'বোবা কাহিনী': সাবঅলটার্নের ব্যাপার ও কোম্পানির বাটখারা

· Prothom Alo

সারকথা

Visit extonnews.click for more information.

আমার আলোচনার উপজীব্য কবি জসীমউদ্‌দীনের উপন্যাস বোবা কাহিনী (১৯৬৪)। আলোচনার শুরুতে শিরোনামে ব্যবহৃত শব্দগুলোর সারমর্ম হাজির করছি, যাতে আলোচনাটির অভিমুখ ও পথচিত্র স্পষ্ট হয়। আমার বিবেচনায় বোবা কাহিনীতে যে বর্গের মানুষের কথা চিত্রিত হয়েছে, তাকে বিদ্যায়তনিকভাবে নিম্নবর্গ বা সাবঅলটার্ন বলা যায়। এখানে ‘নিম্নবর্গ’ শব্দটি আমি কেবল অর্থনৈতিক দরিদ্রতা বোঝাতে ব্যবহার করছি না; বরং প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিনিধিত্বহীনতা, ক্ষমতাহীনতা ও সামাজিক শ্রবণবঞ্চনার অর্থে ব্যবহার করছি। ‘ব্যাপার’ শব্দটিকে এখানে জীবনাচরণ, ব্যবসা, লেনদেন ও সম্পর্ক—এসব অর্থে হাজির করেছি। ‘কোম্পানি’ শব্দটি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তথা ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনকে নির্দেশ করে। আর ‘বাটখারা’ শব্দটি এখানে পরিমাপক, নির্ধারক, এমনকি শাসক অর্থেও ব্যবহৃত। এই আলোচনার কেন্দ্রীয় অভীষ্ট হলো দেখানো যে নিম্নবর্গের জীবন-ব্যাপারে ঔপনিবেশিক বাটখারা কীভাবে পরিমাপক, নির্ধারক ও শাসক হিসেবে কাজ করে এবং কীভাবে আইন, বাজার, ভাষা ও প্রশাসনিক ক্ষমতার মাধ্যমে আজাহেরের মতো চরিত্রকে বোবা করে তোলে।

কাহিনিসংক্ষেপ ও আলোচনার পটভূমি

প্রথমেই পাঠকের সুবিধার্থে উপন্যাসটির একটি সারসংক্ষেপ হাজির করছি। উপন্যাসের পটভূমি ও কাহিনিসংক্ষেপ পেশ করার কাজটি আমি করব অগ্রজ দুজন প্রাবন্ধিকের সাক্ষ্যসহকারে। ‘জসীম উদ্‌দীনের উপন্যাস: নূতন পাঠ’ প্রবন্ধের লেখক জ্যোতিপ্রকাশ চট্টোপাধ্যায় উপন্যাসের পটভূমি ও বিষয় নিয়ে বলছেন, ‘গত শতাব্দীর বিশ-ত্রিশ দশকের বাংলার প্রত্যন্ত, প্রায় দুর্গম গ্রাম এ উপন্যাসের পটভূমি। সেখানকার মুসলমান সমাজের একেবারে নিচুতলার মানুষ এই উপন্যাসের চরিত্র। তাঁদের বেঁচে থাকার যুদ্ধ এ উপন্যাসের বিষয়।’ এরপর আবদুল মোতালেব শেখের লেখা ‘জসীম উদ্‌দীনের বোবা কাহিনী: লোকসংস্কৃতির উপাদান’ রচনার একটি অংশ এখানে কাহিনিসংক্ষেপ হিসেবে পেশ করছি। তিনি বলছেন, ‘এ উপন্যাসের নায়ক আজাহের এক ছিন্নমূল চাষীসন্তান। লাঞ্ছনা-বঞ্চনা বাল্যকাল থেকেই তার নিত্যসঙ্গী। তবুও সে স্বপ্ন দেখে সুখী জীবনের। তাই স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে যুদ্ধ করে যায় বেশি ফসল ফলিয়ে সুখের নাগাল পেতে। কিন্তু নানা প্রতিকূলতায় তার স্বপ্ন বাস্তবায়ন সম্ভব হয় না। নিজের জীবনের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে মুক্তির উপায় খুঁজতে গিয়ে পুত্র বছিরকে উপযুক্ত শিক্ষা-দীক্ষায় মানুষ করার স্বপ্ন দেখে সে।’

সাবঅলটার্ন তত্ত্ব ও আজাহেরের বোবাকরণ

এই পর্যায়ে আমার উপপাদ্য এই যে জসীমউদ্‌দীনের বোবা কাহিনী—অর্থাৎ মুসলমান সমাজের একেবারে নিচুতলার মানুষের কাহিনি—গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাকের ‘Can the Subaltern Speak?’ প্রশ্নটির আলোকে পাঠের জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। আলোচ্য উপন্যাস থেকে উপাত্ত হাজির করার আগে সাবঅলটার্ন তত্ত্বের একটি কার্যকর সংজ্ঞা সংক্ষেপে পেশ করা দরকার। উত্তর–ঔপনিবেশিক তত্ত্বে ‘সাবঅলটার্ন’ বলতে সেসব মানুষ বা গোষ্ঠীকে বোঝায়, যারা কেবল দরিদ্র বা সামাজিকভাবে নিচু অবস্থানে নয়, বরং আধিপত্যশীল জ্ঞানব্যবস্থা, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, আইনি ভাষা ও ক্ষমতার স্বীকৃত পরিসর থেকেও বিচ্ছিন্ন। ফলে তাদের কণ্ঠস্বর থাকলেও তা সামাজিকভাবে শোনা, অনুবাদ, স্বীকৃত ও কার্যকর হয় না। এই অর্থেই আজাহেরের কাহিনি একটি সাবঅলটার্ন কাহিনি।

চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত, ঔপনিবেশিক আইন ও নিম্নবর্গ

জোর দিচ্ছি এই কথায় যে আমাদের উপন্যাসের কাহিনির সময় ঔপনিবেশিক আমল এবং সে আমলের আইন, বিশেষত চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের প্রভাব উপন্যাসের ঘটনাপ্রবাহে বিদ্যমান। এর প্রমাণ আমরা কাহিনির পরতে পরতে পাই। তার বিবরণে যাওয়ার আগে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত বেঙ্গল প্রভিন্সসহ ভাটির প্রদেশগুলোয় কী দুর্দশা ডেকে এনেছিল, তা দু-একজন ঔপনিবেশিক শাসকের মুখেও জেনে নেওয়া যাক। ১৮১৯ সালে বেঙ্গল প্রভিন্সের গভর্নর জেনারেল ফ্রান্সিস রওডন-হেস্টিংস ভাটির প্রদেশগুলোর ওপর চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের প্রভাব সম্পর্কে রিপোর্টে লিখছেন—

‘Yet this truly benevolent purpose, fashioned with great care and deliberation, [the Permanent Settlement] has, to our painful knowledge, subjected almost the whole of the lower classes throughout these provinces to most grievous oppression, an oppression, too, so guaranteed by our pledge, that we are unable to relieve the sufferers.’

