prothom Alo

প্রথম আলো বন্ধুসভার ভার্চ্যুয়াল লেখালেখি কর্মশালা ২০২৬-এর চতুর্থ ও সমাপনী পর্ব অনুষ্ঠিত হয় ৮ আগস্ট। কর্মশালায় ‘ফিচার ও সংবাদ’ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেন প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক সুমনা শারমীন। এই লেখা তাঁর আলোচনার প্রতিলিপি।

ফিচার সাংবাদিকতারই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে সংবাদ আর ফিচারের পথ এক নয়। সংবাদ যেখানে ঘটনার তথ্যকে সরাসরি পাঠকের সামনে তুলে ধরে, ফিচার সেখানে সেই তথ্যের ভেতর থেকে খুঁজে নেয় একটি গল্প। সেই গল্প হতে পারে কোনো মানুষের, কোনো জায়গার, কোনো ঘটনার কিংবা আমাদের খুব পরিচিত কোনো বাস্তবতার, যেটিকে আমরা প্রতিদিন দেখেও হয়তো নতুন করে দেখি না।

Visit bettingx.club for more information.

ফিচারকে অনেকটা সত্য ঘটনা অবলম্বনে লেখা ছোটগল্পের সঙ্গে তুলনা করা যায়। তবে এখানে কল্পনার জায়গা নেই। ঘটনা সত্য হতে হবে, তথ্য নির্ভুল হতে হবে, মানুষের বক্তব্যের যথার্থতা থাকতে হবে। পার্থক্যটা মূলত উপস্থাপনায়। তথ্যের সঙ্গে এখানে যুক্ত হয় গল্পের রস, মানবিক অনুভূতি, পর্যবেক্ষণ ও পাঠকের আগ্রহ ধরে রাখার কৌশল।

ফিচারে তথ্য এবং বিনোদন—এই দুইয়ের সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ পাঠক লেখাটি পড়ে যেমন কিছু জানবেন, তেমনি পড়ার মধ্যেও আনন্দ খুঁজে পাবেন। ভাষা হবে প্রাণোচ্ছল, শব্দচয়ন হবে আকর্ষণীয়। শব্দে অলংকার থাকতে পারে, কিন্তু সেই অলংকার যেন কখনোই বাহুল্যে পরিণত না হয়। ভাষার সৌন্দর্য তখনই অর্থবহ, যখন তা গল্পকে এগিয়ে নেয়; গল্পকে আড়াল করে না।

পাঠকের সামনে এমন কিছু তুলে ধরতে হবে, যা তার কৌতূহল বাড়ায়, তাকে বিস্মিত করে অথবা পরিচিত বিষয়টিকে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করে।

একটি বৃষ্টির দিনকে উদাহরণ হিসেবে ধরা যাক। সারা দিন বৃষ্টি হয়েছে—এটি একটি সংবাদ। বৃষ্টিতে রাজধানীর কোথাও জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে, কোথাও যানজট হয়েছে, কোথাও মানুষের দুর্ভোগ হয়েছে—এসবও সংবাদ। আবহাওয়া অধিদপ্তর হয়তো জানাবে, আরও কয়েক দিন বৃষ্টি হতে পারে। কিন্তু একজন ফিচার লেখকের চোখ এখানেই থেমে থাকবে না।
তিনি হয়তো বৃষ্টির মধ্যেই কারওয়ান বাজারে দেখতে পেলেন একজন নারীকে। বড় বড় ট্রাকে করে বাজারে আসা সবজির মধ্য থেকে পড়ে যাওয়া, ফেলে দেওয়া কিংবা সামান্য পচে যাওয়া সবজি তিনি কুড়িয়ে নিচ্ছেন। সেগুলোই হয়তো তাঁর সংসারের জীবিকার একটি উপায়। অন্যের চোখে যা ফেলে দেওয়া জিনিস, তাঁর কাছে সেটিই দিনের খাবার।
বৃষ্টি হলে বাজারের কাজ ব্যাহত হতে পারে। ট্রাক কম আসতে পারে, সবজি কম পড়ে থাকতে পারে, তার কাজও কমে যেতে পারে। অন্য মানুষের কাছে বৃষ্টি হয়তো একটি দিনের আবহাওয়া; কিন্তু ওই নারীর কাছে বৃষ্টি হয়ে উঠতে পারে একটি দিনের আয়রোজগারের অনিশ্চয়তা। এখানেই ফিচারের গল্প।

চারপাশে তাকালেই ফিচারের অসংখ্য উপাদান ছড়িয়ে আছে। প্রয়োজন শুধু দেখার চোখ। একটি পুরোনো বাড়ি, কোনো মানুষের দীর্ঘদিনের অপেক্ষা, বাজারের এক কোণে বসে থাকা একজন বৃদ্ধ, কোনো শ্রমজীবী মানুষের প্রতিদিনের জীবন কিংবা কোনো নামকরা ব্যক্তির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি অজানা ঘটনা—সবকিছুই হয়ে উঠতে পারে ফিচারের বিষয়।

