কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থায়ী ক্যাম্পাস হবে তো?

· Prothom Alo

২০২১ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে ‘কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় বিল, ২০২১’ পাস হয় এবং ২২ সেপ্টেম্বর গেজেট প্রকাশিত হয়। এই আইনের মাধ্যমে দেশের অষ্টম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। তার আগে রেল-নৌ, যোগাযোগ ও পরিবেশ উন্নয়ন গণকমিটির দীর্ঘ আন্দোলনের মুখে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ২০১৫ সালের ১৫ অক্টোবরের জনসভায় প্রতিশ্রুতি দিয়ে যান।

২০২১ সালে আরও চারটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিল পাস হয়। হবিগঞ্জ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, চাঁদপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ও বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, জামালপুর। প্রায় সব কটিতেই স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণ শুরু হয়েছে।

Visit sportnewz.click for more information.

সারা দেশের জেলাগুলোয় যখন গড়ে দুটি করে উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠান আছে, সেখানে কুড়িগ্রামে মাত্র একটি। ফলে এটি নিয়ে কুড়িগ্রামবাসীর স্বপ্নের শেষ নেই। এত দিনে শিক্ষক নিয়োগ ছাড়াই ক্লাস চলছে ভাড়া বাড়িতে। এতে শিক্ষার্থীদের পাঠদান ও গবেষণা নামকাওয়াস্তে চলছে।

শুভকামনা কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

দুই.

কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাসের ভূমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়ার ইতিহাসটা এমন:

১. মতবিনিময় সভা (২৭ আগস্ট ২০২২): কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসন একটি গুরুত্বপূর্ণ সভার আয়োজন করে। জেলা প্রশাসকের সভাপতিত্বে সম্মেলনকক্ষে এই সভায় রাজনৈতিক নেতা, প্রতিষ্ঠান প্রধানরা, সুশীল সমাজ, সাংবাদিক, ইউজিসি কমিটির সদস্য এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার উপস্থিত ছিলেন। সভায় কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার টগরাইহাট, দাসেরহাট ও নালিয়ার দোলা—এই তিন স্থান নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। জমির চরিত্র, খাসজমির পরিমাণ, ভবিষ্যতে চাইলে জমি অধিগ্রহণ করা যাবে কি না, পানি, পরিবেশ, ভূমি মন্ত্রণালয়ের মতামত এতে তুলে ধরা হয়।

২. স্থান পরিদর্শন ও সুপারিশ: সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ইউজিসি কমিটি, উপাচার্য, জেলা প্রশাসক ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সরেজমিনে তিনটি স্থান পরিদর্শন করেন এবং স্থানীয় ভূমি অফিস থেকে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করেন। সার্বিক পর্যালোচনার পর কমিটি ‘নালিয়ার দোলা’ নামক স্থানে এক ফসলি ২৫০ একর জমি বরাদ্দের সুপারিশ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পেশ করে।

৩. মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা (২২ নভেম্বর ২০২২): কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসককে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্দেশনা প্রদান করে।

৪. ভূমি প্রতিবেদন (৩১ জানুয়ারি ২০২৩): মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ পেয়ে জেলা প্রশাসক জমির তফসিল, স্কেচ ম্যাপ এবং আনুমানিক মূল্যমানসহ একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করেন।

কুড়িগ্রামবাসীর দাবি, নতুন জায়গা খুঁজতে গেলে আবার চার বছর পেছনে যেতে হবে। আর বর্তমান জায়গাটির সঙ্গে নতুন জায়গাগুলোর দূরত্ব দুই-চার কিলোমিটারের মধ্যেই। স্বভাবতই প্রশ্ন আসে, নতুন করে স্থায়ী ক্যাম্পাসের জন্য জায়গা নির্বাচনের দাবি উঠলে বাকি তিন আসনের সংসদ সদস্যরাও পিছিয়ে থাকবেন না।

৫. অধিগ্রহণের আবেদন (২ মার্চ ২০২৩): প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণের লক্ষ্যে বাঞ্চারাম ও সরা মৌজায় ২৫০ একর ভূমি অধিগ্রহণের প্রশাসনিক অনুমোদন চেয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে আনুষ্ঠানিক পত্র প্রেরণ করে।

৬. চূড়ান্ত অনুমোদন (৫ এপ্রিল ২০২৩): বিশ্ববিদ্যালয়ের আবেদনের প্রেক্ষিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ২৫০ একর ভূমি অধিগ্রহণের প্রশাসনিক অনুমোদন প্রদান করে, যা এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ার সফল পরিসমাপ্তি।

কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৩.১১.২০২২ তারিখের এবং সহকারী কমিশনার (ভূমি) কুড়িগ্রাম সদরের ১১.০১.২০২৩ ইং তারিখের পত্রের সূত্র মোতাবেক জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইদুল আরিফ স্বাক্ষরিত একটি পত্র, যার স্মারক নং-৩১.৪৭.৪২০০.০০৬.২২.০৫০.২২-১৮৩ তারিখের মাধ্যমে অধিকৃত ২১০ জন জমির মালিকের ৭৫ পৃষ্ঠার একটি তালিকা চূড়ান্ত করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করা হয়। ভূমি মন্ত্রণালয়, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়, পরিবেশ মন্ত্রণালয়সহ আরও কয়েকটি অধিদপ্তরের ছাড়পত্র সাপেক্ষে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মোহাম্মদ মাহমুদুল আলম ৫.৪.২০২৩ খ্রি. তারিখে চূড়ান্ত অনুমোদন করেন। এত সব পর্ব শেষে কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ২৫০ একর জমি অধিগ্রহণের পুরো প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।

নালিয়ার বিলের তিন সীমানায় রাজারহাট, উলিপুর ও কুড়িগ্রাম। নদী পার হলেই রৌমারী উপজেলা কাভার করে। তা ছাড়া নদীকেন্দ্রিক গবেষণা, মৎস্য, চরভিত্তিক কৃষি গবাদিপশু নিয়ে কাজের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ। ৭৫ একর খাসজমি ছাড়াও বাকি জমির দাম অনেক কম হবে। ব্যয়সাশ্রয়ী। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়হীন গাইবান্ধা জেলা আওতায় আসবে।

তিন.

সম্প্রতি ত্রাণ ও দুর্যোগ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আসাদুল হাবীব দুলু কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণের জন্য নতুন করে দুটি জায়গা পরিদর্শন করেছেন। একটি ছিনাইয়ের ৬ একর জায়গাবিশিষ্ট এলজিইডির একটি পার্ক ও আড়াই শ একর জায়গা অধিগ্রহণ করতে গেলে তিন ফসলি জমিসহ তিন শতাধিক বাড়ি উচ্ছেদ করতে হবে। এবং ধরলার নদীর পূর্বপাড়ে আরেকটি জায়গা যেটিতে ভুটানের ইপিজেড হওয়ার কথা। সম্প্রতি দাশেরহাটে একটি জায়গা পরিদর্শনে আসছে ইউজিসির একটি টিম।

২০২৩ সালেই যেখানে অবকাঠামোর জায়গা নির্ধারণ করা হয়েছে, জমি অধিগ্রহণের চিঠিও দেওয়া হয়েছে, ক্যাম্পাসের ম্যাপও হয়েছে। সেখানে মাননীয় মন্ত্রী নতুন দুটি জায়গাই–বা পরিদর্শন করলেন কেন? আর সদরের সংসদ সদস্য আতিক মুজাহিদই–বা কেন বললেন, দুই–তিনটা জায়গা সিলেক্ট হয়েছে, কোনোভাবেই কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়কে লালমনিরহাটে হতে দেওয়া হবে না?

অথচ সংসদ সদস্য জানেন, নালিয়ার দোলাতেই স্থান নির্বাচন করা হয়েছে। এতে কুড়িগ্রামবাসীরা মনে করছেন, সংসদ সদস্যও কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম পিছিয়ে দিতে চায়।

কুড়িগ্রামবাসীর দাবি, নতুন জায়গা খুঁজতে গেলে আবার চার বছর পেছনে যেতে হবে। আর বর্তমান জায়গাটির সঙ্গে নতুন জায়গাগুলোর দূরত্ব দুই-চার কিলোমিটারের মধ্যেই। স্বভাবতই প্রশ্ন আসে, নতুন করে স্থায়ী ক্যাম্পাসের জন্য জায়গা নির্বাচনের দাবি উঠলে বাকি তিন আসনের সংসদ সদস্যরাও পিছিয়ে থাকবেন না।

২০২২ সালে জমি অধিগ্রহণ শুরু হয়েছে, ২০২৩ সালে জায়গা নির্ধারণ করা হয়েছে আর এখন ২০২৬ সাল, ভবন নির্মাণ শুরুই হয়নি। চার বছর পেছনের কাজ আবার শুরু করলে ২০২৯ সালে নতুন সরকার এসে সিদ্ধান্ত নেবে।

  • নাহিদ হাসান লেখক ও সংগঠক

    ই–মেইল: [email protected]

    মতামত লেখকের নিজস্ব

Read full story at source