শিউলিদিদি
· Prothom Alo

সে বছর বর্ষা অনেক দীর্ঘ হয়েছিল।
আষাঢ় মাসের প্রথম দিন থেকেই আকাশের মুখ ভার। ভোরবেলা ঘুম ভাঙলে দেখা যেত, পুব আকাশে সূর্য উঠেছে ঠিকই কিন্তু তা যেন কুয়াশা-লেপা মেঘের আড়াল থেকে। মাঠের ধান কেবল মাথা তুলতে শুরু করেছে। রাতের বৃষ্টির পরে জমির আইল নরম হয়ে যায়, পা ফেললে কাদামাটি পায়ের সঙ্গে লেগে থাকে। বাঁশঝাড়ের পাতায় টুপটাপ জল পড়ে, কোথাও শজনেগাছের ডালে ভেজা শালিক ডানা ঝাড়ে।
আমাদের গ্রামটা ছিল পদ্মা নদীর খুব কাছে। বর্ষায় নদী ফুলে উঠলে জল এসে মাঠ ছুঁয়ে যেত। পথের দুপাশের খালে কলমিলতা আর শাপলা। কোথাও সবুজ ঘাসের কচি ডগা বাতাসে দুলত। স্কুলে যেতে হলে প্রায় দেড় মাইল পথ হাঁটতে হতো। পথের মাঝখানে একটা বুড়ো বটগাছ—বয়সের ভারে ডাল নুয়ে পড়েছে। শিকড় ঝুলে আছে মাটির কাছাকাছি।
গাছের নিচে প্রায়ই ক্লান্ত পথিক জিরিয়ে নিত।
Visit esporist.com for more information.
সেদিন স্কুল থেকে ফিরছিলাম।
দুপুরের পরে একপশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে। আকাশে টুকরো টুকরো মেঘ ভাসছে। দূরে কোথাও থেমে থেমে মেঘ গর্জে উঠছে।
বটগাছটার কাছে এসে দেখি, একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বয়স আঠারো–উনিশ হবে। ভেজা মাটির দিকে তাকিয়ে কী যেন ভাবছে। পরনে হালকা নীল পাড়ের শাড়ি, হাতে ছোট কাপড়ের ব্যাগ। বাতাসে শাড়ির আঁচল উড়ছে।
আমাকে দেখে মুখ তুলে বলল—এই যে ভাই, কালীবাড়ির পথটা কোন দিকে বলতে পারো?
কণ্ঠস্বরে এমন এক কোমলতা ছিল, যেন অনেক দিনের চেনা কেউ কথা বলছে।
একটু ইতস্তত করে বললাম—এই খালের পাড় ঘেঁষে এগিয়ে যেতে হবে। তারপর সাঁকো পেরিয়ে হাতের ডান দিকে একটু এগোলেই হবে। আমি ওদিকেই যাচ্ছি। চাইলে দেখিয়ে দিতে পারি।
সে মৃদু হেসে বলল—তাহলে তো ভালোই হয়।
আমরা পাশাপাশি হাঁটতে শুরু করলাম।
শিউলিদিদির সঙ্গে দেখা না হলে ইদানীং মনটা কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগে।একদিন স্কুল থেকে ফিরতে একটু দেরি হলো...
খালের ধার দিয়ে পথ। বর্ষার জল প্রায় উপচে পড়ছে। কচুরিপানার ফাঁকে সাদা শাপলা ফুটে আছে। কোথাও জোড়ায় জোড়ায় পানকৌড়ি জলে ডুব দিয়ে মাছ তুলছে। বাতাসে ভেজা মাটির গন্ধ। তার সঙ্গে কেমন এক মিঠে ফুলের সুবাস—হয়তো কাছাকাছি কোথাও বেলি ফুল ফুটেছিল।
মেয়েটি বলল—তোমার নাম কী?
—সৌরভ।
সে একটু হেসে বলল—আমার নাম শিউলি। তবে তুমি চাইলে শিউলিদিদি বলতে পারো।
কেন জানি না, কথাটা শুনে বুকের মধ্যে কেমন প্রশান্তি অনুভব করলাম।
কালীবাড়ির মোড়ে এসে আমরা থামলাম।
—তুমি না থাকলে বুঝি পথ হারাতাম।
তারপর ব্যাগ থেকে একটা পেয়ারা বের করে বলল—নাও, ভাইকে না দিয়ে খেতে ভালো লাগে না।
আমি নিতে চাইলাম না। সে জোর করল।
সেদিন বাড়ি ফেরার সময় খুব ভালো লাগছিল। বৃষ্টি নামছিল টিপটিপ করে। তবু মনে হচ্ছিল, পথটা আজ অন্য রকম।
২.