দেখা যাচ্ছে, ঔপনিবেশিক শাসকেরও এই মত যে কৃষির উৎপাদন বাড়িয়ে কর সংগ্রহ নিশ্চিত করার তথাকথিত সুচিন্তিত পরিকল্পনা, অর্থাৎ ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’, তার অভীষ্ট কাজ করল না; অন্যদিকে সমগ্র নিম্নবর্গকে চরম নিপীড়নের শিকারে পরিণত করল। তাতে শাসকের কী লাভ হলো? শাসকের নগদ লাভ নিম্নবর্গের কণ্ঠ রোধ করে দেওয়া। আমরা সে কথার স্বীকৃতি পাই আরেক ঔপনিবেশিক শাসক লর্ড বেন্টিঙ্কের রিপোর্টে। কোম্পানি যখন স্থানীয় মানুষের বিদ্রোহের আশঙ্কা করছে, তখন বেঙ্গলের তৎকালীন গভর্নর জেনারেল লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক অভয় দিচ্ছেন—সেই আশঙ্কার কোনো কারণ নেই। তাঁর ভাষায়, ‘that insurrection or hostile opposition to the will of the ruling province may be affirmed to be an impossible danger.’ শাসকশ্রেণির বিরুদ্ধে স্থানীয় মানুষের বিদ্রোহ অসম্ভব বলার কারণ হিসেবে ১৮২৯ সালের সেই রিপোর্টে তিনি স্থানীয় মানুষের স্বভাবকে দায়ী করেন এবং সেই সঙ্গে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের প্রভাবকেও কৃতিত্ব দেন। তিনি বিশেষ জোর দিয়ে বলেন:

‘If, however, security was wanting against extensive popular tumult or revolution, I should say that the Permanent Settlement, which, though a failure in many other respects and in its most important essentials, has this great advantage at least, of having created a vast body of rich landed proprietors deeply interested in the continuance of the British Dominion and having complete command over the mass of the people;’

আমরা যদি লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্কের এই ঔপনিবেশিক দৃষ্টিকে উপনিবেশবিরোধী দৃষ্টিতে দেখি, তাহলে ধরা পড়ে—স্থানীয় মানুষের এই ‘সাহসের অভাব’ বা ‘নতমুখী স্বভাব’ নিপীড়নমূলক শাসনের ফলেই সৃষ্ট। তবে তাঁর দৃষ্টিও সমকালীন বাস্তব কারণটি দেখতে ভুল করেনি। তাই জনগণের ওপর শাসকের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় পারমানেন্ট সেটেলমেন্টের ভূমিকার কথাতেই তিনি জোর দিয়েছেন।

বোবা কাহিনীতে আমরা দেখি, আজাহেরের উন্নতির প্রচেষ্টা বারবার ঔপনিবেশিক সমাজব্যবস্থা দ্বারা ব্যাহত হয়। ব্যবস্থার কাছে পর্যুদস্ত হতে হতে সে হারাতে থাকে তার কর্তাসত্তার প্রকাশক কণ্ঠস্বর। গায়ত্রী স্পিভাক যখন বলেন ‘Can the Subaltern Speak?’, তখন ‘speak’ শব্দটি নিছক কথা বলার অর্থে নয়; বরং নিজের স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব, বক্তব্যের সামাজিক স্বীকৃতি, শ্রবণযোগ্যতা এবং রাজনৈতিক কার্যকারিতার অর্থে ব্যবহৃত হয়। অর্থাৎ কথা বলা যথেষ্ট নয়; কথা এমন সামাজিক কাঠামোয় পৌঁছাতে হবে, যেখানে তা গ্রাহ্য, অনুবাদযোগ্য ও কার্যকর। এই অর্থে আজাহের কথা বলতে পারে, কিন্তু ‘স্পিক’ করতে পারে না। তার বোবাত্ব শারীরিক নয়; আইন, বাজার, ভাষা ও প্রশাসনিক ক্ষমতার স্তরে তার বক্তব্যের অগ্রাহ্য হওয়া। এদিক থেকে উপন্যাসের শিরোনাম ‘বোবা কাহিনী’ অত্যন্ত ইঙ্গিতময়। আজাহের তো আক্ষরিক অর্থে বোবা নয়; কিন্তু সমাজের স্বীকৃত শ্রোতা ও ক্ষমতার ভাষার সামনে সে কার্যত বোবা হয়ে পড়ে। উপন্যাসের প্রথম পরিচ্ছদের সূচনাবাক্য—‘আজাহেরের কাহিনী কে শুনিবে?’—এই প্রাতিষ্ঠানিক নীরবতারই ঘোষণা।

‘আজাহেরের কাহিনী কে শুনিবে?’

বলাই বাহুল্য, প্রশ্নটি আলংকারিক; এর লক্ষ্যার্থ হলো আজাহেরের কাহিনি কেউ শোনে না, শুনবে না। যারা আজাহেরের কাহিনিতে আজাহেরের সমতলে আছে, এটা তাদেরও কাহিনি; ফলে তাদের শোনা না-শোনার কথা হচ্ছে না। তারা তো আজাহেরের সঙ্গেই কাহিনিটি যাপন করছে। আর আজাহের যেহেতু সমাজের নিচুতলে অবস্থান করে, লেখক শ্রোতাদের শনাক্ত করছেন মধ্য ও উপরিতলের মানুষদের মধ্যে। এখানে আরেকটি বিষয় পরিষ্কার করা দরকার: আজাহেরের কাহিনি যদি আজাহের নিজে বলে, তাহলে শোনার লোক পাওয়া যাবে না। তাই লেখককে আজাহেরের কাহিনি লিখতে হয়েছে।

