‘নির্মাণ হয় না কবিতার; যা হয়, তা হলো সৃজন—ফুল ফুটিয়ে তোলার মতো করে’

· Prothom Alo

বাংলা ভাষার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একজন কবি মাসুদ খান। তাঁর লেখালেখির শুরু আটের দশকে। সপরিবার বাস করেন কানাডার টরন্টোতে। সেখানে একটি কলেজে ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে শিক্ষকতা করেন। ছন্দের ভাঙচুর, বিষয় ও প্রকাশভঙ্গির বৈচিত্র্য এবং কখনো টানাগদ্যে, মাত্রাবৃত্তে, কখনো স্বরবৃত্তে—অর্থাৎ এমন কোনো নিরীক্ষা নেই যা মাসুদ খান করেননি; আর এই নিরীক্ষাগুলোও সফল। বাংলা কবিতায় তাঁর উল্লখযোগ্য অবদান ও কৃতিত্বের জন্য তাঁকে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারে (২০২৫) সম্মানিত করা হয়। তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাথী নন্দী।

Visit fish-roadgame.online for more information.

সাথী নন্দী: স্যার, কেমন আছেন আপনি? আমার দীর্ঘদিনের ইচ্ছা ছিল বা বলা যায়, স্বপ্ন ছিল আপনার সাক্ষাৎকার গ্রহণের। আজ সেই স্বপ্ন পূরণ হতে চলেছে। আমি কিন্তু আপনার লেখার অনেক বড় ভক্ত!

মাসুদ খান: আমি ভালো আছি সাথী। আশা করি, আপনিও ভালো আছেন। আমি জানি, আপনি আমার লেখালেখির একজন সমঝদার ও অনুরাগী পাঠক। আমার লেখা নিবিড়ভাবে পাঠ করে আসছেন অনেক বছর ধরে। অসংখ্য ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানবেন।

সাথী: প্রথমেই জানতে চাই, আপনার কবিতা লেখার শুরুটা কীভাবে হলো? আপনার পরিবারে কি কেউ সাহিত্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন? এ বিষয়ে যদি বলেন।

মাসুদ: না, আমার পরিবারের কেউই সাহিত্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না কখনো; আর আমার উত্তর–প্রজন্মেরও কেউই যুক্ত নয়। আমার লেখালেখির শুরুটা মূলত আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে। তখন আমি প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। থাকি তিতুমীর হলে। মফস্‌সল শহর সিরাজগঞ্জ থেকে ঢাকায় এসেছি। আরও সুনির্দিষ্ট করে বললে, গ্রাম থেকে রাজধানীতে এসেছি। গ্রামে থাকতে সাহিত্য বলতে পাঠ্যপুস্তকে যেসব কবিতা বা গল্প থাকে, সেগুলোকেই বুঝতাম। তো সেই তিতুমীর হলে থাকত সহপাঠী শামসুল হুদা বাদল, যাকে আমি উৎসর্গ করেছি আমার প্রথম বইটি (পাখিতীর্থদিনে )। বাদল ছিল কবিতাপাগল। সে নিজে কবিতা লিখত না, কিন্তু পড়ত প্রচুর; পড়ে শোনাত, বন্ধুদের উদ্বুদ্ধ–অনুপ্রাণিত করত কবিতারাজ্যে বিচরণের ব্যাপারে। আগাগোড়া কবিতা-অন্তঃপ্রাণ একজন মানুষ সে। সে-ই আমার সামনে প্রথম খুলে দিয়েছিল কবিতারাজ্যের দিগন্ত। সে থাকত চারতলায়, আমি দোতলায়। জীবনানন্দ, শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, আবুল হাসান, শক্তি চট্টোপাধ্যায়…একেক দিন একেক বই খুলে মেলে ধরে কবিতা উচ্চারণ করতে করতে চারতলা থেকে সিঁড়ি দিয়ে দ্রুত নেমে আসত দোতলায়, আমার রুমে। তারপর চলত কবিতাপাঠ, কবিতা নিয়ে তুমুল আড্ডা। এসব দেখে হলের অন্য ছাত্ররা বলত, ‘পাগল’। সকালের নাশতার টাকা বাঁচিয়ে নীলক্ষেতের পুরোনো বইয়ের দোকানে গিয়ে কিনে আনত দেশ-বিদেশের নানা কবিতার বই—মূল বই, অনুবাদগ্রন্থ। সে সময়ে জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়সহ কোনো কোনো বাচিকশিল্পীর কবিতা আবৃত্তির অনুষ্ঠান হতো ঢাকার বিভিন্ন জায়গায়, ইউনিভার্সিটি পাড়ায়। বাদল আর আমি শুনতে যেতাম সেসব আবৃত্তি। ধীরে ধীরে বুঝলাম, কবিতার রাজ্য কত বিশাল। ইন ফ্যাক্ট, বন্ধু বাদলের সংস্পর্শে এসেই আমি উদ্বুদ্ধ হয়েছিলাম কবিতাচর্চায়। প্রথম কবিতা লিখি যখন আমি দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। দিয়েছিলাম এক আত্মম্ভরী নাম ‘আমি স্বতন্ত্র’। ছাপা হয়েছিল হলো ম্যাগাজিনে।

অবশ্য তারও অনেক আগে, যখন গ্রামে থাকতাম, স্কুলজীবনে, ষড়্ঋতু নিয়ে একটা কবিতা লিখতে চেষ্টা করেছিলাম, অন্ত্যমিলটিল দিয়ে। তখন তো ছন্দ বলতে কেবল ওই অন্ত্যমিলকেই বুঝতাম। যথারীতি হারিয়ে গেছে সেই কবিতা; কিন্তু ওই একবারই। বহুবছর আর চেষ্টা করিনি। তারপর বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে এসে ঘটছে সাহিত্যচর্চার সূত্রপাত আর সত্যিকার সাহিত্যচর্চা বলতে যা বোঝায় তার শুরু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করার পর, কর্মজীবনে পা দেওয়ার পর থেকে।

সাথী: আপনার শৈশব-কৈশোরের কথা মনে পড়লে কী কী স্মৃতি ভেসে ওঠে মনে? কেমন ছিল সেই দিনগুলো?

মাসুদ: আমার বাড়ি সিরাজগঞ্জে; কিন্তু জন্মেছি জয়পুরহাট জেলার ক্ষেতলালে, বাবার কর্মস্থলে। বাবার ছিল বদলির চাকরি। সেই সূত্রে আমার শৈশব কেটেছে বৃহত্তর বগুড়া জেলার বিভিন্ন জায়গায়। কোথাও বরেন্দ্র অঞ্চলের ঘন আঠালো লাল মাটি। কোথাও-বা বেলে দোআঁশ। আমার জন্ম ক্ষেতলালে হলেও পরে আমরা ছিলাম সোনাতলায়, পাশেই ছিল ‘বাঙ্গালী’ নদী। কথিত আছে, এটাই বাংলাদেশের একমাত্র নদী, যার একটা অংশ উত্তরবাহিনী। সোনাতলা রেলস্টেশনে এসে থামত আখবোঝাই উদলা মালগাড়ি, গন্তব্য মহিমাগঞ্জ চিনিকল। আমরা পিঠাপিঠি দুই ভাই আর কিছু বন্ধু মিলে সেই মালগাড়ি থেকে টেনে টেনে আখ বের করে আনতাম। পরে ডাকবাংলোর মাঠে বসে সেগুলো খেতাম। নরম আর সুমিষ্ট ছিল সেই আখ। সে সময় মনে মনে ভাবতাম, বড় হয়ে হবো আখচাষি। মনে পড়ে, বাবার যে তহশিল অফিস, মানে তিনি যেখানে চাকরি করতেন, সেই অফিসের লাগোয়া আমাদের যে বাসা, তার পাশে ছিল বেশ কিছু খালি জায়গা, সেখানে আখ চাষ করার জন্য বাবার কাছে আবদার জানিয়েছি, জেদও করেছি; কিন্তু কাজ হয়নি। বাবা সেখানে আখ চাষ না করে চিনাবাদাম চাষ করিয়েছিলেন একবার। তবে সেই চিনাবাদাম চাষ, পরিচর্যা ও শস্য সংগ্রহেও অংশ নিয়েছিলাম আমরা, ‘আখচোরা’ দুই ভাই।

মাসুদ খান
পূর্ববর্তী বাংলা কবিতার উত্তরাধিকার তো আমার কবিতার ওপরেও বর্তেছে। তবে এটা ঠিক, আমার কবিতায় অনেক ক্ষেত্রে উপমা-রূপক এসেছে প্রকৃতিবিজ্ঞানের নানা শাখা থেকে, জ্যোতিঃপদার্থবিদ্যা ও ব্রহ্মাণ্ডবিদ্যা থেকেও। আমার অনেক কবিতাই একধরনের মহাজাগতিক ও অধিবাস্তব ঘরানার কবিতা। যেকোনো তুচ্ছ, আটপৌরে বিষয়কে এক বড় প্রেক্ষাপটে, কখনো কখনো মহাজাগতিক প্রেক্ষাপটে, যুক্ত করা ও মিলিয়ে দেওয়ার একটা প্রবণতা, ভূমিকে ভূমার সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়ার একটা ঝোঁক আছে আমার কবিতায়—এ রকমটা বলে থাকেন কেউ কেউ।

দুই বছর পরে বাবার পোস্টিং হলো পাঁচবিবি থানার শিরট্টি তহশিল অফিসে। অফিস ও বাসা একই কম্পাউন্ডে, সোনাতলার মতোই। মাটির দেয়াল দিয়ে ঘেরা বড় এক কম্পাউন্ড। কম্পাউন্ডের মধ্যে দেয়াল ঘেঁষে মাঝেমধেই আতাফলের গাছ। ফলের মৌসুমে পাতার ফাঁক দিয়ে উঁকি দিত পরিণত সব আতাফল। সেই ফল তুলে এনে চালের বস্তার মধ্যে রেখে দিতাম আমরা। পেকে যেত দু-এক দিনের মধ্যেই। খুব সুস্বাদু একটি ফল এই আতা। দাদা (পিতামহ) বলতেন, এমনকি মা-ও বলতেন, এই ফল বেহেশতের ফল। একমাত্র স্বর্গীয় ফল, যার নমুনা দেখানো হয়েছে ইহলোকে, এই দুনিয়ায়। বহুবছর পরে শৈশবের সেই আতাসংক্রান্ত স্মৃতির অনেকটা প্রতিফলন ঘটেছে আমার ‘আতাফল’ কবিতায়।

শিরট্টি থেকে দুই মাইল দূরে মাধাইনগর হাইস্কুল। আমরা দুই ভাই মিলে হেঁটে হেঁটে যেতাম সেই স্কুলে। মর্নিং স্কুল। ফিরতামও হেঁটে হেঁটে তাপক্লান্ত প্রখর দুপুরে। পথিমধ্যে হাঁটুভাঙা ব্রিজের পাশের বিশাল পাকুড়গাছের ছায়ায় বসে অনেকক্ষণ জিরিয়ে নিতাম দুই ভাই। এখনো মনে পড়ে, বাতানুকূল সেই পাকুড়গাছের ছায়া ছিল ঘননিবিড় আর তার নিচ দিয়ে বয়ে যাওয়া ঠান্ডা মিলমিলে বাতাস জুড়িয়ে দিত আমাদের রোদে পোড়া, ঘামে ভেজা দেহ–মন। ঘুম এসে যেত যথারীতি; আর কেমন যেন অলৌকিক অলৌকিক লাগত সেই ছায়াপ্রদ, সমীরণপ্রজ গাছটিকে।

আমার কৈশোর কেটেছে আমাদের গ্রামের বাড়িতে, সিরাজগঞ্জের মেছড়া গ্রামে। উত্তাল যমুনার পশ্চিম পারে। বর্ষায় সে নদী হয় প্রমত্ত, ভেঙে ভাসিয়ে নিয়ে যায় বসতভিটা, ফসলি জমি। শুকনা মৌসুমে নদীর বুক জুড়ে খাঁ খাঁ বালুচর। কয়েকবার ভেঙেছে আমাদের বসতভিটা। আমরাও সরে সরে গেছি ক্রমে পশ্চিমে। আবার নদীর পূর্ব পাশে জেগে ওঠে চর। সেই চরে বাথানবাড়ি বানিয়ে চলে কৃষিকাজ। যমুনা নদীতে সাঁতারকাটা, মাছ ধরা, নৌকা বাওয়া, খেয়ানৌকায় নদী পার হয়ে চরের বাথানবাড়িতে যাওয়া, ফসল ফলানো…কত যে স্মৃতি জড়িয়ে আছে নদীর সঙ্গে! সবই জীবনসংগ্রামের, তবে সুখস্মৃতি।

যমুনা যেন আমার অলটার-ইগো। একবার ভাদ্র মাসে আমরা দুই ভাই আর এক ফুফাতো ভাই মিলে ছোট্ট একটি ডিঙিনৌকায় করে গরু-বাছুরের জন্য কাশ-ঘাস কাটতে গিয়েছিলাম সদ্য-জেগে-ওঠা এক অস্থায়ী চরে। ফেরার পথে নদী পাড়ি দিতে গিয়ে পড়ি ঝড়ের কবলে। যমুনায় জেগে ওঠে বড় বড় উথালপাতাল ঢেউ। তার ওপরে বৃষ্টিতে সবকিছু ঝাপসা। পরে একরকম অলৌকিকভাবে নৌকাডুবিতে নির্ঘাত মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে ফিরেছিলাম সে-যাত্রায়। সেই সম্ভাব্য সলিলসমাধির স্মৃতিও আমার কাছে একপ্রকার সুখস্মৃতি। নদীর সঙ্গে আমার সম্পর্ক একদিকে এরকমই কঠিন ও বাস্তবিক, অপর দিকে নিগূঢ় আত্মিক। আধ্যাত্মিকও।

সাথী: এই যে দীর্ঘ বছর ধরে বিদেশে জীবনযাপন করছেন অন্য সংস্কৃতি, অন্য ভাষাভাষী মানুষদের মাঝে—এই অনুভূতিটা কেমন? লেখার প্রেরণা কীভাবে মেলে?

