১৫ হাজার টাকায় শুরু, এখন ‘গোলাপ মামার’ হোটেলে ৩৫ জনের কর্মসংস্থান
· Prothom Alo

দুপুর গড়িয়েছে। রাজশাহী নগরের বোয়ালিয়া মডেল থানার সামনের সরু সড়কটিতে তখন মানুষের ব্যস্ততা বাড়ছে। কেউ রিকশা থেকে নামছেন, কেউ অটোরিকশা থামিয়ে খাবারের অপেক্ষায় দাঁড়াচ্ছেন। শিক্ষার্থী, শ্রমিক, চাকরিজীবী, রিকশাচালক—বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের আনাগোনা।
কেউ বসে খাচ্ছেন, কেউ খাবার নিয়ে ফিরছেন। এই ব্যস্ততার মধ্যে বারবার শোনা যাচ্ছে একটি নাম—‘গোলাপ মামা’।
Visit truewildgame.com for more information.
তাঁর আসল নাম মো. গোলাপ সরদার (৪৮)। খুলনার কয়রা উপজেলার মানুষ তিনি। একসময় প্রায় নিঃস্ব অবস্থায় স্ত্রীকে গ্রামে রেখে ট্রেনে চেপে রাজশাহীতে এসেছিলেন। শহরটিতে তাঁর পরিচিত কেউ ছিল না। অন্যের হোটেলে কর্মচারী হিসেবে কাজ শুরু করেন। সেই গোলাপ সরদারের নিজের হোটেলে এখন কাজ করেন ৩০ থেকে ৩৫ জন। তাঁদের মধ্যে সাতজন নারী। প্রতিদিন কয়েক শ মানুষ তাঁর হোটেলে খাবার খান।
ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে রাজশাহীতে
১৯৮৮ সালের বন্যার পর থেকেই গোলাপ সরদারের জীবনে অভাবের শুরু। ১৯৯০ সালে মোংলা বন্দরে তাঁর এক চাচার হোটেলে কাজ শুরু করেন। কয়েক বছর পর নিজেই হোটেল ব্যবসায় নামেন। কিন্তু একাধিকবার লোকসানে পড়ে ব্যবসা বন্ধ করতে হয়। ২০০৩ সালে তাঁর ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৬০ হাজার টাকা।
গোলাপ সরদার বলেন, ‘তখন ৬০ হাজার টাকা অনেক বড় অঙ্ক। ব্যবসা শেষ হয়ে গিয়েছিল। নতুন বউকে বাড়িতে রেখে ভাবলাম, এভাবে আর চলবে না। ট্রেনে উঠে রাজশাহী চলে এলাম।’
২০০৪ সালে রাজশাহীতে এসে প্রথম আশ্রয় নেন রেলস্টেশনে। টানা ছয় রাত সেখানেই কাটে। পরে স্টেশনসংলগ্ন একটি হোটেলে কাজ পান। এরপর কাজ করেছেন আরও কয়েকটি হোটেলে। কাজ করতে করতে রাজশাহীর প্রতি তাঁর ভালো লাগা তৈরি হয়। গোলাপ সরদারের ভাষায়, ‘রাজশাহীতে এসে মনে হলো, মায়ের কোলে চলে এসেছি। এত শান্ত পরিবেশ। তখনই ঠিক করি, পরিবারকে এখানেই নিয়ে আসব।’
ক্যাশ কাউন্টারে বসেই সবকিছু সামলান গোলাপ সরদার। শনিবার বিকেলে রাজশাহী নগরের বোয়ালিয়া মডেল থানার সামনেযেভাবে হলেন ‘গোলাপ মামা’
অন্যের হোটেলে কাজ করার সময় ক্রেতাদের সঙ্গে আন্তরিক আচরণ করতেন গোলাপ সরদার। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাঁর সখ্য গড়ে ওঠে। একসময় শিক্ষার্থীরাই তাঁকে ‘গোলাপ মামা’ বলে ডাকতে শুরু করেন। পরে এই ডাকই হয়ে যায় তাঁর পরিচয়।
২০১৫ সালে কর্মস্থলে একটি ঘটনার পর নিজের হোটেল দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। পুঁজি বলতে ছিল মাত্র ১৫ হাজার টাকা। ওই বছরই মাসে পাঁচ হাজার টাকা ভাড়ায় ছোট একটি দোকান নেন। সেই সময় ঈদ উপলক্ষে আশপাশের অনেক দোকান বন্ধ ছিল। পাশেই চলছিল রথের মেলা। প্রথম দিন থেকেই ভালো বিক্রি হয়। এরপর ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে ক্রেতা।
১৫ হাজার টাকা দিয়ে শুরু করা সেই ছোট দোকানই এখন বড় খাবারের হোটেল। কর্মীদের বেতন বাবদ প্রতিদিন প্রায় ১৯ হাজার টাকা খরচ হয়। যে দোকানের মাসিক ভাড়া একসময় ছিল ৫ হাজার টাকা, এখন তা ৫০ হাজার টাকার বেশি।
