পানির অপর নাম জীবন
· Prothom Alo

সড়ক আর সড়ক নেই, যেন এক খরস্রোতা নদী, চোখের সামনে হাজার হাজার মাথা, মাথার ঢেউ। সকালের চঞ্চল ঢেউ দুপুর গড়াতেই সাগরের উত্তাল ঢেউয়ে পরিণত হয়েছে, সেই ঢেউয়ে আস্তে আস্তে যুদ্ধের ফেনা মিশে যাচ্ছে। এক পাশে সারি সারি পুলিশ, হাতে ঢাল, চোখে ক্লান্তির আগুন, অন্য পাশে মানুষের উজানি স্রোত। কারও হাতে ইট, কারও হাতে লাঠি, কারও হাতে ফেস্টুন। স্লোগানগুলো মুহুর্মুহু রক্তজবার মতো ওঠে, ‘কারার ওই লৌহ কবাট’, ‘বুকের ভিতর দারুণ ঝড়, বুক পেতেছি গুলি কর’। প্রতিটি শব্দ বোমার মতো আছড়ে পড়ে ঢালে, টুকরা টুকরা হয়ে ভাঙে, আবার প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে আসে। বাতাসে বারুদের গন্ধ, ইট উড়ে যায়, টং শব্দে ঢলে পড়ে ঢালে, কেউ কেউ পড়ে যায়, অন্যরা সরিয়ে নেয়।
Visit betsport.cv for more information.
পাশের ঝোপ থেকে একটা কালো সাপ বেরিয়ে আসে, সে ফণা তোলে না, শুধু নিঃশব্দে হামাগুড়ি দিয়ে মানুষের পায়ের ফাঁক দিয়ে চলে যায় নিরাপদ আশ্রয়ে। কেউ দেখে, কেউ দেখে না; পাশের ডোবা থেকে একটা ব্যাঙ ডেকে ওঠে, তার কর্কশ ডাক ভেঙে আসে, কয়েকবার ডেকে থেমে যায়; একটা কাক উড়ে যায় আসমানের দিকে।
পুলিশের ব্যারিকেডের এক পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আশরাফুলের আঙুলগুলো কাঁপছে। তার ইউনিফর্মটা আজ বড়ো বেশি ভারী মনে হচ্ছে। লোহার খাঁচার ওই পাশে যারা আছে, তাদের মুখগুলো খুব চেনা মনে হচ্ছে, ওই মানুষের মধ্যে নিশ্চয় তূর্য মিশে গেছে, সকালে খুব তর্ক করেছে ছেলেটা, ওর সব বন্ধুরা মিছিলে চলে গেছে, সে-ই নাকি ঘরে বন্দী; আসলে ছেলেটা হয়েছে একদম ওর দাদার মতো, আশরাফুলের ঠিক উল্টো, সে তো ঠান্ডা মেজাজের ও শান্ত স্বভাবের লোক, এ জন্য তাকে হাফলেডিস বলে কেউ কেউ, সে অনেকবার শুনেছে, কিন্তু চামড়ার মুখ দিয়ে একটা কথা বেরিয়ে গেলে সে আর কী করতে পারে।
আশরাফুলের মাথায় চিন্তার সাপ কিলবিল করে, এই যে কপালে পতাকা বাঁধা ছেলেটাকে তূর্যের মতো লাগছে, আর ওই যে ‘পানি লাগবে পানি’ বলে যে ছেলেটা চিৎকার করছে তাকে ছোট ভাই বাবুলের মতো লাগছে; বাবুল তো আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের তুখোড় ছাত্র, নিশ্চয়ই এখন মিছিলে আছে; গতকাল একবার ফোন দিয়েছিলাম, বারবার বলছিল, ভাইয়া প্লিজ একটা ছাত্রের গায়ে হাত দিয়ো না। একটা ছিঁচকে চোরকে পর্যন্ত দুটো বাড়ি দিতে পারে না সে, সেখানে আবার গুলি করবে, কীভাবে যে সে পুলিশের চাকরি পেয়েছে তা আল্লাহ মাবুদ ছাড়া কেউ জানে না। এমন সময় আশরাফুলের ফোন বাজতে থাকে, স্ত্রী শিউলি মেসেজ দিচ্ছে, তিন দিন ধরে ছোট ছেলে সূর্য খুবই অসুস্থ, জ্বর নামছেই না, এই সময় ফোন না তুলে থাকা যায় না, ওসি বিক্রম যতই হুমকিধমকি দিক না কেন, তার চোখ ফাঁকি দিয়ে দুপুরের তীব্র আলোয় আশরাফুল ঘরে ফেরে।