এখানে লেখক কেবল আজাহেরের কাহিনি বলার দায় নিয়েছেন তা–ই নয়; তাঁর কাহিনির মধ্যকার ঘটনাগুলোতেও দেখা যায়, আজাহের তার ঊর্ধ্বতনের দ্বারাই ব্যক্ত হচ্ছে। আজাহের তার গ্রামের মোড়লের জন্য দিনমজুরি করে। আজাহেরের বিয়েতে তাকে প্রতিনিধিত্ব করে সেই মোড়ল; কেননা, দর–কষাকষি করতে হবে এমন পরিস্থিতিতে ‘সে ভালোমত করিয়া গুছাইয়া বলিতে পারে না’; তার গা কাঁপে। অবশ্য যাদের সঙ্গে তার দর–কষাকষির সম্পর্ক নেই, তাদের সে ঠিকই নির্দেশ দিতে পারে। যেমন ‘গেট ধরার বকশিশ’ নিয়ে দর–কষাকষি হবে—এমন পরিপ্রেক্ষিতে বরযাত্রীদের সে বলে, ‘তোরা কেউ কথা কবি না, যা কয় আমাগো মোড়ল কবি।’ কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই সে আবিষ্কার করে, মোড়ল তাকে যথাযথ প্রতিনিধিত্ব করে না। মোড়ল দর–কষাকষিতে আজাহেরের দুই পয়সা বাঁচিয়ে দেওয়ার জন্য তাকে এমনভাবে ছোট করে, যা তার নিজনির্ধারিত ভাবমূর্তিকে ক্ষুণ্ন করে। সে ভাবে, মোড়ল বিয়ের গেটে দাঁড়ানো কনেপক্ষকে আর চার আনা দিলেই পারত। তাকে এতটা গরিব দেখানো ঠিক হয়নি মোড়লের। সে যেহেতু গতর খেটেই মোড়লের দেনা শোধ করে, চার আনা বেশি দিলে নাহয় এক দিন বেশি খেটে শোধ করে দিতে পারত। এতে তার মর্যাদা রক্ষা পেত। আজাহেরের এই মর্যাদার চেতনাটুকু আছে; কিন্তু সে কেবল ভাবে, ব্যক্ত করতে পারে না। এটি বোবা কাহিনীর একটি লাইট মোটিফ; এই মোটিফ বারবার ফিরে আসে বিভিন্ন ঘটনায়। ঔপনিবেশিক শাসক হয়তো এটিকে আজাহেরের স্বভাব হিসেবে দেখবেন। কিন্তু আমরা উপন্যাসের কাহিনির বরাতে দেখব, এটি আর্থসামাজিক কাঠামোগত নিষ্পেষণের ফলে অর্জিত একটি বৈশিষ্ট্য। এই প্রস্তাবের পক্ষে একটি উদাহরণমূলক ঘটনায় দেখা যায়, আক্ষরিক অর্থে কোম্পানির বাটখারা আজাহেরকে ভড়কে দেয় এবং দর–কষাকষিতে আজাহেরের ঠকে যাওয়ার প্রভাবক হিসেবে কাজ করে।

কোম্পানির বাটখারা: বাজার, মাপ ও ভাষার ক্ষমতা

প্রথম ঘটনাটির পরিপ্রেক্ষিত দেওয়া যাক। আজাহেরের সামাজিক উত্তরণের আকাঙ্ক্ষা এবং তা বাস্তবায়নের জন্য তার প্রচেষ্টা ও পরিশ্রমের কমতি নেই। লেখকের ভাষায়, ‘মাথা গুঁজিবার মত দুখানা ঘর, লাঙল চালাইবার মত কয়েক বিঘা জমি আর পেট ভরিয়া আহার;-এরি স্বপ্ন লইয়া তাহারা’—অর্থাৎ আজাহের ও তার বউ—‘কত চিন্তা করে, কত পরামর্শ করে, কত ফন্দি-ফিকির আওড়ায়।’ এই যেমন সে মোড়ল থেকে জমি বর্গা নিয়ে পাট চাষ করে। সে তার বউকে বলে, ‘[...] আমাগো দিন এই বাবেই যাবি না। আশ্বিন মাসে পাট বেইচা অনেক টাহা পাব।’ ভাদ্র মাস আসে, সঙ্গে আসে পাটের ভালো ফলন। পাট কিনতে তার বাড়িতে আসে পাটের ব্যাপারী। এ ব্যাপার বা ব্যবসার চিত্রটি আমাদের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। পাটের ব্যাপারী অছিমদ্দী আজাহেরকে পাটের দাম কমিয়ে দিতে চায়। আজাহের জানে, ফরিদপুরে পাটের দাম ছয় টাকা মণ।  অছিমদ্দী তাকে দেয় মণপ্রতি সাড়ে চার টাকা। সে কেবল দামই কম দেয় তা নয়; মাপের সময়ও হেরফের করে, ঠকায়। আজাহের তার পাটের পরিমাণ আগেই মেপে রেখেছিল—ছাব্বিশ মণ। ব্যাপারীর পাল্লায় মাপ দেওয়ায় সেই একই পাটের ওজন আসে বিশ মণ। আজাহের পাটের দাম ও ওজন নিয়ে দর–কষাকষি করতে গেলে ব্যাপারী তার কণ্ঠস্বর দমন করতে কোম্পানির স্ট্যান্ডার্ড ব্যবহার করে। আজাহের দমে যায়। কোম্পানির স্ট্যান্ডার্ডের ব্যবহারটি কেমন, তা আজাহের ও ব্যাপারীর সংশ্লিষ্ট সংলাপের বাছাই করা বাক্যের মাধ্যমে দেখা যাক।

আজাহের: ‘তা বেপারীর পো, চার টাকার পাট আমি কিছুতেই ছাড়ব না।’

অছিমদ্দী: ‘আরে মিয়া তোমার পাট ত তেমুন বাল না। কোম্পানী-আলা পাট নিতিই চায় না।...।

আজাহের: ‘হুনলাম ফইরাতপুরি পাটের দাম ছয় টাহা মণ।’

অছিমদ্দী: ‘[...] যাও না ফইরাতপুর পাট লয়া। তোমার ভিজা পাট দেকলি পুলিশেই তোমাকে দৈরা দিব্যানে।’

এর সঙ্গে অছিমুদ্দিন আজাহেরের মনোভাব বুঝে আরও আট আনা বাড়িয়ে দেয়; আজাহেরকে মিঞা বলে সম্বোধনও করে। আজাহের ওইটুকু সম্মান পেয়েই গলে যায়, মণপ্রতি সাড়ে চার টাকা দরেই তার পাট বেচতে রাজি হয়ে যায়। এরপর পাটের ওজন করা নিয়ে যে সংলাপ, তাতেও আমরা দেখতে পাই, কোম্পানির পুলিশ ও বাটখারার ভয় দেখিয়ে আজাহেরকে ঠকানো হচ্ছে। এবারও তা সংশ্লিষ্ট সংলাপের বাছাই করা বাক্যের মাধ্যমে দেখা যাক।

আজাহের: ‘আমি নিজে ওজন দিছিলাম। পাটের ওজন ঐছিল ছাব্বিশ মণ। কিন্তুক আপনার ওজনে ঐল মোটে কুড়ি মণ।’

অছিমদ্দী: ‘[...] কোথাকার নকল পালা-পৈড়ান দিয়া তুমি ওজন দিছিলা। তাইতি ওজনে বেশী ঐছিল। একথা কারও কাছে কইও না, যে তোমার কাছে নকল পালা-পৈড়ান আছে। একথা পুলিশ জানতি পারলি এহনি তোমারে থানায় ধইরা নিয়া যাবি। আমার পালা-পৈড়ানে কোমপানি বাহাদুরের নাম লেহা আছে। ইংরাজী পড়বার পার মিঞার বেটা?" 

