ইউক্রেনযুদ্ধে হারছে রাশিয়া, কিন্তু পুতিন কেন এত মরিয়া
· Prothom Alo

প্রায় সবাই মনে করছেন, ইউক্রেনে ভ্লাদিমির পুতিন গভীর সংকটে পড়েছেন। ভ্লাদিমির জেলেনস্কি, তাঁর ইউরোপীয় সমর্থকেরা এবং পশ্চিমা সামরিক বিশ্লেষক ও ভাষ্যকার—সবাই যেন বিশ্বাস করেন, রাশিয়ার এই শাসক অপমানজনক পরিণতির দিকে এগোচ্ছেন। অবশ্য সবাই ভুলও হতে পারেন। কিন্তু যদি তাঁরা ঠিক হন?
Visit esporist.com for more information.
যদি সত্যিই পরাজয়ের সম্ভাবনা সামনে আসে, তাহলে নীতিগত ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিয়ে আতঙ্কিত ও কোণঠাসা পুতিন কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাবেন? অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, তিনি আত্মসমর্পণ করবেন না; বরং সংঘাত আরও বাড়াবেন। তাঁর বিকল্পের পরিসর ইউটিউবে প্রচারণা যুদ্ধ চালানো থেকে শুরু করে পারমাণবিক যুদ্ধ পর্যন্ত বিস্তৃত।
ইউক্রেনের জন্য সাম্প্রতিক খবরগুলো মূলত ইতিবাচক। অত্যাধুনিক ইউক্রেনীয় ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে তারা আগ্রাসী বাহিনীকে প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে যেতে বাধ্য করেছে। বলা হচ্ছে, রাশিয়ার নিহত ও আহত সেনার সংখ্যা মাসে প্রায় ৩০ হাজারে পৌঁছেছে। তাদের অগ্রযাত্রা থেমে গেছে, কিছু জায়গায় আবার পিছু হটতেও হয়েছে। রাশিয়ার ভেতরে ইউক্রেনীয় বিমান হামলা যুদ্ধের বাস্তবতা এমন জনগণের সামনে তুলে ধরছে, যাদের বিভ্রান্ত ও হতাশ করে রাখা হয়েছিল। সেন্ট পিটাসবার্গ জ্বলছে। জ্বালানির সংকটে আতঙ্কিত হয়ে মানুষ অতিরিক্ত কেনাকাটা করছে।
মূল্যস্ফীতি ও কর বাড়ছে। ২০২২ সালে পুতিনের ঘোষিত ‘বিশেষ সামরিক অভিযান’, যা দ্রুত বিজয় এনে দেওয়ার কথা বলেছিল, সেটি এখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের চেয়ে দীর্ঘস্থায়ী হয়ে গেছে।
ট্রাম্প ও পুতিন কেন ভুলের ফাঁদ থেকে বের হতে পারছেন নাইউক্রেনীয়রা এখনো প্রতিদিন আরও নির্বিচার বিমান হামলার শিকার হচ্ছে। কিন্তু গত সপ্তাহে দ্য গার্ডিয়ানকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জেলেনস্কি আশাবাদ জানান, এই দুঃস্বপ্ন হয়তো শেষের দিকে। তাঁর এই মূল্যায়ন আংশিকভাবে সমর্থন করছেন পশ্চিমা বিশেষজ্ঞরাও। রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিস ইনস্টিটিউটের স্থলযুদ্ধ–বিশেষজ্ঞ জ্যাক ওয়াটলিং এ মাসে লিখেছেন, রাশিয়ার যুদ্ধক্ষেত্রের সক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ছে এবং যুদ্ধবিরতি নাগালের মধ্যে আসতে পারে। মার্কিন ভাষ্যকার সেথ স্টডার লিখেছেন, ‘পুতিনের নিষ্ঠুরতাকে ছাড়িয়ে গেছে কেবল এর অসারতা। ধীরে হলেও নিশ্চিতভাবে তিনি নিজেরই বাধানো যুদ্ধে হারছেন।’
