‘রত্নময়ী আংটি’ থেকে ‘আবাবিল পাখি’—যেভাবে গৃহবধূর ১০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয় ‘জিনের বাদশা’

· Prothom Alo

কফিলের কাছে সৌদিপ্রবাসী স্বামীর পাওনা ৩৫ লাখ টাকা ফিরে পাওয়ার আশায় শেষ ভরসা খুঁজছিলেন গৃহবধূ রহিমা বেগম। আর সেই সুযোগ লুফে নেয় একটি প্রতারক চক্র। ‘জিনের বাদশা’ পরিচয়ে চক্রটি অলৌকিক ক্ষমতায় ৭২ ঘণ্টার মধ্যে টাকা উদ্ধারের প্রতিশ্রুতি দেয়। তবে এ কাজে আগরবাতি থেকে শুরু করে রত্নময়ী আংটি, ভুটানি গরুর দুধ ও আবাবিল পাখি কেনার কথা বলে ধাপে ধাপে হাতিয়ে নেয় গৃহবধূর ১০ লাখ টাকা।

এ ঘটনায় ২০২৪ সালের ২২ এপ্রিল রাজধানীর তেজগাঁও থানায় একটি মামলা করেন ভুক্তভোগী গৃহবধূ। মামলার তদন্ত শেষে ২৩ জনকে আসামি করে গত ১৩ জুলাই আদালতে অভিযোগপত্র দিয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। এ মামলায় গ্রেপ্তার তিন আসামির সবাই এখন জামিনে আছেন।

Visit asg-reflektory.pl for more information.

তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের উপপরিদর্শক (এসআই) মো. সজিবুল হাসান বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অলৌকিক ক্ষমতার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের প্রলোভন দেখিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ মানুষকে লক্ষ্যবস্তু করে প্রতারণা চালিয়ে আসছিল এই চক্র। মানুষের বিশ্বাস অর্জন করতে চক্রটি ধর্মকেও ব্যবহার করত।

গত ১৬ জুলাই অভিযোগপত্রটি নথিভুক্ত হয় বলে জানান ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অপরাধ তথ্য ও প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই মো. হামিদ। তিনি জানান, অভিযোগপত্র আমলে নেওয়ার বিষয়ে আগামীকাল রোববার শুনানি রেখেছেন আদালত।

চটকদার বিজ্ঞাপনের ফাঁদ

মামলার নথি অনুযায়ী, রাজধানীর তেজকুনিপাড়ার বাসিন্দা রহিমা বেগমের স্বামী কবির হোসেন সৌদি আরবে কর্মরত ছিলেন। বাংলাদেশ থেকে ১৭ জনকে সৌদি আরবে নিতে নিজের কফিলকে ৩৫ লাখ টাকা দেন। কিন্তু পরে ভিসা জটিলতায় তাঁদের সৌদি পাঠানো না গেলেও টাকা ফেরত দেননি কফিল।

এরপর এই টাকা উদ্ধারে নানা ধরনের চেষ্টা করতে থাকে পরিবারটি। একপর্যায়ে ২০২২ সালের ৮ মার্চ ফেসবুক ও ইউটিউবে ‘হাবিবুল্লাহ হুজুরের দরবার শরীফ’, ‘জৈনপুরী মা-ফাতেমা দরবার শরীফ’ ও ‘তান্ত্রিককম.ঘর’ নামে বিজ্ঞাপন দেখে যোগাযোগ করেন রহিমা বেগম। বিজ্ঞাপনে পাওনা টাকা উদ্ধার, স্বামী-স্ত্রীর মিল, ভাগ্য পরিবর্তন ও লটারিতে জেতানোর মতো নানা আশ্বাস দেওয়া হয়।

তদন্তে উঠে এসেছে, প্রতারকেরা নিজেদের জিনের বাদশা ও আধ্যাত্মিক সাধক পরিচয় দিয়ে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে টাকা উদ্ধারের প্রতিশ্রুতি দেয়। এরপর শুরু হয় অর্থ আদায়ের নানা কৌশল। প্রথমে আগরবাতি, মোমবাতি, গোলাপজল ও সিঁদুর কেনার কথা বলে টাকা নেওয়া হয়। পরে বলা হয়, বদ জিনের শনি কাটাতে ‘ভুটানি গরুর ২১ কেজি দুধ’ দিয়ে জিন-পরিকে পবিত্র করতে হবে। এরপর আসে জিনের মাধ্যমে ‘রত্নময়ী শ্রী আংটি’ পাঠানোর কথা।