স্পষ্টতই আমরা দেখতে পাচ্ছি, কোম্পানির বাটখারা, কোম্পানির ইংরেজি এবং কোম্পানির পুলিশ—তথা ঔপনিবেশিক ক্ষমতা—কীভাবে একজন বর্গাচাষিকেও সন্ত্রস্ত করে তোলে: ঔপনিবেশিক বাটখারা সহি, প্রান্তিক বর্গাচাষির বাটখারা নকল। ঔপনিবেশিক ব্যবস্থা নির্ধারণ করে দেয়—শ্রমের ফসল নিম্নমানের; তদুপরি ভেজা বিধায় জেলে যাওয়ার ভয় আছে। বর্গাচাষি নিজের পক্ষের বক্তব্য ঔপনিবেশিক ক্ষমতার কাছে তুলে ধরতে পারে না। কেননা, সে ক্ষমতার ভাষায় কথা বলতে পারে না। যে ভাষায় কথা বললে তার কথা গ্রাহ্য হবে, সে সেই ভাষায় কথা বলতে পারে না; এই অর্থে সে কথা বলতে পারে না—he cannot speak.

আজাহেরের কাহিনির এই পর্বে আমরা দেখতে পেলাম, ঔপনিবেশিক ব্যবস্থা একটি বোবাকরণ-ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করছে, যার শিকার হচ্ছে নিম্নবর্গের মানুষ। ব্যবস্থাটি মনস্তত্ত্বের এত গভীরে শিকড় গেড়েছে যে উৎপাদক নিজের উৎপাদনের গুরুত্ব ভুলে যেতে বাধ্য হয়। যে পাট ঔপনিবেশিক অর্থনৈতিক চাকা ঘোরাতে কাজ করে, সেই পাট উৎপাদন করেও আজাহের ভাবতে বাধ্য হয়—তার উৎপাদিত পাট আসলে কিছু নয়; এর বিনিময়ে যে টাকা পাচ্ছে, তা তার শ্রমের মূল্য নয়, বরং অনুগ্রহ মাত্র। ঔপন্যাসিক আজাহেরের এই ভাবনার করুণ বর্ণনা দেন এভাবে:

‘এতো টাকা একসঙ্গে পাইয়া খুশীতে আজাহেরের ইচ্ছা করিতেছিল, অছিমদ্দী বেপারীর পায়ের কাছে লুটাইয়া ছালাম জানায়। সে যেন নিতান্ত অনুগ্রহ করিয়াই তাকে টাকাগুলি দিয়া গেল। পাটগুলি যে লইয়া গেল, সে যেন একটা তুচ্ছ উপলক্ষ মাত্র।’ 

পরিতাপের বিষয়, দর–কষাকষির সময় ঔপনিবেশিক বাটখারা, ইংরেজি ভাষা এবং পুলিশের ভয় দেখিয়ে যে তাকে ঠকানো হলো, আজাহের তা পুরোপুরি অজ্ঞাত নয়। কিন্তু সে এই অন্যায়কে নিজের উৎপাদন ও নিজের মর্যাদা তুচ্ছ করে বুঝে নিতে বাধ্য হয়। উপরন্তু তার বউ যখন বলে যে তাকে মাপে ঠকানো হয়েছে, মোড়লকে ডেকে এনে তার সামনে মাপের কাজটি করা যেত, তখন আজাহের স্বীকার করে যে কথাটি তার মনে আসেনি। এখানেই আবার প্রতিষ্ঠিত হয় যে উৎপাদক হিসেবে তার শ্রম আছে, কিন্তু নিজেকে প্রতিনিধিত্ব করার প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ নেই। আরও পরিতাপের বিষয়, এই ব্যর্থতা সে নিয়তির ভাষায় অনুবাদ করতে বাধ্য হয়। তার ভাষায়, ‘খোদা নছিবে যা লেখছে তাই তো আমি পাব। এর বেশি কিডা দিবি।’ এ কথা শুনে আজাহেরের বউও বোবা হয়ে যায়। কেননা, মন যত খুঁতখুঁত করুক, ‘এ কথার উপরে আর কথা চলে না।’ অর্থাৎ ঔপনিবেশিক শোষণ তার কাছে সরাসরি রাজনৈতিক অন্যায় হিসেবে নয়, নিয়তির ভাষায় অনূদিত হয়ে ফিরে আসে।

আদালত, চাপরাস ও প্রাতিষ্ঠানিক নীরবতা

প্রশ্ন উঠতে পারে—ঔপনিবেশিক শাসন তো একটি আইনব্যবস্থাও; এখানে আইন আছে, অন্যায়ের শিকার হলে প্রজারা সেই আইনের আশ্রয় নিতে পারে। দেখা যাক, আমাদের আজাহেরের বেলায় এই ব্যাপারে কী ঘটে। বিয়ের খরচ মেটাতে আজাহের গ্রামের কুসীদজীবী, তথা সুদের ব্যাপারী শরৎ সাহার কাছ থেকে পনেরো টাকা ঋণ নিয়েছিল। পাট বেচে সেই টাকা সুদে-আসলে ফেরতও দিতে গিয়েছিল সে। সাহারা একসময় ছিল বণিক; কিন্তু বর্তমানে সুদের ব্যবসা করে প্রচুর ধনসম্পদ ও কুখ্যাতি কুড়িয়েছে। কুখ্যাতির কারণ গরিব চাষাদের বিপদে ফেলে উচ্চ সুদ আদায়। যেমন শরৎ সাহা যখন জানে আমাদের আজাহের পাট বিক্রি করে বেশ কিছু টাকা পেয়েছে, তখন সে আজাহেরের কাছ থেকে ঋণের টাকা ফেরত না নিয়ে উল্টো তাকে জমি কেনার দুর্বুদ্ধি দেয়। আজাহেরও ভাবে, নিজের জমি হবে, সেই জমিতে ফসল ফলিয়ে সে ভাগ্য ফেরাবে। কিন্তু দেশের আইনের সুবিধা সে নিতে পারে না। বাড়ি থেকে টাকা এনে জমির দাম হিসেবে শরৎ সাহার হাতে তুলে দেয়; কিন্তু সংশ্লিষ্ট শিক্ষার অভাবে কোনো দলিল বা সাক্ষীর সুবিধা সে নিতে পারে না। বাকি থাকে কিছু টাকা, যা সে ফসল বিক্রি করে পরিশোধ করবে।

