শার্লক হোমসকে অপহরণ! এনোলা কি পারলেন ভাইকে বাঁচাতে
· Prothom Alo

নেটফ্লিক্স যখন ২০২০ সালে ‘এনোলা হোমস’ মুক্তি দেয়, তখন অনেকেই ভেবেছিলেন, এটি হয়তো শার্লক হোমসের জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে বানানো আরেকটি স্পিন-অফ সিনেমা। কিন্তু সিনেমাটি দ্রুতই সে ধারণাকে ভুল প্রমাণ করে। ন্যান্সি স্প্রিঙ্গারের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত ছবিটির প্রাণভোমরা শার্লকের ছোট বোন এনোলা। মুক্তির পর দর্শক-সমালোচকের প্রশংসা পায়; স্বতন্ত্র চরিত্র হিসেবে গড়ে ওঠে এনোলা হোমস। এটি এমন এক কিশোরীর গল্প, যার বুদ্ধিমত্তা, সাহস, রসবোধ ও স্বাধীনচেতা ব্যক্তিত্ব তাকে দর্শকের কাছে খুব দ্রুত জনপ্রিয় করে তোলে।
একনজরেসিনেমা: ‘এনোলা হোমস ৩’ধরন: রহস্য, অ্যাডভেঞ্চার, ক্রাইম, ড্রামাপরিচালনা: ফিলিপ বারান্তিনিস্ট্রিমিং প্লাটফর্ম: নেটফ্লিক্সদৈর্ঘ্য: ১ ঘণ্টা ৪৫ মিনিটঅভিনয়ে: মিলি ববি ব্রাউন, হেনরি ক্যাভিল, লুই পারট্রিজ, হিমেশ প্যাটেল, হেলেনা বোনহ্যাম কার্টার, শ্যারন ডানকান-ব্রুস্টার
প্রথম দুই কিস্তির সাফল্যের পর ১ জুলাই নেটফ্লিক্সে মুক্তি পেয়েছে এই ফ্র্যাঞ্চাইজির তৃতীয় সিনেমা ‘এনোলা হোমস ৩’। মুক্তির প্রথম পাঁচ দিনেই ছবিটি প্রায় দুই কোটি ভিউ অর্জন করে নেটফ্লিক্সের গ্লোবাল টপ চার্টের শীর্ষে উঠে আসে। মুক্তির দুই সপ্তাহ পরও সিনেমাটি নেটফ্লিক্সের টপ চার্টের শীর্ষে রয়েছে। বাংলাদেশের দর্শকেরাও হুমড়ি খেয়ে দেখছেন সিনেমাটি; রয়েছে প্ল্যাটফর্মটির শীর্ষ পাঁচেই।
Visit grenadier.co.za for more information.
সিনেমার শুরুতেই দেখা যায় এনোলা হোমস (মিলি ববি ব্রাউন) জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের সামনে দাঁড়িয়ে। সে বিয়ে করতে যাচ্ছে লর্ড টুক্সব্রিকে (লুই পারট্রিজ)। কিন্তু বিয়ের আগেই তার মনে প্রশ্ন জাগে, বিয়ে কি তার পরিচয় বদলে দেবে? এত দিন যে ‘এনোলা হোমস’ পরিচয় গড়ে তুলতে সে লড়াই করেছে, তা কি এখন অন্য কারও পদবির আড়ালে হারিয়ে যাবে?