আশরাফুল দেখে শিউলি সূর্যের মাথায় জলপট্টি দিচ্ছে, নাক টানছে, সম্ভবত কান্না করেছে, চোখ দুটো জবা ফুলের মতো লাল দেখাচ্ছে। করুণ কণ্ঠে আশরাফুল বলে, ‘শিউলি’, শিউলি মুখ তুলে তাকায়, তার দৃষ্টিতে কোনো অভিমান নেই, অনুযোগ নেই, আছে গভীর উদ্বেগ। সে ধীর গলায় প্রশ্ন করে, ‘তোমার ডিউটি শেষ কখন? বাবুকে হাসপাতালে নিতে হবে।’
আশরাফুল উত্তর দেওয়ার শক্তি খুঁজে পায় না। সে শুধু সূর্যের কপালে হাত রাখে, গা পুড়ে যাচ্ছে জ্বরে। তখন পর্দা সরিয়ে বেরিয়ে আসে তূর্য। তার চোখে আগুন, তা সূর্যের জ্বরের চেয়েও শতগুণ বেশি উত্তপ্ত, ‘আমি আন্দোলনে যাব।’
মানুষের স্রোত বাড়তে থাকে, আশরাফুলের মনে হয়, মানুষগুলো আর মানুষ নেই, তারা একেকটা বারুদের গোলা হয়ে গেছে। তখন ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশ আসে, তারপর শুরু হয় সেই শব্দ, বৃষ্টির মতো গুলি। আশরাফুলের হাত কাঁপে, কিন্তু সে যন্ত্রের মতো ট্রিগার টেপে। হলুদ টি-শার্ট পরা একটা ছেলে পড়ে যায় রাস্তার মাঝখানে। আশরাফুলের বুকটা ধক করে ওঠে, কিছুক্ষণ আগে বাসায় সে যখন তূর্যকে থাপ্পড় দিয়েছিল তখন ওর গায়ে হলুদ টি-শার্ট ছিল! তবে কি বাবা রুস্তমের মতো সেও ছেলেকে মেরে ফেলেছে? পাগলের মতো পা টেনে এগিয়ে যায় সে, ওসি পেছন থেকে চেঁচায়, ‘ওই হাফলেডিস, মিসক্রিয়েন্টটাকে তুলে আন!’
আশরাফুল চমকে ওঠে, সে কর্কশ স্বরে বলে, ‘খবরদার, কোথাও যাবি না তুই।’
তূর্য তাচ্ছিল্যের হাসি হাসে, ‘সবাই যাচ্ছে বাবা, তোমরা আমাদের মারবে আর আমরা ঘরে বসে থাকব তা তো হয় না।’
‘তুই বুঝতে পারছিস না বাইরে কী হচ্ছে!’ আশরাফুল চিৎকার করে ওঠে।
তূর্য এক পা এগিয়ে আসে। তার চোয়াল শক্ত, ‘আমি বুঝি আব্বু, তুমি কার পক্ষে দাঁড়াইছ।’
হঠাৎ এক চড় পড়ে তূর্যের গালে। নিস্তব্ধ ঘরে সেই শব্দটা যেন বাজ পড়ার মতো শোনায়। তূর্য কাঁদে না, সে স্থির চোখে বাবার দিকে তাকিয়ে থাকে।
শিউলি আর্তনাদ করে ওঠে, ‘তোমরা থামো! দোহাই লাগে থামো!’ সে দৌড়ে গিয়ে আশরাফুলের হাত ধরে, ‘এই চাকরি ছাইড়া দাও, আমরা ভিক্ষা করে খাব, দরকার হলে গ্রামে ফিরে যাব। কিন্তু তুমি আর বাইরে যাইয়ো না। টিভিতে দেখাচ্ছে মানুষ মরছে...ফেসবুক বন্ধ হয়ে গেছে। তুমি ফিরে না এলে আমি এই বাচ্চা দুইটা নিয়ে কোথায় যাব?’