অতঃপর আমরা দেখি, সেই জমিতে সে নাওয়া-খাওয়া ভুলে পরিশ্রম করে ব্যাপক ফসল ফলায়। কিন্তু সেই ধান কেটে নিতে আসে শরৎ  সাহা; সে অস্বীকার করে যে আজাহেরের কাছে জমি বিক্রি করেছিল। জোর করে ফসল কেটে নিতে থাকে। তখন আজাহের চিৎকার করে কোম্পানিওয়ালার দোহাই দেয়, ইংরেজ বাহাদুরের দোহাই দেয়, মহারানি মায়ের দোহাই দেয়। তাতে শরৎ //// সাহা থামে না; সঙ্গে করে নিয়ে আসা কামলাদের বলে হাত চালিয়ে ধান কাটতে। কারণ, সে জানে, কোম্পানি তার পক্ষে থাকবে। আজাহেরের চিৎকার শুনে ছুটে আসে শরৎ সাহার ভাষায় ‘ছোটলোক’, ‘ছোট জাত’ গ্রামের মাতবর মিনাজদ্দী ও তার লোকেরা। মিনাজদ্দীরও শরৎ সাহার কাছ থেকে ঋণ নেওয়ার অভিজ্ঞতা আছে; ফলে সে জানে শরৎ সাহা মিথ্যা বলছে। তাই তার দলবল নিয়ে আজাহেরের পক্ষে খেতের ধান কাটতে শুরু করলে সাহাজি পিছু হটতে বাধ্য হয় এবং মিনাজদ্দীকে সদর কোর্ট, দেওয়ানি আদালতের ভয় দেখায়। বলে, সাপ নিয়ে খেলার পরিণাম ভালো হবে না; বড়শিতে বিঁধিয়ে টেনে নিয়ে গিয়ে নাগরদোলায় চড়াবে, তথা জেলের ভাত খাওয়াবে।

অবশেষে সাপ আসে আজাহেরের বাড়িতে। একজন খাকি পোশাক পরা লোক এসে খোঁজে ‘এক নম্বর আসামি আজাহের’-কে। আজাহেরকে না পেয়ে তার ঘরের বেড়ার সঙ্গে সমন বেঁধে দিয়ে যায়। লোকে বলে, ওই খাকি পোশাক পরা লোকটি আদালতের পিয়ন। পুঁথিপাঠক বচন মোল্লার সাহায্যে সেই সমনের পাঠোদ্ধার করতে গিয়ে সবাই জানতে পারে, তাতে আজাহেরকে আসামি করা হয়েছে। বচন মোল্লার পরামর্শে সে ওই সমন আগের স্থানেই বেঁধে রেখে দেয়। কিন্তু এই সমন নিয়ে আতঙ্ক সে বেঁধে রাখতে পারে না। ‘রাত্রে বিছানায় শুইয়া শুইয়া আজাহেরের ঘুম আসে না। সেই কাগজের টুকরাটি হিংস্র অজগর হইয়া যেন তাহাকে কামড়াইতে আসে।’ আরেক দিন সে স্বপ্নে দেখে, ‘তাহার শিশু পুত্রটি কোলের উপর বসিয়া খেলা করিতেছে। হঠাৎ সেই কাগজের টুকরাটি প্রকাণ্ড একটা হা করিয়া আসিয়া তার সেই শিশু পুত্রটিকে গ্রাস করিয়া ফেলিল। চিৎকার করিয়া করিয়া কাঁদিয়া উঠিয়া আজাহের কোলের ছেলেটিকে বুকের মধ্যে জড়াইয়া ধরে।’ এই স্বপ্ন বাস্তব হতে একটু সময় নেয়। পাঁচ বছর পর শরৎ সাহা গোটা দশেক লোক নিয়ে আদালতের পিয়নসহ আজাহেরের বাড়িতে আসে। যদিও আজাহের তার ঋণ শোধ দিয়েছে, তবু প্রমাণের অভাবে তা চক্রবৃদ্ধি হারে আরও যেন কী প্রকারে পাঁচ শত টাকা হয়েছে। যদি সে তা না দিতে পারে, তাহলে তার স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি ক্রোক হওয়ার ডিক্রি হয়েছে। কোমরে আদালতের চিহ্ন বা চাপরাস পরা পিয়ন সে কথাই ধমকের সঙ্গে বলল।

সুদ উশুল করার লক্ষ্যে সাহার লোক হালের গরু দুটি নিয়ে যেতে উদ্যত হয়। আজাহের এবারও কোম্পানির দোহাই দেয়, মা মহারানির দোহাই দেয়, আদালতের পিয়নের পা জড়িয়ে ধরে। পিয়ন বলে, ‘রাজার হুকুম, আমার কি সাধ্য আছে মিঞা সায়েব।’ আজাহেরের কান্না শুনে অনেকে তার বাড়িতে জড়ো হয়; মাতবর মিনাজদ্দীও আসে। সবাই দেখে আদালতের সেই পিয়নের ‘মাজায় আদালতের ছাপমারা চাপরাশ ঝকমক করিতেছে’; ফলে ‘কেহই আজাহেরকে কোন সাহায্য করিতে সাহস পাইল না।’ সাহার লোক তখন আজাহেরের ঘরের চাল, ডাল, বীজধান—সব নিতে উদ্যত হয়। আজাহেরের বউ পথ আগলিয়ে দাঁড়ালে তাকে তারা অসম্মান করতে যায়। মাতবর মিনাজদ্দী প্রতিবাদ করলে আদালতের পিয়ন এগিয়ে এসে তাকে নিবৃত্ত করে, ভয় দেখায়, আইন ভঙ্গ করলে আজাহেরের ওপর এবং যারা তাকে সাহায্য করতে এসেছে, তাদের ওপর কী ভয়াবহ দুর্যোগ নেমে আসবে, তার বিশদ বর্ণনা দেয়; পুলিশি নির্যাতনের উদাহরণ দেয়। শুনে মিনাজদ্দী দমে যায়। তাকে চুপ হতে দেখে পিয়ন বলে, ‘আমরা যে গ্রাম-ভরে এতো বুকটান করে ঘুরি সে নিজের জোরে নয় মাতবর সাহেব! এই চাপরাশের জোরে।’ এ যেন ঔপন্যাসিক আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছেন, ঔপনিবেশিক চাপরাশের ঝলক কীভাবে নিম্নবর্গের মানুষকে চোখ থাকতে অন্ধ করে দেয়, পুলিশি নির্যাতনের ভয় কীভাবে মুখ থাকতেও তাদের বোবা করে দেয়। অতঃপর তারা প্রতিবাদ গিলে ফেলতে বাধ্য হয়। ফলে মিনাজদ্দী আজাহেরকে উদ্ধার করতে ব্যর্থ হয়ে স্থান ত্যাগ করে। সাহার লোকজন ঘরের সব পুঁটলি বেঁধে গাড়িতে তোলে, টিনের চালও খুলে নেয়, বাড়ির উঠানে বাঁশ পুঁতে বাড়ি দখলের ঘোষণা করে এবং শেষে হালের গরু দুটিও নিয়ে যেতে থাকে। আজাহের গরু দুটির কাছে গিয়ে গলা জড়াইয়া ধরে ডাকে, ‘বোবাধন’। এতক্ষণে আমরা দেখি, আজাহের তার গরু দুটিকে বোবাধন বলে সম্বোধন করে। আমাদের মনে পড়ে যায়, উপন্যাসের নাম বোবা কাহিনী। কাহিনির ক্লাইম্যাক্সে এসে আমরা অনুভব করতে পারি, গরু যেমন বোবা, তেমন বোবা হচ্ছে আজাহের, আজাহেরের পরিবার, মাতবর মিনাজদ্দী এবং যারা তাকে সাহায্য করতে এসেছিল। ঔপন্যাসিক এই অঙ্কের উপসংহার এভাবে ব্যক্ত করেন, ‘তাহারা’—তথা গ্রামের লোকেরা—‘নীরব দর্শকের মতই দাঁড়াইয়া রহিল। কোন কথাই বলিতে পারিল না।’