সেদিনের পর থেকে পথ আর আগের মতো রইল না।
আগে স্কুল ছুটির পর বাড়ি ফেরার জন্য মন উৎসুক হয়ে থাকত। কখন মাঠ পেরোব, কখন বাড়ি গিয়ে ভাত খাব। কিন্তু সেদিনের পর থেকে অদ্ভুতভাবে চোখ চলে যেত বটগাছটার দিকে। মনে হতো—আজও কি সে দাঁড়িয়ে আছে?
সপ্তাহখানেক পর।
ভোর থেকেই আকাশে মেঘ। পড়ায় মন বসছিল না। দুপুরের পরে একপশলা বৃষ্টি নামল ঝমঝম করে। ছুটি হতেই দৌড়ে বেরিয়ে এলাম। কারও মাথায় তালপাতার ছাতা, কেউ রুমাল চাপা দিয়ে হাঁটছি।
আমি ভিজতে ভিজতেই বটতলার কাছে এসে দাঁড়ালাম।
আর তখনই দেখি—সে আছে।
বটগাছের মোটা গুঁড়ির পাশে দাঁড়িয়ে। এক হাতে আঁচল টেনে নিয়েছে, তবু বাতাসে চুলগুলো এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে।
আমাকে দেখেই বলল—এই যে! আজ তো একেবারে ভিজে ইঁদুর হয়ে গেছ।
আমি একটু লজ্জা পেয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম।
সে ব্যাগ থেকে একটা শুকনা গামছার মতো কাপড় বের করে বলল—মাথাটা মুছে নাও। অসুখ করবে।
কেন জানি না, কথা শুনে মনে হলো—সত্যিই যেন কোনো আপনজন বলছে।
আমরা বৃষ্টির ভেতর বটতলায় দাঁড়িয়ে রইলাম।
চারদিকে বৃষ্টির শব্দ। বটপাতা বেয়ে জল পড়ছে টুপটুপ করে। দূরের মাঠ কুয়াশার মতো ধোঁয়াটে। মাঝেমধ্যে বাজ পড়লে আকাশ সাদা হয়ে উঠছে।
সে বলল—তুমি রোজ এই পথ দিয়ে যাও?
—হ্যাঁ।
—তাহলে আমাদের আবার দেখা হবে।
কথাটা শুনে শিহরিত হলাম।
তার পর থেকে সত্যিই দেখা হতে লাগল।
প্রায় রোজ না হলেও, সপ্তাহে তিন-চার দিন।
কখনো বিকেলের দিকে খালপাড়ে, কখনো কালীবাড়ির মোড়ে, কখনো বটতলায়।
একদিন দেখি সে খালের ধারে বসে জলে কী যেন ছুড়ছে। কাছে যেতেই বলল—দেখো, মাছগুলো কেমন ভিড় করছে।
আমি পাশে বসে রইলাম।
খালের জলে তখন বর্ষার স্রোত। কচুরিপানা ভেসে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। দূরে তালগাছের মাথার ওপর কালো মেঘ জমেছে।
শিউলিদিদি বলল—তোমাদের গ্রামটা বেশ সুন্দর!
আমি বললাম—এ তো রোজ দেখি। নতুন কী?
সে একটু হেসে বলল—যা রোজ দেখা হয়, তার সৌন্দর্য মানুষ বুঝতে পারে না।
সেদিন কথাটার অর্থ ঠিক বুঝিনি।
আরেক দিন।
দুপুরের পরে হঠাৎ রোদ উঠেছিল।
বর্ষার আকাশে এমন রোদ উঠলে মাঠের সবুজ যেন ঝলমল করে ওঠে। খালের ধারে সাদা বকের আনাগোনা বাড়ে।
শিউলিদিদি একটা ছোট্ট কৌটো খুলে বলল—নাও, নারকেলের নাড়ু করেছি।
আমি বললাম—তুমি বানিয়েছ?
—হুঁ। তবে খারাপ হলে বোকো না কিন্তু।
আমি খেয়ে বলেছিলাম—খুব ভালো।
সে এমনভাবে হেসেছিল, যেন বিরাট সুখ পেয়েছে।
তারপর বলল—আমার ভাই যদি থাকত!
আমি অবাক হয়ে বললাম—তোমার ভাই কই?
সে অনেকক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর খুব আস্তে করে বলল—ছিল।
আমি আর কিছু জিজ্ঞেস করিনি।
আমার মনে হলো, খালের জলও যেন চুপ হয়ে গেছে।
দিন যেতে লাগল।
শ্রাবণ শেষ হয়ে ভাদ্র এল।
বৃষ্টির দাপট কমে গেল। আকাশে নীল রং দেখা দিতে শুরু করল। বিকেলের আলো কোমল হয়ে এল। মাঠের ধারের কাশফুল মাথা দোলাতে শুরু করল।
শিউলিদিদির সঙ্গে দেখা না হলে ইদানীং মনটা কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগে।
একদিন স্কুল থেকে ফিরতে একটু দেরি হলো।
বটতলার কাছে এসে দেখি, সে দাঁড়িয়ে আছে।
মুখে কেমন অস্থির ভাব।
আমাকে দেখেই বলল—আজ এত দেরি হলো কেন? ভাবলাম, অসুখ-বিসুখ করল নাকি।
আমি অবাক হলাম।
কেউ আমার জন্য এভাবে অপেক্ষা করেছে—এমন তো আগে কখনো হয়নি।
সেদিন ফেরার পথে বাতাসে পাকা ধানের গন্ধ ছিল। দূরে কোথাও গোধূলির শাঁখ বাজছিল।
শিউলিদিদি হঠাৎ বলল—তুমি আমাকে ভুলে যাবে না তো?
আমি হেসে বললাম—তুমি আবার এমন কথা বলছ কেন?
সে উত্তর দিল না।
শুধু আকাশের দিকে চেয়ে রইল।
দেখলাম, পশ্চিম আকাশে সাদা মেঘের ফাঁকে সূর্য ডুবে যাচ্ছে। আর তার মুখটা বিষণ্ন হয়ে আছে।
৩.
ভাদ্রের শেষ দিক থেকে আকাশ কেমন বদলে যেতে থাকল। সকালে ঘুম ভাঙলে দেখা যেত, পুব আকাশে মেঘের গায়ে হালকা রোদ লেগে আছে। রাতের শিশিরে ঘাস ভিজে গেছে। খালের ধারে কাশফুলগুলো আরও সাদা হয়ে উঠছে। বাতাসে কোথা থেকে একধরনের মিঠে গন্ধ ভেসে আসছে—হয়তো শিউলি ফুল ফুটতে আরম্ভ করেছে।
এ সময় পৃথিবীকে খুব শান্ত মনে হয়। বৃষ্টি নেই। আবার মাটির গন্ধও পুরোপুরি মুছে যায়নি। দুপুরের দিকে আকাশ নীল। সন্ধ্যায় নরম আলো। এমন দিনেই শিউলিদিদির সঙ্গে সম্পর্কটা আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা হয়ে গেল। এখন আর শুধু পথচলার আলাপ নয়—সে যেন সত্যিই আমার দিদি হয়ে উঠল।
সেবার পরীক্ষায় আমি অঙ্কে খুব কম নম্বর পেলাম। মন খারাপ করে বটতলার দিকে যাচ্ছিলাম। দেখি, শিউলিদিদি বসে আছে।
আমার মুখ দেখেই বলল—কী হয়েছে? এমন চুপচাপ কেন?
আমি রাগ করে বললাম—আমি কিছুই পারি না।
সে হেসে ফেলল। এই জন্য মন খারাপ? ছোটবেলায় আমিও অঙ্কে কাঁচা ছিলাম।
তারপর ব্যাগ থেকে একটা খাতা বের করে মাটিতে বসে অঙ্ক বুঝিয়ে দিতে লাগল। বটপাতার ফাঁক দিয়ে আলো এসে পড়ছে তার মুখে। বাতাসে শুকনা পাতার শব্দ। দূরে খালের জল চিকচিক করছে।
সেদিন ফেরার আগে সে বলেছিল—শোনো, একবার না পারলে দশবার চেষ্টা করবে। বড় মানুষরা কখনো হাল ছাড়ে না।
আমি বাড়ি ফিরে সত্যিই অঙ্ক নিয়ে বসেছিলাম।
কয়েক দিন পর।
আকাশ বেশ পরিষ্কার। স্কুল ছুটির সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে পড়লাম। খালের ধারে গিয়ে দেখি, শিউলিদিদি কচুরি ফুল তুলছে।
আমাকে দেখে বলল—এদিকে এসো।
আমি গিয়ে দাঁড়াতেই সে কয়েকটা কচুরি ফুল হাতে দিয়ে বলল—দেখো, কী সুন্দর! তাই না?