মাসুদ: এখানকার সংস্কৃতিটা মিশ্র, সেই সঙ্গে এ ব্যাপারে আমার অনুভূতিটাও মিশ্র। তবে একদিক থেকে বলা চলে, মোটামুটি বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির মধ্যেই বাস করি আমি। টরন্টোতে যে এলাকায় থাকি, সেটা বাংলাপাড়া। ঘরে তো বটেই বাইরেও কমবেশি বাংলা কথা, বাংলা দোকান, বাংলা খাবার, বাংলা স্বভাব, বাংলা চালচলন। আর এই আন্তর্জালিক যোগাযোগের জগতে, ফেসবুক ও ইউটিউবের জগতে, পৃথিবীর যে কোনো স্থানাঙ্ক থেকেই নিজ সংস্কৃতির মধ্যেই বসবাস করা সম্ভব, অন্তত ভার্চুয়ালি। অবশ্য কর্মক্ষেত্র, রাস্তাঘাট, মার্কেট, শপিং মল, থিয়েটার, পাবলিক ট্রান্সপোর্ট—এসব জায়গায় তো এখানকার সংস্কৃতির মুখোমুখি হতেই হয়। তবে আমি এখানকার মূলধারা সাহিত্য-সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে যাওয়ার যে চেষ্টা, তা কখনো করতে যাইনি বা করা হয়ে ওঠেনি।

সাথী: আপনার কবিতার প্রবণতা-বৈশিষ্ট্যসমূহ পূর্ববর্তী বাংলা কবিতা থেকে ব্যতিক্রমধর্মী— ভাবনাচিন্তার এই ব্যতিক্রমতা সম্পর্কে কী বলবেন?

মাসুদ: খুব কি ব্যতিক্রমী? পূর্ববর্তী বাংলা কবিতার উত্তরাধিকার তো আমার কবিতার ওপরেও বর্তেছে। তবে এটা ঠিক, আমার কবিতায় অনেক ক্ষেত্রে উপমা-রূপক এসেছে প্রকৃতিবিজ্ঞানের নানা শাখা থেকে, জ্যোতিঃপদার্থবিদ্যা ও ব্রহ্মাণ্ডবিদ্যা থেকেও। আমার অনেক কবিতাই একধরনের মহাজাগতিক ও অধিবাস্তব ঘরানার কবিতা। যেকোনো তুচ্ছ, আটপৌরে বিষয়কে এক বড় প্রেক্ষাপটে, কখনো কখনো মহাজাগতিক প্রেক্ষাপটে, যুক্ত করা ও মিলিয়ে দেওয়ার একটা প্রবণতা, ভূমিকে ভূমার সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়ার একটা ঝোঁক আছে আমার কবিতায়—এ রকমটা বলে থাকেন কেউ কেউ। কেউ কেউ বলেন, আমার কবিতা কজমিক, কেউ-বা বলেন কজমো-মেটাফিজিক্যাল। সেই দিক থেকে বিবেচনা করলে কিছুটা ব্যতিক্রমী বলতে পারেন বইকি।

মাসুদ খানের ‘আঁধারতমা আলোকরূপে তোমায় আমি জানি’ বইয়ের প্রচ্ছদ
আমি প্রায়ই ভাবি, আমাদের এ অঞ্চল যদি উপনিবেশিত না হতো, তবে সমাজবিকাশের স্বাভাবিক ধারায় বাংলা কবিতা, বাংলা কথাসাহিত্য এখন, এই একবিংশ শতকে এসে কী রূপ পরিগ্রহ করত, কীরূপ হতো তার গতিপথ? তা কি এই রকমই হতো, যেভাবে আমরা এখন লিখি? নিশ্চয়ই না। যদিও প্রশ্নটা হাইপোথেটিক্যাল, তবু এই প্রশ্নটা মাথায় রেখে আমি কাজ করার চেষ্টা করি। বাংলার বাগ্ভঙ্গিমা, বাগ্‌ধারা, ছন্দভঙ্গি, অলংকার, বাংলার আচার ও ব্রত, বাংলার ভাব ও দর্শন, বাংলায় প্রচলিত ও আচরিত যেসব ধর্মপুরাণ, লোকপুরাণ, রূপকথা, উপকথা… সেসবেরই প্রতিফলন ঘটাতে চাই আমার কবিতায়।

সাথী: ইউরোপীয় ধ্যানধারণা কিংবা পাশ্চাত্যের অনুকরণে মানুষ ভুলেই যাচ্ছে বাংলার সংস্কৃতি, মিথ ও পুরাণ; সেখানে দাঁড়িয়ে আপনি আবহমান বাংলার কাব্য ধারাবাহিকতাকে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন—এটা কীভাবে সম্ভবপর করে তুললেন? আপনার মনোভাবটা জানতে চাই।

মাসুদ: আমার কবিতা তো আধুনিক (পশ্চিমা আধুনিকতাবাদী অর্থে) কবিতাই—প্রবণতা, বৈশিষ্ট্য, গড়নপ্রকৃতি… সব অর্থেই। তার নপরও যেহেতু বাংলা ভাষায় লিখি আর পাটাতনটাও আবহমান বাংলা কাব্যের, তাই কবিতায় স্বাভাবিকভাবেই প্রতিফলিত হয়েছে বাংলা কাব্যধারারই ছন্দ ও অলংকার, এসেছে বাংলার সংস্কৃতি, ভাবকথা ও পুরাণের উদ্ভাস, নানাভাবে, নানা রূপে। শুধু যে বাংলার ভাবকথা ও পুরাণ, তা-ই নয়, রয়েছে ভারতীয়, সেমেটীয় ও প্রতীচ্য পুরাণকথার নানা ব্যবহার।

সাথী: আসলে আপনি কবিতার মধ্য দিয়ে খুঁজে চলেন ধারাবাহিকতার ছিন্নসূত্র—এটা যদি স্পষ্ট করে বলেন?

মাসুদ: এই বিশ্ব ধারাবাহিকভাবেই অগ্রসরমান। প্রকৃতিতে কিংবা বাস্তবতায় নেই কোনো ছিন্নসূত্র, আছে নিরন্তর ইভোল্যুশন। বিশ্বপ্রকৃতি ও বাস্তবতা ক্রমবির্বতনশীল। জীবন ও জগতের সবকিছু তো আর মানুষ আবিষ্কার বা উন্মোচন করে উঠতে পারেনি এখনো। বিশ্বপ্রকৃতির অনুন্মোচিত অংশটুকুকে তাই বলা হয়ে থাকে মিসিং লিংক। উন্মোচিত হয়নি, তাই মনে হয় যেন ছিঁড়ে গেছে ধারাবাহিকতা। আসলে কি তা-ই? জীবন ও জগৎ এক জিগ-স’ পাজল। সেই পাজলের যেখানে যেখানে ধারাবাহিকতা ছিন্ন হয়ে গেছে বলে মনে হয়, সেই মিসিং অংশগুলোর মধ্যে কবি–সাহিত্যিক–শিল্পীরা খুঁজে ফেরেন যোগসূত্র আর তাঁদের কল্পনা ও সৃজনীশক্তি দিয়ে গড়ে তুলতে চান সেতুবন্ধ। এই মিসিং অংশ, এই যোগসূত্র-ছিন্ন অংশ আর অসংগতি-বিসংগতি-অমসৃণতা আছে বলেই সেগুলো পূরণ করে দিতে যুগ যুগ ধরে মানবমন সৃজন করে চলেছে নানা নন্দনশিল্প। শুধু আমি নই, সব শিল্পী-সাহিত্যিকই মূলত তা-ই করেন।

আর ধারাবাহিকতা বলতে যদি আবহমান বাংলা কবিতার ধারাবাহিকতা বুঝিয়ে থাকেন, তাহলে বলব— হ্যাঁ, স্বাভাবিক ধারাবাহিতায় বিচ্যুতি ঘটেছিল উপনিবেশিত হওয়ার কারণে। ঔপনিবেশিক শাসনবাহিত যে আধুনিকতা, তার প্রভাব কমবেশি সব ক্ষেত্রেই পড়েছিল, সমাজ, রাজনীতি, দর্শন, শিক্ষা, সাহিত্যসংস্কৃতি সব এলাকাতেই। পশ্চিমা আধুনিক সাহিত্য ও তত্ত্বের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে বাংলা সাহিত্য। এটা বাস্তবতা। তবে আমার কাছে প্রায়ই মনে হয়েছে, এই আধুনিকতা তো আমাদের সমাজকাঠামোর স্বাভাবিক বিকাশের ধারায় আসেনি, এসেছে ঔপনিবেশিক শাসনের মাধ্যমে। এটা অনেকটাই কৃত্রিম।

কারণ, শিল্পবিপ্লব ও পুঁজিতন্ত্রের ভিতের ওপর যখন দাঁড়াতে শুরু করেছে পশ্চিম, তখন তার উপরিকাঠামো হিসেবে সেখানে দেখা দিয়েছে আধুনিকতাবাদ; যা কিনা আবার উপনিবেশ ও সাম্রাজ্যবাদ প্রতিষ্ঠার সহায়ক শক্তি হিসেবেও কাজ করেছে; কিন্তু আমাদের এখানকার সমাজ তো সেই ঐতিহাসিক কালপর্বের মধ্য দিয়ে যায়নি, সমাজের বেসিক স্ট্রাকচার তো এখনো সে রকম হয়নি; অথচ সুপার স্ট্রাকচারে আমরা একরকম কৃত্রিমভাবেই গ্রহণ করেছি পশ্চিমের আধুনিকতাকে। আমি প্রায়ই ভাবি, আমাদের এ অঞ্চল যদি উপনিবেশিত না হতো, তবে সমাজবিকাশের স্বাভাবিক ধারায় বাংলা কবিতা, বাংলা কথাসাহিত্য এখন, এই একবিংশ শতকে এসে কী রূপ পরিগ্রহ করত, কীরূপ হতো তার গতিপথ? তা কি এই রকমই হতো, যেভাবে আমরা এখন লিখি? নিশ্চয়ই না। যদিও প্রশ্নটা হাইপোথেটিক্যাল, তবু এই প্রশ্নটা মাথায় রেখে আমি কাজ করার চেষ্টা করি। বাংলার বাগ্ভঙ্গিমা, বাগ্‌ধারা, ছন্দভঙ্গি, অলংকার, বাংলার আচার ও ব্রত, বাংলার ভাব ও দর্শন, বাংলায় প্রচলিত ও আচরিত যেসব ধর্মপুরাণ, লোকপুরাণ, রূপকথা, উপকথা… সেসবেরই প্রতিফলন ঘটাতে চাই আমার কবিতায়। আরও অনেকে তা-ই করেন। হ্যাঁ, সেই অর্থে বলতে পারেন, খুঁজে চলি ধারাবহিকতার যোগসূত্র। আবার একই সঙ্গে সমকালীন বিশ্বসংস্কৃতি ও দর্শনের সঙ্গেও ধরে রাখতে চাই সংযোগ।

সাথী: আপনার কবিতায় ছড়িয়ে আছে প্রাগৈতিহাস, প্রত্ন–ইতিহাস, ইতিহাসচেতনা; আর এই সবই গড়ে ওঠে মিথসংলগ্নতায়, পুরাণকথায়, ধর্মীয় উপাখ্যানে, বিবর্তনকামী নৃতত্ত্বমনস্কতায়। এগুলো আপনার মধ্যে কীভাবে এলো?

