২২ বছর ধরে চলা এক বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা

· Prothom Alo

আমরা যখন শ্বাস নিই, তখন একবারও থেমে ভাবি না এই সাধারণ কাজটির পেছনে কত নিখুঁত রাসায়নিক সমন্বয় চলছে। বাতাস থেকে অক্সিজেন ফুসফুসে ঢোকে, সেখান থেকে মিশে যায় রক্তে। তারপর এক অদৃশ্য যাত্রায় পৌঁছে যায় শরীরের প্রতিটি কোষে। কিন্তু ফুসফুস ও কোষের এই সেতুবন্ধন তৈরি করে দেয় এক গুরুত্বপূর্ণ অণু—হিমোগ্লোবিন। এই অণুটি না থাকলে অক্সিজেন ফুসফুসেই আটকে থাকত, শরীরের কোষে পৌঁছে জীবনপ্রদীপ জ্বালাতে পারত না।

Visit mchezo.life for more information.

তবু একসময় মানুষ জানত না হিমোগ্লোবিন দেখতে কেমন। তার ভেতরে পরমাণুগুলো ঠিক কীভাবে সাজানো, কিংবা কী এক জাদুকরী প্রক্রিয়ায় সে অক্সিজেনকে একবার শক্ত করে ধরে, আবার কোষের কাছে গিয়ে ছেড়ে দেয়!

এই অদেখা অণুটিকে সরাসরি দেখতে চেয়েছিলেন তরুণ বিজ্ঞানী ম্যাক্স পেরুতস। কেবল তাত্ত্বিক ধারণা নয়, তিনি চেয়েছিলেন পরমাণুর স্তরে এর ত্রিমাত্রিক কাঠামো উন্মোচন করতে। তাঁর মনে প্রশ্ন ছিল সহজ, কিন্তু গভীর। হিমোগ্লোবিন কীভাবে অক্সিজেনকে আঁকড়ে ধরে, আর ঠিক কোন সংকেতে সেটিকে আবার মুক্ত করে দেয়?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে পেরুতস এক বিশাল বৈজ্ঞানিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হলেন। বিংশ শতাব্দীর সেই সময়ে প্রোটিনের পূর্ণাঙ্গ গঠন নির্ণয় করা ছিল প্রায় অসম্ভব এক কল্পনা। লবণের মতো ছোট অণুর গঠন জানা সম্ভব হলেও হিমোগ্লোবিনের মতো হাজার হাজার পরমাণু নিয়ে গঠিত জটিল দানবের রহস্যভেদ করা ছিল অসাধ্য সাধনের মতো। অনেক নামী বিজ্ঞানীই তাঁকে সতর্ক করেছিলেন যে এই পথে হাঁটলে বছরের পর বছর পণ্ডশ্রমে কেটে যাবে, মিলবে না কোনো নিশ্চিত সাফল্য।

হিমোগ্লোবিন শব্দটা কীভাবে এল?
এই অদেখা অণু হিমোগ্লোবিনকে সরাসরি দেখতে চেয়েছিলেন তরুণ বিজ্ঞানী ম্যাক্স পেরুতস। কেবল তাত্ত্বিক ধারণা নয়, তিনি চেয়েছিলেন পরমাণুর স্তরে এর ত্রিমাত্রিক কাঠামো উন্মোচন করতে।

কিন্তু পেরুতস দমে যাননি। এক্স-রে ক্রিস্টালোগ্রাফির সাহায্যে তিনি শুরু করলেন এক দীর্ঘ লড়াই, যা শেষ পর্যন্ত পাল্টে দিয়েছিল আধুনিক জীববিজ্ঞানের ইতিহাস।

তবে তিনি কাজ শুরু করেছিলেন এক নীরব বিশ্বাস নিয়ে। তাঁর ভেতরে কোনো চটকদার ঘোষণা ছিল না, ছিল না নাটকীয় আত্মবিশ্বাসের আস্ফালন। ছিল কেবল এক দুর্ভেদ্য জেদ। পেরুতস জানতেন, প্রকৃতির বড় রহস্যগুলো উন্মোচনের জন্য প্রয়োজন অসীম ধৈর্য। তাই দিনের পর দিন ল্যাবরেটরিতে বসে তিনি প্রোটিনের স্ফটিক বা ক্রিস্টাল তৈরির চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। সেই স্ফটিকের ভেতর দিয়ে এক্স-রে পাঠিয়ে সংগ্রহ করেছেন হাজার হাজার আলোকবিন্দুর প্রতিফলন। বাইরে থেকে সেই ডিফ্র্যাকশন প্যাটার্নকে অগোছালো কিছু বিন্দু আর রেখা মনে হলেও পেরুতসের চোখে সেগুলো ছিল এক অদৃশ্য মানচিত্রের টুকরো।

কেমব্রিজে প্রোটিনের গঠন উন্মোচনের দীর্ঘ যাত্রা শুরু হয়েছিল এই ল্যাবরেটরিতেই

তবে পথের সবচেয়ে বড় বাধা ছিল ফেজ বা দশা-সংক্রান্ত তথ্যের অভাব। এক্স-রে থেকে প্রাপ্ত তথ্যগুলো তাঁকে বলছিল আলো ঠিক কতটা প্রতিফলিত হয়েছে, কিন্তু সেই আলোর তরঙ্গগুলো ঠিক কোন অবস্থানে ছিল, তা জানা যাচ্ছিল না। এই তথ্য ছাড়া প্রোটিনের ত্রিমাত্রিক কাঠামো তৈরি করা ছিল অসম্ভব। অবস্থাটা ছিল অনেকটা এমন, গানের কথা আছে কিন্তু সুর নেই; কথা পড়া যাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু গানটি শোনা যাচ্ছে না। এই সীমাবদ্ধতাই তাঁকে আটকে রেখেছিল বছরের পর বছর।

শরীর থেকে কী পরিমাণ রক্ত হারালে প্রাণঘাতী হতে পারে
পেরুতস জানতেন, প্রকৃতির বড় রহস্যগুলো উন্মোচনের জন্য প্রয়োজন অসীম ধৈর্য। তাই দিনের পর দিন ল্যাবরেটরিতে বসে তিনি প্রোটিনের স্ফটিক বা ক্রিস্টাল তৈরির চেষ্টা চালিয়ে গেছেন।

সময় বয়ে গেছে আপন গতিতে। চারপাশের দৃশ্যপট বদলেছে, সহকর্মীরা অন্য গবেষণায় মন দিয়েছেন। বিজ্ঞানের দিগন্তে নতুন নতুন ক্ষেত্র উন্মোচিত হয়েছে, দ্রুত সাফল্যের জোয়ার এসেছে অনেকের জীবনে। কিন্তু পেরুতস নড়েননি। দীর্ঘ ২২টি বছর তিনি ব্যয় করেছেন কেবল একটিমাত্র প্রোটিনের রহস্যভেদে। একজন মানুষের জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়গুলোর একটি বিশাল অংশ! এই দীর্ঘ সময়ে ক্লান্তি এসেছে, প্রবল হতাশা এবং সন্দেহ তাঁকে ঘিরে ধরেছে বারবার। কিন্তু তিনি হার মানেননি।