আজাহের আবার সর্বহারা হয়ে পড়ল এবং শরৎ সাহার ওপর তার সমস্ত রাগ জমা হলো। সে এবং তার পরিবারের এমন লাঞ্ছনা-বঞ্চনা সে সহ্য করতে পারছে না; তার মনে কে যেন বলতে থাকে, শরৎ সাহার মুণ্ডু কেটে আন। মোড়লকে সে কথা বলার পর মোড়ল তাকে মাথা ঠান্ডা করতে বলে। আমরা দেখব, মোড়লের কথার উদ্দেশ্য হলো—মাথা ঠান্ডা করলে আসল কালপ্রিট চেনা যাবে। কিন্তু আজাহেরের মাথা ঠিক রাখা কঠিন। সে বলে, ‘ঠিক আর কি মোড়ল বাই! কাইল যখন দেখপ, আমার চাষ দেওয়া খ্যাতে অন্য মানষী হাল জুড়ছে, আমার এত আদরের গরু দুইডি অন্য লোকের খ্যাত চাষ করতাছে, ক্যামন কইরা তা আমি সহ্য করব মোড়ল বাই?’ আজাহেরের এই প্রশ্নের উত্তরে মোড়ল অমোঘ বাক্যটি উচ্চারণ করে, ‘কি করবা আজাহের! রাজার আইন।’ আমরা মোড়লের মাধ্যমে ঔপন্যাসিকের উপস্থিতি টের পাই। রাজার আইনই হচ্ছে আসল কালপ্রিট। এই আইন শরৎ সাহাদের মতো কুসীদজীবীদের পক্ষে কাজ করে। আমরা জানি, বঙ্গে মহাজনী সুদের ব্যবস্থা বা কুসীদবৃত্তি সবচেয়ে কুৎসিত রূপ লাভ করে ঔপনিবেশিক আমলে। শরৎ সাহার বয়ানে দেখি তারই সাক্ষ্য: সারা বঙ্গদেশজুড়ে তার টাকা খাটানো আছে, হাজার হাজার লোক তার কাছ থেকে উচ্চ সুদে ঋণ নিয়েছে, তার ঋণের খাতায় তার বাড়ি ভর্তি। বোবা কাহিনীতে ঔপন্যাসিক ইঙ্গিত করেন, বণিকদের বাণিজ্য করার বৃত্তি ভারতের অন্যদের হাতে চলে যায় এবং বঙ্গের বণিকেরা অলস হয়ে পড়ে কৃষকের ঘাড়ে বসে সুদের ব্যবসা করে বিশাল সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলে। আমরা এ–ও জানি যে এই রূপান্তর শীর্ষে পৌঁছেছিল ঔপনিবেশিক আমলে; নতুন ভূমি আইন, তথা চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে লাখো কৃষক ভূমিহীন হয়ে পড়ে। তারা নির্ভরশীল হয়ে পড়ে জমিদার ও সুদের ব্যাপারী মহাজনদের খপ্পরে। ঔপনিবেশিক শাসন এবং বিশেষত চিরস্থায়ী বন্দোবস্তজাত এই খপ্পর, তথা মজলুমিয়াতের মধ্যেই ম্রিয়মাণ আজাহেরের নিজের কাহিনি শেষ হয়। শুরু হয় আজাহেরের ছেলে বছিরের কাহিনি।

বছির, শিক্ষা ও লোকায়ত আধুনিকতার সম্ভাবনা

বছির যখন উচ্চশিক্ষার্থে বিলেত যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন গ্রামের সব লোক আজাহেরের উঠানে আসে তাকে বিদায় জানাতে। গরিবুল্লা মাতবর বছিরকে বিদায়বেলায় যে কথাগুলো বলেন, তা আমাদের অনুসিদ্ধান্তকে প্রতিপাদন করে। গরিবুল্লা বছিরকে বলেন, ‘বাজান রে, আমরা বোবা। দুস্কের কথা কয়া বুজাইতে পারি না। তাই আমাগো জন্যি কেউ কান্দে না। তোমারে আমরা আমাগো কান্দার কান্দুইনা বানাইবার চাই।’ বছিরের মধ্যে জসীমউদ্‌দীনকে দেখতে পান পূর্বোক্ত প্রাবন্ধিক জ্যোতিপ্রকাশ চট্টোপাধ্যায়; অন্য কথায়, নিম্নবর্গের মুসলমান সমাজের কথা বিশ্বের কাছে প্রকাশ করা বা পৌঁছে দেওয়ার কাঙ্ক্ষিত চরিত্র হিসেবে তাঁকে চিহ্নিত করেন। তাঁর ভাষায়, ‘জসীমউদ্‌দীন এই বোবাদের কাহিনিই লিখেছেন। তাদের কান্দুইনা হয়েছেন।’ এ প্রসঙ্গে নিজের লেখালিখি সম্পর্কে জসীমউদ্‌দীনের নিম্নোক্ত বক্তব্যটি বিবেচনার যোগ্য।