আশরাফুলের মনে হয় তার চারপাশের দেয়ালগুলো ভেঙে পড়ছে। সে শিউলির হাত ছাড়িয়ে গুমরে ওঠা বুক নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়।
আশরাফুল আবারও যখন স্পটে পৌঁছায়, তখন পরিবেশ অত্যন্ত ঘোলাটে, কিছুই বোঝা যাচ্ছে না, শুধু কানে আসে, স্লোগান আর ওয়্যারলেসের কর্কশ আওয়াজ। ওসি বিক্রম গর্জে ওঠে, ‘ডিউটি ফালায়া কোথায় গেছিলি?’
আশরাফুল মাথা নিচু করে বলে, ‘স্যার, আমার ছেলেটার খুব জ্বর...’
‘নাটক রাখ, হাফলেডিস কোথাকার’ বলে ওসি থুতু ফেলে।
মানুষের স্রোত বাড়তে থাকে, আশরাফুলের মনে হয়, মানুষগুলো আর মানুষ নেই, তারা একেকটা বারুদের গোলা হয়ে গেছে। তখন ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশ আসে, তারপর শুরু হয় সেই শব্দ, বৃষ্টির মতো গুলি। আশরাফুলের হাত কাঁপে, কিন্তু সে যন্ত্রের মতো ট্রিগার টেপে। হলুদ টি-শার্ট পরা একটা ছেলে পড়ে যায় রাস্তার মাঝখানে।
আশরাফুলের বুকটা ধক করে ওঠে, কিছুক্ষণ আগে বাসায় সে যখন তূর্যকে থাপ্পড় দিয়েছিল তখন ওর গায়ে হলুদ টি-শার্ট ছিল! তবে কি বাবা রুস্তমের মতো সেও ছেলেকে মেরে ফেলেছে? পাগলের মতো পা টেনে এগিয়ে যায় সে, ওসি পেছন থেকে চেঁচায়, ‘ওই হাফলেডিস, মিসক্রিয়েন্টটাকে তুলে আন!’
আশরাফুলের দেহ অবশ হয়ে আসে, তবু সে আগায়, ছেলেটার কপালে পতাকা বাঁধা, হুবহু তূর্যের মতো, সে আরও কাছে যায়, তারপর যেন শান্তির দৃশ্য—না, এটা তূর্য নয়, অন্য কেউ।
আসমান-জমিন-পাতাল থেকে পঙ্গপালের মতো মানুষ ধেয়ে আসে। ম্যাজিস্ট্রেট গাড়ি নিয়ে পালিয়ে যায়। পুলিশ সদস্যরা থানার ভেতরে আশ্রয় নেয়।
কয়েকজন কমজোর পুলিশ সদস্যকে রাখা হয় নিচতলার মূল গেটের পাহারায়, সেই দলে আশরাফুলও আছে। বাইরে তখন মানুষের পায়ের আওয়াজ।
আসমান লাল হয়ে ওঠে, গোধূলির আবছা আঁধারে মশালের আলোয় গাঢ় অন্ধকার নামে না। থানার চারপাশ ঘিরে মানুষ স্লোগান দিচ্ছে। সেই স্লোগানগুলো প্রতিবাদ নয়, তা যেন আসন্ন বিচারের রায়। নিচতলায় দাঁড়িয়ে থাকা আশরাফুলের হাতের রাইফেলটা পাহাড়ের মতো ভারী মনে হয়।
হঠাৎ থানার লোহার গেট ভেঙে পড়ে। মানুষ পিলপিল করে ঢোকে। পুলিশ সদস্যরা দৌড়ে দোতলায় উঠে কলাপসিবল গেট বন্ধ করে দেয়। ভেতরে প্রায় পঁচিশজন পুলিশ সদস্য। সবার চোখে মৃত্যু। ওসি পাগলের মতো ওপর মহলে ফোন করে, ‘স্যার, আর্মি পাঠান! আমরা শেষ হয়ে যাচ্ছি!’
