বিশ্বকাপের ড্রেসিংরুম কেমন হয়, কী কী থাকে

· Prothom Alo

মাঠের পাশে থাকা অন্ধকার সুড়ঙ্গ দিয়ে খেলোয়াড়েরা বেরিয়ে আসেন, তার ওপারে কিন্তু এক গোটা দুনিয়া লুকিয়ে আছে। আর বিশ্বকাপের ড্রেসিংরুম মানে সাধারণ কোনো ঘর নয়, ছোটখাটো এক ল্যাবরেটরি আর ফাইভ স্টার হোটেলের মিশেল।

Visit amunra-online.pl for more information.

বিশ্বকাপের সবচেয়ে অবাক করা নিয়ম হলো দুই দলের ড্রেসিংরুম হতে হবে সমান। এটা শুনলে হয়তো চমকে যাবে। ফিফার নিয়ম অনুযায়ী, একটা স্টেডিয়ামের দুই দলের ড্রেসিংরুম আকারে, সাজসজ্জায় সুযোগ–সুবিধায় একদম সমানে সমান হতে হবে। কারণ, বিশ্বকাপ একটা নিরপেক্ষ আসর—এখানে কোনো দল ‘হোম টিম’ সুবিধা পাবে না। ঘরোয়া লিগে অনেক সময় স্বাগতিক দলের ঘর জমকালো আর অতিথি দলের ঘর সাদামাটা হয়, কিন্তু বিশ্বকাপে দুই দলকেই দিতে হবে একই মানের সব সুবিধা। প্রতিদ্বন্দ্বিতা যেন শুধু মাঠেই হয়, ড্রেসিংরুম নিয়ে নয়।

একটা বিশ্বকাপ মানের ড্রেসিংরুম কয়েকটা আলাদা অংশে ভাগ করা থাকে—খেলোয়াড়দের জায়গা, কোচ-কর্মকর্তাদের জায়গা, ফিজিওথেরাপির জন্য আলাদা ঘর, আর জিনিসপত্র রাখার জায়গা।

মূল ঘরে থাকে—

—প্রত্যেক খেলোয়াড়ের জন্য তালা দেওয়া আলাদা লকার, বসার আরামদায়ক বেঞ্চ বা চেয়ার।

—কোচের কৌশল বোঝানোর জন্য বড় হোয়াইটবোর্ড বা ডিজিটাল স্ক্রিন (যেখানে ম্যাচের ফুটেজ দেখানো যায়)।

—ম্যাসাজ টেবিল, একটা ফ্রিজ, সেন্ট্রাল এসি আর হিটার।

—পরিষ্কার করা সহজ এমন দেয়াল–মেঝে, ঝকঝকে আলো আর টিভির সংযোগ।

ঘানার ওঝার মন্ত্র আর হ্যারি কেইন

পাশেই থাকে আলাদা শৌচাগার-বাথরুম, একাধিক শাওয়ার নেওয়ার জায়গা, আয়নাসহ বেসিন, এমনকি বুট ধোয়ার আলাদা সিংক আর চুল শুকানোর ড্রায়ার পর্যন্ত।

আধুনিক বিশ্বকাপে ম্যাচের পরের দ্রুত রিকভারিটাও একটা বড় ব্যাপার। তাই ড্রেসিংরুমের সঙ্গে থাকে বরফ-পানিতে গোসলের টাব (আইস বাথ) বা কোল্ড প্লাঞ্জ, যা পেশির ব্যথা আর প্রদাহ কমায়, থাকে হাইড্রোথেরাপির ব্যবস্থা, চিকিৎসার টেবিল আর ফিজিওথেরাপির পুরো একটা কর্নার। ম্যাসাজের ঘরটা সাধারণত মূল ড্রেসিংরুমের পাশেই হয়, যাতে খেলোয়াড়েরা নিরিবিলি পরিবেশে দ্রুত চাঙা হয়ে উঠতে পারেন।

জাপানের রেখে যাওয়া অরিগ্যামি

টানেলের ওপারে বা ওপরে আরও কিছু ঘর থাকে, যেগুলোর কথা সাধারণত আমরা জানি না, যেমন রেফারিদের জন্য আলাদা ড্রেসিংরুম, ডোপ-টেস্টের জন্য আলাদা ঘর (ডোপিং কন্ট্রোল রুম), ফিফার প্রতিনিধিদের ঘর। মাঠের পাশে দুই দলের বদলি খেলোয়াড়দের গা-গরম করার (ওয়ার্ম-আপ) জায়গাও থাকে দুটো, আর সেগুলোও হতে হয় সমান আকারের। ড্রেসিংরুম থেকে মাঠ পর্যন্ত যেতে খেলোয়াড়দের জন্য থাকে আলাদা নিরাপদ, ব্যক্তিগত একটা পথ, যেখানে কোনো দর্শক বা সাংবাদিক ঢুকতে পারেন না।