সবই ভালো শোনায়। কিন্তু এখানে তিনটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন উঠে আসে। প্রথমত, পুতিন কি আদৌ বুঝতে পারছেন যে তিনি হারছেন? রাশিয়ার এই নেতা একজন রক্ষণশীল, পুরোনো ধাঁচের গুন্ডা–শাসক। তিনি মনে করেন, রাশিয়া এখনো একটি সুপারপাওয়ার; যদিও তিনি একে এমন এক ঘৃণিত বেপরোয়া রাষ্ট্রে পরিণত করেছেন, যা এখন অনেকটাই চীনের ওপর নির্ভরশীল।
বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন পুতিন স্মার্টফোন বা ইন্টারনেট ব্যবহার করেন না। বলা হয়, তিনি ভরসা করেন নিজের অভ্যন্তরীণ বৃত্তের আমলা, অনুগত জেনারেল, গোয়েন্দা ও রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের ওপর, যারা তাঁকে শুধু সেটাই বলে যা তিনি শুনতে চান। যদি তা-ই হয়, তাহলে বাস্তবতা যা–ই হোক না কেন, তিনি এগিয়েই যাবেন।
এই পরিস্থিতির শেষ কোথায়? হয়তো এর শেষ নেই। পুতিনের ব্যর্থ ইউক্রেন অভিযান নিয়ে তৃতীয় অস্বস্তিকর প্রশ্ন হলো ভবিষ্যতের সম্ভাব্য ‘শান্তিচুক্তি’ কেমন হবে। ইউক্রেন ও ইউরোপ উভয়ই যুদ্ধের সমাপ্তি চায়। এটা জেনেই পুতিন হয়তো সংঘাতকে সাময়িকভাবে স্থগিত করে সেনাবাহিনী পুনর্গঠন ও আবার অস্ত্রসজ্জা করতে চাইবেন অথবা জেলেনস্কির যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব গ্রহণ করলেও স্থায়ী সমাধানে আন্তরিক না–ও হতে পারেন। এখানেই কিয়েভের জন্য বড় বিপদ।
কিন্তু এই বিশ্লেষণ দ্বিতীয় এবং আরও ভয়াবহ প্রশ্ন তোলে: যদি একসময় ক্রেমলিনের সেই কৃত্রিম নিরাপত্তাবলয় ভেঙে যায় এবং হঠাৎ পুতিন বুঝতে পারেন যে সামনে এক বিধ্বংসী কৌশলগত ও ব্যক্তিগত পরাজয় অপেক্ষা করছে, তখন তিনি কী করবেন? তাঁর কাছে শান্তির আবেদন আশা করবেন না। মাত্র গত সপ্তাহেই তিনি জেলেনস্কির যুদ্ধবিরতি আলোচনার প্রস্তাব অবজ্ঞাভরে প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং নিজের যুদ্ধ-লক্ষ্য আবার জোর দিয়ে বলেছেন।
পুতিনের সবচেয়ে সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া হবে সংঘাতকে আরও বিস্তৃত করা—ইউক্রেনের বাইরে সক্রিয় যুদ্ধক্ষেত্র সম্প্রসারণ করা, যাতে ইউরোপের ন্যাটো সদস্যরাষ্ট্রগুলো সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। অনেক দিক থেকেই সেটি ইতিমধ্যেই ঘটছে। ইউক্রেনে যত বেশি রাশিয়া চাপে পড়ছে, তত বেশি ইউরোপীয় নিরাপত্তা, গোয়েন্দা ও সামরিক কর্মকর্তারা সতর্ক করছেন যে রাশিয়ার নাশকতা, গোপন অপারেশন ও জবরদস্তিমূলক কর্মকাণ্ড দ্রুত বাড়ছে।
এমআইফাইভের প্রধান ব্লেইজ মেট্রেভেলি সতর্ক করে বলেছেন, ‘এখন ফ্রন্টলাইন সর্বত্র।’ তাঁর ভাষায়, ‘বিশৃঙ্খলা রপ্তানি করা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে রাশিয়ার কৌশলের কোনো ত্রুটি নয়, বরং সেটাই তাদের বৈশিষ্ট্য।’ তিনি আরও বলেন, এটি পুতিনের ‘আগ্রাসী, সম্প্রসারণবাদী ও সংশোধনবাদী মানসিকতা’র ফল।