আশরাফুলসহ কয়েকজনকে কলাপসিবল গেটের কাছে রাখা হয়, যাতে গাছের গুঁড়ি, শাবল, হ্যামার বা বড় কিছু দিয়ে গেট ভাঙতে না পারে।
আজান হচ্ছে, পশ্চিম আসমানে খেলা করছে হাসান-হোসেনের রক্ত, সেই রক্তের লীলা পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে তূর্য, যতই এগোচ্ছে ততই বাড়ছে মানুষের হইহুল্লোড় ও স্লোগান। এই তো চলে এসেছে, কিন্তু সবখানে মানুষ আর মানুষ, কেউ চিৎকার করে বলে, ‘ধর শালা রে, মার শালা রে।’ একটা ছেলে পবনের গতিতে তাকে অতিক্রম করে সামনে গিয়ে বলে, ‘রুপু রে ধরছে নাকি?’ আরেকজন বলে, ‘ধর শালা রে, অনেক জ্বালাইছে।’
আশরাফুলের বমি বমি লাগছে, চোখের সামনে এক বছরের সূর্যের মুখটা ভেসে ওঠে, বড় ছেলে তূর্যের জন্মের ১৭ বছর পর সূর্যের জন্ম হয়েছে, কিন্তু সেই ছেলেটা ঠান্ডা জ্বরে মারা যাচ্ছে, অথচ জন্মদাতা হয়ে সে কিছুই করতে পারছে না। মনে পড়ছে, তূর্যের সেই আগ্নেয়গিরির মতো চোখ। তূর্য কি এখন এই ভিড়ের মধ্যে আছে? তূর্যও কি তাকে মারতে আসবে? যদি আসে আসুক, বুক পেতে দেবে, তূর্য, আজ আমি রুস্তম, তুমি সোহরাব হয়ে আমাকে হত্যা করো। নাকি বাবা রুস্তমকে উদ্ধার করতে ছুটে আসবে? সে কি জানে তার বাবা এখানে আটকা পড়েছে? আজকের এই পরিস্থিতি কি আশরাফুলের প্রায়শ্চিত্ত? কতগুলো ভুল করেছে সে? একটু আগে এলোপাতাড়ি গুলির কারণে যে ছেলেটা পাখির মতো পড়ে গেল সেই ছেলেটা কি তার গুলিতে পড়েছে? ওই মুহূর্তে সে যদি অস্ত্র ফেলে বাসায় চলে যেত, যদি ওসিকে বলত, স্যার এই চাকরি আমি করব না, তবে কেমন হতো? আসলে কী করার আছে তার? জীবনে অভাব আর অভাব, সে অন্যদের মতো উপরি কামাই করতে পারে না কিংবা কারও উপকারে আসতে পারে না; সম্বন্ধীর হারিয়ে যাওয়া মুঠোফোন উদ্ধার করে দিতে পারেনি, মামার জমির দখল নিয়ে দিতে পারেনি, শ্যালিকার ইভ টিজারকে পর্যন্ত একটা থ্রেট দিতে পারেনি, তাই আত্মীয়স্বজনও তাকে পাত্তা দেয় না। কেমন পঙ্গু জীবন তার, তারপরও টানাটানির এই সংসারকে স্থির করতে কিছু উপরি কামাই করেছিল; আসলে পাবলিকই তাকে সেধে দিয়েছিল। সে নিজেকে সান্ত্বনা দিতে চায়—সংসার ছিল, ঋণ ছিল, মা–বাবার চিকিৎসা ছিল, কী করবে সে! কিন্তু আজ এই আগুনের মুখে দাঁড়িয়ে অজুহাতগুলো শনপাপড়ির মতো উড়ে যায়।
আশরাফুল যখন বন্দী হয়ে এসব ভাবছে, তখন ঘরে আবদ্ধ শিউলির মগজ গলে যাওয়ার জোগাড়; তূর্য আন্দোলনে, আশরাফুল ডিউটিতে, সূর্যের অবস্থা ডুবোডুবো, তারপরও সে সূর্যকে বুকের মধ্যে নিয়ে এক হাতে ফেসবুকে চোখ রাখছে; হাত-পা নিথর হয়ে আসছে তার; আশরাফুল কী করছে? নিরাপদে আছে তো? বুকের ধন তূর্য কোথায়? এখনো আসে না কেন সে? আল্লাহ নাকি মানুষের পরীক্ষা নেন, এ কোন পরীক্ষায় ফেলেছে তাকে? সে কোন দিক সামলাবে?