‘...দেশের অর্ধশিক্ষিত আর শিক্ষিত সমাজ আমার পাঠক-পাঠিকা। তাহাদের কাছে আমি গ্রামবাসীদের সুখ-দুঃখ ও শোষণ-পীড়নের কাহিনি বলিয়া শিক্ষিত সমাজের মধ্যে তাহাদের প্রতি সহানুভূতি জাগাইতে চেষ্টা করি। আর চাই, যারা দেশের এই অগণিত জনগণকে তাহাদের সহজ-সরল জীবনের সুযোগ লইয়া তাহাদিগকে দারিদ্র্যের নির্বাসনে ফেলিয়া রাখে, তাহাদের বিরুদ্ধে দেশের শিক্ষিত সমাজের মনে বিদ্রোহের আগুন জ্বালাইতে।’  

অতঃপর আমরা জানি, জসীমউদ্‌দীনের এই গণমুখী ও প্রান্তিকজন-সহানুভূতিশীল লক্ষ্য আজও পুরোপুরি অর্জিত হয়নি। দেশের শিক্ষিত সমাজের বড় অংশ এখনো নব্য ঔপনিবেশিক নানা বন্দোবস্ত বাস্তবায়নে ব্যস্ত; তাদের অনেক ব্যাপার-স্যাপারে শাসক-পরিমাপক হিসেবে উপনিবেশবাদী কোম্পানিগুলোর বাটখারা কার্যকর রয়ে গেছে। বিষয়টি জসীমউদ্‌দীনের ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়; বরং সাবঅলটার্ন ও উত্তর–ঔপনিবেশিক পাঠে দেখা যায়, কেবল একজন প্রতিনিধির শিক্ষিত হয়ে ওঠা নিম্নবর্গের সামষ্টিক মুক্তির নিশ্চয়তা দেয় না। এমন সমাজ থেকে একজন বছির হয়তো বিলেতে গিয়ে জীবাণুবিজ্ঞানী হতে পারে, কিন্তু তাতে তাম্বূলখানা গ্রামের গরিব মানুষের শ্রেণি–উত্তরণ নিশ্চিত হয় না। তাম্বূলখানার মতো আরও হাজারো গ্রামের প্রান্তিক চাষির ভাগ্য পরিবর্তনের বস্তুগত শর্তও কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যে হাজির হয় না।

এই সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও জসীমউদ্‌দীনের প্রস্তাব তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি সমাজ রূপান্তরের পন্থা হিসেবে আধুনিক শিক্ষাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছেন। কিন্তু তা বিচ্ছিন্ন, শহরমুখী বা এলিট আধুনিকতার অনুকরণে নয়। বছির যে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করে তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছায়, সেই ত্যাগ তার শ্রেণির জন্য বিশেষভাবে কঠিন; অন্য শ্রেণিতে একই উত্তরণের জন্য এমন ত্যাগ প্রয়োজন হয় না। এখানেই শ্রেণিগত অসাম্য রয়ে যায়। তবু জসীমউদ্‌দীনের পার্থক্য এই যে উপন্যাসটির মূল নায়ক আসলে একটি বর্গ, যদিও তা আজাহেরের কাহিনির আলোকে ব্যক্ত হচ্ছে। আজাহেরের মাধ্যমে লেখক পুরো বর্গের বোবাত্বকে তুলে ধরেছেন; সামাজিক, অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক বেড়াজালের ভেতর ব্যক্তি ও বর্গ কীভাবে বোবাকরণের শিকার হয়, তার একটি ঘন এথনোগ্রাফিক চিত্র নির্মাণ করেছেন। আর সমস্যার সমাধানের যে পথ তিনি নির্দেশ করেন, তা আধুনিকতার পথ হলেও নিজস্ব সংস্কৃতি, লোকায়ত অভিজ্ঞতা ও সামষ্টিক দায়বোধ থেকে বিচ্ছিন্ন নয়।

বছিরকে প্রথমে রমিজদ্দীন উকিলের বাড়িতে থেকে পড়াশোনা করতে পাঠান ঔপন্যাসিক জসীমউদ্‌দীন। মধ্যবিত্ত রমিজদ্দীন উকিল মুসলমান মক্কেল পাওয়ার জন্য হিন্দু উকিলদের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক ঘৃণা ছড়াতে শুরু করে। সে শুধু এতেই সীমিত থাকতে পারে না, কেননা পথটি পিচ্ছিল। সে স্থানীয় মৌলভি-মৌলানাদের তার সমিতিতে সদস্য করে নেয়, তাদের মাধ্যমে মক্কেল জোগাড় করে। উকিল ও মৌলভি মিলে গরিব মুসলমানদের জীবনাচরণের ওপর ফতোয়া জারি করে। তার মতে, হিন্দুয়ানি নৌকাবাইচে অংশ নেওয়া হারাম; তাই করিমের নৌকা ভেঙে দিতে চায়। বয়াতি গানে আরজান ফকিরকে হেনস্তা করে, তার মাথার চুল কেটে দেয়, তার সারিন্দা ভেঙে দেয় এবং তাকে একঘরে করে। এসব দেখে উকিলের বাড়িতে আশ্রিত বছির আরজান ফকিরসহ গরিব চাষিদের ওপর উকিল-মৌলভিদের অত্যাচারের জন্য নিজেকেও দায়ী মনে করে। এই দায় থেকে বের হওয়ার জন্য সে আরজান ফকিরের বাড়িতে যায়, কেঁদে কেঁদে তার অনুভূতির কথা জানায়। আরজান ফকিরও তাকে আপন করে নেয়। বছিরের এই সীমা লঙ্ঘনের কথা উকিল রমিজদ্দীন জানতে পারে এবং তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়।

বছির রমিজদ্দীন উকিলের বাড়ি থেকে বেরিয়ে এক মসজিদে আশ্রয় নেয়। কিছুদিন সে আশ্রয়ে থাকতে পারলেও রমিজদ্দীনের আদেশে ইমাম সাহেব বছিরকে বের করে দিতে বাধ্য হন। ইমামের সহানুভূতির অভাব না থাকলেও তাঁর কাছে জানা যায়, উকিলের ক্ষমতাবলয়ের কাছে মসজিদের দাতব্য চরিত্র অসহায়। ঔপন্যাসিক জসীমউদ্‌দীনও উপন্যাসের মধ্যেই তৎকালীন ঔপনিবেশিক শাসনের ফলে অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল বর্গ ও ধর্মনেতাদের অধঃপতনের বিষয়ে বিশ্লেষণ হাজির করেন। শাসনব্যবস্থার কাছে ক্ষমতা হারিয়ে ধর্মনেতারা নানা ফতোয়া নিয়ে গরিব নির্যাতনে নেমে পড়ে। আর অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল বর্গের সদস্যরা শোষণের সহায়কের ভূমিকা পালন করে। এই দুই পক্ষকেই সমাজ রূপান্তরের পথে প্রতিবন্ধকতা হিসেবে চিত্রিত করেন ঔপন্যাসিক। এরপর তিনি বছিরকে আরজান ফকিরের বাড়িতে থেকে পড়াশোনা করার জন্য পাঠিয়ে দেন।

