যে গাছের ছায়ায় দাঁড়ালে হতে পারে বিপদ

· Prothom Alo

ধরো, তুমি বিদেশে কোনো সৈকতে হাঁটছ, হঠাৎ চোখে পড়ল একটা গাছ। পাতা সবুজ, ছোট্ট ছোট্ট ফল ধরে আছে, রংটা হলদেটে-সবুজ। গন্ধটাও বেশ মিষ্টি, হাত বাড়িয়ে একটা ফল তুলে নিতে ইচ্ছা করবে দেখলে। থামো এক মিনিট। এই গাছের কাছে যাওয়াটাই হতে পারে জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল। গাছের নাম ম্যানচিনিল, স্থানীয় লোকজন ডাকে ‘মৃত্যুর গাছ’ বলে। নামটা একদমই বাড়িয়ে বলা না।

কোথায় পাবে এই গাছ

Visit newssport.cv for more information.

বৈজ্ঞানিক নাম Hippomane mancinella ( হিপোমেন ম্যানসিনেলা)। ফ্লোরিডার দক্ষিণ অংশে পাবে, মধ্য আমেরিকা আর দক্ষিণ আমেরিকার উপকূলে, ক্যারিবিয়ান দ্বীপগুলোয়ও। একা জন্মায় না এই গাছ, দল বেঁধে থাকে। প্রায়ই দেখবে ম্যানগ্রোভ বনের ভেতরে বা লোনাপানির ধারে গুচ্ছ হয়ে আছে।

ফ্লোরিডায় এই গাছ এখন বিপন্ন তালিকায়। সংখ্যা কমছে দিনে দিনে। হয়তো একদিন পুরোপুরি হারিয়েও যাবে সেখান থেকে।

নামের পেছনে একটা গল্প আছে। স্প্যানিশ শব্দ মানজানিয়া মানে ‘ছোট্ট আপেল’, ফল আর পাতা দেখতে আপেলের মতো বলেই এই নাম। স্প্যানিশরা আরও একটা নাম দিয়েছিল, মানজানিয়া দে লা মুয়ের্তে, ‘মৃত্যুর ছোট্ট আপেল’। শুনলেই গা ছমছম করে ওঠে!

৮০০ বছরের পুরোনো গাছকে ভালোবেসেই মেরে ফেলল মানুষ

দেখতে আপেলের মতো, খেলেই বিপদ

লম্বায় ৫০ ফুট পর্যন্ত হতে পারে গাছটা। কখনো ছোট ঝোপের মতো, কখনো বড় গাছ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে সৈকতের ধারে। ফল ছোট, একটা একটা বা জোড়ায় জোড়ায় ধরে, দেখতে অবিকল ছোট আপেলের মতো। গন্ধও লোভনীয়।

এই মিষ্টি গন্ধই অনেককে ফাঁদে ফেলেছে বছরের পর বছর। স্প্যানিশ অভিযাত্রী, জাহাজডুবিতে আটকে পড়া নাবিক, আজকের পর্যটক, কেউই বাদ যাননি এই ভুল থেকে।

একটা ঘটনা ইতিহাসে খুব পরিচিত। বিখ্যাত নাবিক ক্যাপ্টেন জেমস কুক একবার লোকজনকে পাঠিয়েছিলেন পানি আর কাঠ সংগ্রহ করতে, সেই কাঠ ছিল ম্যানচিনিলের। গাছ কাটার সময় কেউ কেউ হাত দিয়ে চোখ ঘষেছিলেন। তাতেই বিপদ। কয়েকজন নাবিক প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে দেখতেই পাননি কিছু।

জাহাজডুবিতে পড়া নাবিকদের গল্পও কম নেই। ক্ষুধার চোটে এই ফল খেয়ে ফেলেছিলেন কেউ কেউ, তারপর মুখে আর ঠোঁটে ফোসকা পড়েছিল, সঙ্গে তীব্র জ্বালা।