একপর্যায়ে প্রতারক চক্র দাবি করে, জিনদের জন্য মিষ্টি, আগুনে ছোঁয়া বিশেষ শাড়ি, বিদেশি জাতের শকুন ও আবাবিল পাখি না আনলে কাজ হবে না। এভাবে বিভিন্ন ধাপে ১০ লাখ ২০ হাজার টাকা নেওয়ার পর প্রতারকেরা যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়।

পরে ভুক্তভোগী রহিমা বেগম রাজধানীর তেজগাঁও থানায় মামলা করেন। অভিযোগপত্রে বলা হয়, এরপর গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও ভোলার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন মো. রাকিব (২০), মো. রাকিব মোল্লা (২৯) ও মো. আলাউদ্দিন (২৬)। পুলিশ তাঁদের কাছ থেকে চারটি মুঠোফোন, প্রতারণার কাজে ব্যবহৃত তিনটি ভিডিও, ভুক্তভোগীদের ভয় দেখানোর ১০টি ভয়েস রেকর্ড এবং সাতটি বিজ্ঞাপনের ছবি জব্দ করে।

অভিযোগপত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতারকেরা অনলাইন থেকে সম্পাদনা করা বিকৃত ও ভীতিকর ছবি নিয়ে জিন-পরির ছবি বলে ভুক্তভোগীদের পাঠাতেন। নিজেদের কণ্ঠ বিকৃত করে রেকর্ড করা বক্তব্য জিনের বাদশার কথা বলে ভয় দেখাত। আবার কাউকে বিষয়টি জানালে সন্তানের মৃত্যু হবে, পরিবারে অমঙ্গল নেমে আসবে—এমন ভয় দেখিয়েও তাঁদের চুপ থাকতে বাধ্য করত।

প্রতারণার বিষয়ে ভুক্তভোগী রহিমা বেগম বলেন, ‘ওরা কোরআনের ওপর হাত রেখে শপথ করাইত আর বলত, আমি যেন কাউকে এ ঘটনা না বলি। বললে আমার অনেক বড় ক্ষতি হবে—জিনরা ক্ষতি করবে; আমার ছেলেমেয়ের গলা দিয়ে রক্ত উঠে মারা যাবে।’

প্রতারণা করে হাতিয়ে নেন ২–৩ কোটি টাকা

গ্রেপ্তার তিন আসামি আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে প্রতারণার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। আসামি মো. রাকিব জবানবন্দিতে জানান, ২০২০ সাল থেকে জিনের বাদশা সেজে মানুষের সঙ্গে প্রতারণার শুরু করেন। প্রতারণামূলক বিজ্ঞাপনে সব সমস্যার সমাধান, পাওনা টাকা আদায়, স্বামী–স্ত্রীর মিল করে দেওয়া, মামলা–মোকদ্দমায় জয়ী করা, গুপ্তধন পাইয়ে দেওয়া থেকে শুরু করে ভিসা পাইয়ে দেওয়ার মতো প্রতিশ্রুতি দেওয়া হতো।

মো. রাকিব বলেন, ‘কেউ ফোন করলে আমরা তখন বলি তোমার কী সমস্যা? একেকজন একেক সমস্যার কথার বলতেন। আমরা বলতাম সমাধান করতে পারব। কিন্তু ভোগ দেওয়ার জন্য আগরবাতি, মোমবাতি, গোলাপজল ইত্যাদি কেনার জন্য হাদিয়া হিসেবে ৫ হাজার, ৭ হাজার, ১০ হাজার—এমন পরিমাণ টাকা লাগবে। কেউ কেউ রাজি হয়ে বিকাশ–নগদ নম্বরে টাকা পাঠিয়ে দিত।

জবানবন্দিতে এই আসামি আরও জানান, এভাবে খাসি/পাঁঠা, গরু, ভুটানি গরুর দুধ, ভুটানি গরু কেনার জন্য টাকা লাগবে জানিয়ে ধাপে ধাপে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত তারা চাইতেন। এই মামলার বাদীর কাছ থেকে সৌদি কফিলের কাছ থেকে টাকা উদ্ধার করে দেওয়ার কথা বলে বিভিন্ন কৌশলে প্রায় ৮ লাখ টাকা নেন বলে স্বীকার করেন মো. রাকিব।

মুঠোফোনে আর্থিক লেনদেনে নিজের নামে ও পরিবারের সদস্যদের নামে সিম ব্যবহার করতেন বলেও জবানবন্দিতে জানান মো. রাকিব। তিনি বলেন, ‘আমার ফ্যামিলির লোকজন এই প্রতারণার কথা জানত। আমি এ পর্যন্ত ২–৩ কোটি টাকা প্রতারণা করে আনছি। টাকা আমি ও আমার গ্রুপের লোকজন ভাগ করে নিই।’

