৭ জেলায় পানিবন্দী লাখো পরিবার, মৃত্যু বেড়ে ৫১
· Prothom Alo

‘চোখত ঘুম নাই, পেডত ভাত নাই। বইন্যার পানি হত্তে নামিব, ন জানি। এরহম দুর্দশাত ক্যানে পইড়লাম। আরেক্কান ঘর তুলিবার টিঁয়াও নাই।’
চট্টগ্রামের স্থানীয় ভাষায় কথাগুলো বলছিলেন শেলী আক্তার। তাঁর বাড়ি চট্টগ্রামের বাঁশখালীর বাহারছড়া ইউনিয়নে। শেলী আক্তারের মাটির ঘরের মেঝে এখনো পানির নিচে। পাঁচ দিন ধরে ঠিকমতো ঘুম হয়নি। ছয় সন্তান নিয়ে প্লাস্টিকের ঝুড়ি ও কাঠের তক্তা জোড়া দিয়ে ঘরের ভেতর কোনোমতে উঁচু একটি মাচা বানিয়ে সেখানে দিন কাটাচ্ছেন তিনি।
Visit esporist.org for more information.
শেলী আক্তারের মতো অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির লাখো মানুষের। চট্টগ্রাম বিভাগের এই পাঁচ জেলা ছাড়াও সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জও এখন বন্যার কবলে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের ১২ জুলাইয়ের প্রতিবেদন বলছে, গতকাল রোববার দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত বন্যাপ্লাবিত হয়েছে এসব জেলার ৫৯টি উপজেলা। বন্যায় পানিবন্দী পরিবার ২ লাখ ৬৭ হাজার ৯১৮টি। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১০ লাখ ২২ হাজার ৯৬৩ জন।
মো. ফারুক, চট্টগ্রামের বাঁশখালীর বাসিন্দা তিলে তিলে গড়া ঘরটা এক রাতেই শেষ হয়ে গেল। এখন আবার নতুন করে কীভাবে শুরু করব, বুঝতে পারছি না।মন্ত্রণালয়ের হিসাবে বন্যা, পাহাড়ি ঢল ও পাহাড়ধসে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫১। শনিবার মৃতের সংখ্যা ছিল ৪৪। এ দুর্যোগে সর্বোচ্চ ২৮ জন
মারা গেছেন কক্সবাজারে। এর বাইরে চট্টগ্রামে ১৩ জন, বান্দরবানে ৬, রাঙামাটিতে ৩ ও মৌলভীবাজারে ১ জনের মৃত্যু হয়েছে।
দেশে মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে চট্টগ্রাম অঞ্চলে ৫ জুলাই থেকে ভারী বর্ষণ শুরু হয়। ৫ জুলাই সকাল ৬টা থেকে গতকাল বেলা তিনটা পর্যন্ত চট্টগ্রামে ১ হাজার ৩৫৪ দশমিক ৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টি হয়েছে ১৫১ দশমিক ৭ মিলিমিটার। আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, আগামী দুই–তিন দিনও ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টি হতে পারে। চট্টগ্রামের পর সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জেও বন্যা শুরু হয়।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী পার্থ প্রতীম বড়ুয়া গতকাল রাতে প্রথম আলোকে বলেন, দেশের দক্ষিণ–পূর্বাঞ্চল অর্থাৎ চট্টগ্রাম অঞ্চলে এক দিনের মধ্যে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে। এ ছাড়া সিলেট বিভাগের নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হবে কি না, তা নির্ভর করছে বৃষ্টি কতটা হয় তার ওপর।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের ১২ জুলাইয়ের প্রতিবেদন বলছে, গতকাল রোববার দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত বন্যাপ্লাবিত হয়েছে এসব জেলার ৫৯টি উপজেলা। বন্যায় পানিবন্দী পরিবার ২ লাখ ৬৭ হাজার ৯১৮টি। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১০ লাখ ২২ হাজার ৯৬৩ জন।
বেশি ক্ষতি চট্টগ্রাম অঞ্চলে