এই ব্যক্তিগত সংকটের মধ্যেই আসে আরেকটি বড় ধাক্কা। রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হয়ে যান শার্লক হোমস (হেনরি ক্যাভিল)। বিয়ের অনুষ্ঠান ছেড়ে ভাইকে খুঁজে বের করার সিদ্ধান্ত নেয় এনোলা। পথে তার সঙ্গী হয় ড. জন ওয়াটসন (হিমেশ প্যাটেল) আর পরে যোগ দেন এনোলার মা ইউডোরিয়া হোমস (হেলেনা বোনহ্যাম কার্টার)। তবে তদন্ত যত এগোতে থাকে, ততই স্পষ্ট হয় যে এটি কেবল একজনের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা নয়। বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পুরোনো শত্রুতা, গোপন ষড়যন্ত্র, রাজনৈতিক স্বার্থ এবং ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অন্ধকার ইতিহাস। এনোলা কি পারে রহস্য ভেদ করে তাঁর ভাইকে মুক্ত করতে? এ সিনেমায় এ গল্পই দেখানো হয়েছে।
শার্লক হোমস ফিরলেন, পুরোনো জাদু ফিরল কিপ্রথম সিনেমায় আমরা দেখি বিখ্যাত গোয়েন্দা শার্লক হোমসের ছায়া থেকে বেরিয়ে এসে এনোলার নিজের পরিচয় গড়ে তোলার গল্প। দ্বিতীয় সিনেমায় সে নিজের ডিটেকটিভ এজেন্সি গড়ে তুলে একজন স্বনির্ভর গোয়েন্দা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। তাই ‘এনোলা হোমস ৩’-এর সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল রহস্যকে আরও বড় করে দেখানো নয়, বরং এনোলার চরিত্রকে আরও পরিণতভাবে উপস্থাপন করা। পরিচালক ফিলিপ বারান্তিনি সে পথেই হাঁটার চেষ্টা করেছেন। তাই ‘এনোলা হোমস ৩’ শুধু নতুন একটি রহস্য নয়, বরং এনোলার ব্যক্তিগত বিকাশের গল্পও বলতে চায়। যদিও সে প্রচেষ্টা সব সময় সমানভাবে সফল হয়নি।
‘এনোলা হোমস ৩’–এর দৃশ্য। আইএমডিবিতবে এনোলা হোমস হিসেবে মিলি ববি ব্রাউন আবারও প্রমাণ করেছেন যে তিনিই সেরা। প্রথম ছবির কৌতূহলী কিশোরী থেকে তৃতীয় ছবির আত্মবিশ্বাসী ও পরিণত গোয়েন্দা—এ দীর্ঘ যাত্রার পরিবর্তন তিনি অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে দর্শকের সঙ্গে সরাসরি কথা বলার পরিচিত ভঙ্গিটিও এবার শুধু হাস্যরসের জন্য নয়, বরং চরিত্রটির ভেতরের দ্বন্দ্ব ও আবেগ প্রকাশের মাধ্যম হয়ে উঠেছে।
শার্লক হোমস (হেনরি ক্যাভিল) বরাবরের মতোই ক্যারিশম্যাটিক হলেও এবার তার উপস্থিতি ছিল নামমাত্র। প্রথম দুটি ছবিতে ভাই-বোনের রসায়ন সিরিজটির অন্যতম বড় সম্পদ ছিল। তাই এ পর্বে সেটার অনুপস্থিতি বেশ ভালোভাবেই টের পাওয়া যায়। অন্যদিকে লর্ড টুক্সব্রি চরিত্রে লুই পারট্রিজ আগের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠলেও চরিত্রটির সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো হয়নি। ইউডোরিয়া হোমস (হেলেনা বোনহ্যাম কার্টার) পর্দায় এলেই ছবিতে যেন প্রাণ ফিরে আসে। এবারও তাঁর ব্যতিক্রম হয়নি। এবারে চমক হিসেবে বেশ গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে দেখা গেছে ড. ওয়াটসনকে (হিমেশ প্যাটেল)। তিনি তদন্তের অগ্রগতিতে কার্যকর সঙ্গী হয়ে ওঠেন। মরিয়ার্টির (শ্যারন ডানকান-ব্রুস্টার) উপস্থিতি যথেষ্ট দৃঢ় হলেও চিত্রনাট্যের সীমাবদ্ধতায় চরিত্রটির গভীরতা পুরোপুরি বিকশিত হয় না।