আরেক আসামি মো. রাকিব মোল্লা জবানবন্দিতে জানান, ২০১৯ সাল থেকে জিনের বাদশা সেজে প্রতারণা করে আসছেন তিনি। এ কাজে টেলিভিশন এবং ফেসবুক ও ইউটিউবে বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য প্রতি পাঁচ দিনে ১৫ হাজার টাকা খরচ করতেন। কোনো রোগী কিংবা সাহায্যপ্রার্থীর বিজ্ঞাপনে দেওয়া নম্বরে কল করে বিভিন্ন কাজ করে দেওয়ার কথা বলেও টাকা হাতিয়ে নিতেন। এসব কাজে অন্যের সিম ব্যবহার করতেন।

অভিযোগপত্রে তদন্ত কর্মকর্তা ২৩ জনকে আসামি করেছেন। তাঁদের অধিকাংশের বাড়ি ভোলা জেলার বোরহানউদ্দিন উপজেলায়। তাঁদের মধ্যে তিনজন গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে ছিলেন। পরে জামিনে মুক্তি পান। অন্য ২০ জনকে পলাতক উল্লেখ করে তাঁদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আবেদন করা হয়েছে। এ ছাড়া ভুয়া সিম সরবরাহকারী ‘ইমন’ নামের এক ব্যক্তির পূর্ণাঙ্গ পরিচয় নিশ্চিত না হওয়ায় তাঁকে আপাতত অব্যাহতি দিয়ে সম্পূরক অভিযোগপত্র দাখিলের আবেদন করা হয়েছে।

পিবিআই বলছে, পুলিশের অপরাধসংক্রান্ত তথ্যভান্ডার অনুযায়ী, এই মামলার কয়েকজন আসামির বিরুদ্ধে আগেও চুরি, ডাকাতি ও মাদক-সংক্রান্ত একাধিক মামলা রয়েছে।

আত্মহত্যার চেষ্টা ভুক্তভোগীর

প্রতারণার শিকার রহিমা বেগম প্রথম আলোকে বলেন, ‘ফেসবুকে বিজ্ঞাপন দেখে যোগাযোগ করেন। এরপর ফোনেই কথা হতো। এমনভাবে কথা বলত, মনে হতো তারা তাঁর সব জানে। শুরুতে রাতে বেশি কথা হতো। বলত, আমার ওপর শনি আছে। এটা কাটাতে টাকা লাগবে, এতিমদের খাওয়াতে হবে। এভাবে প্রায় ১০ লাখ টাকা নেয় ধাপে ধাপে।’

টাকা উদ্ধারের কথা বলে এভাবে একের পর তারিখ দিলে রহিমা বেগম বুঝতে পারেন তিনি প্রতারক চক্রের খপ্পরে পড়েছেন। এতগুলো টাকা খুইয়ে মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। রহিমা বেগম জানান, একপর্যায়ে টাকার চিন্তায় গলায় উড়না পেঁছিয়ে আত্মহত্যারও চেষ্টা করেন তিনি।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সজিবুল হাসান প্রথম আলোকে বলেন, এই চক্রে ২০ জনের বেশি প্রতারক কাজ করে। জিনের বাদশা সেজে বিভিন্ন ব্যক্তিকে ফোন দেয় তারা। মানুষের বিপদ–আপদ ও দুর্বল দিকগুলো নিয়ে কথা বলে। তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে আসামিদের গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের নামে এ–সংক্রান্ত একাধিক মামলা আছে।

অভিযোগপত্রে আনা অপরাধের সঙ্গে আসামিদের সম্পৃক্ততার বিষয়ে জানতে চাইলে আসামিপক্ষের আইনজীবীদের একজন আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘এজাহারে যা আছে তা–ই। প্রকৃত ঘটনা কী, সেটা আমার জানা নেই। আসামিদের কাছে জিজ্ঞাসা করলে বলে তারা নির্দোষ।’

আসামিপক্ষের আরেক আইনজীবী সুজন তালুকদার বলেন, ‘আমি আসামি আলাউদ্দিনের পক্ষে কাজ করেছিলাম। আমি জজকোর্টে তাঁর জন্য জামিন চাই। কিন্তু এখানে জামিন না হওয়ায় তারা হাইকোর্ট থেকে জামিন নেয়।’ তবে তিনি বলেন, জিনের বাদশা সেজে প্রতারণার অনেক মামলা আছে।

এ ধরনের প্রতারণা রোধে আসামিদের আইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ শাস্তি হওয়া উচিত বলে মনে করেন ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘এ ধরনের ঘটনা কোনোভাবেই কাম্য নয়। আমরা আশা করি, দোষী ব্যক্তিরা যথাযথ শাস্তি পাবে।’

Read full story at source