অবশেষে দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর তিনি এক বুদ্ধিদীপ্ত সমাধান খুঁজে পেলেন। তিনি প্রোটিন স্ফটিকের ভেতরে কিছু ভারী ধাতব পরমাণু যোগ করলেন। এতে ডিফ্র্যাকশন প্যাটার্নে সূক্ষ্ম কিছু পরিবর্তন দেখা দিল। এই পরিবর্তনের গাণিতিক বিশ্লেষণ করেই তিনি উদ্ধার করলেন সেই হারিয়ে যাওয়া ফেজ তথ্য।

ধীরে ধীরে ঝাপসা পর্দা সরে গিয়ে চোখের সামনে ভেসে উঠল হিমোগ্লোবিনের পূর্ণাঙ্গ ত্রিমাত্রিক রূপ। দেখা গেল অক্সিজেন ঠিক কোথায় যুক্ত হয়, অক্সিজেন গ্রহণ করার পর হিমোগ্লোবিনের বিশাল অণুটি কীভাবে নিজের আকার বদলে ফেলে। আধুনিক জীববিজ্ঞানের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো স্পষ্ট হলো জীবনদায়ী এই অণুর ভেতরের নিখুঁত কারিগরি।

কোষের ভেতরের খুদে কাঁচি ও এক অদৃশ্য টহলদার
অবশেষে দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর পেরুতস বুদ্ধিদীপ্ত সমাধান খুঁজে পেলেন। তিনি প্রোটিন স্ফটিকের ভেতরে কিছু ভারী ধাতব পরমাণু যোগ করলেন। এতে ডিফ্র্যাকশন প্যাটার্নে সূক্ষ্ম কিছু পরিবর্তন দেখা দিল।

ডিএনএর আলো, প্রোটিনের অন্ধকার

বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়টা ছিল অণুজীববিজ্ঞানের উত্তেজনায় ঠাসা অধ্যায়। ডিএনএর দ্বিসূত্রক গঠন সবে আবিষ্কৃত হয়েছে। বিজ্ঞানীরা যেন হঠাৎ করেই হাতে পেয়ে গেছেন জীবনের গোপন বার্তার পাঠোদ্ধার করার চাবিকাঠি। সংবাদপত্রের শিরোনাম থেকে গবেষণাগারের আড্ডা, সবখানেই তখন ডিএনএর জয়গান। মনে হচ্ছিল, জীবনের রহস্যের শেষ দরজাটি বুঝি এবার খুলেই যাবে। কিন্তু সেই চোখধাঁধানো আলোর ঠিক পাশেই পড়ে ছিল এক বিশাল অন্ধকার অঞ্চল—প্রোটিন।

ডিএনএতে জমা থাকা সমস্ত তথ্য শেষ পর্যন্ত প্রোটিনেই রূপান্তরিত হয়। আমাদের শরীরের প্রতিটি কাজ—হাঁটা, চিন্তা করা, দেখা কিংবা শোনা—সবই সম্পন্ন হয় প্রোটিনের মাধ্যমে। শরীরের এনজাইম, রিসেপ্টর কিংবা হরমোন—সবই প্রোটিন। সহজ কথায়, ডিএনএ কেবল নকশা দেয়, কিন্তু সেই নকশা অনুযায়ী রাজমিস্ত্রির মতো কাজটা করে প্রোটিনই। অথচ সেই সময়ে প্রোটিনের গঠন ছিল বিজ্ঞানীদের কাছে প্রায় সম্পূর্ণ অজানা।

বিজ্ঞানীরা জানতেন প্রোটিন অ্যামিনো অ্যাসিডের দীর্ঘ শৃঙ্খলে তৈরি। কিন্তু সেই শৃঙ্খল কীভাবে ভাঁজ খেয়ে একটি নির্দিষ্ট ত্রিমাত্রিক আকার নেয় এবং কীভাবে সেই আকারটিই তার কাজ নির্ধারণ করে, এসব ছিল শুধুই অনুমান। অবস্থাটা ছিল এমন, আমাদের হাতে একটি কবিতার শব্দগুলো আছে ঠিকই, কিন্তু তার সুর কেমন হবে তা জানা নেই। ডিএনএ তখন খ্যাতির আলোয় ভাসছে, তার ছবি আঁকা হয়ে গেছে। আর প্রোটিন যেন কুয়াশায় ঢাকা এক দুর্গম পাহাড়; সবাই জানে সেটি বিশাল, কিন্তু তার প্রকৃত রূপটি কেমন তা কারও চোখে স্পষ্ট নয়।

ডিএনএ সংখ্যার রহস্য
ডিএনএ কেবল নকশা দেয়, কিন্তু সেই নকশা অনুযায়ী রাজমিস্ত্রির মতো কাজটা করে প্রোটিনই। অথচ সেই সময়ে প্রোটিনের গঠন ছিল বিজ্ঞানীদের কাছে প্রায় সম্পূর্ণ অজানা।

ঠিক এই মাহেন্দ্রক্ষণেই ম্যাক্স পেরুতসের সিদ্ধান্তটি ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সমসাময়িক অধিকাংশ গবেষক যখন ডিএনএর আলোয় আকৃষ্ট হচ্ছিলেন, পেরুতস তখন চোখ রাখলেন সেই অন্ধকার অজানার দিকে। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, প্রোটিনের গঠন জানা না গেলে ডিএনএর তথ্যও শেষ পর্যন্ত অপূর্ণ থেকে যাবে। কারণ নকশা বোঝা জরুরি, কিন্তু সেই নকশা বাস্তবে কীভাবে রূপ নেয়, তা জানাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।  

হিমোগ্লোবিনকে বেছে নেওয়া তাই কেবল বৈজ্ঞানিক কৌতূহল ছিল না, এটি ছিল দৃষ্টিভঙ্গির এক আমূল পরিবর্তন। তিনি সজ্ঞানেই আলোর ঝলকানি ছেড়ে অন্ধকারের দিকে পা বাড়ালেন। তিনি জানতেন এই পথ বন্ধুর, জানতেন হয়তো খুব দ্রুত কোনো পুরস্কার মিলবে না। তবু তাঁর অটল বিশ্বাস ছিল, প্রোটিনের গহিন অন্ধকার এক দিন ঠিকই কেটে যাবে। মানুষের সামনে উন্মোচিত হবে জীবনের আসল কারিগরি।

মানুষের প্রথম কোডন আবিষ্কার
হিমোগ্লোবিনকে বেছে নেওয়া তাই কেবল বৈজ্ঞানিক কৌতূহল ছিল না, এটি ছিল দৃষ্টিভঙ্গির এক আমূল পরিবর্তন। পেরুতস সজ্ঞানেই আলোর ঝলকানি ছেড়ে অন্ধকারের দিকে পা বাড়ালেন।

এক তরুণ গবেষক, এক অসম্ভব লক্ষ্য

১৯৩৭ সালে কেমব্রিজে কাজ শুরু করলেন এক তরুণ গবেষক, নাম ম্যাক্স পেরুতস। বয়স তখন খুব বেশি নয়, কিন্তু তাঁর ঝুলি ভরা ছিল আকাশছোঁয়া সব প্রশ্ন। প্রোটিন দেখতে কেমন, কেবল সেটুকুই তাঁর জিজ্ঞাসার শেষ ছিল না। তিনি জানতে চেয়েছিলেন এই হিমোগ্লোবিন ঠিক কোন জাদুকরী কৌশলে অক্সিজেন ধরে রাখে এবং মোক্ষম সময়ে আবার ছেড়ে দেয়। ফুসফুসে প্রবেশের পর অক্সিজেনের সঙ্গে তার যে মিতালি হয়, টিস্যুতে পৌঁছানোর পর কেন তা আলগা হয়ে যায়?

