হিটলারকে হাসির পাত্র বানিয়ে অস্কার জেতা মানুষটি আজ শতবর্ষে পা দিলেন

· Prothom Alo

অভিনেতা ও নির্দেশক মেল ব্রুকস

‘একজন স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে বক্তৃতা দিয়ে হয়তো তাঁকে হারানো যাবে না। কিন্তু তাঁকে নিয়ে যদি মানুষকে হাসানো যায়, তাহলে তাঁর ক্ষমতাই ভেঙে দেওয়া সম্ভব।’ এই বিশ্বাসকে আজীবন শিল্পে রূপ দিয়েছেন মার্কিন নির্মাতা, অভিনেতা, চিত্রনাট্যকার ও কৌতুকশিল্পী মেল ব্রুকস। আজ তাঁর ১০০তম জন্মদিন।

এক শতাব্দীর জীবনে তিনি শুধু কমেডিকে নতুন করে উপস্থাপন করেননি, ব্যঙ্গকে পরিণত করেছেন প্রতিরোধের এক শক্তিশালী ভাষায়। যে কারণে এক শ বছর বয়সে এসেও তিনি কখনো অভিনয়ে সরব হচ্ছেন, কখনো কণ্ঠ দিচ্ছেন। যিনি দীর্ঘ ক্যারিয়ারে সব সময়ই জীবনকে ভিন্নভাবে দেখার চেষ্টা করেছেন। তাই তো এই কমেডিয়ান বলতেন, ‘বেঁচে থাকাটাই একটা দারুণ ব্যাপার। এর জন্য কোনো বিশেষ কারণের প্রয়োজন নেই। যতক্ষণ পর্যন্ত আপনি হাসতে পারছেন, কেউ আপনাকে মেরে ফেলতে পারবে না।’

Visit freshyourfeel.com for more information.

অভিনেতা ও নির্দেশক মেল ব্রুকস

১৯২৬ সালের ২৮ জুন নিউইয়র্কের ব্রুকলিনে এক ইহুদি পরিবারে জন্ম মেল ব্রুকসের। মাত্র দুই বছর বয়সেই বাবাকে হারান। দারিদ্র্যের মধ্যেই বড় হয়েছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মার্কিন সেনাবাহিনীতে কর্পোরাল হিসেবে ইউরোপে দায়িত্ব পালন করেন। যুদ্ধের ভয়াবহতা, নাৎসি বাহিনীর নিষ্ঠুরতা এবং হলোকাস্টের ক্ষত খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন তিনি। পরে বলেছিলেন, ‘মানুষের অন্ধকারকে হারানোর সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র হতে পারে হাসি।’ যুদ্ধের ভয়াবহতা কাছ থেকে দেখেছেন। এগুলো তাঁকে বিষণ্ন করে তুলতে। সে কারণেই কি মানুষকে হাসানোর পথ বেছে নিলেন?

মেল ব্রুকস ১৯৫১ সালে অভিনয়ে নাম লেখালেও পরে অনিয়মিত ছিলেন। ৬০–এর দশকে তিনি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রে ভয়েস দিয়ে নিয়মিত হন। ১৯৬৭ সালে মুক্তি পায় তাঁর প্রথম পরিচালিত চলচ্চিত্র ‘দ্য প্রডিউসারস’। এটি তাঁর ক্যারিয়ারের আলোচিত সিনেমা। গল্পটি ছিল দুই প্রযোজককে নিয়ে, যারা হিসাব কষে সিদ্ধান্ত নেয়—সফল নাটকের চেয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে একটি ভয়াবহ ফ্লপ নাটক বানালে বেশি অর্থ উপার্জন করা সম্ভব। সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই তারা মঞ্চে আনে ‘স্প্রিংটাইম ফর হিটলার’—যেখানে ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর একনায়ক অ্যাডলফ হিটলারকে উপস্থাপন করা হয় এক হাস্যকর চরিত্র হিসেবে।

মেল ব্রুকস অভিনীত ‘ইয়াং ফ্রাংকেনস্টাইন’- সিনেমার পোস্টার

এই ছবি মুক্তির পর হলিউডে সাড়া পড়ে যায়। কেউ একে সাহসী বলেছিলেন, কেউ বিতর্কিত। কিন্তু দর্শক ছবিটিকে গ্রহণ করেন। ‘দ্য প্রডিউসারস’-এর জন্য মেল ব্রুকস জিতে নেন সেরা মৌলিক চিত্রনাট্যের অস্কার। পরে এই ছবি থেকেই নির্মিত ‘ব্রডওয়ে মিউজিক্যাল’ তাঁকে এনে দেয় টনি ও গ্র্যামি পুরস্কারও।