মাসুদ: এগুলো সম্ভবত এসেছে অধীত বিদ্যা থেকে, সামাজিক মিথস্ক্রিয়া থেকে, শৈশবে দাদির কাছে, মায়ের কাছে শোনা লোককাহিনি ও ধর্মীয় উপাখ্যান থেকে। আমার প্রথম বইয়ে বেশি এসেছে এসব। আশির দশকে লিটল ম্যাগাজিন-কেন্দ্রিক আমাদের একটা সাহিত্যপ্রজন্ম গড়ে ওঠে। আমরা তখন সবেমাত্র লিখতে এসেছি। সে সময়ে বাংলাদেশে পপকর্নের মতো একধরনের কবিতার আধিপত্য ছিল। ব্যতিক্রমধর্মী কবিতাও যে লেখা হতো না; তা নয়, তবে সেগুলো ছিল সংখ্যায় অল্প। দৈনন্দিন জীবনের উপরিতলের শোভা অবলোকন; আর তা থেকে তাৎক্ষণিকভাবে উৎপন্ন একধরনের ফেনানো, আড়ালহীন, পুনরাবৃত্তিমূলক, ফিরিস্তিবহুল ও প্রতিবেদনধর্মী কবিতারই রাজত্ব তখন। সত্যি বলতে কি, সেসব কবিতায় ক্লান্ত ও বিবমিষ হয়ে পড়েছিলাম আমরা।

সেই প্রেক্ষাপটে, কবিতায় রূপবদল ঘটাবার অভিপ্রায়ে একরকম বিদ্রোহ হিসেবেই আমরা লিখতে শুরু করি অন্য ধরনের কবিতা—ভাব, ভাষা, শৈলী, গড়ন…সবকিছু মিলিয়েই অন্য ধরনের। বলা যায়, একরকম প্রতিজ্ঞাই করেছিলাম, শামসুর রাহমান-প্রবর্তিত ও সে–সময়ে ব্যাপকভাবে প্রচলিত যে প্রতিবেদনধর্মী, তালিকাবয়নমূলক কবিতাধারা, সে রকমটি আর লিখব না। আমাদের কবিতায় এল বাক্‌সংযম, কবিতা হয়ে উঠল ঘনবদ্ধ, ব্যঞ্জনা ও ইশারাপূর্ণ। এবং সেই সূত্রেই বিষয়বস্তুতেও আসতে থাকল ভিন্নতা—প্রাগৈতিহাস, প্রত্ন-ইতিহাস, পুরাণ, বিজ্ঞান ও মহাজাগতিক বিষয়–আশয়।

মাসুদ খানের ‘এই ধীর কমলাপ্রবণ সন্ধ্যায়’ বইয়ের প্রচ্ছদ
ভাষার সর্বোত্তম ব্যবহার ঘটে কবিতায়। নতুন নতুন শব্দ ও শব্দবন্ধ তৈরি, প্রথাগত এমনকি একেবারে ক্লিশে হয়ে যাওয়া শব্দের অপ্রথাগত ব্যবহার, শব্দ থেকে অভিধানসিদ্ধ অর্থের অতিরিক্ত অন্য অর্থ নিষ্কাশন, নতুন নতুন উপমা-উৎপ্রেক্ষা সৃজন, একটি বস্তু বা বিষয়ের রূপ ও গুণ অপর বস্তু বা বিষয়ের ওপর আরোপণ অর্থাৎ মেটাফর…নতুন নতুন মেটাফর সৃজন, এসবই তো ঘটে কবিতায়।

সাথী: লোকপুরাণ, ধর্মপুরাণ, সাহিত্যপুরাণ, প্রাচ্য, প্রতীচ্য, সেমেটিক পুরাণ—এসবই আপনি দুই হাতে ব্যবহার করেছেন আশ্চর্য কুশলতায়, এর পেছনের রহস্যটা আসলে কী?

মাসুদ: কবিতা প্রকৃতিগতভাবেই সংশ্লেষণধর্মী। বিচিত্র বিষয়ের সমাবেশ তো থাকবেই তাতে। উপমা, রূপক ও চিত্রকল্প সৃজনের জন্য যখন যে বিষয়কে উপযুক্ত ও অপরিহার্য মনে হয়, তাকেই ব্যবহার করার চেষ্টা করি। তবে তা ‘আশ্চর্য কুশলতায়’ করতে পেরেছি কি না, সেটা বলতে পারছি না।

সাথী: আপনি চলিত ভাষার বদ্ধমাত্রিক শব্দগুলোর সুন্দরতম ব্যবহারে বাংলা ছন্দে বৈচিত্র্য এনেছেন বা বলা চলে শব্দসন্ধির মাধ্যমে তৈরি করেছেন নতুন বাক্‌স্পন্দন। শব্দসন্ধির বিনির্মাণ সম্পর্কে কী বলতে চাইবেন?

মাসুদ: এক পর্বের বদ্ধধ্বনি উপচে গিয়ে অন্য পর্বে গিয়ে পড়া; কিংবা ব্যঞ্জনান্ত শব্দ পরের শব্দের স্বরধ্বনিকে শুষে নিয়ে স্বরান্ত শব্দ বনে যাওয়া, স্থানে স্থানে বাক্‌যতি আর ছন্দযতির মধ্যে টানাপড়েন সৃষ্টি, মানে, বাক্‌যতি যেখানে থামতে বলে, ছন্দযতি সেখানে গিয়ে না পড়ে, পড়ে অন্য জায়গায়। অর্থাৎ বাক্‌যতি আর ছন্দযতির সমাপতন না ঘটা…এসব তো আমার কবিতায় আছেই (বিশেষ করে মাত্রাবৃত্ত ও স্বরবৃত্তে লেখা কবিতায়), অনেকেরই কবিতায় আছে এগুলো; আর অক্ষরবৃত্ত ও গদ্যের চাল মিলেমিশে যাওয়া একপ্রকারের ছন্দস্পন্দই হচ্ছে আমার অপরাপর কবিতাসমূহের বাহন। একবারে টায়-টায় নিখুঁত অক্ষরবৃত্তের কবিতা আমার কমই আছে।

সাথী: মাসুদ খানের কবিতা ছন্দের ও ছন্দহীনতার। দুই ক্ষেত্রেই আপনি সমান পারদর্শী। এ ব্যাপারে আপনি কী বলবেন?

মাসুদ: এ ব্যাপারে ওপরে কিছুটা বলেছি। আমাদের কথা বলার মধ্যে একপ্রকার সহজ ছন্দ আছে—বাক্‌প্রক্ষেপণটা কেমন হওয়া উচিত, কখন কোথায় কতটুকু ঝোঁক বা স্ট্রেস দিতে হবে, কোথায় কতটুকু বাক্‌যতি পড়বে, কোন জায়গায় ইনটোনেশনের কী প্রকার ওঠানামা হবে, কোথায় স্বর-প্রলম্বন বা স্বর-সংকোচন ঘটবে, বাক্প্রবাহের তাল-লয় কেমন হবে, অজান্তে সেসব মেনেই তো কথা বলি আমরা, সেই সঙ্গে জেসচার বা অঙ্গভঙ্গি তো আছেই—তবেই-না পরিস্ফুট হয়ে হঠে আমাদের মনের ভাব। যোগাযোগ ঘটে অন্যের সঙ্গে।

এ তো গেল বাচনিক ভাষার কথা; কিন্তু কবিতা তো লেখ্য (বাচিকও বটে), সেখানে বাক্প্রবাহের এই সহজ চলনটা, সহজাত ছন্দটা কীভাবে প্রতিফলিত হবে, সেটা সত্যিই চ্যালেঞ্জের বিষয়। কবিতায় এই কাজ সম্পন্ন হয় মূলত লাগসই শব্দের লাগসই বিন্যাসের মাধ্যমে অর্থাৎ কোলরিজ-কথিত ‘বেস্ট ওয়ার্ডস ইন দ্য বেস্ট অর্ডার’। শব্দের পারস্পরিক অবস্থান বদল, ধ্বনিগত অনুপ্রাসযুক্ত শব্দগুলোর আপেক্ষিক অবস্থান, মুক্তাক্ষর ও বদ্ধাক্ষরযুক্ত শব্দাবলির সুচারু বিন্যাস, পঙ্‌ক্তিসজ্জা ও যতিচিহ্নের বিশেষ ব্যবহার এসবের মাধ্যমে সাধিত হয় সেই সহজাত ছন্দ।

একটি কথা কতরকম বিন্যাসেই-না বলা যায়, লেখা যায়! বাংলা ভাষায় এই ফ্লেক্সিবিলিটি বা নমনীয়তা অনেক বেশি। যেমন ‘আমি নীরবে তোমাকে ভালোবেসে যাই’—এই একটি সাধারণ কথার শব্দগুলো কতভাবেই যে বিন্যস্ত হতে পারে! যেমন ‘আমি তোমাকে ভালোবেসে যাই নীরবে’, ‘ভালোবেসে যাই আমি তোমাকে নীরবে’, ‘বেসে যাই ভালো নীরবে তোমাকে আমি’…এ রকম নানা বিন্যাস ও সমাবেশ। এমনকি সব কটি বিন্যাসে ঊহ্য রাখা যায় ‘আমি’ শব্দটি। সে ক্ষেত্রে আবার ক্রিয়াসম্পাদক হিসেবে ‘আমি’ কিংবা ‘আমরা’ যেকোনোটিকেই বোঝায়; আসে ভাবের দ্ব্যর্থকতা। এ ছাড়া কথাটির মাঝখানে কোথাও যতিচিহ্ন দিলে (যেমন ‘তোমাকে, ভালোবেসে যাই নীরবে’) তৈরি হয় নতুন ব্যঞ্জনা।

এই প্রতিটি বিন্যাসেই যেমন রয়েছে ভাবব্যঞ্জনার সূক্ষ্ম তারতম্য; তেমনি রয়েছে এগুলোর নিজস্ব সহজাত ছন্দ। এই ছন্দ প্রথাগত দলবৃত্ত, কলাবৃত্ত কিংবা অক্ষরবৃত্ত নয়; সেই অর্থে হয়তো ছন্দহীনতাই…, তবে এ–ও তো একপ্রকার ছন্দ, কী বলা যায়, বাক্স্পন্দের সহজাত ছন্দ।

হ্যাঁ, ঠিকই বলেছেন, আমার কবিতা প্রথাগত ছন্দ ও ছন্দহীনতার। সব আধুনিক কবির কবিতাই তো কমবেশি তা-ই। এ ক্ষেত্রে আমি বিশেষ কোনো পারদর্শিতা বা অপারদর্শিতার দাবিদার নই।

সাথী: আপনার কবিতার উপমা ও রূপকল্প বাংলা শব্দভান্ডারে একাধিক নতুন শব্দবন্ধ সংযুক্ত করেছে— আর এসবই মৌলিক। যেমন আলকাতরার জলাশয়, কীটপুত্র, ক্রোমোজোমের উল্লাস, সাদা হিংসা, ছাইরঙা সন্ন্যাস, অগ্নিপাহাড় প্রভৃতি। আপনার কবিতায় এই উপমা ও রূপকের ব্যবহার সম্পর্কে জানতে চাই?

মাসুদ: ভাষার সর্বোত্তম ব্যবহার ঘটে কবিতায়। নতুন নতুন শব্দ ও শব্দবন্ধ তৈরি, প্রথাগত এমনকি একেবারে ক্লিশে হয়ে যাওয়া শব্দের অপ্রথাগত ব্যবহার, শব্দ থেকে অভিধানসিদ্ধ অর্থের অতিরিক্ত অন্য অর্থ নিষ্কাশন, নতুন নতুন উপমা-উৎপ্রেক্ষা সৃজন, একটি বস্তু বা বিষয়ের রূপ ও গুণ অপর বস্তু বা বিষয়ের ওপর আরোপণ অর্থাৎ মেটাফর…নতুন নতুন মেটাফর সৃজন, এসবই তো ঘটে কবিতায়। যে শব্দবন্ধগুলোর উল্লেখ করেছেন, সেগুলো সবই আমার প্রথম দিকের লেখা একটি কবিতা থেকে নেওয়া। তবে কতটাই-বা মৌলিক এই শব্দবন্ধগুলো!