আমি হেসে বললাম—ফুল দিয়ে কী হবে?
আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল—সবকিছুর কাজ থাকতে হয় না। কিছু জিনিস শুধু সুন্দর বলেই ভালো লাগে।
তারপর হঠাৎ বলল—তুমি বড় হয়ে এসব মনে রাখবে তো?
আমি বললাম—কী?
—এই আকাশ, এই পথ…আর এই আমাকে।
আমি হাসতে গিয়েও পারলাম না। কেন জানি মনে হলো—সে যেন কোথাও দূরে চলে যাওয়ার কথা ভাবছে।
কিছুক্ষণ পরে ব্যাগের ভেতর থেকে একটা আংটি বের করে আমার বাঁ হাতের অনামিকায় পরিয়ে দিল।
আমি অবাক হয়ে দেখলাম।
দিদি বলল—যখন আমি থাকব না, তখন এই আংটিটার সঙ্গে কথা বলবে। মনে করবে, আমি তোমার সামনেই আছি।
আরেক দিনের কথা।
আমি স্কুল থেকে ফিরছি। পেটে অনেক ক্ষুধা। মনে মনে ভাবছি—দিদি যদি আজ কিছু খাবার নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকত, তাহলে খুব ভালো হতো।
আমার কথা দিদি শুনেছিল কি না জানি না। বটতলায় এসে দিদিকে দেখে অবাক হয়ে গেলাম।
বললাম—তুমি কি আমার মনের কথা শুনতে পাও?
মুচকি হেসে বলল—শুনতে না পেলে চলবে কেমন করে? তারপর বলল—চোখ বন্ধ করো।
করলাম।
অনুভব করলাম—আমার মাথা দিয়ে জামার মতো কিছু একটা পরানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
অনুমতি নিয়ে চোখ খুলে দেখলাম—কাঁচা হলুদ রঙের একটা ফতুয়া। তার ওপর হাতের অনেক কাজ করা। কোথায় পেলে এটা? জিজ্ঞেস করতেই দিদি বলল—নিজের হাতে তৈরি করেছি। কেমন হয়েছে?
ঘটনার আকস্মিকতায় আমি এতটা অভিভূত হয়ে পড়েছিলাম যে মুখ দিয়ে আর কিছু বলতে পারিনি। অস্ফুট স্বরে শুধু বলেছিলাম—সুন্দর। খুশির চোটে ক্ষুধার কথা ভুলেই গিয়েছিলাম।
দিন কয়েক বাদে খালের পাড়ে দিদির সঙ্গে আবার দেখা। ভেতরে ভেতরে আমি অনেক খুশি। খুশির আমেজে কিছু বলতে যাচ্ছি, এমন সময় দিদির মুখ দেখে খটকা লাগল। জিজ্ঞেস করলাম—কী হয়েছে? মন ভার কেন?
দিদি কোনো উত্তর দিল না। ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল। খেয়াল করলাম—দিদি যেন কেমন চুপচাপ হয়ে গেছে।
আগে অনেক গল্প করত। এখন দেখি বেশির ভাগ সময় খালের জলের দিকে তাকিয়ে থাকে।
একদিন সাহস করে বলে ফেললাম—তোমার কি মন খারাপ?
সে একটু চমকে উঠল।
তারপর মৃদু হেসে বলল—সব সময় কি মানুষের মন ভালো থাকে?
—কিন্তু তুমি আগে এমন ছিলে না।
সে কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল—আমাদের দেখা হওয়ার দিন বুঝি ফুরিয়ে আসছে।
তার কথা শোনার পর মনে হলো, আমার বুকের মধ্যে কেউ একজন পাথর ছুড়ে মারল।
—কেন?
—বাবার বদলি হয়েছে। কিছুদিনের মধ্যেই চলে যেতে হবে।
আমি চুপ করে গেলাম।
চারদিকে তখন অদ্ভুত নীরবতা।
দূরে ধানখেতে বাতাস বইছে। কাশফুলগুলো মাথা নেড়ে উড়ছে। আকাশ এত বড়, তবু কেন জানি দম বন্ধ হয়ে আসছিল। সেদিন ফেরার পথে কোনো কথা হয়নি। শুধু খালের ওপর বাঁশের সাঁকো পার হতে গিয়ে একবার বলেছিল—ভাই, মানুষকে খুব বেশি আপন ভাবতে নেই।
আমি অবাক হয়ে তাকিয়েছিলাম।
সে হেসেছিল বটে; কিন্তু সেই হাসির মধ্যে কোনো প্রাণ ছিল না।
তারপরও দেখা হতো।
কিন্তু আগের মতো না।
আমাদের দুজনের মাঝখানে যেন না-বলা এক দুঃখ এসে বাসা বাঁধল।
একদিন দেখি, দিদি আমার জন্য একটা ছোট্ট খাতা এনেছে।
—ভালো ভালো কথা লিখবে এতে। বড় হয়ে পড়তে পারবে।
আরেক দিন আমার মাথায় হাত রেখে বলল—দুষ্টুমি করবে না।
আমি হেসে বললাম—তুমি না থাকলে বকবে কে?