তবে ব্যবসার প্রসারের চেয়েও কর্মসংস্থান তৈরি হওয়াকেই বড় অর্জন মনে করেন গোলাপ সরদার। তিনি বলেন, ‘আমার সবচেয়ে বড় আনন্দ হলো, পরিবারগুলোর রুজির ব্যবস্থা হচ্ছে। আমি নিজেও একসময় কর্মচারী ছিলাম। তাই তাঁদের সঙ্গে ভালো আচরণ করি।’
কম দামে খাবার
গোলাপ মামার হোটেলের আরেকটি পরিচয় কম দামের খাবার। এখনো ২০ টাকায় পাওয়া যায় এক প্লেট খিচুড়ি। দুপুরের খাবারের সঙ্গে ডাল দেওয়া হয় বিনা মূল্যে। প্রায় ৩০ পদের খাবার থাকে হোটেলে। ৪০ টাকার মধ্যেই ভাত, ভাজি, ভর্তা ও ডাল দিয়ে পেট ভরে খাওয়া যায়। সকাল সাতটা থেকে রাত দুইটা পর্যন্ত চলে রান্না ও খাবার বিক্রি। তবে দুপুরে ভিড় থাকে সবচেয়ে বেশি। শিক্ষার্থী, শ্রমিক, চাকরিজীবী, রিকশাচালকসহ নিম্ন আয়ের মানুষের বড় একটি অংশ নিয়মিত এখানে খান।
রিকশাচালক মো. আনোয়ার হোসেন ছয় বছর ধরে এই হোটেলে খাচ্ছেন। তাঁর ভাষায়, ‘আমরা গরিব মানুষ। যেখানে কম, সেখানেই খাব। এখানে কম টাকায় ভালো খাবার পাওয়া যায়, ভালোভাবে বসে খাওয়া যায়।’
চার বছর ধরে এই হোটেলে নিয়মিত খান শিক্ষার্থী শাম্মী আক্তার। তিনি বলেন, ‘গোলাপ মামা মানুষ হিসেবে ভালো। তাঁর হোটেলের খাবারও ভালো।’
প্রতিদিন অনেক মানুষ এই হোটেলে খাবার খেতে আসেন। শনিবার বিকেলে রাজশাহী নগরের বোয়ালিয়া মডেল থানার সামনেটাকা না থাকলেও মেলে খাবার
শিক্ষার্থীদের প্রতি গোলাপ সরদারের আলাদা টান। তিনি নিজে পড়াশোনা করতে পারেননি। তাই কষ্ট করে শহরে পড়তে আসা শিক্ষার্থীদের প্রতি তাঁর সহানুভূতি বেশি। তিনি বলেন, ‘কারও কাছে টাকা না থাকলে খেয়ে চলে যায়, আমি কিছু বলি না। মনে হয়, তাদের পাশে দাঁড়াতে পারলে আল্লাহও আমার পাশে থাকবেন।’
এই সম্পর্ক শুধু খাবারের টেবিলেই থেমে নেই। তাঁর হোটেলে খেতে আসা অনেক শিক্ষার্থী এখন দেশের বিভিন্ন জায়গায় চাকরি করেন। রাজশাহীতে এলে কেউ কেউ পরিবার নিয়ে গোলাপ মামার সঙ্গে দেখা করতে আসেন। খোঁজখবর নেন, একসঙ্গে বসে খাবার খান।
১০ বছর ধরে গোলাপ সরদারের সঙ্গে কাজ করছেন মো. বাচ্চু। তিনি বলেন, ‘গোলাপ ভাইও একসময় কর্মচারী ছিলেন। তাই আমাদের সঙ্গে ভালো আচরণ করেন। প্রতিদিনের বেতন প্রতিদিনই দেন।’
চলে আসি রাজশাহীর টানে
রাজশাহীতে এখন গোলাপ সরদারের নিজের বাড়ি হয়েছে। বড় ছেলে রাজশাহী কলেজে অনার্সে পড়ছেন। ছোট ছেলে এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে ব্যবসা করার স্বপ্ন দেখেন তিনি।
সাফল্যের গল্প বলতে গিয়ে গোলাপ সরদার বলেন, ‘ব্যবসা করতে হলে মাথা ঠান্ডা রাখতে হয়। লাভ একটু কম হলেও মানুষের ভালোবাসা অর্জন করতে হয়। একসময় আমি অন্যের হোটেলে কাজ করতাম। আজ এত মানুষ আমার সঙ্গে কাজ করেন। যা চেয়েছি, আল্লাহ তার চেয়েও বেশি দিয়েছেন।’
খুলনার গ্রামের বাড়িতে এখন সহজে যাওয়া হয় না গোলাপের। তবে কোনো নিকটাত্মীয় মারা গেলে ব্যবসার হিসাব মাথায় থাকে না। ছুটে যান সেখানে। কিন্তু বেশি দিন থাকতেও পারেন না। আবার ফিরে আসেন রাজশাহীতে। তাঁর ভাষায়, ‘কেউ মারা গেলে তখন আর ব্যবসার দিকে তাকাই না। সোজা চলে যাই। আবার সেখানে গিয়ে থাকতেও পারি না। চলে আসি রাজশাহীর টানে।’