মেল ব্রুকসের বিশ্বাস ছিল, ব্যঙ্গ কেবল হাসানোর জন্য নয়; এটি ক্ষমতার বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর প্রতিবাদ। তাঁর বিখ্যাত উক্তি, ‘আমি আঙুল কাটলে সেটা ট্র্যাজেডি, আর তুমি নর্দমায় পড়ে মারা গেলে সেটা কমেডি।’ এই নির্মম রসবোধই তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে।

এরপর একের পর এক কালজয়ী চলচ্চিত্রে কাজ করেছেন। ‘ব্লেজিং স্যাডলস’-এ ওয়েস্টার্ন ঘরানার প্রচলিত ধারণাকে ভেঙেছেন। ‘ইয়াং ফ্রাংকেনস্টাইন’-এ হরর সিনেমাকে রূপ দিয়েছেন বুদ্ধিদীপ্ত কমেডিতে। ‘হিস্ট্রি অব দ্য ওয়ার্ল্ড, পার্ট-১’-এ ইতিহাসের গুরুগম্ভীর ঘটনাগুলোকে মিউজিক্যাল ব্যঙ্গচিত্রে পরিণত করেছেন, যা দর্শক দারুণভাবে গ্রহণ করেছেন। তাঁর ব্যঙ্গ হলিউডের বাণিজ্যিক চলচ্চিত্র সংস্কৃতিকেই যেন বদলে দিয়েছে।

আমি জীবনটাকে সহজ করে চিন্তা করি: অপূর্ব অভিনেতা ও নির্দেশক মেল ব্রুকস

এই অভিনেতা ও পরিচালকের কাজের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল দর্শকের প্রত্যাশা ভেঙে দেওয়া। যেখানে দর্শক ভয় পাওয়ার অপেক্ষায়, সেখানে তিনি হাসিয়েছেন। যেখানে গাম্ভীর্য প্রত্যাশিত, সেখানে তৈরি করেছেন কৌতুক। তাঁর মতে, ‘হাসি মানুষের সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষা। হাস্যরস হলো মানুষের সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষামূলক অস্ত্র। এটি আমাদের সমস্ত মানসিক আঘাত থেকে বাঁচিয়ে রাখে।’

শুধু চলচ্চিত্র নয়, টেলিভিশন ও মঞ্চেও সমান সফল ছিলেন তিনি। জনপ্রিয় টিভি সিরিজ ‘ম্যাড অ্যাবাউট ইউ’-তে অতিথি শিল্পী হিসেবে অভিনয়ের জন্য জিতেছেন এমি। অস্কার, এমি, গ্র্যামি ও টনি—চারটি বড় মার্কিন বিনোদন পুরস্কার জেতা শিল্পীদের অভিজাত তালিকা ইগট-এর সদস্য তিনি।

শত বছর বয়সেও মেল ব্রুকস থেমে থাকেননি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিয়মিত সক্রিয় এই কিংবদন্তি এখনো নতুন প্রজন্মের কাছে অনুপ্রেরণা। তাঁর চলচ্চিত্র আজও চলচ্চিত্রবিদ্যা, কমেডি ও রাজনৈতিক ব্যঙ্গের পাঠ্য উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়।
পুরস্কারের উজ্জ্বল আলো তাঁকে ঘিরে থেকেছে সারা জীবন। কিন্তু তাঁর সবচেয়ে বড় অর্জন হয়তো অন্য জায়গায়। তিনি প্রমাণ করেছেন, হাসি শুধু বিনোদন নয়—এটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদেরও এক অসাধারণ ভাষা। তাই এক শ বছর বয়সেও মেল ব্রুকস শুধু একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা, অভিনেতা নন—তিনি ব্যঙ্গের ইতিহাসে এক জীবন্ত প্রতিষ্ঠান। কমেডি নির্মাণ নিয়ে তিনি একবার বলেছিলেন, ‘যদি আপনি পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে চিৎকার করেন, তবে তা একটি সুন্দর প্রতিধ্বনি তৈরি করবে। কিন্তু যদি আপনি একটি কৌতুক বলেন, তবে পুরো পৃথিবী আপনার সঙ্গে হাসবে।’ ২৮ জুন ১৯২৬ সালে তাঁর জন্ম।


আইএমডিবি ও ভ্যারাইটি অবলম্বনে

Read full story at source