আরজান ফকির একজন ভিক্ষুক, একজন বয়াতি। তার বাড়িতে থেকে পড়াশোনা করে সাফল্যের মুখ দেখে বছির। এই সফলতার পেছনে ফকিরনির মমতা ও যত্ন যেমন আছে, তেমন আছে গ্রামের লোকদের যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী বছিরের শিক্ষা-উপকরণ কেনার জন্য আর্থিক অনুদান। বছিরের শিক্ষার আশু উদ্দেশ্য ম্যালেরিয়ার জীবাণু নিয়ে গবেষণা করা, কেননা এটি তার গ্রামের একটি স্থানীয়/এন্ডেমিক সমস্যা। গ্রামের সবাই এই জ্বরের কবলে আছে এবং তার নিজের বোন এই জ্বরেই মারা গেছে। ফলে এই সমস্যা দূর করাকেই জীবনের লক্ষ্য করে নিয়েছে বছির। এটি সর্বজনের সহায়তায় সর্বজনের সমস্যা দূরীকরণের জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষালাভ এবং সেই শিক্ষার সুফল সর্বজনের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার একটি লোকজ পন্থা। এই পন্থা স্থানীয়, সমস্যাভিত্তিক এবং ব্যক্তি ও সমাজের সম্পর্কের ওপর নির্মিত; এর কার্যক্ষেত্রও ছোট। এই বিবেচনায় জসীমউদ্‌দীনের বেছে নেওয়া রূপান্তরের সংস্করণ একই সঙ্গে লোকায়ত ও আধুনিক; এবং সর্বোপরি, আধুনিকতাবাদের মূলধারা নির্দেশিত পন্থার মতো অন্ধগলিতে আটকে যাওয়ার নিয়তি থেকে মুক্ত।

উপসংহার

সুতরাং বোবা কাহিনী কেবল আজাহের নামের এক দরিদ্র কৃষকের ব্যক্তিগত বিপর্যয়ের কাহিনি নয়; এটি ঔপনিবেশিক আইন, বাজার, ভাষা ও প্রশাসনিক ক্ষমতার সম্মিলিত ব্যবস্থায় নিম্নবর্গের বোবাকরণের কাহিনি। কোম্পানির বাটখারা এখানে শুধু ওজন মাপার যন্ত্র নয়; এটি বৈধতা, ভয়, ভাষা ও শাসনের রূপক। আজাহেরের পাট, জমি, গরু, ঘর—সবকিছু হারানোর সঙ্গে সঙ্গে তার নিজের বক্তব্যের সামাজিক কার্যকারিতাও হারিয়ে যায়। অন্যদিকে বছিরের শিক্ষা সম্ভাবনার দরজা খুললেও সেই সম্ভাবনা ব্যক্তিগত উত্তরণের সীমা অতিক্রম করে সামষ্টিক মুক্তির শর্ত তৈরি করতে পারে কি না, এই প্রশ্ন উপন্যাসটি খোলা রাখে। এই খোলা প্রশ্নের মধ্যেই বোবা কাহিনীর রাজনৈতিক ও সাহিত্যিক শক্তি নিহিত।

তথ্যসূত্র

স্পিভাক ১৯৮৮।। Gayatri Chakravorty Spivak, 'Can the Subaltern Speak?', Marxism and the Interpretation of Culture, Cary Nelson and Lawrence Grossberg (eds.), Basingstoke: Macmillan Education, pp. 271-313।

জসীম ১৯৯৭।। জসীমউদ্‌দীন, যে দেশে মানুষ বড়, ঢাকা: পলাশ প্রকাশনী।

মোতালেব ২০১৪।। আবদুল মোতালেব শেখ, ‘জসীম উদ্‌দীনের বোবা _কাহিনী: লোকসংস্কৃতির উপাদান’, অনুস্বার, মার্চ ২৩। দেখুন, t.ly/Xnc_O। 

জ্যোতিপ্রকাশ ২০১৬।। জ্যোতিপ্রকাশ চট্টোপাধ্যায়, ‘জসীম উদ্‌দীনের উপন্যাস, নূতন পাঠ’, জসীম উদ্‌দীনের, পুলক চন্দ সম্পাদিত, নতুন দিল্লি: সাহিত্য অকাদেমি, পৃ. ১১৪-১২৮।

কিথ ১৯২২।। Arthur Berriedale Keith, Speeches and Documents on Indian Policy, 1750-1921, London: Oxford University Press।

অনামা ১৮৩২।। Minutes of Evidence Taken before the Select Committee on the Affairs of the East India Company: and also an Appendix and Index: III. Revenue, London: House of Commons।

লেখক পরিচিতি

ড. আহমেদ শামীম যুক্তরাষ্ট্রের কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাঙ্গুয়েজ রিসোর্স সেন্টারে (এলআরসি) একাডেমিক প্রোগ্রাম কোঅর্ডিনেটর হিসেবে কর্মরত আছেন। এই দায়িত্বে তিনি এলআরসির বিভিন্ন একাডেমিক ভাষাবিষয়ক উদ্যোগ সমন্বয় ও মূল্যায়ন করেন, যার মধ্যে রয়েছে শেয়ারড কোর্স ইনিশিয়েটিভ, ল্যাঙ্গুয়েজেস অ্যাক্রস দ্য কারিকুলাম এবং জাম্পস্টার্ট। এলআরসি-তে যোগদানের আগে তিনি এক দশকেরও বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত সেমিস্টার এবং সামার প্রোগ্রামগুলোতে বাংলা পড়িয়েছেন। শামীম ভাষাবিজ্ঞানে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেছেন। বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও ভাষাবিজ্ঞান বিষয়ে তাঁর দুটি বই প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর গবেষণার আগ্রহের জায়গাগুলো হলো ভাষা শিক্ষাদান পদ্ধতি, ধ্বনিতত্ত্ব, রূপতত্ত্ব এবং ব্যাকরণ।

Read full story at source