গাছের প্রতিটি অংশই বিষাক্ত, ছুঁলেই বিপদ

এই গাছের কোনো অংশই নিরাপদ নয়। ফল বিষাক্ত, পাতা আর কাণ্ড থেকে বের হওয়া রসও সমান বিষাক্ত। শরীরের কোনো অংশে এই রস লাগলে আগে জ্বালা শুরু হয়, তারপর চামড়ায় ফোসকা পড়ে যায়, ব্যথাও হয় বেশ।

দূরে থাকাই তাই বুদ্ধিমানের কাজ। গাছ বা ফল হাত দিয়ে ছোঁয়া একদম বারণ। বৃষ্টির সময় এর নিচে দাঁড়ানোও ঠিক নয়, পাতা বেয়ে পড়া পানিতেও বিষ মিশে থাকে। সেই পানি গায়ে লাগলে চামড়া পুড়ে যেতে পারে সহজেই।

আরেকটা ভয়ের কথা। এই গাছের কাঠ পোড়ালে ধোঁয়ায়ও বিষ থাকে। সেই ধোঁয়া চোখে বা ফুসফুসে গেলে সাময়িক অন্ধত্ব হতে পারে, কারও কারও শ্বাসকষ্টও দেখা দিতে পারে।

এই জন্যই যেসব এলাকায় এই গাছ জন্মায়, সেখানে গাছের গায়ে প্রায়ই একটা লাল রঙের দাগ এঁকে দেওয়া হয়। সহজ ভাষায়, এটা একরকম সতর্কবার্তা—‘এই গাছের কাছে যাবে না।’

বিশ্বকাপের জার্সি পরে ঘুরে বেড়াচ্ছে হাঁস

এই গাছ কি একদম অকেজো

এত বিষাক্ত হওয়ার পরও এই গাছ পুরোপুরি ফেলনা নয়। স্থানীয় মানুষ আর প্রাচীনকালের অভিবাসীরা সাবধানে এই গাছের কাঠ কাজে লাগাতেন। আগে রস শুকিয়ে নিরাপদ করে নেওয়া হতো রোদে রেখে, তারপর সেই কাঠ দিয়ে বানানো হতো আসবাবপত্র।

কিছু আদিবাসী গোষ্ঠী আরেক কাজেও ব্যবহার করত এই গাছ। তিরের ফলায় রস মাখিয়ে নিতেন তাঁরা, শিকার তখন হয়ে উঠত আরও সহজ।

প্রকৃতিও এই গাছের একটা ভূমিকা আছে, যেটা সহজে চোখে পড়ে না। সমুদ্রতীরে আর জলাভূমিতে জন্মানো এই গাছ বাতাসের ঝাপটা ঠেকায়, মাটির ভাঙনও কমিয়ে দেয় অনেকটা। দেখতে যতই ভয়ংকর লাগুক, প্রকৃতির হিসেবে এই গাছ একদম অকেজো নয়।

সাবধান থাকার সহজ উপায়

ফ্লোরিডা বা ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের কোনো সৈকতে গেলে একটা কথা মাথায় রেখো। সবুজ পাতার ছোট, আপেলের মতো ফলওয়ালা গাছ দেখলেই একটু সতর্ক হতে হবে। গায়ে লাল দাগ আঁকা থাকলে সন্দেহের কিছু নেই, এটাই সেই বিপজ্জনক ম্যানচিনিল।

ছোঁয়া তো বাদই, গাছের নিচে দাঁড়ানোও উচিত নয় কখনো। ফল খাওয়ার প্রশ্ন তো আসেই না।

প্রকৃতিতে অনেক জিনিসই দেখতে সুন্দর, খেতে লোভনীয়; কিন্তু ভেতরে বিপদ লুকিয়ে রাখে। ম্যানচিনিলগাছ তার একদম জ্বলন্ত উদাহরণ। তাই পরের বার সৈকতে গিয়ে কোনো অপরিচিত গাছ বা ফল দেখলে, ছোঁয়ার আগে দুবার ভেবে নিয়ো। প্রকৃতি সব সময় বন্ধুর মতো আচরণ করে না, এই গাছই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।

তথ্যসূত্র: সাউদার্ন লিভিংআর্জেন্টিনার বিশ্বকাপের জার্সির পেছনে ১৮৯৩ লেখা কেন

Read full story at source