চট্টগ্রাম অঞ্চলে একের পর এক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে; ভেঙেছে সড়ক, বিচ্ছিন্ন হয়েছে যোগাযোগ। কোথাও পানি ধীরে ধীরে নামতে শুরু করেছে। কোথাও নতুন করে বাড়ছে। কোনো এলাকায় মানুষ ঘরে ফিরতে শুরু করলেও নৌকা ছাড়া চলাচলের উপায় নেই। কোথাও ত্রাণ পৌঁছাচ্ছে, কোথাও দুর্গত মানুষের কাছে পৌঁছায়নি সহায়তা।
দক্ষিণ চট্টগ্রামের বিস্তীর্ণ জনপদ এখনো কার্যত অবরুদ্ধ। বাঁশখালী, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া ও চন্দনাইশের বহু গ্রামে কোথাও হাঁটু, কোথাও কোমরপানি নিয়ে মানুষ দিন কাটাচ্ছেন। বিশুদ্ধ পানির উৎস ডুবে থাকায় দেখা দিয়েছে তীব্র সংকট। অনেক এলাকায় রান্না করা যাচ্ছে না। ভেঙে পড়া কাঁচা ঘর, নষ্ট হয়ে যাওয়া ফসল আর গবাদিপশুর ক্ষতি নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন মানুষ।
রেললাইন পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় গত মঙ্গলবার প্রায় এক হাজার যাত্রী নিয়ে চট্টগ্রামে আটকে পড়ে ঢাকা থেকে কক্সবাজারগামী ট্রেনসবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চট্টগ্রাম জেলা। বাঁশখালী, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, চন্দনাইশ, ফটিকছড়ি ও হাটহাজারীর অনেক এলাকায় এখনো ঘরের ভেতরে পানি। কোথাও কোথাও পানি কমলেও স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সুযোগ হয়নি। কাঁচা ঘরের দেয়াল ধসে পড়েছে, নষ্ট হয়েছে খাদ্যশস্য। অধিকাংশ নলকূপ এখনো পানির নিচে থাকায় বিশুদ্ধ খাবার পানির সংকট প্রকট হয়ে উঠেছে।
বাঁশখালীর মো. ফারুকের ৩০ বছরের পুরোনো মাটির ঘরটি মঙ্গলবার রাতেই ধসে পড়ে। স্ত্রী ও একমাত্র ছেলেকে নিয়ে তিনি এখন স্থানীয় আশ্রয়কেন্দ্রে থাকছেন। ফারুক বলেন, ‘তিলে তিলে গড়া ঘরটা এক রাতেই শেষ হয়ে গেল। এখন আবার নতুন করে কীভাবে শুরু করব, বুঝতে পারছি না।’
কক্সবাজারে বন্যার পানি কিছু এলাকায় কমলেও দুর্ভোগ কাটেনি। চকরিয়া, পেকুয়া, মাতামুহুরী, রামু ও সদরের বিস্তীর্ণ এলাকায় পানি রয়েছে। কোথাও বেড়িবাঁধ ভেঙে লোকালয়ে পানি ঢুকছে। মানুষ নৌকায় চলাচল করছেন।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চট্টগ্রাম জেলা। বাঁশখালী, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, চন্দনাইশ, ফটিকছড়ি ও হাটহাজারীর অনেক এলাকায় এখনো ঘরের ভেতরে পানি। কোথাও কোথাও পানি কমলেও স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সুযোগ হয়নি। কাঁচা ঘরের দেয়াল ধসে পড়েছে, নষ্ট হয়েছে খাদ্যশস্য।
তিন পার্বত্য জেলায় ঘরে ফিরছে মানুষ
প্রায় এক সপ্তাহের টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রামের অনেক এলাকা এখন পানিবন্দী। গতকাল দুপুরে সাতকানিয়া উপজেলার হাসান বলীপাড়া গ্রাম এলাকায়তিন পার্বত্য জেলায় পানি ধীরে ধীরে নামতে শুরু করেছে। পানি কমার সঙ্গে স্পষ্ট হয়ে উঠছে দুর্যোগের চিত্র। কোথাও ভেঙেছে গ্রামীণ সড়ক, কোথাও ধসে পড়েছে সেতু। ডুবে গেছে আমন ও আউশের বীজতলা, জুমখেত ও সবজিক্ষেত। আশ্রয়কেন্দ্র থেকে মানুষ ঘরে ফিরতে শুরু করলেও অনেক পরিবার এখনো স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেনি।
তিন জেলার মধ্যে সবচেয়ে নাজুক অবস্থা বান্দরবানের। শনিবার বিকেল থেকে বৃষ্টি কমায় সাঙ্গু নদীর পানি নামতে শুরু করে। তবে জেলা শহরের অধিকাংশ এলাকা এখনো পানির নিচে। বান্দরবান-চট্টগ্রাম ও বান্দরবান-রাঙামাটি সড়কের বিভিন্ন অংশ এখনো পানির নিচে।
