বিড়াল কেন টুনা মাছ এত পছন্দ করে
· Prothom Alo
বিড়াল আর মাছের গল্প তো ছোটবেলা থেকেই সবার জানা। কার্টুনের বিড়াল হোক কিংবা ঘরের পোষা বিড়াল, মাছের গন্ধ পেলে ম্যাও ম্যাও করে পায়ে এসে লুটোপুটি খাবেই। বিশেষ করে টুনা মাছের প্রতি বিড়ালদের টান যেন একটু বেশি। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছ, বিড়ালের মতো একটা প্রাণী কীভাবে সামুদ্রিক টুনা মাছের এত বড় ভক্ত হলো?
বিড়ালের পূর্বপুরুষেরা তো নদী বা সাগরের ধারেকাছে থাকত না। এদের বাস ছিল মরুভূমিতে। সেখান থেকে সামুদ্রিক মাছের প্রতি এমন টান সত্যিই অদ্ভুত। সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা এর কারণ খুঁজে পেয়েছেন। বিজ্ঞানীদের মতে, মানুষের মতো বিড়ালের জিবেও বিভিন্ন স্বাদ নেওয়ার ক্ষমতা বা ‘টেস্ট বাড’ আছে। আমরা মিষ্টি, টক, নোনতা আর তেতো স্বাদের পাশাপাশি আরও একটি স্বাদ পাই, যার নাম উমামি। এটি মূলত মাংসের একটি তীব্র ও সুস্বাদু স্বাদ। বিড়ালের জিবে এই স্বাদটিই সবচেয়ে বেশি সাড়া জাগায়।
Visit afrikasportnews.co.za for more information.
২০২৩ সালে বিজ্ঞান সাময়িকী ‘কেমিক্যাল সেন্সেস’-এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশিত হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, বিড়ালের জিবে এই উমামি স্বাদ চেনার বিশেষ রিসেপ্টর বা কোষ রয়েছে। বিড়াল যেহেতু পুরোপুরি মাংসাশী প্রাণী, তাই উমামি স্বাদই এদের সবচেয়ে প্রিয়।
শত্রু হয়েও কিছু বিড়াল কেন কুকুরের সঙ্গে খেলেগবেষকেরা আরও পরীক্ষা করে দেখেছেন, টুনা মাছে এমন কিছু উপাদান বা অণু থাকে, যা বিড়ালের এই উমামি রিসেপ্টরগুলোকে খুব দ্রুত ও তীব্রভাবে জাগিয়ে তোলে। অর্থাৎ টুনা মাছ মুখে দিলেই বিড়ালের জিবে অন্য কোনো খাবারের চেয়ে অনেক বেশি সুস্বাদু অনুভূতির সৃষ্টি হয়। ঠিক এই কারণে বিড়াল অন্য সবকিছুর চেয়ে টুনা মাছ খেতে এতটা পছন্দ করে।
জাপানের মেইজি বিশ্ববিদ্যালয়ের আণবিক জীববিজ্ঞানী ইয়াসুকা তোদা জানান, এই আবিষ্কারের ফলে বিড়ালের পছন্দ-অপছন্দ সম্পর্কে আরও নিখুঁত ধারণা পাওয়া যাবে। এর ওপর ভিত্তি করে পোষা প্রাণীর জন্য খাদ্য তৈরি করার কোম্পানিগুলো বিড়ালের জন্য আরও স্বাস্থ্যকর খাবার বানাতে পারবে। এমনকি বিড়ালের জন্য এমন ওষুধ তৈরি করা সম্ভব হবে, যা এরা কোনো রকম ঝামেলা ছাড়াই আনন্দের সঙ্গে খেয়ে নেবে।
পোষা বিড়ালদের স্বাদ নেওয়ার ক্ষমতা কিন্তু বেশ অদ্ভুত। মানুষের মতো ওরা সব ধরনের খাবারের স্বাদ পায় না। যেমন বিড়াল কোনো মিষ্টি জিনিসের স্বাদ বুঝতে পারে না। কারণ, মিষ্টি স্বাদ চেনার জন্য শরীরে যে বিশেষ প্রোটিনের দরকার হয়, বিড়ালের তা নেই।
কিন্তু কেন এমন হলো? পোষ্যখাদ্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ‘ওয়ালথাম পেটকেয়ার সায়েন্স ইনস্টিটিউট’-এর ফ্লেভার সায়েন্টিস্ট স্কট ম্যাকগ্রেন এর একটি চমৎকার ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, যদি কোনো জিনিস ব্যবহার না করা হয়, তবে তা একসময় হারিয়ে যায়। বিড়াল যেহেতু পুরোপুরি মাংসাশী প্রাণী আর মাংসে কোনো চিনি বা মিষ্টি থাকে না, তাই বিড়ালের মিষ্টি স্বাদ নেওয়ার ক্ষমতা নেই। এমনকি বিড়ালের তেতো স্বাদ চেনার ক্ষমতাও অনেক কম।
বিশ্বকাপের জার্সি পরে ঘুরে বেড়াচ্ছে হাঁসতাহলে বিড়াল আসলে কীসের স্বাদ পায়? বিড়াল মূলত মাংসের সুস্বাদু স্বাদ খুঁজে বেড়ায়। মানুষের জিবে দুটি বিশেষ জিন ‘Tas1r1’ এবং ‘Tas1r3’ মিলে এমন একটি কোষ তৈরি করে, যা মাংসের আসল স্বাদ বা উমামি বুঝতে সাহায্য করে। বিড়ালেরও এই জিন দুটি আছে কি না, তা নিয়ে বিজ্ঞানীরা এখনো নিশ্চিত না।
মানুষের কাছে মিষ্টি খাবার যেমন প্রিয়, বিড়ালের কাছে উমামি বা মাংসের স্বাদ ঠিক ততটাই লোভনীয়। কুকুর মিষ্টি ও উমামি দুটি স্বাদই বোঝে বলেই হয়তো খাবারের ব্যাপারে কুকুরের চেয়ে বিড়ালের বাছবিচার অনেক বেশি থাকে। বিড়ালের স্বাদের গবেষণা থেকে কোম্পানিগুলো বিড়ালের জন্য আরও সুস্বাদু খাবার তৈরি করতে চেষ্টা করছে। এমনকি ওষুধের সঙ্গে উমামি স্বাদ মিশিয়ে দিলে বিড়াল সহজেই তা গিলে ফেলবে, যা বিড়ালপ্রেমীদের বড় একটি স্বস্তি দেবে।
তবে মরুভূমির প্রাণী হয়েও বিড়ালের টুনা মাছের প্রতি এই আকর্ষণের রহস্য পুরোপুরি জানতে পারেননি বিজ্ঞানীরা। ১০ হাজার বছর আগে মরুভূমিতে মাছ পাওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না। ধারণা করা হয়, বিড়াল এই অভ্যাসটি সময়ের সঙ্গে রপ্ত করেছে। খ্রিষ্টপূর্ব ১৫০০ অব্দের প্রাচীন মিসরীয় ছবিতে ও মধ্যযুগে বন্দরের জেলেদের ফেলে দেওয়া উচ্ছিষ্ট মাছ খেয়ে বিড়াল এই স্বাদ চিনেছে। গবেষকেরা জানান, মাছের প্রতি রুচি তৈরি হওয়া বিড়ালগুলো খাবার পাওয়ার দিক থেকে অন্য বিড়াল থেকে এগিয়ে ছিল।
সূত্র: সায়েন্স অর্গ, লাইভ সায়েন্সবিড়াল গাছে উঠে আটকে গেলে কী করব