পরিচালক ফিলিপ বারান্তিনি ছবিটিকে আগের তুলনায় একটু গভীরভাবে উপস্থাপন করতে চেয়েছেন। মাল্টার মনোরম লোকেশন, ভিক্টোরিয়ান যুগের সেট ডিজাইন ও পোশাক পরিকল্পনা ছবিটির অন্যতম বড় সম্পদ। সিনেমাটোগ্রাফি ও প্রোডাকশন ডিজাইন পুরো পরিবেশকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে। যদিও মাঝেমধ্যে অতিরিক্ত ফ্ল্যাশব্যাক কিছুটা অপ্রয়োজনীয় মনে হয়।
‘এনোলা হোমস ৩’–এর পোস্টার। আইএমডিবিতবে ছবির সবচেয়ে দুর্বল দিক হলো রহস্য নির্মাণ। ‘শার্লক হোমস’ জগতের গল্পে দর্শক যেখানে সূক্ষ্ম সূত্র আর চমকে ভরা তদন্তের প্রত্যাশা করেন, সেখানে এ ছবি রহস্যের চেয়ে অ্যাডভেঞ্চারকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। একদিকে জটিল ষড়যন্ত্রের আভাস দেওয়া হলেও অন্যদিকে গুরুত্বপূর্ণ সূত্রগুলো এত সহজে সামনে আসে যে দর্শকের নিজের মতো করে ধাঁধা মেলানোর সুযোগ কমে যায়। ফলে রহস্যের সমাধান সন্তোষজনক হলেও, সেটি প্রত্যাশিত বুদ্ধিবৃত্তিক তৃপ্তি এনে দিতে পারে না। এমনকি মরিয়ার্টিকে ঘিরেও যে মানসিক টানাপোড়েন বা বুদ্ধির লড়াই প্রত্যাশিত ছিল, সেটিও পুরোপুরি বিকশিত হয় না।
অ্যাকশন দৃশ্যগুলো মন্দ নয়, তবে মনে রাখার মতোও নয়। ক্লাইম্যাক্সে নাটকীয়তা থাকলেও রহস্যের সমাধান প্রত্যাশিত মাত্রার উত্তেজনা তৈরি করতে পারে না। তবু ছবির সাবলীল গতি ও চরিত্রগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক গল্পকে এগিয়ে নিয়ে যায়।
‘এনোলা হোমস ৩’–এর দৃশ্য। আইএমডিবিপ্রথম দুটি ছবির পরিচালক হ্যারি ব্র্যাডবিয়ারের জায়গায় এবার এসেছেন ‘অ্যাডোলেসেন্স’-এর নির্মাতা ফিলিপ বারান্তিনি। তাঁর পরিচালনায় ছবিতে এসেছে আরও পরিণত ভিজ্যুয়াল ভাষা। দীর্ঘ শট, সাবলীল ক্যামেরা মুভমেন্ট আর দ্রুত সম্পাদনা ছবিটিকে আগের মতোই প্রাণবন্ত রেখেছে। দৃশ্য থেকে দৃশ্যে গল্প এগোয় ধাঁধার টুকরা জোড়া লাগানোর মতো করে। তিনি আগের ছবিগুলোর হালকা, প্রাণখোলা মেজাজও অক্ষুণ্ন রেখেছেন। ফলে এটি একদিকে তরুণদের জন্য রোমাঞ্চকর অভিযান, অন্যদিকে প্রাপ্তবয়স্ক দর্শকের জন্যও আবেগময় এক যাত্রা।
কিন্তু ছবির সবচেয়ে বড় সমস্যা গল্পের কেন্দ্রীয় রহস্য। শার্লকের মতো অভিজ্ঞ গোয়েন্দার এত সহজে অপহৃত হওয়া পুরোপুরি বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় না। আবার রহস্যের সমাধানও খুব বেশি চমক সৃষ্টি করতে পারে না।
‘এনোলা হোমস ৩’ প্রথম দুটি ছবির জাদু পুরোপুরি ফিরিয়ে আনতে পারেনি কিন্তু পারিবারিক রহস্য-অ্যাডভেঞ্চার হিসেবে বেশ উপভোগ্য। যাঁরা এ ফ্র্যাঞ্চাইজির ভক্ত, তাঁরা পরিচিত চরিত্রগুলোর নতুন অভিযানে হতাশ হবেন না। তবে যাঁরা আরও জটিল রহস্য বা শক্তিশালী গোয়েন্দা গল্প চান, তাঁদের কাছে কিছুটা ম্লান লাগতে পারে।
‘এনোলা হোমস ৩’–এর দৃশ্য। আইএমডিবি