তিস্তার ভাঙন: ‘ওইটা মোর ভিটা না, মোর কলিজা ভাঙছে’
· Prothom Alo
৩৫ বছরের সংসারে অন্তত ১০ বার তিস্তা নদীতে বৃদ্ধ সুলতানা বেগমের বসতভিটা বিলীন হয়েছে। সর্বশেষ ১০ বছর আগে কাচারীপাড়ায় ঠাঁই নেন। সেখানেও তিস্তার ভাঙনে আবাদি জমিসহ ভিটামাটি হারিয়েছেন তিনি। এখন কোথায় যাবেন, কী করবেন—এই দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে সুলতানা বেগমের।
তিস্তার ভাঙনে বসতভিটা হারিয়ে এভাবেই বুধবার দুপুরে কথাগুলো বলতে বলতেই হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন সুলতানা বেগম। তাঁর চোখের সামনে মুহূর্তেই তিস্তায় তলিয়ে যায় শেষ আশ্রয়টুকুও। যে ভিটায় নতুন করে বেঁচে থাকার স্বপ্ন গড়েছিলেন, সেটিও আর রইল না।
Visit bettingx.club for more information.
সুলতানা বেগমের বাড়ি রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার নোহালী ইউনিয়নের কাচারীপাড়া গ্রামে। গত ছয় দিনের ভাঙনে তাঁর মতো ওই গ্রামের আটটি বাড়ি নদীতে বিলীন হয়েছে। শতাধিক বাড়ি এখন ভাঙনের ঝুঁকিতে। সুলতানা বেগম বলেন, ‘দশভাঙা দিচু। ৪০ বিঘা মাটি গেইছে। এটে ১০ বছর থাকি খড়কুটা জোগানু, কষ্ট করিয়া বাড়িকোনা বানানু। তাক ভাঙি নদীত গেইছে। আমার জীবন নাই রে ময়না, অসহায় হইনো রে... অ্যালা কোটে যাইম, কি করিম রে।’
বুধবার দুপুরে সরেজমিনে কাচারীপাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, তিস্তার স্রোতে নদীতীরের বিশাল অংশ ধসে পড়ছে। কোথাও বাড়ির উঠান নেই, কোথাও ঘরের বারান্দা ঝুলছে নদীর ওপর। কেউ ঘরের টিন খুলে নিচ্ছেন, কেউ ইট-কাঠ সরিয়ে নিরাপদ জায়গায় রাখার চেষ্টা করছেন। অনেক পরিবার গৃহস্থালির মালামাল নিয়ে খোলা আকাশের নিচে বসে আছে।
তিস্তার স্রোতে নদীতীরের বিশাল অংশ ধসে পড়ছে। কোথাও বাড়ির উঠান নেই, কোথাও ঘরের বারান্দা ঝুলছে নদীর ওপর। কেউ ঘরের টিন খুলে নিচ্ছেন, কেউ ইট-কাঠ সরিয়ে নিরাপদ জায়গায় রাখার চেষ্টা করছেন।
২০০৮ সালে প্রায় ১৪ লাখ টাকা খরচ করে ৯ কক্ষের একটি পাকা বাড়ি করেছিলেন মোতালেব মিয়া। তিন ছেলেকে নিয়ে সেখানেই ছিল তাঁর সংসার। এখন সেই বাড়ির কোনো অস্তিত্ব নেই। নদীগর্ভে বিলীন হওয়া ভিটার শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে একবার স্রোতের দিকে, আরেকবার ভাঙনের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে ছিলেন তিনি। হঠাৎ আঙুল তুলে মোতালেব মিয়া বললেন, ‘ওই যে ধপাস করি মাটি ভাঙছে, ওইটা মোর ভিটা না, মোর কলিজা ভাঙছে। শেষ বয়সেও তিস্তা মুক্তি দিল না। ভাঙতে ভাঙতে জীবনটাই কাড়ি নেওছে। এর কি কোনো প্রতিকার নাই?’
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নদীর পানি বাড়ার সময় বন্যার আশঙ্কা ছিল। এখন পানি কমতে শুরু করলেও ভাঙন আরও তীব্র হয়েছে। বর্তমানে তিস্তার পানি বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হলেও তীব্র স্রোতের কারণে নদীতীর দ্রুত ভেঙে পড়ছে। এতে ওই এলাকার লেবু মিয়া, আনোয়ার হোসেন, মোতালেব মিয়া, শাহজাহান, সুরুজসহ আটজনের বসতভিটা নদীতে বিলীন হয়েছে। প্রতিদিনই নতুন নতুন এলাকা ভাঙছে।
২৩ বিঘা আবাদি জমি, পুকুর, বসতভিটা হারিয়ে এখন দিশাহারা হয়ে পড়েছেন লেবু মিয়া। আক্ষেপ করে তিনি বলেন, ‘বালুর বাঁধ ভাঙার পর আর বাঁধ হয়নি। তখন থাকি নদী ভাঙতে ভাঙতে গ্রামোত আসছে। এখন ঘরবাড়ি বিলীন হয়া গেল। বাড়িঘর ভাঙ্গি এখন কোথায় যাব, কী করব? এটার কোনো নিশ্চয়তা ওপর আল্লাহ ছাড়া কেউ দিতে পারবে না। জমিজমা, বাড়ি-ভিটা ও সঞ্চয় করি সউগ এখন নদীতে।’
আরেক ভুক্তভোগী শাহজাহান বলেন, ভিটেমাটি হারিয়ে তাঁরা অসহায়। এখন কোথায় থাকবেন, জানেন না। সরকার যদি দ্রুত সাহায্যের হাত না বাড়ায়, তাহলে পরিবার নিয়ে পথে বসতে হবে। পুরো গ্রাম নদীতে বিলীন হয়ে যাবে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন ঠেকাতে হবে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসন এবং স্থায়ী নদীশাসন প্রকল্প বাস্তবায়ন না হলে কাচারীপাড়ার আরও অনেক বসতবাড়ি, কৃষিজমি ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা তিস্তায় বিলীন হয়ে যাবে।
তিস্তায় বিলীন বসতঘরের কাছে বিলাপ করছেন সুলতানা বেগম। বুধবার দুপুরে রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার কাচারীপাড়া এলাকায়নোহালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আশরাফ আলী বলেন, ভাঙনের পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ইতিমধ্যে আটটি বসতবাড়ি ও কৃষিজমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। বিষয়টি উপজেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডকে জানানো হয়েছে। জরুরি ভিত্তিতে ভাঙন রোধে ব্যবস্থা নেওয়া না হলে আরও বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জেসমিন আক্তার বলেন, ‘ভাঙনের বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছি। আমার প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা গিয়ে তালিকা করেছেন। টিন নেই; শুকনো খাবার দেওয়া হবে। ঝুঁকিপূর্ণ বাড়ি, স্কুল ভাঙনের হাত থেকে যাতে রোধ করতে পারি, এ জন্য আমরা পানি উন্নয়ন বোর্ডকে চিঠি লিখেছি।’
জানতে চাইলে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম বলেন, ‘ভাঙনের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। আমরা এলাকা পরিদর্শন করেছি। গতকাল ২০০ বস্তা জিও ব্যাগ দেওয়া হয়েছে। ওই এলাকায় মোট ৪০০ জিও ব্যাগ দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেছি।’