মাটির নিচে ছত্রাকের রহস্যময় জাল

· Prothom Alo

আমাদের পায়ের নিচের মাটি স্থির মনে হলেও সেখানে প্রতিনিয়ত এক বিশাল কর্মযজ্ঞ চলছে। উদ্ভিদ এবং ছত্রাকের এই কর্মযজ্ঞকে বলা হয় মাইকোরাইজাল নেটওয়ার্ক। এটি আসলে মাটির নিচে ছড়িয়ে থাকা ছত্রাকের এক অবিশ্বাস্য সুতার জাল। মাটি থেকে পুষ্টি উপাদান উদ্ভিদে পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি উদ্ভিদের সালোকসংশ্লেষণ থেকে তৈরি কার্বন মাটির অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে সহায়তা করে এই জাল। পৃথিবীর প্রায় ৭০ শতাংশ উদ্ভিদ প্রজাতি বেঁচে থাকার জন্য এই আণুবীক্ষণিক জালের ওপর নির্ভর করে। সম্প্রতি মাটির নিচে থাকা ছত্রাকের এই রহস্যময় অদৃশ্য জালের বৈশ্বিক মানচিত্র তৈরি করেছেন নেদারল্যান্ডসের ভ্রিজে ইউনিভার্সিটি আমস্টারডাম ও সোসাইটি ফর দ্য প্রোটেকশন অব আন্ডারগ্রাউন্ড নেটওয়ার্কসের গবেষকেরা।

গবেষণায় দেখা গেছে, মাটির নিচে থাকা আরবাস্কুলার মাইকোরাইজাল ছত্রাকের সুতা সম্মিলিতভাবে প্রায় ১১০ কোয়াড্রিলিয়ন কিলোমিটারজুড়ে বিস্তৃত। এই দৈর্ঘ্য কতটা বিশাল, তা সাধারণ কল্পনার বাইরে। পৃথিবী থেকে সূর্যের দূরত্ব প্রায় ১৫ কোটি কিলোমিটার। মাটির নিচের এই ছত্রাকের জাল দিয়ে পৃথিবী থেকে সূর্য পর্যন্ত প্রায় ১০০ কোটি বার যাতায়াত করা সম্ভব। এ বিষয়ে ভ্রিজে ইউনিভার্সিটি আমস্টারডাম ও সোসাইটি ফর দ্য প্রোটেকশন অব আন্ডারগ্রাউন্ড নেটওয়ার্কসের পরিবেশবিদ জাস্টিন স্টুয়ার্ট জানান, এই ছত্রাকের গুরুত্ব এবং বিশালতা সহজে বোঝানো কঠিন। মাত্র এক চা–চামচ মাটিতে প্রায় ১০ মিটার (প্রায় ৩৩ ফুট) দীর্ঘ মাইকোরাইজাল নেটওয়ার্ক থাকতে পারে। ছত্রাকের এই নেটওয়ার্ক মূলত হাইফি নামক মাটির নিচের সূক্ষ্ম সুতার সমন্বয়ে গঠিত। এগুলো বিভিন্ন উদ্ভিদের নিচে ছড়িয়ে থাকে। উদ্ভিদের শিকড় যেখানে পৌঁছাতে পারে না, সেখান থেকে এই সুতাগুলো ফসফরাস ও পানি টেনে এনে উদ্ভিদকে দেয়। বিনিময়ে উদ্ভিদের কাছ থেকে কার্বন সংগ্রহ করে। এই আদান-প্রদানের কারণে বিজ্ঞানীদের একাংশ একে উড ওয়াইড ওয়েব নামে ডাকেন। এটি আমাদের গ্রহের কার্বন চক্রের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।

Visit grenadier.co.za for more information.

গবেষকদের তথ্যমতে, বিশ্বের নয়টি ভিন্ন অঞ্চল থেকে ১৬ হাজারের বেশি মাটির নমুনা সংগ্রহ করার পাশাপাশি আগের ৩২২টি গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এরপর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা মেশিন লার্নিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে যেসব অঞ্চলের তথ্য পাওয়া যায়নি, সেখানকার ছত্রাকের জালের ঘনত্ব অনুমান করা হয়েছে। একই সঙ্গে রোবোটিক ইমেজিংয়ের মাধ্যমে ৩ লাখেরও বেশি জীবন্ত ছত্রাকের সুতার পুরুত্ব পরিমাপ করে জালের দৈর্ঘ্যকে জৈবভর বা বায়োমাসে রূপান্তর করা সম্ভব হয়েছে। দেখা গেছে, মাটির ওপরের অংশে মাত্র ১৫ সেন্টিমিটারের মধ্যে প্রায় ১১০ কোয়াড্রিলিয়ন কিলোমিটার দীর্ঘ হাইফি রয়েছে। মাটির নিচে এই জালের মোট ওজন প্রায় ৩০ কোটি টন। এই বিশাল নেটওয়ার্কের মধ্য দিয়ে প্রতিবছর উদ্ভিদ থেকে মাটির নিচের ইকোসিস্টেমে প্রায় ৪০০ কোটি টন কার্বন ডাই-অক্সাইড সমতুল্য উপাদান স্থানান্তরিত হয়।

গবেষণায় সবচেয়ে বড় চমক দেখা গেছে ছত্রাকের ঘনত্বের স্থান নিয়ে। সাধারণ ধারণামতে ক্রান্তীয় রেইনফরেস্ট বা আমাজনের মতো বনে এই জালের ঘনত্ব বেশি হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে, তৃণভূমি, প্রেইরি, স্টেপ এবং জলাভূমিতে এই জালের ঘনত্ব সবচেয়ে বেশি। পৃথিবীর মোট ছত্রাকের বায়োমাসের প্রায় ৪০ শতাংশই এসব এলাকায় অবস্থিত। ধারণা করা হচ্ছে, ঘাসজাতীয় উদ্ভিদগুলো গাছের তুলনায় ছত্রাককে বেশি কার্বন সরবরাহ করে। তবে গবেষণায় একটি উদ্বেগজনক তথ্যও উঠে এসেছে। যেসব জমিতে নিয়মিত কৃষিকাজ বা চাষাবাদ করা হয়, সেখানে ছত্রাকের জালের ঘনত্ব সাধারণের চেয়ে গড়ে ৪৭ শতাংশ কম। অতিরিক্ত রাসায়নিক সার যেমন ফসফরাস ও নাইট্রোজেন এবং ছত্রাকনাশক ব্যবহারের কারণে এই নেটওয়ার্ক ধ্বংস হচ্ছে। এর দীর্ঘমেয়াদি পরিণতি হিসেবে মাটির কার্বন ধরে রাখার ক্ষমতা এবং পুষ্টি পরিবহনের সক্ষমতা মারাত্মকভাবে কমে যেতে পারে।

সূত্র: সায়েন্স অ্যালার্ট

Read full story at source