বাঘ বাস্তুতন্ত্রের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ

· Prothom Alo

বাঘের পায়ের ছাপ মাপতে গিয়ে বনরক্ষী কাদায় হাঁটু পর্যন্ত ডুবে যান। এই দৃশ্যটা সুন্দরবনে নতুন কিছু না। কিন্তু প্রশ্ন হলো, তিনি আসলে কী মাপছেন? একটা প্রাণীর সংখ্যা, নাকি আরও কিছু?

Visit michezonews.co.za for more information.

বিজ্ঞানে এর একটা নাম আছে। বাংলায় একে ছাতা প্রজাতি বলা চলে। একটা প্রাণীকে বাঁচাতে যে পরিমাণ বনভূমি, খাদ্যশৃঙ্খল ও ভারসাম্য দরকার হয়, সেই একই ছাতার নিচে আশ্রয় পেয়ে যায় আরও শত শত প্রজাতি। বাঘ বাঁচাতে যে বন অক্ষত রাখতে হয়, সেখানেই বেঁচে থাকে চিত্রল হরিণ, বুনো শুয়োর, মেছো বিড়াল, গোসাপ, অজগর এবং অসংখ্য পাখি প্রজাতি। একটা বাঘের এলাকা রক্ষা মানে আসলে একটা গোটা ইকোসিস্টেমের টিকে থাকা।

সংখ্যাটা একবার ভাবা দরকার। পূর্ণবয়স্ক বাঘের নিজস্ব এলাকা কয়েক বর্গকিলোমিটার থেকে শুরু করে শতাধিক বর্গকিলোমিটার পর্যন্ত যেতে পারে। এটা নির্ভর করে বনের ঘনত্ব ও শিকারের প্রাপ্যতার ওপর। বাংলাদেশ অংশের সুন্দরবন প্রায় ছয় হাজার বর্গকিলোমিটার জুড়ে বিস্তৃত। সবশেষ বাঘশুমারিতে এখানে বাঘের সংখ্যা ধরা পড়েছে ১০০টির কিছু বেশি।

একটা বাঘ টিকিয়ে রাখতে হলে সেই এলাকা অক্ষত রাখতে হয়

এই স্বল্প সংখ্যাটাই বলে দেয়, প্রতিটি বাঘের পেছনে কতটা বিশাল এলাকা এবং কতটা সমৃদ্ধ খাদ্যশৃঙ্খল লুকিয়ে থাকতে হয়।

একটা বাঘ টিকিয়ে রাখতে হলে সেই এলাকা অক্ষত রাখতে হয়। সেখানে গাছ কাটা চলবে না, শিকার প্রজাতি কমতে দেওয়া যাবে না, বসতি বিস্তার ঠেকাতে হবে। এই শর্ত পূরণ করতেই যে কাঠামো দাঁড়ায়, সেটাই আসলে জঙ্গলের প্রতিটি প্রাণীর নিরাপত্তা বলয় হয়ে ওঠে।

বাঘ ও বাঘিনীর প্রেম
বাংলাদেশ অংশের সুন্দরবন প্রায় ছয় হাজার বর্গকিলোমিটার জুড়ে বিস্তৃত। সবশেষ বাঘশুমারিতে এখানে বাঘের সংখ্যা ধরা পড়েছে ১০০টির কিছু বেশি।

সুন্দরবনে বাঘ শুধু স্থলজ প্রাণী নয়। নদী, খাঁড়ি, লবণাক্ত জলাভূমিসহ সবকিছুর সঙ্গে জড়িয়ে আছে তার অস্তিত্ব। বাঘ শিকার করে চিত্রল হরিণ, বুনো শুয়োর এবং মাঝেমধ্যে মাছ। প্রয়োজনে এরা সাঁতরে পার হয় এক খাঁড়ি থেকে আরেকটায়। এই খাদ্যশৃঙ্খলের প্রতিটি স্তর নদীর স্বাস্থ্যের সঙ্গে বাঁধা। নদী দূষিত হলে মাছ কমে। মাছ কমলে ছোট শিকারি প্রাণী কমে। তার প্রভাব গিয়ে পড়ে বাঘের খাদ্যে।

উল্টো দিক থেকে দেখলে, বাঘ বাঁচাতে নদী-খাঁড়ি দূষণমুক্ত রাখার যে চেষ্টা হয়, তার সুফল পায় মিঠাপানির মাছ, কাঁকড়া, চিংড়ির পোনা এবং লাখো মানুষের জীবিকা যারা এই জলের ওপর নির্ভরশীল।

আবার জলবায়ুর প্রসঙ্গটাও এড়ানো যায় না এখানে। সুন্দরবনের মতো ম্যানগ্রোভ বন কার্বন ধরে রাখার ক্ষমতায় সাধারণ স্থলজ বনের চেয়ে বহুগুণ এগিয়ে। মাটির নিচে জমে থাকা শিকড় আর জৈব পদার্থে দীর্ঘদিন আটকে থাকে কার্বন।

সুন্দরবনের মতো ম্যানগ্রোভ বন কার্বন ধরে রাখার ক্ষমতায় সাধারণ স্থলজ বনের চেয়ে বহুগুণ এগিয়ে