হাইড্রেশন ব্রেক কীভাবে ইংল্যান্ডকে বিভ্রান্ত করছে

ম্যাচ শেষ হওয়ার পর ড্রেসিংরুমে নানা রকম উত্তপ্ত বা আনন্দের মুহূর্ত তৈরি হয়, কেউ হয়তো ছুড়ে ফেলে পানির বোতল, আবার কোচ হয়তো শান্ত করেন সবাইকে—এসব নিয়ে অজস্র গল্প আছে। ফুটবল নিয়ে বানানো অ্যাপল টিভির ওয়েব সিরিজ ‘টেড ল্যাসো’ দেখলে তার অনেক কিছুই জানা যায়। তবে আমার কাছে এবারের ২০২৬ বিশ্বকাপে সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্তগুলোর একটি হচ্ছে—১৪ জুন ডালাসে নেদারল্যান্ডসের সঙ্গে ২-২ ড্রয়ের পর জাপান দল যখন তাদের ড্রেসিংরুম একদম ঝকঝকে তকতকে পরিষ্কার করে রেখে গেল সেটা। চেয়ারগুলো সাজানো, তোয়ালে যত্ন নিয়ে ভাঁজ করা, ময়লা গোছানো—এমন দায়িত্বশীল আচরণই আসলে মাঠের বাইরে ফুটবলের আসল সৌন্দর্য। ২০২২ সালেও তারা জার্মানিকে হারানোর পর ড্রেসিংরুমে রেখে এসেছিল কাগজের তৈরি সারস (অরিগ্যামি) আর একটা ধন্যবাদের চিঠি। জাপানের স্কুলে ছোটবেলা থেকেই বাচ্চাদের নিজেদের ক্লাসরুম পরিষ্কার করতে শেখানো হয়—সেই অভ্যাসই তারা বিশ্বমঞ্চে বয়ে নিয়ে যায়। বিলাসবহুল ড্রেসিংরুমের সবচেয়ে দামি জিনিসটা তাই হয়তো আসবাব নয়, বরং সম্মান। ড্রেসিংরুম আর আতিথেয়তা নিয়ে এবারের বিশ্বকাপে আলাদা করে চিঠি লিখে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন ইরানের ফুটবলাররাও।

ইরানের রেখে যাওয়া চিঠি

তাই পরেরবার যখন তোমরা কোনো ম্যাচ দেখবে, একটু অন্যভাবে দেখতে পারো। দলের ফরমেশনের সঙ্গে সঙ্গে আকৃতিটা খেয়াল করবে, বল পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কিংবা ডিফেন্সের সময় সেটা কীভাবে বদলে যাচ্ছে। ধারাভাষ্যকার যখন ‘বাস পার্ক করল’ বলবে, হয়তো মুচকি হাসবে। কারণ, এর পেছনের গল্পটা তো এখন তোমার জানা। আর যখন খেলোয়াড়েরা টানেল দিয়ে ঢুকে চোখের আড়াল হবে, তখন কল্পনা করতে পারবে সেই রহস্যময় ঘরটা, যেখানে আইস বাথ যেমন রয়েছে, তেমন রয়েছে ট্যাকটিকস বোঝানোর হোয়াইট বোর্ড, আর হয়তো এক কোণে ভাঁজ করে রাখা একটা তোয়ালে। ফুটবল তো আসলে শুধু পায়ের খেলা নয়, বরং এর একটা আলাদা ভাষা আছে, আলাদা একটা অঙ্ক, এমনকি বিজ্ঞানও আছে, আর কোচদের মস্তিষ্ক তো যেন একেকটা লুকানো দাবার ছক। সেই গোপন দুনিয়াটা যত বুঝবে, খেলাটা ততই সুন্দর আর মজার হয়ে উঠবে।

বাবা নাইজেরিয়ান, মা ফিলিপিনো, স্ত্রী জার্মান; অস্ট্রিয়ার অধিনায়ক আলাবা যেন বিশ্বনাগরিক

Read full story at source