সূর্য নাক ফুলিয়ে শ্বাস নিচ্ছে, বুকের নিচের অংশ ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে, খিঁচুনি হচ্ছে। হঠাৎ কলিং বেল বেজে ওঠে; ক্লান্ত ও বিধ্বস্ত শরীর নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে তূর্য, তার কনুইয়ে জমাটবাঁধা রক্ত। শিউলি যেন চন্দ্রের নাগাল পায়, তারপর বলে, ‘সূর্যের অবস্থা ভালো না, তাড়াতাড়ি তোর বাবাকে খবর দে’, এখনই হাসপাতালে নিতে হবে। তূর্য এক সেকেন্ডও দেরি করে না, সঙ্গে সঙ্গে থানার দিকে ছোটে, পাঁচ মিনিটের পথ পাড়ি দিতে তিন মিনিটের বেশি সময় লাগবে না।
আজান হচ্ছে, পশ্চিম আসমানে খেলা করছে হাসান-হোসেনের রক্ত, সেই রক্তের লীলা পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে তূর্য, যতই এগোচ্ছে ততই বাড়ছে মানুষের হইহুল্লোড় ও স্লোগান। এই তো চলে এসেছে, কিন্তু সবখানে মানুষ আর মানুষ, কেউ চিৎকার করে বলে, ‘ধর শালা রে, মার শালা রে।’ একটা ছেলে পবনের গতিতে তাকে অতিক্রম করে সামনে গিয়ে বলে, ‘রুপু রে ধরছে নাকি?’
আরেকজন বলে, ‘ধর শালা রে, অনেক জ্বালাইছে।’
তরুণ নেতা রুপু অনেক অত্যাচার করেছে, মাদক ব্যবসা থেকে শুরু করে এমন কোনো অপকর্ম নেই যে সে করেনি; মেয়েছেলের গায়ে পর্যন্ত হাত দিয়েছে।
বাবা পানি চেয়েছিল, কিন্তু মানুষ তাচ্ছিল্য করে বলেছিল, এই লোকটা একটা জীবন কেড়ে নিয়েছে। বাবা কি সত্যিই জীবন কেড়ে নিয়েছে? তূর্যের বিশ্বাস হয় না। জীবন আছে বলে যে মানুষ একটা তেলাপোকা পর্যন্ত মারতে পারে না, সেই মানুষ কিনা জীবন কেড়ে নেবে? তূর্য আর ভাবতে পারে না, তখন তার মনে পড়ে অসুস্থ সূর্যের কথা; মায়ের অশ্রুসজল চোখের ছবি ভাসে। তূর্যের দম বন্ধ হয়ে আসে, চোখের পাতা নিথর হয়ে ঢলে পড়ে; তখন শুধু চোখের সামনে ভাসে, বাবার কোলে বসে সে মুখস্থ করছে—পানির অপর নাম জীবন, পানির অপর নাম জীবন...।
কিছুক্ষণের জন্য হলেও তূর্য বাবার কথা ভুলে যায়, সে দাঁড়িয়ে থাকে, রুপুকে মারছে মানুষ, বিরাট এক উৎসবে পরিণত হয়েছে থানার মোড়। তূর্যের তখন মনে পড়ে, একদিন এই রুপুই তার সামনে তার বাবাকে হাফলেডিস বলে গালি দিয়েছিল; রুপু কী একটা কাজের কথা বলেছিল, বাবা নাকি করেনি। তূর্যের শরীরে দারুণ এক জোশ আসে, বাবাকে অপমানের প্রতিশোধ নিতে হবে, এই সুযোগ হাতছাড়া করা যাবে না। মানুষের ঢেউয়ের ভেতরে ডলফিনের মতো লাফ দিয়ে ঢুকে পড়ে তূর্য; তারপর সে দেখে, একটি মৃতপ্রায় দেহকে ঘিরে মানুষের উল্লাস।