রাঙামাটির বাঘাইছড়ি, বিলাইছড়ি, বরকলসহ বিভিন্ন উপজেলার নিম্নাঞ্চল থেকে পানি কমতে শুরু করায় আশ্রয়কেন্দ্র থেকে মানুষ ঘরে ফিরছেন। বাঘাইছড়ির রূপকারী ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ধনেশ্বর চাকমা বলেন, কিছু মানুষ বাড়ি ফিরলেও অধিকাংশ এখনো আশ্রয়কেন্দ্রে।
খাগড়াছড়ির দীঘিনালা-লংগদু সড়কের হেডকোয়ার্টার এলাকা থেকে পানি নেমে যাওয়ায় যান চলাচল স্বাভাবিক হয়েছে। বন্যার পানি কমায় বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্র ছেড়ে মানুষ নিজ নিজ বাড়িতে ফিরছেন।
তিন জেলার মধ্যে সবচেয়ে নাজুক অবস্থা বান্দরবানের। শনিবার বিকেল থেকে বৃষ্টি কমায় সাঙ্গু নদীর পানি নামতে শুরু করে। তবে জেলা শহরের অধিকাংশ এলাকা এখনো পানির নিচে। বান্দরবান-চট্টগ্রাম ও বান্দরবান-রাঙামাটি সড়কের বিভিন্ন অংশ এখনো পানির নিচে।
বন্যা পরিস্থিতি আরও কয়েক জেলায়
হবিগঞ্জে বন্যায় প্রায় সাড়ে ছয় হাজার পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। উঁচু এলাকার পানি কিছুটা কমতে শুরু করলেও নিম্নাঞ্চলে এখনো দুই থেকে আড়াই ফুট পানি। গতকাল সকাল থেকে থেমে থেমে বৃষ্টি হওয়ায় দুর্ভোগ আরও বেড়েছে।
হবিগঞ্জ সদর উপজেলার বনগাঁও গ্রামের সিরাজ মিয়া (৬৫) বলেন, ঘরে পানি। গরু-ছাগল নিরাপদ জায়গায় রাখতে হয়েছে। কৃষিজমির সব ফসল নষ্ট হয়ে গেছে। কয়েক দিনের মধ্যেই পানি না নামলে আরও বড় ক্ষতি হবে।
মৌলভীবাজারের সাত উপজেলার মধ্যে পাঁচটিতে বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। পানিবন্দী হয়ে পড়েছে ৭ হাজারের বেশি পরিবার। বন্যায় সেখানে একজনের মৃত্যুর তথ্য দিয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়।
সুনামগঞ্জে পাঁচ দিনের টানা বর্ষণ ও উজানের ঢলে নদ-নদী ও হাওরে পানি বেড়েছে। গত মঙ্গলবার জেলায় মৌসুমের সর্বোচ্চ ২৬৫ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়। এর সঙ্গে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে রমা নদীর পানি বেড়েছে। ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস থাকায় স্বল্প মেয়াদে বন্যা পরিস্থিতির আশঙ্কা করা হচ্ছে।
হবিগঞ্জ সদর উপজেলার বনগাঁও গ্রামের সিরাজ মিয়াঘরে পানি। গরু-ছাগল নিরাপদ জায়গায় রাখতে হয়েছে। কৃষিজমির সব ফসল নষ্ট হয়ে গেছে। কয়েক দিনের মধ্যেই পানি না নামলে আরও বড় ক্ষতি হবে।গত কয়েক দিনের মাঝারি, ভারী বৃষ্টিসহ উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে নেত্রকোনার সব নদ-নদীর পানি অব্যাহতভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে করে উপজেলার বেশ কিছু এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এতে জেলার নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টির শঙ্কা করা হচ্ছে।
টানা ভারী বৃষ্টির কারণে পানি বেড়ে কুড়িগ্রাম জেলার বিভিন্ন নদীতে ভাঙন বেড়েছে। ধরলা, ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা ও দুধকুমার নদের তীব্র ভাঙনে বসতভিটা হারানোর শঙ্কায় দিন কাটছে নদীতীরের মানুষের।
টানা ভারী বৃষ্টিতে যশোরের কেশবপুর পৌর এলাকার দুই শতাধিক পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। বসতবাড়িতে পানি ওঠায় মানুষ সীমাহীন দুর্ভোগে পড়েছে।
[প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়েছেন নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ ও মৌলভীবাজার এবং প্রতিনিধি, বান্দরবান, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, নেত্রকোনা, কুড়িগ্রাম ও কেশবপুর, যশোর]