তবে বিষয় থাকলেই ভালো ফিচার হয় না। বিষয় নির্বাচন করতে হয় খুব সচেতনভাবে। পাঠক যেন লেখা পড়তে গিয়ে একবার হলেও বলেন—‘ও, তাই নাকি!’ পরিচিত কোনো বিষয়কেও নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে উপস্থাপন করা যায়। মূল বিষয় হলো নতুনত্ব। পাঠকের সামনে এমন কিছু তুলে ধরতে হবে, যা তার কৌতূহল বাড়ায়, তাকে বিস্মিত করে অথবা পরিচিত বিষয়টিকে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করে।

আর সেই কৌতূহল তৈরি করতে হবে শুরুতেই। ফিচারের প্রথম এক-দুই লাইনই অনেক সময় ঠিক করে দেয় পাঠক লেখাটির সঙ্গে থাকবেন কি না। তাই শুরু হতে পারে কোনো দৃশ্য দিয়ে, কোনো মানুষের কথা দিয়ে, কোনো প্রশ্ন দিয়ে কিংবা এমন কোনো তথ্য দিয়ে, যা পাঠককে থামিয়ে দেয়। প্রথম কয়েকটি লাইন পাঠকের মনে যদি ‘এরপর কী?’ প্রশ্নটি তৈরি করতে পারে, তাহলে লেখক তাঁর প্রথম পরীক্ষায় সফল।

ফিচারের গল্প এরপর ধীরে ধীরে এগোয়। হার্ড নিউজে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সাধারণত শুরুতেই আসে। কাঠামোটি অনেকটা উল্টো পিরামিডের মতো—সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আগে, তারপর অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। ফিচার সেখানে ভিন্ন। এটি অনেকটা ধীরে ধীরে বোনা কাপড়ের মতো। একটি তথ্যের সঙ্গে আরেকটি তথ্য, একটি মানুষের বক্তব্যের সঙ্গে আরেকটি অভিজ্ঞতা, একটি দৃশ্যের সঙ্গে আরেকটি পর্যবেক্ষণ যুক্ত হতে হতে গল্পটি পূর্ণতা পায়।

ফিচার লেখককে শুধু তথ্য সংগ্রহ করলেই হবে না; তথ্যের ভেতরের গল্পটিও খুঁজে নিতে হবে। এই গল্পের কেন্দ্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে মানুষ। একজন মানুষ কীভাবে বেঁচে আছেন, কীভাবে সংগ্রাম করছেন, কী হারিয়েছেন, কী স্বপ্ন দেখছেন—এসব প্রশ্ন একটি সাধারণ ঘটনাকে মানবিক গল্পে পরিণত করতে পারে। অন্যের জায়গায় নিজেকে রেখে অনুভব করার ক্ষমতা তাই একজন ফিচার লেখকের গুরুত্বপূর্ণ গুণ।

মানুষের সঙ্গে কথা বলতে হবে, তাদের জীবন কাছ থেকে দেখতে হবে। শুধু প্রশ্ন করলেই হবে না; শুনতে হবে। শুধু বক্তব্য লিখলেই হবে না; দেখতে হবে। একজন মানুষ কীভাবে কথা বলছেন, তার চারপাশে কী আছে, পরিবেশ কেমন, তার আচরণ কেমন—এসব ছোট বিষয়ও একটি ফিচারকে জীবন্ত করে তুলতে পারে।

ফিচার লেখার ক্ষেত্রে সরেজমিন পর্যবেক্ষণের গুরুত্ব এখানেই। ডেস্কে বসে তথ্য সংগ্রহ করা যায়, কিন্তু মানুষের জীবনকে কাছ থেকে অনুভব করতে হলে মাঠে যেতে হয়। যে লেখক মাঠে হাঁটবেন, মানুষের সঙ্গে কথা বলবেন, তাঁদের জীবন দেখবেন, তাঁর লেখায় বাস্তবতার গন্ধও তত বেশি থাকবে।

একটি ভালো ফিচার শেষ হওয়ার পরও যদি তার গল্প পাঠকের মনে থেকে যায়, তাহলে সেই লেখা সফল। কখনো কোনো প্রশ্ন রেখে শেষ করা যায়, কখনো কোনো দৃশ্য দিয়ে, আবার কখনো এমন একটি তথ্য দিয়ে যা পাঠককে লেখাটি শেষ করার পরও ভাবতে বাধ্য করে।