মাসুদ খানের ‘দেহ-অতিরিক্ত জ্বর’ বইয়ের প্রচ্ছদ
হ্যাঁ, বলতে পারেন, এক অর্থে তা-ই—কোনো কিছুকে পরিচিত রূপক দিয়ে না ধরে অপ্রথাগত, অপরিচিত রূপকে ধরার চেষ্টা। যেমন প্রথম বইয়ের ‘পরমাণু’ কবিতায় পরমাণুর ভেতরকার গতিবিধিকে দেখাতে চেয়েছি রাধা-কৃষ্ণের প্রেম-উপাখ্যানের রূপকে। পরমাণুর ভেতরে রাধারূপী ইলেকট্রনকে প্রতিনিয়ত আকর্ষণ করে বনের নিউক্লিয়াসে থাকা কৃষ্ণরূপী প্রোটনের বাঁশির সুর। ইলেকট্রনের মন সারাক্ষণ বাঁধা থাকে প্রোটনের প্রতি কিন্তু উনুনের রান্না, তদুপরি তার অবলোহিত কুলমর্যাদা…মিলিত হতে দেয় না ইলেকট্রনকে, প্রিয়তম প্রোটনের সঙ্গে।

সাথী: আপনার রচনায় চারণ, নিষাদ, ব্যাধ, শূদ্র, হরপ্পা, ধীবর, টোটেম প্রভৃতি প্রত্ন–ইতিহাস ও নৃবিজ্ঞান সংশ্লিষ্ট শব্দগুলো বারবার এসেছে। এগুলোর প্রতি কেন এত টান অনুভব করেন?

মাসুদ: মূলত আমার প্রথম বই পাখিতীর্থদিনের বিভিন্ন কবিতায় এসেছে এসব শব্দ। পরের বইগুলোতে তেমনটা আর নেই। হ্যাঁ, সেই সময়ে, সেই আশির দশকের মধ্য ও শেষভাগে আমরা (বিশেষ করে তখনকার লিটল ম্যগাজিনের কবিরা), কবিতাধারায় বাঁকবদলপ্রয়াসী তরুণ কবিরা এসব প্রত্ন ও নৃবিদ্যাসংশ্লিষ্ট বিষয়ের প্রতি ঝুঁকেছিলাম, প্রচল থেকে আলাদা হওয়ার জন্যই অনেকটা হয়তো।

সাথী: মহাভারত-এর চরিত্রগুলো আপনি কবিতায় ব্যবহার করেছেন। এমনকি যুধিষ্ঠিরের কুকুরও কবিতায় এসেছে। মহাভারত আপনার কতটা প্রিয়? একে আপনি কীভাবে দেখেন?

মাসুদ: কবিরা সর্বভুক। সব বিষয়ই তাঁদের প্রিয়। সেই অর্থে মহাভারত থেকে শুরু করে মহাবিশ্ব, মহাকাশ, মহাকাল—সবই আমার প্রিয় বিষয়। মহাভারত প্রাচীন ভারতের একটি সামগ্রিক দলিল। রাজনীতি, কূটনীতি, সমাজচিত্র, অর্থনীতি, যুদ্ধ, হিংসা, প্রতিহিংসা, রিরংসা, বাৎসল্য, জ্ঞাতিত্ব, শৌর্য, চাতুর্য, শঠতা, শোক, নিয়তি, কর্মফল, মানবজীবনের গূঢ় অর্থ, জীবনদর্শন সব বিষয়েরই যেন এক মহাকাব্যিক ডকুমেন্টশন।

সাথী: আমি যত দূর বুঝেছি, বিজ্ঞান আপনার চেতনাকাঠামোতে দাগ কেটেছে ভীষণভাবে। সে জন্যই হয়তো প্রিজম, ম্যাঙ্গানিজ, অকটেন, ঘর্ষবিদ্যুৎ, প্লাস্টিক, সিলিকন, ইলেকট্রন, স্পিডোমিটার, ট্রান্সপারেন্সি, পটাশিয়াম সায়ানাইড, ফার্নেস প্রভৃতি শব্দ বারবার ঘুরেফিরে আসে কবিতা নির্মাণের সময়। বিজ্ঞানের এসব শব্দের ব্যবহার সম্পর্কে জানতে চাই।

মাসুদ: এগুলো আমার প্রথম দিকের লেখালেখিতে বেশি এসেছে। পরবর্তীকালে কাজ করেছে এক ধরনের মহাজাগতিক চেতনা, কসমো-মেটাফিজিক্যাল চেতনা, সেই সঙ্গে মানুষ, প্রকৃতি, প্রেম ও সমাজচেতনাও। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আমি বিজ্ঞান ও প্রকৌশলের ছাত্র; আর ওই যে বলেছি, আমরা তখন নিমগ্ন ছিলাম কবিতাধারার রূপবদল তথা বাঁকবদল প্রয়াসে—নানা রকম পরীক্ষানিরীক্ষা ও ভাঙচুরে তখন আমরা অকাতর, বেহিসাব। শব্দব্যবহার, বিষয়বস্তু, শৈলী, ভাব ও ভাষা অর্থাৎ আধার ও আধেয়—সব দিক থেকেই চেয়েছিলাম পরিবর্তন আনতে। সেই ঝোঁক থেকেই হয়তো প্রথম প্রথম এসব শব্দের প্রতিফলন ঘটেছে আমার কবিতায়।

সাথী: নিঃসন্দেহে আপনি অত্যন্ত পরিশ্রমী একজন লেখক; কিন্তু আপনার এসব শব্দের ব্যবহার কি পরিচিত ভাষাকাঠামোকে অপরিচিতকরণের (ডিফ্যামিলিয়ারাইজ) জন্য?

মাসুদ: হ্যাঁ, বলতে পারেন, এক অর্থে তা-ই—কোনো কিছুকে পরিচিত রূপক দিয়ে না ধরে অপ্রথাগত, অপরিচিত রূপকে ধরার চেষ্টা। যেমন প্রথম বইয়ের ‘পরমাণু’ কবিতায় পরমাণুর ভেতরকার গতিবিধিকে দেখাতে চেয়েছি রাধা-কৃষ্ণের প্রেম-উপাখ্যানের রূপকে। পরমাণুর ভেতরে রাধারূপী ইলেকট্রনকে প্রতিনিয়ত আকর্ষণ করে বনের নিউক্লিয়াসে থাকা কৃষ্ণরূপী প্রোটনের বাঁশির সুর। ইলেকট্রনের মন সারাক্ষণ বাঁধা থাকে প্রোটনের প্রতি কিন্তু উনুনের রান্না, তদুপরি তার অবলোহিত কুলমর্যাদা…মিলিত হতে দেয় না ইলেকট্রনকে, প্রিয়তম প্রোটনের সঙ্গে।

‘একটি চিত্রিত হরিণের পেছনে একটি চিত্রিত বাঘ ছুটছে’ কবিতায় চিতাবাঘের তাড়া খাওয়া এক চিত্রল হরিণের দ্রুত প্লবগতি পলায়নদৃশ্যকে উপমিত করতে চেয়েছি অসিলোস্কোপে উদ্ভাসিত হাফ-সাইন-ওয়েভের সঙ্গে।

কিংবা ‘আপেল’ কবিতায় গাছের আপেলকে ডাকছে ধরিত্রী তার একেবারে গর্ভকেন্দ্রে চলে আসার জন্য। কিন্তু আপেল ঝরে না। সেটি ক্রমে পেকে উঠবে দিনে দিনে, তবেই-না ঝরে পড়বে ধরিত্রীর বুকে। একদিকে গাছ টেনে ধরে রাখে আপেলকে, অন্যদিকে ধরিত্রীও টানে তাকে। তবে অপেক্ষা করে ধীরা ধরিত্রী, হয়তো একটু এগিয়েও যায় আপেলের দিকে। তারপর একদিন বোঁটা–খসা ফল ঝরে পড়ে তার বুকে।

সাথী: আপনি শব্দ নির্বাচন, নতুন প্যারাডাইমিক শব্দের ব্যবহার নিয়ে এই যে প্রচুর চিন্তাভাবনা করে থাকেন, আমার কখনো মনে হয় আপনি কি তাহলে নির্মাণকেই বেশি প্রাধান্য দিচ্ছেন?

মাসুদ: প্রথম প্রথম নিরীক্ষা ও নির্মাণকেই প্রাধান্য দিতাম, হয়তোবা। পরে দ্বিতীয় বই থেকেই, ধীরে ধীরে সরে এসেছি। বিবর্তিত হয়েছে আমার কবিতা ক্রমে ক্রমে।

সাথী: আপনার প্রথম কাব্যগ্রন্থ পাখিতীর্থদিনে (১৯৯৩)। যার প্রথম কবিতাই হলো আমাদের কোচবিহার জেলার খুব কাছে অবস্থিত কুড়িগ্রাম নিয়ে। কবিতা থেকে কয়েকটা লাইন আমি বলছি। ‘সেই দেশে কুড়িগ্রামে, ওরা মাছরাঙা আর পানকৌড়ি, দুই বৈমাত্রেয় ভাই/ কুড়িগ্রামের সব নদী শান্ত হয়ে এলে/ দুইভাই নদী বুকে বাসা বাঁধে/ স্ত্রী পুত্র কন্যাসহ তারা কলহ করে’ এখানে বাস্তবতা এবং অবাস্তবতা, জগৎ এবং মহাজগৎ মিলেমিশে এক হয়ে গেছে। আপনার মুখে শুনতে চাই এর বিষয়, এর নির্মাণ সবটাই।

মাসুদ খানের ‘প্রজাপতি ও জংলি ফুলের উপাখ্যান’ বইয়ের প্রচ্ছদ
এই সেই কুহকশহর কুড়িগ্রাম। শহরবাঁধের ধারে কংক্রিটের বড় একটি ব্লকের ওপর একদিন এক তারাভরা বসন্তসন্ধ্যায় শুয়ে আছি চুপচাপ। চারদিকে ছোপ ছোপ অন্ধকার, হাওয়া ও নীরবতা। ওপরে নিখিল নভোভারতের রাজ্যে রাজ্যে তখন অন্ধকার ঝোপঝাড়ের মধ্যে জোনাকির মতো জ্বলছে–নিভছে ছড়ানো নক্ষত্ররাজি। এভাবে বেশ কিছুক্ষণ ধরে লীলালাস্য অবলোকন করছি নক্ষত্রজোনাকির। একসময় হঠাৎ ওজনহীনতার বোধ জাগে। যেন কুড়িগ্রাম তার আলাভোলা আধপাগলা ধরলাকে সঙ্গে নিয়ে ধরণির সব অভিকর্ষ ছিন্ন করে আস্তে আস্তে উঠে যাচ্ছে ওপরে।

মাসুদ: সময়টা সম্ভবত ১৯৯১ কিংবা ’৯২। অফিসের কাজে ঘুরে বেড়াচ্ছি উত্তর বাংলার বিভিন্ন এলাকায়—পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর, রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, নওগাঁ, নাটোর, রাজশাহী, বগুড়া ও সিরাজগঞ্জের বিভিন্ন পল্লিতে। এসব অঞ্চলের মৃত্তিকা কোথাও ঝুরঝুরে বেলে, কোথাও বেলে-দোআঁশ, আবার কোথাওবা শক্ত, আঠালো লালমাটি। মাঠের পর মাঠ—কখনো সবুজ, দিগন্তপ্রসারিত অবারিত সবুজ গালিচা; আবার কখনো ধূসর, ঊষর—পুরোনো, ময়লা, দাগদাগালিতে ভরা, দাগটানা মানচিত্রের মতো। মাঝেমধ্যে লোকালয়, জ্যোৎস্নায় ভিজতে থাকা কুঁড়েঘর, ভেঙে যাওয়া হাট, মেঠো পথ, পথের পাশে চায়ের দোকান। শেষ–শীতের শুষ্ক আবহাওয়া, রুক্ষ ভূপ্রকৃতি। এসবের মধেই হঠাৎ সুনীল শুশ্রূষার মতো দেখা মেলে কোনো পুষ্করিণীর কিংবা কোনো দিঘির। কাকচক্ষুকালো জল; লোকে শখ করে নাম দেয় ‘সাগর’— রামসাগর, নীলসাগর, জয়সাগর, হুরাসাগর। অথবা ময়দান আকারের কোনো দিঘি। ময়দানদিঘি। স্পষ্ট বরাভয়ের মতো বিরল দু-একটি নদী। শান্ত, শীর্ণকায়া, বালিবক্ষা, বঙ্কিমগতি। আঁকাবাঁকা গতিপথ। এই এলাকার নদীর নাম মহানন্দা, বেরং, ডাহুক, ঘাঘট, বুড়ি যমুনা, তিস্তা, ধরলা, করতোয়া, বাঙ্গালী, কালিন্দী, আত্রাই...।

সেই আদিগন্ত-সমতল ভূ-আয়তনের এক কোণে পড়ে আছে একটি শহর। কুড়িগ্রাম। অখ্যাত, নিরীহ, ছোট্ট ও ছিমছাম। ধরলা নদীর বাঁকে। সেই নদীর প্রবাহ ইস্পাত-পাতের মতো চকচকে ও ক্ষুরধার। এই সেই নদী যেখানে ফাঁদে পড়ে বগা কাঁদে আর বগী ঘুরে ঘুরে উড়তে থাকে তার চারপাশ ঘিরে। খুবই সাদামাটা, আটপৌরে এক বঙ্গশহর; কিন্তু অদ্ভুত এক মায়া ও কুহক সারাক্ষণ লেগে থাকে শহরটির গায়ে। সেখানকার ধরলা নদী সাড়া দেয় গ্রহ-উপগ্রহের আকুল আহ্বানে। উতলা হয়ে ওঠে। মাঝেমধ্যে ঝোড়ো হাওয়ার উসকানিতে বড় বড় ঢেউ তুলে বয়ে যায়।

বাস্তবতা এ পর্যন্তই। বাকিটুকু ফ্যান্টাসি—স্বপ্নে-পাওয়া।

সেই উত্তালতার পর নদী শান্ত হয়ে আসে যখন, তখন মাছরাঙা আর পানকৌড়ি, দুই বৈমাত্রেয় ভাই, বাসা বাঁধে নদীর বুকে। স্ত্রী–পুত্র–কন্যাসহ তারা কলহ করে। কুড়িগ্রামের বয়নকুশলী বাবুই পাখিরাও কি এক নাক্ষত্রিক কারণে থেকে থেকে ভুলে যায় বয়নসূত্র হঠাৎ; আর শাস্ত্রবাক্যে-বাঁধা যত গৃহনারী—বিবিধ বেড়া ও প্রাচীর ডিঙিয়ে এসে ভিড় করে দাঁড়ায় নদীকূলে। তখন কী যে সপ্রতিভ হয়ে ওঠে তারা! প্রকাণ্ড স্ফটিকের মতো সপ্রতিভ।

এই সেই কুহকশহর কুড়িগ্রাম। শহরবাঁধের ধারে কংক্রিটের বড় একটি ব্লকের ওপর একদিন এক তারাভরা বসন্তসন্ধ্যায় শুয়ে আছি চুপচাপ। চারদিকে ছোপ ছোপ অন্ধকার, হাওয়া ও নীরবতা। ওপরে নিখিল নভোভারতের রাজ্যে রাজ্যে তখন অন্ধকার ঝোপঝাড়ের মধ্যে জোনাকির মতো জ্বলছে–নিভছে ছড়ানো নক্ষত্ররাজি। এভাবে বেশ কিছুক্ষণ ধরে লীলালাস্য অবলোকন করছি নক্ষত্রজোনাকির। একসময় হঠাৎ ওজনহীনতার বোধ জাগে। যেন কুড়িগ্রাম তার আলাভোলা আধপাগলা ধরলাকে সঙ্গে নিয়ে ধরণির সব অভিকর্ষ ছিন্ন করে আস্তে আস্তে উঠে যাচ্ছে ওপরে। উঠছে, উঠছে, মেঘ-মেঘান্তর ফুঁড়ে, বায়ুমণ্ডল ভেদ করে... কুড়িগ্রাম যেন এক অতিকায় পিরিচবাহন...দ্রুত ভেসে চলেছে হালকা হাওয়ার ভেতর দিয়ে, কখনো হাওয়াহীনতার, কখনো-বা এক পূর্বাপর ভয়েড ও ভ্যাকুয়াম-রাজের মধ্য দিয়ে। কাত হয়ে তাকিয়ে দেখি, নিচে এক ভয়াল-কালো গহ্বর। ভেসে চলেছি তো চলেছিই... একসময় লাল লাল বাষ্পের ঝাপটা এসে লাগল এক দমক...কেমন যেন একধরনের ঘ্রাণ! কী কী যেন দেখতে পাচ্ছি চকিত ঝলকে, কীসের যেন স্পর্শ, কীসের যেন আস্বাদ-উদ্ভাস! একযোগে ঘনিয়ে আসছে সবগুলো ইন্দ্রিয়; কিংবা স্থানবদল করে চলেছে তারা মুহুর্মুহু... এইমাত্র কোনো এক নক্ষত্র-জংশনকে শাঁই করে পাশ কাটিয়ে চলে গেল আমাদের এই পিরিচবাহন। কি জানি! এভাবে অনেকক্ষণ...কুড়িগ্রাম ভাসতে ভাসতে এত ওপরে উঠে যাচ্ছে যে দূরের ধরিত্রী থেকে হয়তো এই কুহকশহরকে মনে হচ্ছে আকাশের মুখে এক নিটোল তিলচিহ্ন। এক অপরিহার্য সৌন্দর্যবিন্দু।

যেন বয়ে চলেছে এক অপরূপ স্বপ্নভ্রমণের রাত্রি, এক অপূর্ব শোভামেরাজ... মোহ জেগে উঠছে, ভেঙে যাচ্ছে, ফের জেগে উঠছে, নিশিডাকে, রাত্রিচারিতায়। এক দুর্দান্ত এপিফ্যানি— মুহূর্তঝিলিকের মতো চকিত, গন্ধকাহিনির মতো স্নিগ্ধ।

‘কুড়িগ্রাম’ কবিতার প্রেক্ষাপটটি ছিল এরকমই বাস্তব ও অবাস্তব, জাগরণ ও স্বপ্নের দোলাচলে ভরা। যেন স্বপ্নমধ্যে উদ্‌যাপিত ভিন্ন উড্ডয়ন।

সাথী: আবার এই কাব্যগ্রন্থের ‘মৌমাছি’ কবিতায় বলছেন—‘যাবতীয় বিধিগ্রন্থ ভেদ করে যাক মূর্খ তির/ কড়িবর্গা দুলে ওঠো, কাঠামোতে ভয়াবহ চিড়/ খেয়ে ভেঙে যাও। রোগে বজ্রে হও পাটল কপিশ।/ কীটে ও কেন্নোয় হোক আমাদের মেটামরফসিস’—এ সম্পর্কে কিছু যদি বলেন…

মাসুদ: কবিতাটি অক্ষরবৃত্তে, অন্ত্যমিলযুক্ত। এটি আমার একবারে প্রথম দিকের লেখা। লেখাটির ভাব ও ভাষার ওপর পড়েছে তাই বোদলেয়ারীয় ঝাপটা।

মাসুদ খানের ‘প্রসন্ন দ্বীপদেশ’ বইয়ের প্রচ্ছদ
কবিতাচর্চার অভিজ্ঞতা থেকে এবং দেশ-বিদেশের নানা কবিতা ও কবিতাবিষয়ক লেখাপত্র পড়ে আমার মধ্যে ধীরে ধীরে এই উপলব্ধি জাগে যে কেবল নিরীক্ষা করে করে কিংবা গাঁথুনি দিয়ে দিয়ে হয় না কোনো ভালো কবিতা। কবিতার মধ্যে আবশ্যিকভাবে থাকতে হয় রুহদারি একটা ব্যাপার, যাকেই হয়তো বলা হয় ‘দুয়েন্দে’, যা কবিতার বিষয়বস্তু ও শৈলী—অতিরিক্ত এক অনির্বচনীয় সৌন্দর্য, যা আত্মার মতো ছাপিয়ে ওঠে কবিতার শরীরকে, তার আধার ও আধেয়কে। কবিতা আসলে হয়ে ওঠে—গাছের পাতা গজানোর মতো, ফুল ফুটে ওঠার মতো স্বতঃস্ফূর্তভাবে। নির্মাণ হয় না কবিতার, যা হয় তা হলো সৃজন, ফুল ফুটিয়ে তোলার মতো করে।

সাথী: আপনার দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ নদীকূলে করি বাস (২০০১)-এর মূল বিষয়ভাবনা নিয়ে যদি বলেন…

মাসুদ: আসলে কোনো একটি একক বিষয়ভাবনাকে কেন্দ্র করে লেখা হয়নি নদীকূলে করি বাস-এর কবিতাগুলো। বস্তুত আমার কোনো বই-ই সে রকম নয়। প্রথম বই প্রকাশের দীর্ঘ ৭–৮ বছর পরে প্রকাশিত হয় বইটি। বইটিতে তাই সংযোজিত হয়েছে নানা সময়ের নানা মেজাজের, নানা ঘরানার, নানা দৈর্ঘ্যের কবিতা।

আমার প্রথম বই পাখিতীর্থদিনে-তে ছিল ওজোগুণসম্পন্ন তৎসম শব্দের আধিক্য, বিষয়ের অতিবিমূর্তীকরণ, যুক্তিশৃঙ্খলার বেপরোয়া বিপর্যয়, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও প্রত্ন–ইতিহাসের আবহাওয়ায় নানা রকম পরীক্ষা–নিরীক্ষা। বইটিতে যতটা না প্রকৃতি ও মানুষের দেখা মেলে, তার চেয়ে অনেক বেশি দেখা মেলে বস্তু ও বস্তুকণার উদ্ভাস, ভাঙচুর ও বিকিরণ। পরবর্তীকালে স্পষ্টতই সরে এসেছি সেখান থেকে। বদল ঘটেছে আমার কাব্যভাবনায়। মনোযোগী হয়েছি প্রকৃতি, মানুষ এবং সমাজের দিকে, জল ও মাটির দিকে, একই সঙ্গে বিবেচনায় রেখেছি এই মহাবিশ্বের সাপেক্ষে তাদের অবস্থান ও তাৎপর্যের দিকটিও। আমার কাব্যভাষায় এসেছে সোশ্যাল ভোকাবুলারির শব্দ, বাগ্‌ধারা ও বাগ্ভঙ্গি। আবার পাশাপাশি কখনো কখনো এসেছে মহাজাগতিক ব্যঞ্জনা, এসেছে মরমি ও অধিবিদ্যক দ্যোতনা।

একই সঙ্গে মনোযোগী হয়েছি কবিতায় ভাব ও ভাষা, কনটেন্ট ও ফর্মের মধ্যকার সুসংগতি, সুষমা ও ভারসাম্যের বিষয়েও এবং কীভাবে স্বল্প ও সহজ কথায় অপেক্ষাকৃত গভীর ভাব-এর বিকিরণ ঘটানো যেতে পারে সেই বিষয়ে। বস্তুত প্রতিটি বইয়েই পাল্টে গেছি অল্প অল্প করে, ক্রমান্বয়ে। ধারাবাহিক বিবর্তনশীলতা ও বৈচিত্র্যই আমার কাব্যধারার অন্যতর বৈশিষ্ট্য।

নদীকূলে করি বাস বইটি মূলত পাখিতীর্থদিনে-র কবিতা আর পরবর্তীকালের পাল্টে যাওয়া কবিতাবলির মধ্যকার একটি সংযোগ সেতু।

সাথী: আপনার কাব্যভাবনার অভিমুখ অনেকটাই বদলে যায় তৃতীয় কাব্যগ্রন্থে এসে। যার নাম সরাইখানা ও হারানো মানুষ (২০০৬)—আপনার মধ্যে এই পরিবর্তনটা কীভাবে এল?

মাসুদ: প্রকৃতপক্ষে আমার কাব্যভাবনা বিবর্তিত হতে শুরু করে নদীকূলে করি বাস থেকেই—যেমনটা আগেই বলেছি ওপরের প্রশ্নের জবাবে। মূলত বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে সরাইখানা ও হারানো মানুষ-এ এসে।

কবিতাচর্চার অভিজ্ঞতা থেকে এবং দেশ-বিদেশের নানা কবিতা ও কবিতাবিষয়ক লেখাপত্র পড়ে আমার মধ্যে ধীরে ধীরে এই উপলব্ধি জাগে যে কেবল নিরীক্ষা করে করে কিংবা গাঁথুনি দিয়ে দিয়ে হয় না কোনো ভালো কবিতা। কবিতার মধ্যে আবশ্যিকভাবে থাকতে হয় রুহদারি একটা ব্যাপার, যাকেই হয়তো বলা হয় ‘দুয়েন্দে’, যা কবিতার বিষয়বস্তু ও শৈলী—অতিরিক্ত এক অনির্বচনীয় সৌন্দর্য, যা আত্মার মতো ছাপিয়ে ওঠে কবিতার শরীরকে, তার আধার ও আধেয়কে। কবিতা আসলে হয়ে ওঠে—গাছের পাতা গজানোর মতো, ফুল ফুটে ওঠার মতো স্বতঃস্ফূর্তভাবে। নির্মাণ হয় না কবিতার, যা হয় তা হলো সৃজন, ফুল ফুটিয়ে তোলার মতো করে।

সাথী: এই কাব্যগ্রন্থের ৫০টি কবিতাই ভিন্নধর্মী এবং আঙ্গিকও ভিন্ন। তবে টানা গদ্যভাষার যে প্রয়োগ আপনি করেছেন সে বিষয়ে যদি বলেন।