আজ আমরা জানি, হিমোগ্লোবিন চারটি উপাংশ বা সাবইউনিট নিয়ে গঠিত এবং অক্সিজেন যুক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এর গঠন খানিকটা বদলে যায়। কিন্তু সেই সময়ে এই ধারণাগুলো ছিল নিছক কল্পনা। পেরুতসের সামনে ছিল এমন এক বিশাল ও রহস্যময় অণু, যার কাজ সবাই জানলেও প্রকৃত রূপটি কারও জানা ছিল না।

সেই যুগে প্রোটিনের ত্রিমাত্রিক গঠন নির্ণয় করাকে মনে করা হতো অসম্ভব মিশন। এক্স-রে ক্রিস্টালোগ্রাফি ছোট ছোট অণুর ক্ষেত্রে সফল হলেও হাজার হাজার পরমাণু দিয়ে তৈরি হিমোগ্লোবিনের মতো দানবাকৃতির অণুকে বাগে আনা ছিল অবিশ্বাস্য। অনেকেই সতর্ক করেছিলেন—এই পথে হাঁটলে বছরের পর বছর পণ্ডশ্রম হবে, কিন্তু সাফল্যের মুখ দেখা যাবে না। কিন্তু পেরুতস ছিলেন নাছোড়বান্দা। তিনি বিশ্বাস করতেন, প্রকৃতি যদি এই অণুকে এত সূক্ষ্মভাবে সাজাতে পারে, তবে মানুষের পক্ষে তার রহস্যভেদ করা অসম্ভব হতে পারে না।

জীবনের কোড ভাঙার এক গোপন অভিযান
এক্স-রে ক্রিস্টালোগ্রাফি ছোট ছোট অণুর ক্ষেত্রে সফল হলেও হাজার হাজার পরমাণু দিয়ে তৈরি হিমোগ্লোবিনের মতো দানবাকৃতির অণুকে বাগে আনা ছিল অবিশ্বাস্য।

কিন্তু গবেষণার শুরুতেই ইতিহাস তাঁর পথে প্রাচীর হয়ে দাঁড়াল। শুরু হলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। উত্তাল হয়ে উঠল গোটা ইউরোপ। অস্ট্রিয়ান বংশোদ্ভূত হওয়ায় পেরুতসকে দেখা হলো সন্দেহের চোখে। নিজ দেশেই তিনি শত্রু হিসেবে চিহ্নিত হলেন এবং তাঁকে সাময়িকভাবে বন্দী করা হলো। ল্যাবরেটরি থেকে দূরে, চরম এক অনিশ্চয়তার মধ্যে কাটল তাঁর দিনগুলো। থেমে গেল গবেষণা, ছিঁড়ে গেল সাধনার ধারাবাহিকতা।

এমন পরিস্থিতিতে যে কেউ হয়তো হাল ছেড়ে দিতেন। বেছে নিতেন সহজ কোনো বিষয় বা দ্রুত সাফল্য পাওয়ার মতো কোনো প্রকল্প। কিন্তু পেরুতসের ভেতরে ছিল এক নীরব পাহাড়সম একাগ্রতা। যুদ্ধ শেষ হতেই তিনি আবার ফিরে এলেন কেমব্রিজে, আবার গিয়ে দাঁড়ালেন সেই একই অণুর সামনে। সময় হয়তো তাঁর পথকে দীর্ঘ করেছিল, কিন্তু তাঁর সংকল্পকে এক বিন্দুও টলাতে পারেনি।

জিন কেন সব সময় কাজ করে না
অস্ট্রিয়ান বংশোদ্ভূত হওয়ায় পেরুতসকে দেখা হলো সন্দেহের চোখে। নিজ দেশেই তিনি শত্রু হিসেবে চিহ্নিত হলেন এবং তাঁকে সাময়িকভাবে বন্দী করা হলো।

হাল ছেড়ে দেওয়ার প্রলোভন

আমরা প্রায়ই ভাবি বিজ্ঞানীরা বুঝি সব সময় অবিচল, নির্ভুল ও প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসী। কিন্তু ল্যাবরেটরির নিঃসঙ্গ রাতগুলোয় একজন বিজ্ঞানীও দিন শেষে একজন মানুষই। সেই জটিল ফেজ সমস্যার সামনে দাঁড়িয়ে ম্যাক্স পেরুতসও নিশ্চয়ই বহুবার নিজেকে প্রশ্ন করেছেন—আমি কি ভুল পথে হাঁটছি? এতগুলো বছর ধরে একই বৃত্তে ঘুরপাক খাচ্ছি না তো?

ল্যাবরেটরির প্রতিদিনের গল্পে সাফল্য থাকে না। কখনো মূল্যবান স্ফটিকটি ভেঙে যায়, কখনো এক্স-রে ডিফ্র্যাকশন প্যাটার্ন আসে ঝাপসা হয়ে। দিন শেষে টেবিলের ওপর পড়ে থাকে কাগজভর্তি সংখ্যা ও কাটাকুটি করা নকশা। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত সেই ত্রিমাত্রিক গঠনের দেখা মেলে না। এই অন্তহীন ব্যর্থতা ধীরে ধীরে মানুষের আত্মবিশ্বাসের দেয়ালে ফাটল ধরায়।

এদিকে চারপাশের জগৎটা তখন বদলে যাচ্ছে দ্রুত। ডিএনএ নিয়ে প্রবল উত্তেজনা, নতুন নতুন আবিষ্কার এবং দ্রুত সাফল্যের জোয়ারে ভাসছেন অন্য গবেষকেরা। সহকর্মীদের কেউ কেউ হয়তো হিতৈষী হয়েই পরামর্শ দিয়েছিলেন, বিষয়টা বদলে ফেললেই তো হয়! এত জটিল ধাঁধায় এক জীবন আটকে রাখার মানে কী? একজন গবেষকের জন্য সময় সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। দ্রুত ফল না এলে ক্যারিয়ার নড়বড়ে হয়ে পড়ে। তা ছাড়া অনিশ্চিত কোনো দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পে তহবিল জোগাড় করাও ছিল এক দুঃসাধ্য লড়াই।

এমন পরিস্থিতিতে হাল ছেড়ে দেওয়াই ছিল সবচেয়ে স্বাভাবিক এবং যুক্তিসংগত পথ। নিরাপদ ও দ্রুত ফলাফল দেবে এমন কোনো বিষয় বেছে নেওয়াটাই হয়তো বুদ্ধিমত্তার পরিচয় হতো। কিন্তু পেরুতসের ভেতরে ছিল এক নীরব ও দুর্ভেদ্য দৃঢ়তা। তিনি সন্দেহ অনুভব করেছেন, ক্লান্তিতে নুয়ে পড়েছেন বারবার, কিন্তু প্রশ্নটাকে কখনো হাতছাড়া করেননি। তাঁর কাছে হিমোগ্লোবিনের গঠন কেবল একটি অ্যাকাডেমিক সমস্যা ছিল না; এটি ছিল প্রকৃতির এক গূঢ় রহস্য, যার উত্তর না জানা পর্যন্ত তিনি শান্তি খুঁজে পাচ্ছিলেন না।

রান্নাঘরের ব্লেন্ডার থেকে জীবনের রহস্য
একজন গবেষকের জন্য সময় সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। দ্রুত ফল না এলে ক্যারিয়ার নড়বড়ে হয়ে পড়ে। তা ছাড়া অনিশ্চিত কোনো দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পে তহবিল জোগাড় করাও ছিল এক দুঃসাধ্য লড়াই।

এক্স-রে, স্ফটিক ও এক অদৃশ্য সমস্যা

হিমোগ্লোবিনের গঠন জানার প্রথম ও প্রধান শর্ত ছিল একটি নিখুঁত ও স্থিতিশীল স্ফটিক বা ক্রিস্টাল তৈরি করা। এক্স-রে ক্রিস্টালোগ্রাফি পদ্ধতিটি অনেকটা আয়নায় আলো ফেলে প্রতিফলনের মতো। এখানে শর্ত হলো, অণুগুলোকে অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে সারিবদ্ধ অবস্থায় থাকতে হয়। প্রোটিনগুলো যদি এলোমেলো থাকে, তবে সেখান থেকে এক্স-রে ঠিকঠাক প্রতিফলিত হতে পারে না, ফলে কোনো স্পষ্ট তথ্যও মেলে না।

কাজটি শুনতে সহজ মনে হলেও বাস্তবে ছিল এক দুঃসাধ্য লড়াই। প্রোটিন অত্যন্ত সংবেদনশীল অণু। তাপমাত্রার সামান্য হেরফের হলে এর গঠন ভেঙে যায়, আবার দ্রবণের রাসায়নিক ঘনত্ব একটু এদিক-সেদিক হলেই কাঙ্ক্ষিত স্ফটিকটি আর তৈরি হয় না। বছরের পর বছর পেরুতসকে ল্যাবরেটরিতে শুধু এই জুতসই পরিবেশটিই খুঁজে ফিরতে হয়েছে।

প্রোটিন স্ফটিকের ওপর এক্স-রে প্রয়োগ করলে ডিফ্র্যাকশন প্যাটার্ন তৈরি হয়

বহুবার চেষ্টা আর ব্যর্থতার পাহাড় ডিঙিয়ে অবশেষে এক দিন দেখা মিলল সেই মাহেন্দ্রক্ষণের। তৈরি হলো হিমোগ্লোবিনের এক ক্ষুদ্র, স্বচ্ছ এবং প্রায় অদৃশ্য এক টুকরো স্ফটিক। সাধারণ চোখে এটি হয়তো ধূলিকণার মতো তুচ্ছ কিছু ছিল, কিন্তু পেরুতস জানতেন—এই ছোট্ট স্ফটিকের অন্দরমহলেই লুকিয়ে আছে জীবনের এক মহাকাব্যিক নকশা।

এরপর শুরু হলো এক্স-রের কারিশমা। হিমোগ্লোবিনের সেই অতি ক্ষুদ্র স্ফটিকের ওপর ফেলা হলো শক্তিশালী এক্স-রে। স্ক্রিনে ফুটে উঠল অসংখ্য বিন্দু, ছায়া ও বিচিত্র সব রেখা। বিজ্ঞানের ভাষায় একেই বলে ডিফ্র্যাকশন প্যাটার্ন। এই বিন্দুগুলোই ছিল তথ্যের খনি। কিন্তু সমস্যা হলো, এই বিন্দুগুলো দেখে কীভাবে একটি পূর্ণাঙ্গ ত্রিমাত্রিক কাঠামো তৈরি করা সম্ভব?

যে ডিএনএ টেস্ট ভিলেন বানিয়ে দিয়েছিল একজন মাকে
প্রোটিন অত্যন্ত সংবেদনশীল অণু। তাপমাত্রার সামান্য হেরফের হলে এর গঠন ভেঙে যায়, আবার দ্রবণের রাসায়নিক ঘনত্ব একটু এদিক-সেদিক হলেই কাঙ্ক্ষিত স্ফটিকটি আর তৈরি হয় না।

এক্স-রে বিশ্লেষণ আমাদের বলে দেয়, প্রতিফলন ঠিক কতটা তীব্র ছিল, কিন্তু এটি বলে না সেই আলোকতরঙ্গের সুনির্দিষ্ট অবস্থান বা ফেজ কী ছিল। বিজ্ঞানে এটিই কুখ্যাত ফেজ সমস্যা নামে পরিচিত। আপনার কাছে তীব্রতা বা ইন্টেনসিটির তথ্য আছে, কিন্তু নেই তরঙ্গের দশা বা ফেজ। আর এই তথ্য ছাড়া ত্রিমাত্রিক মানচিত্র তৈরি করা প্রায় অসম্ভব। বিষয়টা অনেকটা এমন, আপনার কাছে একটি বিশাল পাজলের সব কটি টুকরো আছে ঠিকই, কিন্তু মূল ছবির অর্ধেক রং উধাও! টুকরোগুলো জোড়া লাগানো গেলেও পূর্ণাঙ্গ দৃশ্যটি কখনোই স্পষ্ট হয়ে ধরা দিচ্ছে না।

এই অদৃশ্য দেয়ালটিই পেরুতসকে বছরের পর বছর এক জায়গায় আটকে রেখেছিল। ওদিকে বাইরের পৃথিবী তখন বিজ্ঞানের দ্রুততম অগ্রযাত্রায় মাতোয়ারা। ডিএনএর দ্বিসূত্রক গঠন আবিষ্কৃত হয়ে গেছে, জেনেটিক কোড নিয়ে উত্তেজনা তখন তুঙ্গে। প্রতিদিন নতুন নতুন সাফল্যের খবর সংবাদপত্রের শিরোনাম হচ্ছে। আর কেমব্রিজের এক নির্জন কোণে বসে পেরুতস তখনো বিন্দু আর রেখার গোলকধাঁধায় হিমশিম খাচ্ছেন। তাঁর হাতে তথ্য আছে, কিন্তু নেই সেই কাঙ্ক্ষিত ছবি। প্রতিবার মনে হয় এবার বুঝি রহস্যের সমাধান মিলবে, কিন্তু পরক্ষণেই গাণিতিক হিসাবে দেখা দেয় বিশাল গরমিল।

