নিউক্লিয়ার ফিউশন জ্বালানি তৈরির সহায়ক উপাদান শনাক্ত করল কোয়ান্টাম কম্পিউটার
· Prothom Alo

মহাবিশ্বের নক্ষত্র কোটি কোটি বছর ধরে যে প্রক্রিয়ায় আলো আর শক্তি উৎপাদন করে চলেছে, তার নাম নিউক্লিয়ার ফিউশন। সৃষ্টির সেই আদি রহস্যকে পৃথিবীর বুকে বন্দী করে অফুরন্ত শক্তির উৎস বানানোর চেষ্টা করছেন বিজ্ঞানীরা। এবার সেই মহাজাগতিক শক্তির চাবিকাঠি বা ফিউশন জ্বালানি শনাক্তের ক্ষেত্রে এক অভাবনীয় মাইলফলক স্পর্শ করেছে কোয়ান্টাম কম্পিউটার।
Visit chickenroadslot.pro for more information.
নিউক্লিয়ার ফিউশনপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে শক্তি উৎপাদনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হলো জ্বালানির অভাব। এবার ইতিহাসের প্রথমবারের মতো কোয়ান্টামকেন্দ্রিক সুপারকম্পিউটার ব্যবহার করে ফিউশন জ্বালানি তৈরির সহায়ক উপাদানের ৯টি আণবিক বিন্যাস বা কনফিগারেশন শনাক্ত করা হয়েছে। এই যুগান্তকারী সাফল্য পদার্থবিদ্যার অন্যতম বড় প্রতিবন্ধকতা দূর করতে সাহায্য করবে। অধিকাংশ প্রস্তাবিত ফিউশন রিঅ্যাক্টর (ডোনাট আকৃতির টোকামাক রিঅ্যাক্টর) মূলত ট্রিটিয়াম ও ডিউটেরিয়ামের ফিউশন বা মিলনের মাধ্যমে চলে। দুটিই হাইড্রোজেনের আইসোটোপ, তবে ট্রিটিয়াম তেজস্ক্রিয় এবং ডিউটেরিয়াম একটি স্থিতিশীল উপাদান। এ দুই আইসোটোপের মধ্যকার ফিউশন বিক্রিয়ায় একটি হিলিয়াম নিউক্লিয়াস, একটি মুক্ত নিউট্রন এবং ১৭.৬ মেগা ইলেকট্রন ভোল্ট শক্তি উৎপন্ন হয়। ফিউশন বিক্রিয়ার ক্ষেত্রে এই নির্দিষ্ট সংমিশ্রণটি খুব উচ্চ বিক্রিয়া হার এবং প্রচুর শক্তি উৎপাদন করে।
দুর্ভাগ্যবশত পৃথিবীতে ট্রিটিয়ামের অস্তিত্ব নেই বললেই চলে। প্রাকৃতিকভাবে এটি কেবল বায়ুমণ্ডলে পাওয়া গেলেও কসমিক রে বা মহাজাগতিক রশ্মির মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে খুব সামান্য পরিমাণে তৈরি হয়। তবে বিজ্ঞানীরা যদি কৃত্রিমভাবে ট্রিটিয়াম উৎপাদনের একটি কার্যকর উপায় খুঁজে পান, তবে ফিউশন শক্তি একটি বাস্তব ও নির্ভরযোগ্য উৎসে পরিণত হতে পারে। ফিউশন শক্তির সমর্থকেরা একে একটি পরিবেশবান্ধব শক্তির উৎস বলেন। কারণ, এটি জীবাশ্ম জ্বালানির মতো গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন করে না এবং প্রচলিত নিউক্লিয়ার ফিশন বিক্রিয়ার তুলনায় অনেক কম তেজস্ক্রিয় বর্জ্য তৈরি করে। তবে প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে ফিউশন শক্তি এত দিন কেবল গবেষণাগারের ভেতরেই সীমাবদ্ধ ছিল।