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার বলেছেন, পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বিশ্বাস করে আগামী চার বছরের মধ্যে রাশিয়া ন্যাটোভুক্ত কোনো দেশে হামলা চালাতে পারে। ফলে যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা ব্যয় নিয়ে চলমান বিতর্ক আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ভ্লাদিমির পুতিনকে যেভাবে পরাজিত করা সম্ভবব্রিটেনের গোয়েন্দা সংস্থা জিসিএইচকিউর প্রধান অ্যান কিস্ট-বাটলার গত মাসে দাবি করেন, মস্কোর বাহিনী ‘যুদ্ধক্ষেত্রে পিছিয়ে যাচ্ছে’। এর জবাবে পুতিন ইউক্রেনের মিত্র ও প্রতিবেশীদের ওপর চাপ বাড়াচ্ছেন, বিশেষ করে সাইবার হামলা ও গোপন বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণার মাধ্যমে। তাঁর ভাষায়, ‘মস্কো নিরলসভাবে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া, সরবরাহব্যবস্থা ও জনবিশ্বাসকে লক্ষ্যবস্তু করছে।’
রাশিয়ার এই অভিযান এখন আরও সরাসরি ও আক্রমণাত্মক হয়ে উঠছে। সশস্ত্র ড্রোন ও যুদ্ধবিমান নিয়ে ন্যাটোর আকাশসীমায় অনুপ্রবেশ বাড়ছে। বেসামরিক বিমান ও সমুদ্রপথে নৌ চলাচল ব্যাহত করা হাজার হাজার জিপিএস বিঘ্নের ঘটনার জন্য রাশিয়াকে দায়ী করা হচ্ছে।
পোল্যান্ডের রেল নেটওয়ার্ক, যা ইউক্রেনে সরবরাহ পাঠায়, নাশকতার শিকার হয়েছে। জার্মানি ও যুক্তরাজ্যও একই ধরনের হামলার শিকার হয়েছে। বাল্টিক সাগরের নিচের পাইপলাইন ও ইন্টারনেট ক্যাব্ল কেটে দেওয়া হয়েছে। এই অঘোষিত যুদ্ধে নরওয়ের রাশিয়া সীমান্ত, উত্তর সাগর ও উত্তর আটলান্টিক নতুন ফ্রন্টলাইনে পরিণত হচ্ছে।
বিস্তারমান যুদ্ধক্ষেত্রের একটি শক্তিশালী ভূরাজনৈতিক দিকও রয়েছে। গত সপ্তাহে রাশিয়ার ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর ইউরোপীয় ইউনিয়ন অবশেষে ইউক্রেনের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সদস্যপদ আলোচনা শুরু করেছে। আগামী মাসের ন্যাটো সম্মেলনে আবার সংহতির অঙ্গীকার করা হবে, যদিও যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানে কিছুটা পিছিয়ে পড়ার ইঙ্গিত রয়েছে।
ইউরোপের পূর্ব সীমান্তে, বিশেষ করে মলদোভা ও আর্মেনিয়ায় রাশিয়ার প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। হাঙ্গেরিতে ভিক্তর অরবানের পরাজয় পুতিন ও মস্কোপন্থী উগ্র-ডানপন্থী জাতীয়তাবাদী শক্তির জন্য বড় ধাক্কা। পশ্চিম বলকান অঞ্চলও আরেকটি পরীক্ষাক্ষেত্র হয়ে উঠেছে।
থিঙ্কট্যাংক সেন্টার ফর ডেমোক্র্যাসি অ্যান্ড রেসিলেন্স বলছে, রাশিয়া ইউরোপজুড়ে ‘হাইব্রিড যুদ্ধ’ আরও তীব্র করবে। এর মূল লক্ষ্য হলো ভয় ও বিভ্রান্তি ছড়িয়ে পশ্চিমা সমন্বিত পদক্ষেপ দুর্বল করা। খুব শিগগির ইউরোপীয় দেশগুলোকে বিচ্ছিন্ন প্রতিক্রিয়া বাদ দিয়ে বুঝতে হবে যে তারা সম্মিলিতভাবে আক্রমণের শিকার এবং রাশিয়ার ওপর আরও বড় ‘সরাসরি ও অসমমিত মূল্য’ চাপিয়ে পাল্টা জবাব দিতে হবে। ১৯৩০-এর দশকের পর আবার ইউরোপে সবচেয়ে বড় অস্ত্রসজ্জা কর্মসূচির মধ্যেই সরাসরি পূর্ব-পশ্চিম সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