এই সময়টা ছিল পেরুতসের জীবনের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা। ব্যর্থতা শুধু ল্যাবরেটরির খাতায় নয়, বরং তাঁর মনেও বিষাদের পাহাড় জমাচ্ছিল। চারপাশের সবাই যখন এগিয়ে যাচ্ছে, তিনি যেন তখনো এক তিমিরে দাঁড়িয়ে। তবু তিনি জানতেন, সমস্যাটি দুর্ভেদ্য হলেও তার সমাধান আছে। তিনি ভিন্ন পথে চিন্তা করতে শুরু করলেন। তাঁর মাথায় এল এক যুগান্তকারী বুদ্ধি—যদি স্ফটিকের ভেতর ভারী কোনো পরমাণু ঢুকিয়ে দেওয়া যায়, তাহলে কি ডিফ্র্যাকশন প্যাটার্নে সূক্ষ্ম কোনো পরিবর্তন আসবে? আর সেই পরিবর্তন বিশ্লেষণ করেই কি উদ্ধার করা যাবে হারিয়ে যাওয়া ফেজ তথ্য? এই বৈপ্লবিক চিন্তাই জন্ম দিল আইসোমরফাস রিপ্লেসমেন্ট পদ্ধতির। সেটাই এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করল প্রোটিন গবেষণার ইতিহাসে।

রক্তের গ্রুপ কীভাবে আবিষ্কার হলো
কেমব্রিজের এক নির্জন কোণে বসে পেরুতস তখনো বিন্দু আর রেখার গোলকধাঁধায় হিমশিম খাচ্ছেন। তাঁর হাতে তথ্য আছে, কিন্তু নেই সেই কাঙ্ক্ষিত ছবি।

২২ বছরের মহাকাব্যিক ধৈর্য

একজন মানুষ কত বছর ধরে একই প্রশ্ন আঁকড়ে থাকতে পারেন? পাঁচ বছর হয়তো সম্ভব, কারও কারও পক্ষে হয়তো দশ বছরও। কিন্তু একটিমাত্র বৈজ্ঞানিক সমস্যার পেছনে জীবনের দুই দশকেরও বেশি সময় উৎসর্গ করা অবিশ্বাস্য এক ত্যাগ। ম্যাক্স পেরুতস ছিলেন সেই বিরল মানুষদের একজন। দীর্ঘ ২২টি বছর তিনি ব্যয় করেছেন হিমোগ্লোবিনের রহস্যভেদে। এই দীর্ঘ সময়ে তাঁর চারপাশের পৃথিবী বদলেছে, বদলেছে বিজ্ঞানের চেনা জগৎ—কিন্তু তাঁর আদি প্রশ্নটি ছিল অটল।

এই দীর্ঘ সময় তিনি কেবল ল্যাবরেটরিতে তথ্যের পাহাড় জমাননি; বরং প্রতিটি ব্যর্থতায় নতুন করে চিন্তা করেছেন। ফেজ সমস্যার সেই দুর্ভেদ্য দেয়ালের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি বুঝেছিলেন, প্রচলিত পথে কোনো সমাধান মিলবে না। এক্স-রে থেকে প্রাপ্ত প্রতিফলনের তীব্রতা দিয়ে অণুর পূর্ণাঙ্গ মানচিত্র তৈরি করা অসম্ভব, যতক্ষণ না সেই আলোকতরঙ্গের দশা জানা যাচ্ছে।

এই হারানো তথ্য উদ্ধারের জন্য তিনি এক চমকপ্রদ কৌশল বেছে নিলেন। তিনি হিমোগ্লোবিনের স্ফটিকের ভেতর কয়েকটি ভারী ধাতব পরমাণু (যেমন পারদ) যুক্ত করলেন। একই কাঠামোর ভেতরে এই সামান্য পরিবর্তনের ফলে ডিফ্র্যাকশন প্যাটার্নে সূক্ষ্ম কিছু বিচ্যুতি দেখা দিল। পেরুতস অনুধাবন করলেন, এই বিচ্যুতি বা পরিবর্তনগুলো গাণিতিকভাবে বিশ্লেষণ করলেই অনুপস্থিত ফেজ তথ্য উদ্ধার করা সম্ভব।

রক্তের গ্রুপ মিলিয়ে দেখতে হয় কেন
দীর্ঘ ২২টি বছর ম্যাক্স পেরুতস ব্যয় করেছেন হিমোগ্লোবিনের রহস্যভেদে। এই দীর্ঘ সময়ে তাঁর চারপাশের পৃথিবী বদলেছে, বদলেছে বিজ্ঞানের চেনা জগৎ—কিন্তু তাঁর আদি প্রশ্নটি ছিল অটল।

এই ধারণাটি সহজ ছিল না, আর এটি এক দিনে ধরাও দেয়নি। এটি ছিল দীর্ঘ পর্যবেক্ষণ আর অসংখ্য ব্যর্থতার পর জেগে ওঠা এক দিব্যজ্ঞান। যেন এক অন্ধকার ঘরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ হঠাৎ বুঝতে পারল—সরাসরি কিছু দেখা যাচ্ছে না বলে আলো নেই তা নয়, বরং আলোকে দেখার চোখ বদলাতে হবে। ঘরের একটি ভারী বস্তু সরিয়ে তার ছায়া মেপে যদি বাকি জিনিসগুলোর অবস্থান বোঝা যায়, তবেই মিলবে মুক্তি। পেরুতস ঠিক এই বুদ্ধিবৃত্তিক কৌশলই ব্যবহার করেছিলেন। তিনি সরাসরি গঠন দেখতে পাচ্ছিলেন না ঠিকই, কিন্তু পরিবর্তনের পার্থক্য থেকে অণুর প্রকৃত রূপটি উদ্ধার করছিলেন।

এই পদ্ধতিটিই বিজ্ঞানের ইতিহাসে 'আইসোমরফাস রিপ্লেসমেন্ট' নামে অমর হয়ে আছে, যা প্রোটিন ক্রিস্টালোগ্রাফিতে এনে দিয়েছিল এক বৈপ্লবিক মোড়। প্রতিটি ধাপে ব্যর্থতার ঝুঁকি থাকলেও পেরুতস থামেননি। কারণ তিনি জানতেন, এই বাধা টপকাতে পারলেই খুলে যাবে জীববিজ্ঞানের এক নতুন দিগন্ত।

অবশেষে বছরের পর বছর ধরে চলা ডেটা বিশ্লেষণ আর গাণিতিক হিসাবের জটিল জট খুলতে শুরু করল। ধীরে ধীরে কুয়াশার ভেতর থেকে যেন এক অপার্থিব অবয়ব স্পষ্ট হয়ে উঠল। হাজার হাজার বিন্দু আর রেখার গোলকধাঁধা থেকে উদ্ভাসিত হলো হিমোগ্লোবিনের পূর্ণাঙ্গ ত্রিমাত্রিক রূপ। অক্সিজেন কোথায় যুক্ত হয়, গ্রহণের পর প্রোটিনের আকার কীভাবে জাদুকরীভাবে বদলে যায়—সবই প্রথমবারের মতো মানুষের চোখের সামনে স্পষ্ট হলো। সার্থক হলো দীর্ঘ ২২ বছরের নীরব সাধনা।

রক্তের নেগেটিভ গ্রুপ কী
পেরুতসের ২২ বছরের সাধনা আমাদের শিখিয়ে দিল যে প্রোটিন কেবল শরীরের ইট-পাথর নয়, বরং তারা এক-একটি নিখুঁত প্রাণবন্ত যন্ত্র, যাদের ছন্দোবদ্ধ গতির ওপর নির্ভর করে আমাদের বেঁচে থাকা।

এক শ্বাস নেওয়া অণুর গল্প

হিমোগ্লোবিনের গঠন যখন ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠল, তখন বিজ্ঞানীদের সামনে উন্মোচিত হলো এক বিস্ময়কর সত্য। এত দিন আমরা যাকে কেবল একটি সাধারণ রাসায়নিক পরিবহনকারী অণু বলে মনে করতাম, দেখা গেল সেটি মোটেও জড় কোনো বস্তু নয়। এটি নিছক একটি স্থির কাঠামো নয়, বরং এক আশ্চর্য গতিশীল যন্ত্র।

পেরুতস আবিষ্কার করলেন, হিমোগ্লোবিন অণুটি আসলে শ্বাস নেয়! যখন সে অক্সিজেনের সংস্পর্শে আসে, তখন তার বিশাল কাঠামোর ভেতরে এক সূক্ষ্ম কিন্তু নাটকীয় পরিবর্তন ঘটে। অক্সিজেনের একটি অণু যুক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হিমোগ্লোবিনের চারটি উপাংশ বা সাবইউনিট নিজেদের অবস্থান বদলে ফেলে—যেন তারা একে অপরের দিকে হাত বাড়িয়ে দেয়। এই গাঠনিক পরিবর্তনের ফলেই হিমোগ্লোবিনের বাকি অংশগুলো আরও দ্রুত অক্সিজেন গ্রহণ করতে পারে।

হিমোগ্লোবিনের ত্রিমাত্রিক গঠন

আবার যখন রক্ত শরীরের টিস্যুতে পৌঁছায়, তখন ঠিক উল্টো ঘটনাটি ঘটে। হিমোগ্লোবিন তার আকার পরিবর্তন করে অক্সিজেনকে মুক্ত করে দেয়। এই যে সংকোচন আর প্রসারণ—এটিই জীবনকে সচল রাখে। পেরুতসের সেই ২২ বছরের সাধনা আমাদের শিখিয়ে দিল যে প্রোটিন কেবল শরীরের ইট-পাথর নয়, বরং তারা এক-একটি নিখুঁত প্রাণবন্ত যন্ত্র, যাদের ছন্দোবদ্ধ গতির ওপর নির্ভর করে আমাদের বেঁচে থাকা।

ফুসফুসে যখন অক্সিজেনের ঘনত্ব বেশি থাকে, তখন একটি অক্সিজেন অণু এসে হিমোগ্লোবিনের ‘হিম’ (Heme) গ্রুপের লৌহ পরমাণুর সঙ্গে যুক্ত হয়। কিন্তু এই যুক্ত হওয়াটা কোনো সাধারণ ঘটনা নয়। অক্সিজেনটি বাঁধার সঙ্গে সঙ্গেই পুরো প্রোটিন অণুর ভেতরে একটি সূক্ষ্ম কিন্তু সুদূরপ্রসারী গাঠনিক পরিবর্তন ঘটে। একটি উপাংশের সামান্য সরে যাওয়া অন্য উপাংশগুলোর অবস্থানেও একধরনের কাঁপন ধরিয়ে দেয়।

মানুষ প্রতিদিন কতবার শ্বাস নেয়, সারাজীবনে কতবার
পেরুতস আবিষ্কার করলেন, হিমোগ্লোবিন অণুটি আসলে শ্বাস নেয়! যখন সে অক্সিজেনের সংস্পর্শে আসে, তখন তার বিশাল কাঠামোর ভেতরে এক সূক্ষ্ম কিন্তু নাটকীয় পরিবর্তন ঘটে।

ফলে যা ঘটে, তা এককথায় জাদুকরী—বাকি তিনটি হিম গ্রুপের জন্য অক্সিজেনকে ধরে ফেলা অনেক বেশি সহজ হয়ে যায়। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় কো-অপারেটিভিটি বা সমবায় আচরণ। বিষয়টা অনেকটা এমন—ঘরের একটি দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গেই বাকি দরজাগুলোও আপনা-আপনি আলগা হয়ে যাচ্ছে। এই বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কারণেই ফুসফুসের ভেতর হিমোগ্লোবিন অত্যন্ত দ্রুত চারটি অক্সিজেন অণুকে নিজের সঙ্গে বেঁধে নিতে পারে। এটি কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়, বরং প্রোটিনের আণবিক গঠনের মধ্যেই নিখুঁতভাবে প্রোগ্রাম করা একটি কারিগরি।

কিন্তু গল্পের আরেকটি রোমাঞ্চকর দিকও আছে। শরীরের কোষ বা টিস্যুতে যখন অক্সিজেনের অভাব দেখা দেয়, তাপমাত্রা বেড়ে যায় কিংবা কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা বৃদ্ধি পায়, তখন পরিবেশ বদলে যায়। সেই প্রতিকূল পরিবেশে হিমোগ্লোবিন আবারও তার গঠন সামান্য পরিবর্তন করে ফেলে। যে গঠনটি ফুসফুসে অক্সিজেনকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরেছিল, টিস্যুর বিশেষ রাসায়নিক প্রভাবে সেটিই আবার আলগা হয়ে যায়।

ম্যাক্স পেরুতস প্রমাণ করেছিলেন যে হিমোগ্লোবিন মূলত দুটি ভিন্ন অবস্থায় থাকতে পারে। একটি অবস্থা অক্সিজেনকে সহজে ধরে রাখে (R-state), আর অন্যটি অক্সিজেন ছেড়ে দিতে সাহায্য করে (T-state)। এই দুই অবস্থার মাঝখানের অতি ক্ষুদ্র গাঠনিক পরিবর্তনই আমাদের শরীরের শ্বাসপ্রশ্বাসের পুরো রাসায়নিক গতিপথ নিয়ন্ত্রণ করে।

একটি মাত্র কোষ থেকে কীভাবে তৈরি হয় মস্তিষ্ক
শরীরের কোষ বা টিস্যুতে যখন অক্সিজেনের অভাব দেখা দেয়, তাপমাত্রা বেড়ে যায় কিংবা কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা বৃদ্ধি পায়, তখন পরিবেশ বদলে যায়।

এক ল্যাবে দুই স্বপ্ন

কেমব্রিজের সেই ক্যাভেন্ডিশ ল্যাবরেটরিতে ম্যাক্স পেরুতস একা লড়ছিলেন না। তাঁর পাশেই আরেকজন গবেষক নীরবে বুনে যাচ্ছিলেন এক মহাকাব্যিক স্বপ্নের জাল—তিনি জন কেনড্রু। দুজনের গবেষণার বিষয় আলাদা হলেও লক্ষ্য ছিল অভিন্ন: জীবনের কারিগর প্রোটিনকে সরাসরি দেখা এবং তার ত্রিমাত্রিক রহস্য উন্মোচন করা।