মাসুদ: ‘পঞ্চাশটি কবিতাই ভিন্নধর্মী এবং আঙ্গিকও ভিন্ন’, তা-ই কি? তা হয়তো নয়। তবে বিভিন্ন ভাবের বা দর্শনের এবং নানারূপ ছন্দ, নিশ্ছন্দ ও স্বাচ্ছন্দ্যের কবিতা আছে বইটিতে। আছে টানা গদ্যের কবিতা, আছে নানা রকম হ্রস্ব ও দীর্ঘ কবিতা। কিছু ঊনমানের কবিতাও আছে এ বইয়ে, (সব বইয়েই আছে কিছু কিছু) যেগুলো নিয়ে আমি নিজেও সন্তুষ্ট নই।

আমার প্রতিটি বইয়ের লেখাই বলতে গেলে কমবেশি বৈচিত্র্যধর্মী। এ কথা প্রযোজ্য আরও অনেক কবির কবিতার ক্ষেত্রেই। কবিতা (বা যেকোনো নন্দনশিল্প) হচ্ছে সৃজনকর্ম। প্রকৃতিজগতের সৃজনকর্মে যেমন থাকে বহু বৈচিত্র্য, বহু রং, বহু গন্ধ, বহু গতি ও সৌন্দর্য, তেমনই কবিতা বা শিল্পকর্মেও থাকে, থাকতে হয় বৈচিত্র্য ও সৌন্দর্য। আর আমি বরাবরই বৈচিত্র্যপ্রয়াসী। দেখবেন, একই বইয়ে যেমন আছে বিভিন্ন স্বাদগন্ধ আর বিভিন্ন গতির কবিতা, তেমনই আমার এক বই থেকে আরেক বইয়ের কবিতার ভাব-ভাষায়ও আছে ভিন্নতা ও বৈচিত্র্য।

টানা গদ্যভাষা এসেছে মূলত নানারূপ গতি ও প্রবাহের দ্যোতক হিসেবে। উঁচু ঝরনার পানিপ্রবাহ অভিকর্ষের অধীন, তাই তাদের গতি উল্লম্ব ও দ্রুত, আবার শীতের নিস্তরঙ্গ নদীর প্রবাহ ধীর ও অনুভূমিক। জলোচ্ছ্বাসের গতি একই সঙ্গে অনুভূমিক ও উল্লম্ব, দ্রুত ও ভয়াল। বসন্তবাতাসের গতি একরৈখিক ও গন্ধবহুল কিন্তু বাউরি বাতাসের গতি পাক-খাওয়া ও পাতাকুড়ানিয়া। নিরাক-পড়া গ্রীষ্মের দুপুরের সবকিছু মন্থর, সেই সঙ্গে ঢুলঢুলু চোখে মায়ের গল্প বলার গতিও মন্থর।

আমার লেখা টানা গদ্যের কোনো কবিতায় দেখবেন বৃষ্টিপতনের গতি ও ছন্দ (‘আষাঢ়’), আবার কোনো কবিতায় জলোচ্ছ্বাসের মারদাঙ্গা গতি ও গর্জন (‘জলোচ্ছ্বাস’), আবার কোনো কবিতায় অলস দুপুরে গল্প বলার সহজ মন্থরতা (‘ছক’ কিংবা ধরুন নদীকূলে করি বাস-এর ‘আতাফল’)…

সাথী: আপনি এই কাব্যগ্রন্থের একটি কবিতায় বলছেন যে—‘আজও দেশে দেশে কত লোক অভিমানে/ ঘর ছেড়ে একা কোথায় যে চলে যায়’—এর মূল বক্তব্যটা আসলে কী?

মাসুদ খানের ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’ বইয়ের প্রচ্ছদ
মানুষ বোঝে, জীবন একটাই এবং তা ক্ষণস্থায়ী। অন্যান্য প্রাণী তা বোঝে না, সেই ধরনের বোধশক্তি বা চৈতন্য নেই তাদের। তাই তাদের খেদ নেই, বিপন্নতা নেই, নেই বিষণ্নতা ও অতৃপ্তি। কিন্তু মানুষের আছে, কারণ সে চৈতন্যধারী। মানুষ নিরন্তর খুঁজে বেড়ায় জীবনের অর্থ ও তাৎপর্য। তাই তো উদ্ভব এত এত ধর্ম, পুরাণ, অধিবিদ্যা, রূপকথা, শিল্পকলা ও দর্শনের, যাদের ছায়ায় আশ্রয় নেয় চিরবিষণ্ন, চিরবিপন্ন মানুষ, মহাজগতের এই ঝাঁ–ঝাঁ-করা, পরিত্রাণহীন, রহস্য-রোদ্দুরের প্রহেলিকা থেকে বাঁচতে। অনেকে ঘুমিয়েও পড়ে ধর্ম ও পুরাণের ছায়ায়।

মাসুদ: এই দুটি পঙ্‌ক্তি ‘তুমি, তোমার সরাইখানা ও হারানো মানুষ’ কবিতার। কবিতাটিতে কল্পনা করা হয়েছে এক দিব্য সরাইখানার, যেখানে আহার ও আশ্রয় পায় পথভোলা, হারিয়ে যাওয়া মানুষ, অভিমান করে ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়া মানুষ, ভবঘুরে মানুষ, সংসার থেকে ছিটকে পড়া মানুষ, আর সেই সব মানুষ, হারিয়ে যাওয়াই যাদের ধর্ম, হারিয়ে পড়াতেই যাদের আনন্দ, যারা ‘স্বজনের ভয়ে দেশ থেকে দেশে ঘোরে’ আর স্বজনেরা যুগ যুগ ধরে খুঁজতে থাকে তাদের। মূলত সেই দিব্য সরাইখানারই এক অদৃশ্য, অনির্দেশ্য প্ররোচনায়, নদী–মাঠ–বায়ুর আহ্বানে হারিয়ে যাওয়ার গোপন উন্মাদনা জাগে ঘরে ঘরে, সংসারে সংসারে।

সাথী: বিষাদ, অতৃপ্তি, পুনর্জন্মের ইচ্ছা, আশাবাদ—প্রভৃতির মধ্য দিয়ে ঠিক কোন কথা বলতে চেয়েছেন এই কাব্যগ্রন্থে?

মাসুদ: মানুষ বোঝে, জীবন একটাই এবং তা ক্ষণস্থায়ী। অন্যান্য প্রাণী তা বোঝে না, সেই ধরনের বোধশক্তি বা চৈতন্য নেই তাদের। তাই তাদের খেদ নেই, বিপন্নতা নেই, নেই বিষণ্নতা ও অতৃপ্তি। কিন্তু মানুষের আছে, কারণ সে চৈতন্যধারী। মানুষ নিরন্তর খুঁজে বেড়ায় জীবনের অর্থ ও তাৎপর্য। তাই তো উদ্ভব এত এত ধর্ম, পুরাণ, অধিবিদ্যা, রূপকথা, শিল্পকলা ও দর্শনের, যাদের ছায়ায় আশ্রয় নেয় চিরবিষণ্ন, চিরবিপন্ন মানুষ, মহাজগতের এই ঝাঁ–ঝাঁ-করা, পরিত্রাণহীন, রহস্য-রোদ্দুরের প্রহেলিকা থেকে বাঁচতে। অনেকে ঘুমিয়েও পড়ে ধর্ম ও পুরাণের ছায়ায়। এতে কিছুটা হলেও তারা শান্তি পায়, কিছুটা হলেও কমে তাদের অস্থিরতা ও বিষণ্নতা। কারণ, তারা শান্তি পায় পরলোক বা পুনর্জন্মের কথা ভেবে, শান্তি পায় এই ভেবে যে জীবনের বিলয় নেই, মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে শেষ হয়ে যায় না সবকিছু।

জীবন বিলয়হীন, অবিনাশী—এই যে ভাবনা, সেটা কেউ ভাবে আক্ষরিক অর্থে, কেউ ভাবে রূপক অর্থে, আবার কেউ ভাবে বস্তু ও শক্তির অবিনাশিতা বা নিত্যতার সূত্রে।

আসলে কবিতায় যে ‘ঈশ্বর’, তা আসলে রূপকের ‘ঈশ্বর’, কবিতায় যে ‘পুনর্জন্ম’ বা ‘পরলোক’, তা রূপকাশ্রিত ‘পুনর্জন্ম’ বা ‘পরলোক’।

সাথী: চতুর্থ কাব্যগ্রন্থ আঁধারতমা আলোকরূপে তোমায় আমি জানির কবিতাগুলো ভাবে রোমান্টিক, আঙ্গিকে আধুনিক, ভাষা বা শব্দ ব্যবহারে অত্যাধুনিক এবং মেটাফিজিকস–এর মিশেলে বিস্ময়কর মিথস্ক্রিয়া লক্ষ করা যায়—আমি কী ঠিক বলছি?

মাসুদ: ভাবের দিক থেকে এ বইয়ের সব কবিতাই যে রোমান্টিক, তা নয়। তবে ‘কল্পনা’, যা কিনা রোমান্টিসিজমের একটা গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, তার আধিপত্য রয়েছে কবিতাগুলোয়। হ্যাঁ, ঠিক, রোমান্টিসিজমের সঙ্গে মেটাফিজিকসের মিশেল ঘটেছে এ বইয়ের বিভিন্ন কবিতায়। তবে ‘ভাষা বা শব্দব্যবহারে অত্যাধুনিক’ কি না তা বলতে পারব না। সেটি ভালো বলতে পারবেন কবিতার সংবেদী ও অনুসন্ধিৎসু পাঠকেরা।

সাথী: আমার মনে হয়, আপনি এই কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলোয় ভাববাদ, বাস্তব ও পরাবাস্তবের সমন্বয়ে পাঠকমনে এক আলো-আঁধারির আচ্ছন্নতা সৃষ্টি করতে চেয়েছেন। এটা কীভাবে সম্ভব করে তুললেন?

মাসুদ: আমার অন্যান্য বইয়ের মতো এই বইয়েও আছে বিভিন্ন ভাব ও শৈলীর কবিতা। তবে এই বইয়ে বৈচিত্র্যের পরিধি ও স্পেকট্রামটা আরও প্রশস্ত। এখানে যেমন আছে জাতকের কাহিনির বিচ্ছুরণ (‘নলজাতক’), রামকৃষ্ণ পরমহংসের কথামৃতের বিকিরণ (‘প্রহ্লাদপুরের জঙ্গল’), তেমনিই আছে প্রাকৃতিক, সামাজিক-রাজনৈতিক ও মহাকাশীয় বিভিন্ন ফেনোমেনার প্রতিসরণ ও রূপান্তর (‘ব্লিজার্ড’, ‘আচমকা ব্রাশফায়ার, অতর্কিতে অচেনা বৃষ্টির’, ‘বসন্তকাল’, ‘মন্দা’, ‘নকশিকাঁথা’, ‘খসড়া’, ‘সুবেশা, ‘সবুজকেশা’, ‘নিঃসঙ্গ’), ক্ল্যাসিক কোনো চলচ্চিত্র-দৃশ্যের উদ্ভাস (‘দমকল’), আছে প্রেম ও রতিপুলকের প্রতিভাস (‘নির্বাসন’, ‘জ্বরের ঋতুতে’, ‘জাদু’), আছে জীব-পরমের মধ্যকার পারস্পরিক আকর্ষণ ও আকুতির আভা (‘সেতু’)। এ ছাড়া আছে রোমান্টিক ঘরানার কবিতা, আছে পরা ও অধি-বাস্তব ধারার কবিতা। তবে একটা কথা—আমার কবিতায় ঠিক অবিমিশ্র রোমান্টিকতা কিংবা অবিমিশ্র পরাবাস্তব বা অধিবাস্তব ধারা খুঁজে পাওয়া মুশকিল।

‘নিঃসঙ্গতা’, ‘পরলোকগমন’, ‘ধর্ম’ কিংবা ‘অধর্ম’—এসব শব্দের প্রথাসিদ্ধ অর্থ ও ব্যঞ্জনায় বিচ্যুতি ঘটিয়ে ভিন্নভাবে সংজ্ঞায়িত করার আয়োজন রয়েছে ‘নিঃসঙ্গ’, ‘লোকান্তর’ ও ‘ধর্মাধর্ম’ কবিতায়। আর বইটিতে ছন্দে লেখা কবিতা যেমন আছে, তেমনি আছে অক্ষরবৃত্তের সঙ্গে গদ্যস্পন্দ মেশানো মিশ্রচালের কবিতা এবং শেষভাগে টানা গদ্যের একটি দীর্ঘ কবিতা (‘নাট্যমালা, তামাশাপ্রবাহ…’)।