২০২২ সালের শেষের দিকে যুক্তরাষ্ট্রের লরেন্স লিভারমোর ন্যাশনাল ল্যাবরেটরির বিজ্ঞানীরা ফিউশন বিক্রিয়ায় প্রথমবারের মতো সাফল্য পেয়েছিলেন। সে সময় বিক্রিয়া শুরু করতে যে পরিমাণ শক্তির প্রয়োজন হয়েছিল, বিক্রিয়া শেষে তার চেয়ে বেশি শক্তি উৎপাদন করেছিলেন তাঁরা। সম্প্রতি ফিউশন বিক্রিয়ার জন্য প্রয়োজনীয় উত্তপ্ত প্লাজমা ১ হাজার ৩৩৭ সেকেন্ড ধরে রাখার নতুন রেকর্ড তৈরি হয়েছে। ফিউশন শক্তির বাস্তবায়নে বিজ্ঞানীদের এখন প্রধান কাজ ট্রিটিয়ামের সংকট সমাধান করা। এই লক্ষ্যে ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিক, ওক রিজ ন্যাশনাল ল্যাবরেটরি, আইবিএম টি জে ওয়াটসন রিসার্চ সেন্টার ও মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটির গবেষকেরা যৌথভাবে সুপারকম্পিউটারের সাহায্য নিয়েছেন।
ওক রিজ ন্যাশনাল ল্যাবরেটরির কম্পিউটেশনাল কেমিস্ট টম বেক জানান, ফিউশন রিঅ্যাক্টরের জ্বালানি হিসেবে পর্যাপ্ত ট্রিটিয়াম উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় পদ্ধতি আবিষ্কার এবং নকশার চক্রকে ত্বরান্বিত করতে কোয়ান্টাম কম্পিউটার প্রধান হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছে। এই শক্তিশালী কম্পিউটারগুলো এফএলআইবিই নামের একটি তরল লবণের ৯টি ভিন্ন আণবিক বিন্যাস বের করেছে। এই লবণ লিথিয়াম ফ্লোরাইড ও বেরিলিয়াম ফ্লোরাইডের মিশ্রণে তৈরি। ট্রিটিয়াম উৎপাদনের জন্য এফএলআইবিই খুবই কার্যকর। ফিউশন রিঅ্যাক্টরের ভেতরে এটি একটি উৎপাদনকারী স্তর তৈরি করে, যেখানে চরম উচ্চ তাপমাত্রায় ট্রিটিয়াম গঠন হয়।
বর্তমানে সুপারকম্পিউটারগুলো কেবল ভার্চ্যুয়াল সিমুলেশন বা কৃত্রিম পরীক্ষা সম্পন্ন করেছে। এই বিন্যাসগুলো এখন গবেষণাগারে পরীক্ষা করতে হবে। তবে এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গবেষকেরা এফএলআইবিইর ইলেকট্রনিক গঠন, পারমাণবিক আচরণ এবং প্রতিটি বিন্যাস থেকে তৈরি হতে যাওয়া ট্রিটিয়ামের ভেতরের আণবিক বন্ধনের শক্তি সম্পর্কে একটি নিখুঁত ধারণা পেয়েছেন। এর ফলে ফিউশন বিজ্ঞানীরা বাস্তবে পরীক্ষা করার আগেই বুঝতে পারবেন কোন বিন্যাসগুলো নিয়ে কাজ করা সুবিধাজনক হবে।
আইবিএমের এক্সপেরিমেন্টাল কোয়ান্টাম কম্পিউটিং বিজ্ঞানী জেরি চো জানিয়েছেন, এই ফলাফল প্রমাণ করে, কোয়ান্টামকেন্দ্রিক সুপারকম্পিউটিং এখন রসায়নবিদ, প্রকৌশলী ও বিজ্ঞানীদের দীর্ঘদিনের চ্যালেঞ্জিং সমস্যাগুলো সমাধানের হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। কোয়ান্টাম কম্পিউটারের সক্ষমতা যত বাড়বে, সামনের পথ তত বেশি সম্ভাবনাময় হবে।
সূত্র: সায়েন্স অ্যালার্ট