ম্যাক্স পেরুতস ও জন কেনড্রু। একই ল্যাবে দুই গবেষকের কাজ মিলেই প্রোটিন কাঠামো গবেষণায় নতুন যুগের সূচনা করে

পেরুতস বেছে নিয়েছিলেন হিমোগ্লোবিনকে—হাজার হাজার পরমাণু নিয়ে গঠিত এক জটিল ও দানবাকৃতির প্রোটিন, যার চারটি উপাংশ একে অপরের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কাজ করে। অন্যদিকে জন কেনড্রুর মনোযোগ ছিল মায়োগ্লোবিন নামে অণুর দিকে। মায়োগ্লোবিন তুলনামূলকভাবে ছোট এবং সরল প্রোটিন। এর প্রধান কাজ আমাদের পেশিতে অক্সিজেন জমা রাখা।

যদিও হিমোগ্লোবিনের চেয়ে মায়োগ্লোবিন আয়তনে ছোট ছিল, তবুও সেই যুগে এর পূর্ণাঙ্গ ত্রিমাত্রিক কাঠামো তৈরি করা ছিল হিমালয় জয়ের মতোই কঠিন। পেরুতস ও কেনড্রু—এই দুই অগ্রপথিকের হাত ধরেই বিজ্ঞানের ইতিহাসে এক নতুন যুগের সূচনা হতে যাচ্ছিল, যেখানে মানুষের চোখ প্রথমবারের মতো দেখতে পাবে জীবনের আণবিক স্থাপত্য।

রক্তকণিকা কোথায় তৈরি হয়
পেরুতস বেছে নিয়েছিলেন হিমোগ্লোবিনকে—হাজার হাজার পরমাণু নিয়ে গঠিত এক জটিল ও দানবাকৃতির প্রোটিন, যার চারটি উপাংশ একে অপরের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কাজ করে।

কেমব্রিজের একই গবেষণাগারে, একই পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা আর একই ফেজ সমস্যার দেয়ালের সামনে দাঁড়িয়ে দুই গবেষক সমান্তরালভাবে এক অজানার পথ খুঁজছিলেন। তাঁদের এই পথচলা প্রতিযোগিতার চেয়েও বড় ছিল সহযোগিতার। কখনো ল্যাবের টেবিলে বসে একে অপরের কাজ নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করেছেন, কখনোবা দীর্ঘ প্রতীক্ষার ক্লান্তি আর হতাশা ভাগ করে নিয়েছেন নিজেদের মধ্যে। তাঁদের সাফল্যের মুকুট আলাদা হলেও লড়াইয়ের ভিত্তি ছিল অভিন্ন।

অবশেষে ১৯৫৮ সালে বিজ্ঞানের ইতিহাসে এক মাহেন্দ্রক্ষণ এল। জন কেনড্রু উন্মোচন করলেন মায়োগ্লোবিনের গঠন। ইতিহাসে সেটিই ছিল প্রথমবারের মতো কোনো প্রোটিনের পূর্ণাঙ্গ ত্রিমাত্রিক রূপ। সেই মুহূর্তে গোটা বিশ্বের কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল যে যা এত দিন অসম্ভব বলে মনে করা হতো, তা আসলে সম্ভব। প্রোটিনের গহিন অন্দরের কারুকার্য সত্যিই মানুষের চোখে ধরা দেয়। কেনড্রুর এই সাফল্য পেরুতসের দীর্ঘ ২২ বছরের লড়াইকেও এক নতুন শক্তিতে বলীয়ান করে তুলল।

এর কয়েক বছর পরই হিমোগ্লোবিনের জটিল গঠনটিও মানুষের নাগালে চলে এল। বিজ্ঞানীদের হাতে তখন দুটি প্রোটিনের নকশা—একটি সরল ও ছোট (মায়োগ্লোবিন), অন্যটি জটিল ও সমবায় আচরণকারী (হিমোগ্লোবিন)। এই দুই আবিষ্কার কেবল দুটি প্রোটিনের গল্প ছিল না, এটি ছিল বিজ্ঞানের এক নতুন দিগন্ত—স্ট্রাকচারাল বায়োলজি বা গাঠনিক জীববিজ্ঞানের আনুষ্ঠানিক জন্মলগ্ন।

দেহের অণুচক্রিকা কমলে করণীয় কী​​​​​​​​​​​​​​​​​​​​​​​​​​​​
অবশেষে ১৯৫৮ সালে বিজ্ঞানের ইতিহাসে এক মাহেন্দ্রক্ষণ এল। জন কেনড্রু উন্মোচন করলেন মায়োগ্লোবিনের গঠন। ইতিহাসে সেটিই ছিল প্রথমবারের মতো কোনো প্রোটিনের পূর্ণাঙ্গ ত্রিমাত্রিক রূপ।

নোবেল পুরস্কার, কিন্তু তার চেয়েও বড় স্বীকৃতি

১৯৬২ সালে ম্যাক্স পেরুতস এবং জন কেনড্রু যৌথভাবে লাভ করলেন রসায়নে নোবেল পুরস্কার। এই ঘোষণা ছিল দীর্ঘ দুই দশকের অধ্যবসায় আর অদম্য জেদের এক আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি। যে তরুণ গবেষক একসময় অসম্ভব বলে মনে করা এক সমস্যাকে আঁকড়ে ধরেছিলেন, তিনি অবশেষে বিশ্বমঞ্চে সম্মানিত হলেন। কিন্তু পেরুতসের কাজের প্রকৃত গুরুত্ব শুধু একটি পুরস্কারের স্বর্ণপদকেই সীমাবদ্ধ ছিল না।

পেরুতস প্রমাণ করেছিলেন যে প্রোটিনকে সত্যিই দেখা যায়। শুধু রাসায়নিক সংকেত বা কাজের তালিকা হিসেবে নয়, বরং ত্রিমাত্রিক পরমাণু-স্তরের এক বাস্তব স্থাপত্য হিসেবে। তাঁর কাজ বিশ্বকে শেখাল যে প্রোটিনের গঠন এবং তার কাজ আলাদা কোনো বিষয় নয়। পরমাণুগুলো ঠিক কোন বিন্যাসে সাজানো কিংবা তাদের মধ্যে সামান্য যে মোচড় বা সরে যাওয়া ঘটে—সেই পরিবর্তনই মূলত নির্ধারণ করে প্রোটিনটি ঠিক কীভাবে কাজ করবে। হিমোগ্লোবিনের ক্ষেত্রে এটি ছিল অক্সিজেন গ্রহণ ও মুক্তির এক নিখুঁত ব্যাখ্যা।

তিনি আরও দেখালেন, জীবনের রহস্য কোনো স্থির চিত্রে লুকিয়ে থাকে না। একটি প্রোটিন কেবল জমাটবদ্ধ কোনো কাঠামো নয়, বরং একটি চিরচঞ্চল গতিশীল সত্তা। পরিবেশের সামান্য প্রভাবে এর আকার বদলে যেতে পারে, আর সেই সূক্ষ্ম বদলই জীবনের জটিল সব রাসায়নিক প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে। এই ধারণাটি পরবর্তী প্রজন্মের গবেষণায় এক বৈপ্লবিক মোড় এনে দেয়। আজ এনজাইমের কাজ থেকে শুরু করে ওষুধের রিসেপ্টর কিংবা সিগন্যালিং প্রোটিনের সক্রিয়তা—সবক্ষেত্রেই গঠন ও গতিশীলতার এই সম্পর্কটিই ধ্রুব সত্য।

জীবনের নীল নকশার সাতকাহন
পেরুতস প্রমাণ করেছিলেন যে প্রোটিনকে সত্যিই দেখা যায়। শুধু রাসায়নিক সংকেত বা কাজের তালিকা হিসেবে নয়, বরং ত্রিমাত্রিক পরমাণু-স্তরের এক বাস্তব স্থাপত্য হিসেবে।

আজকের দিনে উন্নত ক্রায়ো-ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপি, শক্তিশালী ডিটেক্টর আর দ্রুতগতির কম্পিউটিং ব্যবহার করে আমরা মাত্র কয়েক মাসেই একটি প্রোটিনের গঠন বের করে ফেলি। এটি এখন প্রযুক্তির স্বাভাবিক অগ্রগতি বলে মনে হয়। কিন্তু এই আধুনিক সৌধের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল সেই দিনগুলোতে, যখন একজন মানুষ অসীম ধৈর্য নিয়ে বছরের পর বছর একই সমস্যার সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাঁর উদ্ভাবিত আইসোমরফাস রিপ্লেসমেন্ট পদ্ধতি আর তাঁর চিন্তার গভীরতাই গড়ে দিয়েছে আধুনিক স্ট্রাকচারাল বায়োলজির মজবুত ভিত্তি।

ম্যাক্স পেরুতস আমাদের শিখিয়ে গেছেন যে বিজ্ঞানের বড় বড় জয়গুলো আসলে শুধু মেধার নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি নিষ্ঠা আর হার না-মানা সংকল্পের ফসল।

ম্যাক্স পেরুতস যখন হিমোগ্লোবিনের গঠন উন্মোচন করেছিলেন, তখন হয়তো তিনি নিজেও কল্পনা করতে পারেননি তাঁর এই কাজ কতটা গভীরে গিয়ে পৌঁছাবে। সেই সময়ে এটি ছিল কেবল একটি মৌলিক বৈজ্ঞানিক সাফল্য। কিন্তু ধীরে ধীরে চিকিৎসাবিজ্ঞান বুঝতে পারল, প্রোটিনের গঠন জানা মানে শুধু একটি অণুকে দেখা নয়, বরং রোগের মূলে আঘাত করার নতুন চাবিকাঠি হাতে পাওয়া।

আজ আমরা ডায়াবেটিসের চিকিৎসায় যে ইনসুলিন ব্যবহার করি, সেটিও একটি প্রোটিন। ইনসুলিন ঠিক কীভাবে নিজের আকার ভাঁজ করে কিংবা কোষের রিসেপ্টরের সঙ্গে যুক্ত হয়, তা জানা না থাকলে আধুনিক চিকিৎসায় বিপ্লব আসত না। বর্তমানে আমরা ইনসুলিনের এমন সব আধুনিক সংস্করণ তৈরি করতে পেরেছি, যা রক্তে দ্রুত মিশে যায় অথবা দীর্ঘ সময় কার্যকর থাকে—আর এটি সম্ভব হয়েছে কেবল ইনসুলিনের ত্রিমাত্রিক কাঠামো আমাদের নখদর্পণে থাকার কারণে।

ইনসুলিন আবিষ্কার হলো কীভাবে
আমরা যদি জানি একটি এনজাইম ঠিক কীভাবে তার সাবস্ট্রেটকে ধরে রাখে, তাহলেই আমরা এমন একটি অণু ডিজাইন করতে পারি, যা সেই নির্দিষ্ট স্থানে গিয়ে এনজাইমটিকে নিষ্ক্রিয় করে দেবে।

ক্যানসারের আধুনিক চিকিৎসায় ‘টার্গেটেড থেরাপি’র কথাই ধরা যাক। অনেক ড্রাগ বা ওষুধ সরাসরি কোনো নির্দিষ্ট প্রোটিনকে লক্ষ্য করে কাজ করে। কোনো একটি ক্ষতিকর এনজাইমের ঠিক কোথায় গিয়ে ওষুধের অণুটি বসবে এবং তার কাজ থামিয়ে দেবে, তা জানার জন্য প্রোটিনের নিখুঁত মানচিত্র জানা অপরিহার্য। আজকের কাইনেজ ইনহিবিটর কিংবা মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডির মতো জীবনদায়ী ওষুধগুলোর মূলে রয়েছে এই স্ট্রাকচারাল বায়োলজি।

অ্যান্টিবায়োটিক উন্নয়ন থেকে শুরু করে ভাইরাসের প্রোটিনকে লক্ষ্য করে তৈরি অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ—সবক্ষেত্রেই এখন গঠন বিশ্লেষণ কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে। আমরা যদি জানি একটি এনজাইম ঠিক কীভাবে তার সাবস্ট্রেটকে ধরে রাখে, তাহলেই আমরা এমন একটি অণু ডিজাইন করতে পারি, যা সেই নির্দিষ্ট স্থানে গিয়ে এনজাইমটিকে নিষ্ক্রিয় করে দেবে।

আজকের দিনে আমরা ক্রায়ো-ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপি কিংবা আলফাফোল্ডের মতো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে কয়েক মুহূর্তেই প্রোটিনের গঠন অনুমান করতে পারি। কিন্তু এই সমস্ত অগ্রগতির বীজ রোপিত হয়েছিল তখন, যখন একজন মানুষ ২২ বছর ধরে প্রমাণ করেছিলেন যে প্রোটিনের গঠন নির্ণয় করা সত্যিই সম্ভব।

ম্যাক্স পেরুতস শুধু একটি অণুর ছবি আঁকেননি; তিনি এমন একটি পথ দেখিয়েছেন, যার ওপর দাঁড়িয়ে আজকের বায়োটেকনোলজি আর আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান এগিয়ে চলছে। তাই তাঁর কাজ শুধু ইতিহাসের একটি অধ্যায় নয়; এটি বর্তমানের প্রতিটি কার্যকর ওষুধের অন্দরেও নিঃশব্দে এক আলোকবর্তিকা হয়ে উপস্থিত।

লেখক: শিক্ষার্থী, রসায়ন বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সূত্র: নেচার, কোয়ার্টারলি রিভিউস অব বায়োফিজিক্স, প্রসিডিংস অব দ্য রয়্যাল সোসাইটি এ, অ্যাক্টা ক্রিস্টালোগ্রাফিকা, অ্যানুয়াল রিভিউ অব বায়োকেমিস্ট্রিঅ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কার

Read full story at source