সাবেক প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদেভ যখন প্রায়ই ইউরোপকে পারমাণবিক অস্ত্র দিয়ে হুমকি দেন, তখন সেই চূড়ান্ত উন্মাদনাকে পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না।যত শক্তিশালী পাল্টা প্রতিরোধ হবে, পুতিনের প্রতিক্রিয়া তত বেশি চরম হতে পারে। ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন চালানোর তাঁর মূল সিদ্ধান্তই ছিল অযৌক্তিক। এরপর তিনি ‘মানবঢেউ’ কৌশলে পদাতিক হামলা, শিশুদের গণ-অপহরণ, বেসামরিক মানুষের বিরুদ্ধে অসংখ্য যুদ্ধাপরাধ, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে বেপরোয়া হামলা এবং ‘উন্মত্ত’ হাইপারসনিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পথ বেছে নিয়েছেন।
এগুলো কোনো স্বাভাবিক, ঠান্ডা মাথার মানুষের আচরণ নয়। তাই সাবেক প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদেভ যখন প্রায়ই ইউরোপকে পারমাণবিক অস্ত্র দিয়ে হুমকি দেন, তখন সেই চূড়ান্ত উন্মাদনাকে পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
এই পরিস্থিতির শেষ কোথায়? হয়তো এর শেষ নেই। পুতিনের ব্যর্থ ইউক্রেন অভিযান নিয়ে তৃতীয় অস্বস্তিকর প্রশ্ন হলো ভবিষ্যতের সম্ভাব্য ‘শান্তিচুক্তি’ কেমন হবে। ইউক্রেন ও ইউরোপ উভয়ই যুদ্ধের সমাপ্তি চায়। এটা জেনেই পুতিন হয়তো সংঘাতকে সাময়িকভাবে স্থগিত করে সেনাবাহিনী পুনর্গঠন ও আবার অস্ত্রসজ্জা করতে চাইবেন অথবা জেলেনস্কির যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব গ্রহণ করলেও স্থায়ী সমাধানে আন্তরিক না–ও হতে পারেন। এখানেই কিয়েভের জন্য বড় বিপদ।
সেনাদের ঘরে ফেরানো এবং নতুন নির্বাচন আয়োজনের জনচাপ ইউক্রেনের ভঙ্গুর জাতীয় ঐক্য ভেঙে দিতে পারে। যদি মনে হয় রুশ হুমকি কমে গেছে, তাহলে ইউরোপীয় সরকারগুলো সামরিক সহায়তা কমিয়ে দিতে পারে। কঠোর, আগাম নির্ধারিত নিরাপত্তা গ্যারান্টি ছাড়া যুদ্ধবিরতি ইউক্রেনকে আগের চেয়ে আরও বেশি ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।
বর্তমান পশ্চিমা আশাবাদ হয়তো ভুলও হতে পারে। কিন্তু এটা মনে রাখা জরুরি যে ইতিহাস, ভূগোল, পরিচয় বা মতাদর্শ নয়, এই সমস্ত যন্ত্রণা ও ধ্বংসযজ্ঞের মূল কারণ একজন মানুষ। ইউক্রেন, বিশ্ব এবং নিজেদের স্বার্থে রুশ জনগণের দায়িত্ব তাঁকে ক্ষমতা থেকে সরানো। আগেও যেমন বলা হয়েছে: পুতিন ছাড়া সবকিছু সম্ভব। কিন্তু তাঁকে রেখে দিলে সামনে আছে অন্তহীন যুদ্ধ।
সাইমন টিসডল দ্য গার্ডিয়ানের পররাষ্ট্রবিষয়ক ভাষ্যকার
গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনূদিত