কম আলোতে বই পড়লে কি সত্যিই চোখ নষ্ট হয়
· Prothom Alo
অনেকেরই ধারণা, আবছা কিংবা কম আলোতে পড়াশোনা করলে দৃষ্টিশক্তি কমে যায়। স্বাস্থ্যবিষয়ক প্রচলিত ভুল ধারণাগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম। কিন্তু সত্যিই কি কম আলোতে বই পড়লে চোখের কোনো ক্ষতি হয়? চলুন, আসল সত্যটি জেনে নেওয়া যাক।
Visit h-doctor.club for more information.
বিজ্ঞানীরা সম্প্রতি দাবি করেছেন, কম আলো বা অন্ধকারে বই পড়লে চোখের কোনো স্থায়ী ক্ষতি হয় না। এটি দৃষ্টিশক্তিও কমিয়ে দেয় না। অনেকেই ভাবেন, আবছা আলোতে পড়াশোনা করলে ক্ষীণদৃষ্টির মতো সমস্যা হতে পারে। তবে এই ধারণাটি মোটেও সত্য নয়।
তবে কম আলোতে একটানা পড়লে চোখের ওপর বাড়তি চাপ পড়ে। এর কারণে চোখ সাময়িকভাবে ক্লান্ত হয়ে যেতে পারে কিংবা চোখে কিছুটা অস্বস্তি ও ব্যথা হতে পারে। চোখের ওপর যখন এমন চাপ পড়ে, তখন সাময়িকভাবে কোনো কিছু স্পষ্ট দেখতে কিছুটা সমস্যা হতে পারে।
স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে চোখ জ্বলে? জানুন বাঁচার উপায়কম আলোতে একটানা পড়লে চোখের ওপর বাড়তি চাপ পড়ে। এর কারণে চোখ সাময়িকভাবে ক্লান্ত হয়ে যেতে পারে কিংবা চোখে কিছুটা অস্বস্তি ও ব্যথা হতে পারে।
ভালো খবর হলো, চোখের এই ক্লান্তি বা চাপ একদমই সাময়িক। একটু বিশ্রাম নিলে চোখ আবার আগের মতো স্বাভাবিক হয়ে যায়। এর প্রভাবে চোখে দীর্ঘমেয়াদি কোনো ক্ষতি হয় না। তাই রাতে কম আলোতে পড়ার অভ্যাস থাকলেও চোখের দৃষ্টি নষ্ট হওয়া নিয়ে দুশ্চিন্তার কিছু নেই।
এই প্রচলিত ধারণার পেছনে বৈজ্ঞানিক কোনো প্রমাণ নেই। চিকিৎসাবিজ্ঞানের বড় বড় ডেটাবেস পরীক্ষা করে গবেষকেরা দেখেছেন, চিকিৎসক ও সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রচলিত এই বিশ্বাসগুলোর সঙ্গে বাস্তবতার কোনো মিল নেই।
যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানাপোলিসের রিজেনস্ট্রিফ ইনস্টিটিউটের গবেষক অ্যারন ক্যারল জানান, অনেক চিকিৎসক নিজেরা এই ধারণাগুলো বিশ্বাস করেন এবং রোগীদেরও তা মেনে চলতে বলেন। এমনকি সংবাদপত্র বা টেলিভিশনেও এই ভুল তথ্যগুলো প্রায়ই প্রচার করা হয়। সেখান থেকেই এমন ধারণার জন্ম।
ফোন বা টিভির নীল আলো চোখ, ঘুম ও স্বাস্থ্যের জন্য কতটা ক্ষতিকরচোখে অতিরিক্ত চাপ পড়লে চোখ ভারী ও পরিশ্রান্ত মনে হতে পারে। ফলে মাথাব্যথা, চোখে জ্বালাপোড়া করা, ঘাড় বা কাঁধে ব্যথা হওয়া এবং কোনো কিছু ঝাপসা দেখার মতো সমস্যা হতে পারে।
চোখের ওপর চাপ
মানুষের চোখের গঠন পেঁচার মতো নয়। তাই কম আলো বা অন্ধকারে আমাদের চোখ ভালোভাবে দেখতে পারে না। কম আলোতে কোনো কিছু পড়ার জন্য আমাদের চোখকে অনেক বেশি পরিশ্রম করতে হয়। শরীরের অন্যান্য অঙ্গের মতো একটানা বেশি পরিশ্রম করলে চোখও ক্লান্ত হয়ে পড়ে। একে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় আই স্ট্রেইন বা চোখের চাপ।
চোখে অতিরিক্ত চাপ পড়লে চোখ ভারী ও পরিশ্রান্ত মনে হতে পারে। ফলে মাথাব্যথা, চোখে জ্বালাপোড়া করা, ঘাড় বা কাঁধে ব্যথা হওয়া এবং কোনো কিছু ঝাপসা দেখার মতো সমস্যা হতে পারে।
কম আলোতে কোনো কিছু পড়ার জন্য আমাদের চোখকে অনেক বেশি পরিশ্রম করতে হয়কম আলোতে চোখের ওপর চাপ বাড়ে কেন
কম আলোতে চোখের ওপর এই চাপ বাড়ার পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে:
ফোকাস করতে সমস্যা: আলো কম থাকলে চোখের পক্ষে যেকোনো কিছুর ওপর মনোযোগ দেওয়া বা ফোকাস করা কঠিন হয়ে পড়ে।
বয়সজনিত কারণ: বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের চোখের দেখার ক্ষমতা স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা কমে যায়, যা কম আলোতে বেশি টের পাওয়া যায়। চোখের এই অবস্থাকে প্রেসবায়োপিয়া বলে।
দৃষ্টির ত্রুটি: আগে থেকে যদি কারও চোখে কাছের জিনিস স্পষ্ট দেখলেও দূরের জিনিস ঝাপসা দেখায় বা চোখের কর্নিয়ার আকৃতিগত সমস্যার মতো ত্রুটি থাকে, তাহলে কম আলোতে তাঁদের চোখের ওপর চাপ আরও বেড়ে যায়।
পলক কম ফেলা: আরেকটি বড় কারণ হলো, আলো কম থাকলে মানুষ স্বাভাবিকের চেয়ে চোখের পলক কম ফেলে। চোখের পলক কম পড়ার কারণে চোখ দ্রুত শুকিয়ে যায় এবং চোখে অস্বস্তি তৈরি হয়।
কম্পিউটারে কি চোখ নষ্ট হয়বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের চোখের দেখার ক্ষমতা স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা কমে যায়, যা কম আলোতে বেশি টের পাওয়া যায়। চোখের এই অবস্থাকে প্রেসবায়োপিয়া বলে।
ডিজিটাল ডিভাইসে পড়া কি ভালো
অনেকের কাছে অন্ধকারে বা কম আলোতে বই পড়ার জন্য স্মার্টফোন, আইপ্যাড কিংবা কিন্ডলের মতো ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার করা ভালো উপায় মনে হতে পারে। কারণ, এগুলোতে নিজস্ব আলো থাকে। তবে অন্ধকারে এসব ডিজিটাল স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকলেও চোখের ওপর চাপ পড়ে। কারণ, তখন চোখ একবার উজ্জ্বল স্ক্রিন ও পরমুহূর্তে অন্ধকার ঘরের আলোর সঙ্গে বারবার মানিয়ে নিতে হয়। স্ক্রিনের তীব্র আলো ও চারপাশের অন্ধকারের এই পার্থক্যের কারণে চোখের ওপর চাপ তৈরি হয়। একে ডিজিটাল আই স্ট্রেইন বলা হয়।
অন্ধকারে ডিজিটাল স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকলেও চোখের ওপর চাপ পড়েচোখের ক্লান্তি দূর করার উপায়
অন্ধকারে পড়ার সময় চোখের এই চাপ কমানোর সবচেয়ে সহজ উপায় হলো, ঘরের আলো জ্বালিয়ে নেওয়া। এ ছাড়া আরও কিছু নিয়ম মেনে চললে চোখের এই ক্লান্তি অনেকটাই কমানো সম্ভব। ডিজিটাল স্ক্রিনে পড়ার সময় চোখের ক্লান্তি দূর করার জন্য চিকিৎসকের পরামর্শে বিশেষ ব্লু লাইট ফিল্টার চশমা ব্যবহার করা যেতে পারে। যে ঘরে বসে ডিভাইসে পড়ছেন, সেই ঘরের আলোর উজ্জ্বলতা ও স্ক্রিনের উজ্জ্বলতা যেন কাছাকাছি থাকে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। পড়ার সময় নিয়মিত চোখের পলক ফেলা জরুরি। কারণ, চোখের পলক চোখকে ভেজা বা পিচ্ছিল রাখে, যা চোখের ওপর চাপ কমায়।
দীর্ঘক্ষণ কম্পিউটারের স্ক্রিন দেখলে কি চোখ ব্যথা হয়অন্ধকারে ডিজিটাল স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকলেও চোখের ওপর চাপ পড়ে। কারণ, তখন চোখ একবার উজ্জ্বল স্ক্রিন ও পরমুহূর্তে অন্ধকার ঘরের আলোর সঙ্গে বারবার মানিয়ে নিতে হয়।
পড়াশোনা বা স্ক্রিন ব্যবহারের সময় ২০-২০-২০ নিয়মটি মেনে চলা খুব কার্যকর। এই নিয়ম অনুযায়ী, প্রতি ২০ মিনিট পড়ার পর ২০ সেকেন্ডের জন্য একটি বিরতি দিতে হবে এবং চোখকে আরাম দিতে ২০ ফুট দূরের কোনো জিনিসের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে। পাশাপাশি সাধারণ আলোতেও যদি পড়ার সময় চোখে চাপ লাগে, তবে চিকিৎসকের কাছে গিয়ে চোখ পরীক্ষা করিয়ে রিডিং চশমা নেওয়া উচিত। চোখের পাওয়ার ঠিক আছে কি না, তা নিয়মিত পরীক্ষা করা দরকার।
চোখকে আরাম দিতে ২০ ফুট দূরের কোনো জিনিসের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবেঅন্ধকারে পড়ার কারণে চোখের ওপর চাপ পড়লে সাময়িকভাবে কোনো কিছু স্পষ্ট দেখতে সমস্যা হতে পারে, যা বেশ অস্বস্তিকর। তাই চোখের এই ক্লান্তিকে অবহেলা করা ঠিক নয়। তবে দীর্ঘমেয়াদে চোখের এই চাপ কোনো বিপজ্জনক রোগ নয়। চোখকে পর্যাপ্ত বিশ্রাম দিলে এই সমস্যা নিজে থেকে কমে যায়। কিন্তু চোখব্যথার এই সমস্যা যদি বারবার হতে থাকে কিংবা বিশ্রাম নেওয়ার পরও যদি চোখ স্বাভাবিক না হয়, তবে অবশ্যই একজন চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
লেখক: প্রদায়ক, বিজ্ঞানচিন্তাসূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, হেলথ কেয়ার ও ইউটাহ ডটকমদীর্ঘ সময় পলক না ফেললে চোখে পানি আসে কেন