ব্লু কার্বন—জলাভূমি ও উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্রে জমে থাকা এই কার্বন—তার একটা বড় অংশ লুকানো এই ম্যানগ্রোভের কাদামাটিতে, যা সাধারণ বনভূমির মাটির তুলনায় অনেক বেশি সময় সংরক্ষিত থাকে। বাঘের বাসস্থান রক্ষা মানে পরোক্ষভাবে এই কার্বন-ভাণ্ডার অক্ষত রাখা। একটা পায়ের ছাপ, একরকম জলবায়ু সুরক্ষার দলিলও।

শুধু বাঘকেই কেন বেছে নেওয়া, কোনো পাখি বা ছোট প্রাণী নয় কেন? এর উত্তর লুকিয়ে আছে বাস্তুতন্ত্রে বাঘের অবস্থানে। খাদ্যশৃঙ্খলের শীর্ষে থাকা এই প্রাণীকে বলা হয় অ্যাপেক্স প্রিডেটর। শীর্ষ শিকারি হিসেবে সংখ্যায় স্বল্প, আর তার টিকে থাকা নির্ভর করে নিচের প্রতিটি স্তরের সুস্থতার ওপর। একটা বাঘ বাঁচিয়ে রাখতে হাজার হাজার হরিণ, লাখো কীটপতঙ্গ, অগণিত উদ্ভিদ প্রজাতির সুস্থ থাকতে হয়।

যেভাবে বাঘ গোনা হয়
সুন্দরবনের মতো ম্যানগ্রোভ বন কার্বন ধরে রাখার ক্ষমতায় সাধারণ স্থলজ বনের চেয়ে বহুগুণ এগিয়ে। মাটির নিচে জমে থাকা শিকড় আর জৈব পদার্থে দীর্ঘদিন আটকে থাকে কার্বন।

বাঘ শিকারি সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করে বলেই তৃণভোজীর সংখ্যা একটা ভারসাম্যে থাকে। এই দিকটা প্রায়ই আলোচনার বাইরে থেকে যায়। হরিণের সংখ্যা অনিয়ন্ত্রিতভাবে বাড়লে বনের গাছপালা, ঘাসজমি দ্রুত ক্ষয়প্রাপ্ত হয়, মাটির ক্ষয়ও বাড়ে। ট্রফিক ক্যাসকেড বলা হয় একে। একটা প্রজাতির উপস্থিতি বা অনুপস্থিতি ধাপে ধাপে গোটা বাস্তুতন্ত্রের গঠন বদলে দেয়। ইয়েলোস্টোনে নেকড়ে ফিরিয়ে আনার পর নদীর গতিপথ পর্যন্ত বদলেছিল, নেকড়ে থাকায় হরিণেরা নদীর ধারে বেশিক্ষণ থাকার সাহস পায়নি, উইলো ও অ্যাস্পেন গাছ ফিরে এসেছিল, শিকড় পাড় ধরে রেখেছিল ভাঙন থেকে। বাঘের বেলাতেও একই যুক্তি খাটে।

সুন্দরবন উপকূলীয় মানুষের জন্য একটা প্রাকৃতিক দেয়ালও বটে। ঘূর্ণিঝড়ের সময় ম্যানগ্রোভের ঘন শিকড় আর গাছের সারি জলোচ্ছ্বাসের গতি অনেকটাই কমিয়ে দেয়, বাতাসের বেগ ভাঙে, আর এই বনই বাঘের একমাত্র আবাসস্থল। খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাটের উপকূলীয় জনপদ এই সুরক্ষার ওপরই নির্ভরশীল।

বাঘ শিকারি সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করে বলেই তৃণভোজীর সংখ্যা একটা ভারসাম্যে থাকে

বাঘ সংরক্ষণের নামে যে বনভূমি সুরক্ষিত থাকে, সেটাই লাখো উপকূলবাসীর জীবনরক্ষার দেয়াল। বাঘ বাঁচলে বন বাঁচে, বন বাঁচলে মানুষ বাঁচে, নদী বাঁচে, আবহাওয়ার ভারসাম্যও একধরনের সুরক্ষা পায়। এই শৃঙ্খল আলাদা করে দেখার উপায় নেই।

কাদায় হাঁটু ডুবিয়ে যে বনরক্ষী পায়ের ছাপ মাপেন, তিনি হয়তো জানেনও না এই একটা ছাপের পেছনে কতটা জড়িয়ে আছে। নদীর স্বাস্থ্য, কার্বনের হিসাব, উপকূলের নিরাপত্তা, একটা গ্রামের বেঁচে থাকা। মাপার কাজটা তবু চলতে থাকে, প্রতিদিন, একই রকম মনোযোগে।

লেখক: সাবেক শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালযসূত্র: বাংলাদেশ বন অধিদপ্তর: সুন্দরবন বাঘ শুমারি প্রতিবেদন; আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ ইউনিয়ন, বাংলাদেশ; বিশ্ব বন্যপ্রাণী তহবিল; ইয়েলোস্টোন ন্যাশনাল পার্ক সার্ভিসবাঘ পড়েছে বিরাট প্যারায়

Read full story at source