তবে মাঠে যাওয়ার আগেও প্রস্তুতি দরকার। কারও সাক্ষাৎকার নিতে হলে তাঁর সম্পর্কে আগে জানতে হবে। কোনো প্রতিষ্ঠান নিয়ে লিখলে প্রতিষ্ঠানটির ইতিহাস, কাজ ও প্রেক্ষাপট সম্পর্কে ধারণা থাকতে হবে। বিষয়টি সম্পর্কে যত বেশি হোমওয়ার্ক থাকবে, প্রশ্ন তত বেশি গভীর ও প্রাসঙ্গিক হবে। সাক্ষাৎকারদাতাও বুঝতে পারবেন যে লেখক প্রস্তুতি নিয়ে এসেছেন। ফলে তাঁর সঙ্গে একটি স্বস্তিদায়ক যোগাযোগ তৈরি হবে এবং অনেক সময় এমন তথ্যও পাওয়া যায়, যা সাধারণ কথোপকথনে সামনে আসে না।

ফিচার লেখকের আরেকটি বড় গুণ হলো পর্যবেক্ষণ। শুধু মানুষ কী বলছেন, তা নয়, তিনি কী করছেন—সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। একটি পুরোনো বাড়ির দরজা, দেয়ালে ঝুলে থাকা ছবি, বহুদিনের ব্যবহৃত একটি চেয়ার কিংবা বাজারের এক কোণে পড়ে থাকা একটি ঝুড়ি—এসবও গল্পের অংশ হয়ে উঠতে পারে। কখনো একটি মানুষের একটি ছোট্ট অভ্যাস পুরো গল্পের দরজা খুলে দিতে পারে।

এখানেই ফিচার সাংবাদিকতার সৌন্দর্য। সাধারণ চোখ যেখানে একটি ঘটনা দেখে, ফিচার লেখকের চোখ সেখানে গল্প খুঁজে নেয়।
গল্পের এই সৌন্দর্য কখনোই সত্যকে ছাড়িয়ে যেতে পারে না। ফিচার যতই সাহিত্যধর্মী হোক, তার ভিত্তি সাংবাদিকতা। তাই থাকতে হবে সততা, দায়িত্ববোধ ও মানবিকতা। পাঠককে আকৃষ্ট করার জন্য কোনো তথ্য বানিয়ে দেওয়া, অতিরঞ্জিত করা কিংবা মানুষের অনুভূতিকে ব্যবহার করা ফিচারের উদ্দেশ্য হতে পারে না।

সাজ্জাদ শরিফের কবিতার ক্লাস: শব্দ পেরিয়ে উপলব্ধির শিল্প

ফিচার লেখার সময় লেখককে নিজের লেখার পাঠকও হতে হয়। নিজেকে প্রশ্ন করতে হয়—আমি যদি পাঠক হতাম, কোথায় থামতাম? কোন তথ্য আমাকে অবাক করত? কোন দৃশ্য আমাকে স্পর্শ করত? কোন জায়গা থেকে আমি লেখাটি পড়তে শুরু করতে চাইতাম? এ প্রশ্নগুলোই লেখাকে আরও ধারালো করে।

আর শুরু যেমন গুরুত্বপূর্ণ, শেষও তেমন। একটি ভালো ফিচার শেষ হওয়ার পরও যদি তার গল্প পাঠকের মনে থেকে যায়, তাহলে সেই লেখা সফল। কখনো কোনো প্রশ্ন রেখে শেষ করা যায়, কখনো কোনো দৃশ্য দিয়ে, আবার কখনো এমন একটি তথ্য দিয়ে যা পাঠককে লেখাটি শেষ করার পরও ভাবতে বাধ্য করে।

শেষ পর্যন্ত ফিচার শুধু তথ্য পরিবেশনের একটি মাধ্যম নয়। এটি তথ্যকে মানুষের গল্পে রূপ দেওয়ার একটি শিল্প। এখানে সাংবাদিকের চোখের সঙ্গে যুক্ত হয় গল্পকারের অনুভূতি; গবেষণার সঙ্গে যুক্ত হয় পর্যবেক্ষণ; তথ্যের সঙ্গে যুক্ত হয় মানবিকতা।

এ আলোচনার সবচেয়ে বড় শিক্ষা যেন এটাই—ফিচারের জন্য গল্প আমাদের চারপাশেই আছে। শুধু সেই গল্পটি দেখতে জানতে হবে।
হয়তো গল্পটি বৃষ্টির দিনে কারওয়ান বাজারে দাঁড়িয়ে থাকা এক নারীর। হয়তো পুরোনো কোনো বাড়ির। হয়তো এমন একজন মানুষের, যার পাশ দিয়ে আমরা প্রতিদিন হেঁটে যাই, কিন্তু কখনো তাঁর জীবনের গল্প জানতে চাইনি।
একজন ভালো ফিচার লেখক সেই গল্পটিই খুঁজে নেন। তিনি ঘটনা শুধু দেখেন না—ঘটনার ভেতরের মানুষটিকে দেখেন। শুধু তথ্য সংগ্রহ করেন না—তথ্যের ভেতরের গল্পটি আবিষ্কার করেন। আর সেই গল্প এমনভাবে পাঠকের সামনে তুলে ধরেন, যাতে লেখা শেষ হওয়ার পরও পাঠকের মনে একটি প্রশ্ন থেকে যায়—‘তারপর?’

সহকারী অধ্যাপক, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়

Read full story at source