সাথী: কবিতার কিছু লাইন আমি বলছি... গ্রন্থের প্রথম কবিতা ‘ধর্মাধর্ম’—‘আর যত শীল ও দুঃশীল গতি ও অগতি কুশল ও অকুশল/ আর যত অভিজ্ঞা ও সমাপত্তি, বারো রকমের বন্ধনযাতনা/ সংসার সন্ন্যাস মোক্ষ মোহ কাম কৃত্য ঘাম মূত্র বীর্য ধর্মাধর্ম পুরীষ পৌরুষ/ সব একাকার হবে যেইদিন/ সেদিন কোথায় কোন দূরে নিয়ে যাবে গো আমায়/ ধর্মহারা বীতকৃত্য সূত্রহীন পুরুষবিহীন...’ আবার কোথাও বলছেন, ‘অ্যালুমিনিয়াম ফয়েলে আকাশ ঢাকা/ গায়ে তার জ্বলে কোটি কোটি প্ল্যাংক্টন/ তারই মাঝে একা একটি শ্যামলা মেঘে/ সহসা তোমার মুখের উদ্ভাসন।/ ... হয়তো এখন আকাশ নামছে ঝেপে/ মেঘ ও মেঘনার ছেদরেখা বরাবর/ ঝাপসা একটি আগুনের ছায়ারূপ/ ঝিলিক দিয়েই মিলাচ্ছে অগোচর।’ (‘নির্বাসন’) রোমান্টিক ভাবধারার পাশে কী অসাধারণ সব চিত্রকল্প! এই কবিতাগুলো নিয়ে কিছু বলুন।

মাসুদ খানের ‘দুঃস্বপ্নের মধ্যপর্ব’ বইয়ের প্রচ্ছদ
কবিতার পাশাপাশি বেশ কিছু লেখা লিখেছি যেগুলো আসলে না-কবিতা, না-কাহিনি, না-নিবন্ধ, না-জার্নাল... আবার হয়তো ছুঁয়ে গেছে সবগুলোকেই। সাহিত্যের এই যে নানান জনরা, নানান ধরন—এদের মধ্যকার ভেদরেখাগুলো ঠিক কী রকম, কিংবা যে অভিন্ন শিল্পত্ব এসব ভিন্ন ভিন্ন সাহিত্যশাখার ভেতর সঞ্চার করে সৌন্দর্য ও দীপ্তি, তার স্বরূপটা আসলে কেমন, সেসবের একটা বোঝাবুঝির, একটা নিরীক্ষার চেষ্টা রয়েছে লেখাগুলোতে। এই জনরার নাম দিয়েছি ‘গদ্য-আলেখ্য’, মানে, গদ্য দিয়ে আলেখ্য আঁকার প্রয়াস।

মাসুদ: ‘ধর্মাধর্ম’ কবিতাটি নিয়ে এর আগের প্রশ্নের উত্তরে বলেছি কিছুটা। ‘নির্বাসন’ কবিতাটি রোমান্টিক ঘরানার কবিতা, একই সঙ্গে অধিবাস্তব ও আন্তর্জাগতিক উপাদানও আছে এটিতে। প্রেক্ষাপটটি এ রকম যে ক্ষার, নুন, চুন ও অ্যাসিডবাষ্প-সংকুল দূরের এক গ্রহে বসে কেউ একজন ভাবছে তার আত্মার আত্মীয়টিকে (কিংবা অন্য আরেক অর্থে ব্যাখ্যা করতে চাইলে বলা যায় জীবাত্মা ভাবছে পরমাত্মাকে), যে কিনা ঝিলিক-দিয়ে-মিলিয়ে-যাওয়া ঝাপসা এক আগুনের ছায়ারূপ আকারে প্রতিভাত হচ্ছে তার কাছে। গ্রহটি এতটা দূরে যে, তার সেই প্রিয়কে নিয়ে সে ভাবতেও পারছে না ভালোভাবে। ভাবনারা সেই আন্তর্জাগতিক, ইন্টারটেরেস্ট্রিয়াল হিম ও নিঃসীম ভ্যাকুয়ামের মধ্যে শোষিত ও শোধিত হয়ে অগোছালো হয়ে যাচ্ছে কেবলই। তবে মজার ব্যাপার হচ্ছে, সেই দূরগ্রহেও বলবৎ আছে তার সেই প্রিয়-র শাসন, তার প্রিয়-র আবেশেই সেখানকার মেঘে জাগে বিদ্যুৎ, তার প্রিয়-র রূপ নিয়েই সেখানে ফুটে ওঠে ময়ূর।

সাথী: আচ্ছা আপনি কি অধ্যাত্মবাদে বিশ্বাসী?

মাসুদ: এটা ঠিক যে একজন আধুনিক, বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ হিসেবে আমার বিশ্বাস নেই অধ্যাত্মবাদে, তবে এটাও ঠিক—কবিতায় তো বলা চলে রাত–দিনই বিচরণ করি একপ্রকার মিস্টিক/স্পিরিচুয়াল রাজ্যে।

সাথী: ৩০টি কবিতা নিয়ে আপনার পঞ্চম কাব্যগ্রন্থ এই ধীর কমলাপ্রবণ সন্ধ্যায় (২০১৪)। এখানে আপনি মধ্যযুগের শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্য এবং বৈষ্ণব পদাবলীর রাধাকৃষ্ণের যে প্রেমময়তা কিংবা সুফিতত্ত্ব কে কবিতায় ব্যবহার করেছেন—এর ব্যবহার ও কারণ সম্পর্কে যদি বলেন।

মাসুদ: এই রাধাকৃষ্ণ বা আশেক-মাশুক ভাব এই বইটিতে মূলত প্রতিভাত হয়েছে ‘রাগকৃষ্ণ’ ও ‘অভিশাপ’ এই কবিতা দুটিতে। আমার অন্যান্য বইয়ের লেখাতেও আছে এই ভাব। কৃষ্ণের প্রতি রাধার আকর্ষণ ও উচাটন, পরমাত্মার সঙ্গে মিলিত হওয়ার জন্য জীবাত্মার যে আজন্ম আকুতি কিংবা মাশুকের প্রতি আশেকের যে সংযোগটান ও শর্তহীন মিলন ও সমর্পণ-আকাঙ্ক্ষা—এই ভাব মিশে আছে বাংলা অঞ্চলের স্নায়ুতন্ত্রের সঙ্গে। এটা বাংলার একবারে কোর ফিলোসফির একটি অংশ।

আর কবিতা ও সুফিতত্ত্ব বিষয়ে প্রিয় কবি রণজিৎ দাশ যৌথ খামার পত্রিকার সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে তো বলেই দিয়েছেন— ‘...সুফিসাধনার মতো কাব্যরচনাও একটি মিস্টিক প্রক্রিয়া, একেবারেই ভাবকল্পনার টেকনিক্যাল অর্থে। তাই আজকাল আমি ভাবি যে কবিতা মানেই সুফি কবিতা।’

সাথী: ৩৭টি রচনা নিয়ে সংগঠিত দেহ অতিরিক্ত জ্বর গ্রন্থটিকে আমরা কোন পর্যায়ে ফেলব? এর মধ্য দিয়ে আপনি কী বোঝাতে চেয়েছেন?

মাসুদ: কবিতার পাশাপাশি বেশ কিছু লেখা লিখেছি যেগুলো আসলে না-কবিতা, না-কাহিনি, না-নিবন্ধ, না-জার্নাল... আবার হয়তো ছুঁয়ে গেছে সবগুলোকেই। সাহিত্যের এই যে নানান জনরা, নানান ধরন—এদের মধ্যকার ভেদরেখাগুলো ঠিক কী রকম, কিংবা যে অভিন্ন শিল্পত্ব এসব ভিন্ন ভিন্ন সাহিত্যশাখার ভেতর সঞ্চার করে সৌন্দর্য ও দীপ্তি, তার স্বরূপটা আসলে কেমন, সেসবের একটা বোঝাবুঝির, একটা নিরীক্ষার চেষ্টা রয়েছে লেখাগুলোতে। এই জনরার নাম দিয়েছি ‘গদ্য-আলেখ্য’, মানে, গদ্য দিয়ে আলেখ্য আঁকার প্রয়াস। এই ৩৭টির পরও লিখেছি আরও ৩৭টি গদ্য-আলেখ্য।

কিছু বিষয় আছে যেগুলোকে যেভাবে বলতে চাই, সেভাবে বলা যায় না কবিতায়। মূলত কবিতায় যা কিছু বলা সম্ভব হয়নি, যা কিছু থেকে গেছে অকথিত, সেসব অকথিত কথা নিয়ে ভিন্ন আঙ্গিকে বলার প্রয়াস ও ফলাফল হচ্ছে এই গদ্য-আলেখ্যগুলো। বলা যায়, এগুলো কবিতারই পার্শ্বসৃষ্টি। অনেকে এগুলোকে কবিতাই মনে করেন সিরিয়াসলি। এই বইয়ের কোনো লেখা আমার শ্রেষ্ঠ কবিতা বা কবিতাসংগ্রহতে স্থান পায়নি দেখে কিছুটা অবাক হয়েছেন অনেকে। হতে পারে এগুলো একপ্রকারের কবিতাই। তবে আমি কবিতা মনে করে লিখিনি, তাই কবিতার কোনো সংকলনেই যায়নি এগুলো।

সাথী: প্রসন্ন দ্বীপদেশ কাব্যগ্রন্থের একটি কবিতায় আপনি বলছেন, ‘বহু প্রত্যাশার, বহু সাধ সাধ্য সাধনার যোগ্য/ স্বপ্নভূভাগ কি এরকমই দূর ও দুর্গম, যোগাযোগাতীত?’—এখানে আপনি কোন দেশের কথা বলছেন?

মাসুদ: এক কল্পদেশের মডেল হচ্ছে এই দ্বীপদেশ, যে ভূভাগ সদাপ্রসন্ন, পুনর্নবা, রি-জেনারেটিভ, যেখানে ‘মানিপ্ল্যান্ট আর সোলার প্ল্যান্টের পাতারা একযোগে চিয়ার্স-ধ্বনি তুলে পান করে রোদের শ্যাম্পেন’, যে দেশে রাধিকাপুরের ঝিয়ারিরা তুড়ি দিতে দিতে পথ চলে গভীর রাতে, আর আশপাশের ঝোপঝাড় থেকে তালে তালে তুড়ি বাজায় তুরুকচণ্ডালের চটপটে পাতা ও পল্লবেরা, যেখানে টাশ টাশ করে কথা বলে ওঠে বনবিড়ালির সদ্য-বোল-ফোটা কনিষ্ঠা মেয়েটি কিংবা যেখানে মানুষেরা সটান শুয়ে পড়ে মাটি থেকে শুষে নেয় ভূতাপশক্তি, অর্থাৎ দেহ ও মাটির যোগাযোগ ঘটে সহজ ও সরাসরি।

সেই স্বপ্ন-ভূভাগের খোঁজে জাহাজ নিয়ে বেরিয়ে পড়েছে অনেকেই বহু বছর ধরে। সেই দীর্ঘ অবিরাম অভিযাত্রা শেষে সুদূর উত্তর থেকে বিফল হয়ে ফিরে আসছে একটি জাহাজ। জাহাজের নাবিককে দূর থেকে হাঁক দিয়ে জিজ্ঞেস করছে আরেক অভিযাত্রী জাহাজের নৌচালক, ‘পেয়েছ কি সেই স্বপ্নের দ্বীপদেশের সন্ধান?’… স্বপ্ন, সাধ, দুর্মর অভিলাষ, অভিযাত্রা, স্বপ্নভঙ্গ….। এ-ই হচ্ছে কবিতাটির পটভূমি, পরিপ্রেক্ষিত।

মাসুদ খানের ‘বিছুটিপাতার অটোগ্রাফ’ বইয়ের প্রচ্ছদ
উপন্যাসটি শুরু করেছিলাম বগুড়ার কবি–সাহিত্যিকদের সঙ্গে যৌথ কবিতাযাপন, ঘুরে বেড়ানো, আড্ডা এসব দিয়ে। প্রথম ৩–৪টি পর্বের প্রায় সব চরিত্রই বাস্তবের, তবে ঘটনাগুলো আধো–বাস্তব, আধো–ফ্যান্টাসি। পরের পর্বগুলোতে ধীরে ধীরে এসে মিশেছে অলীক চরিত্র, আর ঘটনাগুলোতে বেড়েছে ফ্যান্টাসির মাত্রা ও দৌরাত্ম্য। এখানে এই বাস্তব-অবাস্তবের শোভাযাত্রায় লেখক কখনো ঢুকে পড়েছেন, কখনো বেরিয়ে যাচ্ছেন। এমনকি অলীক চরিত্রের থাপ্পড়ও এসে লেগেছে বাস্তবের এই লেখকের গালে।

সাথী: আপনি আসলে কী রকম দেশের স্বপ্ন দেখেন?