অন্ধকারে দেহটা দেখা যায় না, তবে সেটি বিবস্ত্র; মুখমণ্ডল ইটের আঘাতে এমনভাবে থেঁতলানো যে চেনার উপায় নেই। শরীরের চামড়াগুলো ঝুলে পড়েছে। তখন একজন দড়ি নিয়ে আসে। নিমেষেই সেই দেহটিকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যায় শিরীষগাছের নিচে। দেহে তবু প্রাণ আছে, সেই দেহ মৃদুস্বরে বলে, ‘পানি, পানি।’
কিন্তু এই অনুরোধ শুনে মানুষ আরও উত্তেজিত হয়ে ‘শালা এতগুলো জীবন নিলি, মানুষ কি পশুপাখি, জীবন কি খেলার পুতুল? এইবার বুঝ কেমন লাগে’ বলে ‘পানি পানি’ শব্দকে পাতালে ঠেলে দেয়।
আগুনের লেলিহান শিখায় তূর্য দেখে, দেহটিকে গাছে ঝুলিয়ে দেওয়া হচ্ছে। বাতাস নেই, তবু দেহটা দোলে, কিন্তু রুপুর মতো লাগছে না; রুপু তো পাঁচ ফুট দুই ইঞ্চি; দেহ চিকন ও লিকলিকে; কিন্তু এই দেহ লম্বা, চওড়া কাঁধ, সিল্কি চুল। তূর্যের বুকের ভেতরে ভয়ংকর ভূমিকম্প চলে, তখন কেউ একজন পাশ থেকে বলে, ‘এই হালার পুতেই আজ একজনের জীবন কাইড়া নিছে।’
জীবন কেড়ে নেওয়া এই ঘাতকের গালে বিরাট এক ঘুষি বসিয়ে সামনে এগিয়ে যায় তূর্য। তখন ভিড়ের মধ্য থেকে একজন চিৎকার করে ওঠে, ‘ওই হাফলেডিসটা না?’ সঙ্গে সঙ্গে উত্তর আসে, ‘হ, হ, ওই হাফলেডিসটা, গেইট ভাঙার পরে ওপরে উঠতে পারে নাই।’
তূর্যের বুক কেঁপে ওঠে, পা দুটো মাটির ভেতরে গেঁথে যায়, সে কাঁপতে কাঁপতে এগিয়ে যায়, ‘বাবা’ বলে যে একটা ডাক দেবে সেই শক্তিটুকু পর্যন্ত উধাও হয়ে যায়; আগুনের নাচন আর ল্যাম্পপোস্টের মিটমিটে আলোয় সে দেখে বাবার উপড়ানো চোখ, সেই চোখগুলো যেন এখনো তাকে শাসন করছে, ‘তুই যাবি না বলছি?’
মানুষের জয়ধ্বনি তূর্যের কানে পৌঁছায় না, সে শুধু দেখে, তার বাবার নিথর দেহটা কৃষ্ণপক্ষের চাঁদের নিচে এক বীভৎস প্রতীকের মতো দুলছে।
তূর্য বাবার করুণ কণ্ঠ চিনতে পারেনি, কেন পারেনি? বাবার কণ্ঠ কি অচেনা হয়ে গিয়েছিল? আরও একবার তূর্যের ইচ্ছা করে ‘বাবা’ বলে চিৎকার করে ঝাঁপিয়ে পড়তে, কিন্তু কোথায় যেন আটকে যায়, কোথাও যেন এক বাধা, গলা দিয়ে কোনো কথা বের হয় না, পা নড়ে না, দম বন্ধ হয়ে আসে।
বাবা পানি চেয়েছিল, কিন্তু মানুষ তাচ্ছিল্য করে বলেছিল, এই লোকটা একটা জীবন কেড়ে নিয়েছে। বাবা কি সত্যিই জীবন কেড়ে নিয়েছে? তূর্যের বিশ্বাস হয় না। জীবন আছে বলে যে মানুষ একটা তেলাপোকা পর্যন্ত মারতে পারে না, সেই মানুষ কিনা জীবন কেড়ে নেবে? তূর্য আর ভাবতে পারে না, তখন তার মনে পড়ে অসুস্থ সূর্যের কথা; মায়ের অশ্রুসজল চোখের ছবি ভাসে। তূর্যের দম বন্ধ হয়ে আসে, চোখের পাতা নিথর হয়ে ঢলে পড়ে; তখন শুধু চোখের সামনে ভাসে, বাবার কোলে বসে সে মুখস্থ করছে—পানির অপর নাম জীবন, পানির অপর নাম জীবন...।