মাসুদ: ওই যে, যে দ্বীপদেশের কথা বললাম ওপরে, সে রকম দ্বীপদেশেরই স্বপ্ন দেখি, যেখানে লোপ পেতে থাকবে নানা রকমের বানিয়ে-তোলা ভেদবুদ্ধি, মানুষে-মানুষে তো বটেই, এমনকি মানুষ ও অপরাপর প্রাণ-প্রাণী-প্রকৃতির মধ্যকার ভেদবুদ্ধিও।

আসলে কবিতা তো কবির স্বপ্নভাষ্যই। কবি তো তাঁর দেখা ও অদেখা স্বপ্নগুলোকেই আঁকেন তাঁর কবিতায়।

সাথী: ঊর্মিকুমার ঘাটে (২০২০) কাব্যগ্রন্থের নাম কবিতার কয়েকটি লাইন আমি বলছি—‘তারপর চুপচাপ চলে যাব কোনো একদিন,/ দূরসম্পর্কের সেই মাথানিচু লাজুক আত্মীয়টির মতো,/ নিজের নামটিকেই ভুলে ফেলে রেখে, তোমাদের কাছে।’ এই যে আপনি অবগাহন করেছেন বোধের অতলতলে, হৃদয় খুঁড়ে বের করে এনেছেন এমন সব কবিতা, এ প্রসঙ্গে কী বলবেন?

মাসুদ: মানুষ চলে যায়, থেকে যায় তার নাম। তারপর জগৎ–সংসারের নিয়মে সেই নামও একসময় চলে যায় বিস্মৃতিতে। তৈরি হয় ছোট্ট এক শূন্যতা। কিন্তু প্রকৃতি তো শূন্যতা সহ্য করে না বেশিক্ষণ। তাই এসে পড়ে অন্য একজন। কিন্তু যে আসে, সে-ও তো এক ‘ভাবী বিলুপ্ততা’, কারণ সে-ও চলে যাবে একদিন, তার নামও বিলীন হয়ে যাবে একসময়ে। কোনো এক মন-উদাস-করা, বৃষ্টিঝরা বিকেলবেলায় মনে হঠাৎ হানা দেয় এই বোধ এবং চেপে বসে। মনে আছে সেদিনই, ভেজা ভেজা সন্ধ্যায় লিখে ফেলি কবিতাটি।

সাথী: এই কাব্যগ্রন্থেরই ‘চিত্রনাট্য’ কবিতায় বলেন যে—‘অতীব ধনীর পুত্র আর তার সিরিয়াস বামপন্থাবিলাস/ বাদামি চিনির প্রলেপ-দেওয়া যত ইষ্টকথা/ মাত্রাছাড়া বামাশক্তি, একইসঙ্গে একটানা বিষয়ভাবনা...’ —আপনি আসলে কী বোঝাতে চেয়েছেন?

মাসুদ: এই কবিতাটি মূলত একটি কোলাজ কম্পোজিশন। এর তিনটি অংশ। প্রথমাংশ একটি কল্পচিত্রনাট্য, যেখানে নায়ক, খলনায়ক, বিবেক, ভাঁড়, অন্যান্য পার্শ্বচরিত্র এবং তাদের নিয়তিরা নাটকের কোন পর্বে কী আচরণ করবে তার একটি রূপরেখা। কবিতাটির দ্বিতীয়াংশে নতুন জেগে-ওঠা কোনো চর বা দ্বীপে গিয়ে কৃষক ও তাদের গবাদিরা কী রকম উত্তেজিত থাকে তাদের শস্যসাংস্কৃতিক পরিকল্পনা নিয়ে, তার একটি খসড়া। আর ঠিক সেই সময়ে অন্য কোথাও একটি শজারুকে আস্ত গিলে ফেলে ভীষণ বিপাকে পড়ে যায় এক অতিকায় অজগর— কোলাজের এই অংশটি উদ্ভাস দিয়েছে কবিতাটির অন্তিম পঙ্‌ক্তিতে।

সাথী: আচ্ছা কবিতার মধ্য দিয়ে আপনি আসলে কিসের অন্বেষণ করেন?

মাসুদ: শব্দ দিয়ে সৌন্দর্য-সৃজন, যা একভাবে স্বপ্নসৃজনও বটে। আর নিরন্তর নতুন নতুন স্বপ্ন ও সৌন্দর্যের পিছে ধাবন।

সাথী: প্রজাপতি ও জংলি ফুলের উপাখ্যান (২০১৬) উপন্যাসের প্রধান চরিত্র বগুড়া নিয়ে জানতে চাই। আর এই উপন্যাস নির্মাণের পেছনে আপনার কি মনোভাব কাজ করেছে?

মাসুদ: আগেই বলেছি, আমার জন্ম ও বেড়ে ওঠা বৃহত্তর বগুড়া অঞ্চলে। বগুড়া ও জয়পুরহাট জেলা এই দুই জেলা মিলে বৃহত্তর বগুড়া অঞ্চল। পরে কর্মসূত্রে আবার বগুড়ায় আসা। সেই ১৯৮৮ থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত—অবশ্য মাঝখানে দুই বছর ছিলাম রংপুরে। দাপ্তরিক কাজে ঘুরে বেড়িয়েছি উত্তর বাংলার নানা জনপদে। আর উত্তরাঞ্চলের বিশেষ করে বগুড়ার কবি–সাহিত্যিকদের সঙ্গে চষে বেড়াতাম বগুড়া শহরের শিরা-উপশিরা, মহাস্থানগড়, শিবগঞ্জ, গাবতলি…।

উপন্যাসটি শুরু করেছিলাম বগুড়ার কবি–সাহিত্যিকদের সঙ্গে যৌথ কবিতাযাপন, ঘুরে বেড়ানো, আড্ডা এসব দিয়ে। প্রথম ৩–৪টি পর্বের প্রায় সব চরিত্রই বাস্তবের, তবে ঘটনাগুলো আধো–বাস্তব, আধো–ফ্যান্টাসি। পরের পর্বগুলোতে ধীরে ধীরে এসে মিশেছে অলীক চরিত্র, আর ঘটনাগুলোতে বেড়েছে ফ্যান্টাসির মাত্রা ও দৌরাত্ম্য। এখানে এই বাস্তব-অবাস্তবের শোভাযাত্রায় লেখক কখনো ঢুকে পড়েছেন, কখনো বেরিয়ে যাচ্ছেন। এমনকি অলীক চরিত্রের থাপ্পড়ও এসে লেগেছে বাস্তবের এই লেখকের গালে।

উপন্যাসের মধ্যভাগ থেকে আবির্ভূত হয়েছে এক অদ্ভুত, আধো-বাস্তব, আধো-অলীক চরিত্র। হকসেদ। কবে কোত্থেকে এসেছে, কেউ জানে না। পেশায় ছিঁচকে চোর, স্বভাবে দুশ্চরিত্র, কিন্তু মহাজ্ঞানী। সময়, ইতিহাস ও ভূগোলের বাইরে থেকে উঠে আসা বিশালদেহী এক রহস্যমানব। তার আবির্ভাব, তার গণসম্মোহন, তীক্ষ্ণ তির্যক অবলোকন, শৃগাল ও কাককে মানুষের ভাষা শেখানো, বিচিত্র সব কীর্তিকাণ্ড, তারপর একদিন দলবলসহ তার উত্তরমুখীন অগস্ত্যযাত্রা...যাত্রাপথের দুই ধারে বাস্তব-ও-ফ্যান্টাসি-মেশামেশি নানা ঘটনাঘটন—আজবগজব ঝড়, নারীশিশুপিরের দরগা, ঠ্যাক-বাহিনী, হ্যান্ডসাম হিটলার আর তার জ্যান্ত কথা-বলা ভাস্কর্য, যমদূতদের উপদ্রব...শেষে সফরসঙ্গীদের নিয়ে এক অলীক অরণ্যের ভেতর হকসেদের ঢুকে পড়া... উপন্যাসের মধ্যভাগ থেকে এসবেরই আধিপত্য, চলেছে একেবারে শেষ পর্ব পর্যন্ত।

বাস্তব অভিজ্ঞতা ও ফ্যান্টাসি-মেশামেশি একটি উপন্যাস এটি, উপন্যাসের যে ধারাবাহিকতা তা এতে বজায় আছে ঠিকই, তবে লক্ষ করে দেখবেন আপনি এর যে কোনো পর্ব থেকেই শুরু করতে পারছেন আপনার পাঠ।

সাথী: একে কি চেতনাপ্রবাহধর্মী উপন্যাস বলা চলে?

মাসুদ: চেতনাপ্রবাহধর্মী বলা যাবে কি? সম্ভবত না। কী বলা যায় এটিকে? ফ্ল্যামবয়্যান্ট উপন্যাস? কী জানি!

সাথী: আপনার লেখা পড়ে এটুকু বুঝেছি আপনি প্রচুর পরিমাণে বই পড়েন। যেকোনো বিষয় নিয়ে গবেষকের মতো অনুসন্ধানী দৃষ্টি নিয়ে পরীক্ষা–নিরীক্ষা করতে থাকেন—আপনার এই বই পড়া, বই সংগ্রহ এসব বিষয়ে যদি বিস্তারে বলেন...

মাসুদ: না, একদমই না। আমিই সম্ভবত সবচেয়ে কম-বই-পড়া লেখক। সাধারণভাবে একজন সংবেদনশীল ও আগ্রহী মানুষ নানা রকম ডিসিপ্লিন থেকে যতটুকু বই পড়ে, সে রকমই পড়া আমার। বেশি কিছু নয়। সেই পড়াটাও আবার সিস্টেমেটিক নয়, অগোছালো।

  • পরিচিতি:

মাসুদ খান: জন্ম ২৯ মে ১৯৫৯, জয়পুরহাট জেলার ক্ষেতলালে। পৈতৃক নিবাস সিরাজগঞ্জ। প্রকৌশলবিদ্যায় স্নাতক, ব্যবসায় প্রশাসনে স্নাতকোত্তর। তড়িৎ ও ইলেকট্রন প্রকৌশলী। বসবাস কানাডার টরন্টোতে। শিক্ষকতা করেন টরন্টোর সেন্টেনিয়াল কলেজে।

প্রকাশিত গ্রন্থ:

পাখিতীর্থদিনে (১৯৯৩, পুনঃপ্রকাশ ২০১৯)—কবিতা।

নদীকূলে করি বাস (২০০১)—কবিতা।

সরাইখানা ও হারানো মানুষ (২০০৬)—কবিতা।

আঁধারতমা আলোকরূপে তোমায় আমি জানি (২০১১)—কবিতা।

এই ধীর কমলাপ্রবণ সন্ধ্যায় (২০১৪)—কবিতা।

দেহ-অতিরিক্ত জ্বর (২০১৫)—গদ্য-আলেখ্য।

প্রজাপতি ও জংলি ফুলের উপাখ্যান (২০১৬)—উপন্যাস।

প্রসন্ন দ্বীপদেশ (২০১৮)—কবিতা।

গদ্যগুচ্ছ (২০১৮)—প্রবন্ধ-নিবন্ধ।

শ্রেষ্ঠ কবিতা (২০১৮)।

পাখপাখালির গান পাগলাঝোরার তান (২০১৯), ছড়াকবিতা।

ঊর্মিকুমার ঘাটে (২০২০)—কবিতা।

দুঃস্বপ্নের মধ্যপর্ব (২০২২)—কবিতা।

কবিতাসংগ্রহ (২০২৫)।

বিছুটিপাতার অটোগ্রাফ (২০২৬)—কবিতা।

সাথী নন্দী: জন্ম ৬ সেপ্টেম্বর, ভারতের কোচবিহার জেলায়। ভালোবাসেন বিচিত্র বিষয়ভিত্তিক গ্রন্থ পাঠ করতে। পছন্দ করেন সাহিত্যিকদের সাহিত্যজীবনের কথা জানতে। তিনি উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর এবং এ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে থাকা বিদ্যাসাগর কলেজ অব এডুকেশন থেকে বিএড ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে এমফিলের গবেষণার কাজে নিযুক্ত হন, যার বিষয় ছিল—‘জহর সেনমজুমদারের কবিতা: গ্রামজীবন ও নগরজীবনের দ্বন্দ্ব’। কিন্তু যেহেতু কথাসাহিত্যের প্রতি তাঁর অমোঘ টান, সেই টানেই তিনি কিন্নর রায়ের লেখা নিয়ে একটি গ্রন্থ প্রকাশ করেন কিন্নর রায়ের সাহিত্য জীবন ও সাহিত্য ভুবন নামে (প্রকাশক—বঙ্গীয় সাহিত্য সংসদ, কলকাতা, ২০২০)। পরে পিএইচডির গবেষণার কাজের ক্ষেত্রে কিন্নর রায়ের কথাসাহিত্যকেই বিষয় হিসেবে বেছে নেন এবং ২০২৪ সালে উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন। ২০২৫ সালে তাঁর সম্পাদিত উন্মোচন গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়, যেখানে ২৫ জনের দীর্ঘ সাক্ষাৎকার সংকলিত রয়েছে এবং বইটি বিশেষভাবে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে।

Read full story at source