কথাটা শুনে সে হঠাৎ মুখ ঘুরিয়ে নিল।
অনেকক্ষণ পরে দেখলাম, তার চোখ দুটো ভিজে গেছে।
আশ্বিন প্রায় শেষ।
ভোরের দিকে শিউলি ফুল ঝরে পড়ে। বাতাসে শীতের আভাস।
বিকেলে বটতলায় গিয়ে দেখি—সে নেই।
পরদিনও না।
তৃতীয় দিন সকালে হঠাৎ আমাদের উঠানে একজন লোক এসে একটা কাপড়ের পুঁটলি দিয়ে গেল।
বলল—শিউলিদিদি দিতে বলেছে।
হাত কাঁপতে লাগল।
ভেতরে একটা ছোট বই, দুটো শুকনা শিউলি ফুল, আর কাগজে লেখা—‘আমার ছোট ভাই—রাগ কোরো না। দেখা করে যেতে পারলাম না। বিদায় নিতে কষ্ট হয়, তাই।’
অনেকক্ষণ কিছু বুঝে উঠতে পারিনি। শুধু মনে হচ্ছিল—বাড়ির উঠানটা হঠাৎ দুলতে শুরু করেছে।
৪.
সেদিনের পর কেমন যেন সব বদলে গেল।
মানুষের জীবনে কিছু শূন্যতা আসে—যার কোনো শব্দ হয় না। বাইরে থেকে কিছুই বোঝা যায় না। ভেতরে ভেতরে কোথাও একটা জায়গা নিঃশব্দে ফাঁকা হয়ে পড়ে।
শিউলিদিদি চলে যাওয়ার পর প্রথম কদিন আমি স্বাভাবিক হতে পারিনি।
স্কুল থেকে ফেরার সময় অভ্যাসবশত চোখ চলে যেত বটগাছটার দিকে। মনে হতো—দিদি হয়তো আজ দাঁড়িয়ে থাকবে। হয়তো হেসে বলবে—এই যে ভাই, আজ এত দেরি কেন?
কিন্তু বটতলার নিচে শুধু শুকনা পাতা উড়ত।
বাঁশঝাড়ের ভেতর বাতাস ঢুকে শনশন শব্দ তুলত। খালের জল আগের মতোই বইত, কচুরিপানা ভেসে যেত ধীরে ধীরে। পৃথিবীর কোথাও কিছু বদলায়নি—শুধু আমার ছোট্ট পৃথিবী বদলে গিয়েছিল।
শরৎ শেষে হেমন্ত এল।
ভোরবেলা মাঠে কুয়াশা নামতে শুরু করল। ধানের শিষ পেকে হলদে হয়ে উঠল। বাতাসে খড়ের গন্ধ ভাসতে লাগল।
একদিন খুব ভোরে স্কুলে যাওয়ার আগে বটতলার দিকে গেলাম। ঘাসের শিশিরে পা ভেজালাম। বটগাছটার নিচে দেখি, কয়টা শিউলি ফুল পড়ে আছে।
কোথা থেকে এল কে জানে। আশপাশে তো কোনো শিউলিগাছ নেই।
আমার মনে হলো, খুব ভোরে বুঝি শিউলিদিদি এসেছিল। হয়তো দাঁড়িয়ে ছিল অনেকক্ষণ। আমাকে না পেয়ে চুপচাপ চলে গেছে।
সেদিন ফুলগুলো কুড়িয়ে বইয়ের ভেতর রেখে দিয়েছিলাম।
সেগুলো অনেক দিন ছিল।
শীতের এক দুপুরে ডাকপিয়ন এসে একটা চিঠি দিয়ে গেল।
আমার নামে।
জীবনে প্রথম কেউ আমাকে চিঠি লিখেছে।
হাত কাঁপতে লাগল।
শিউলিদিদির লেখা।
অল্প কয়েকটা কথা—
ভাই,
নতুন জায়গা ভালো লাগছে না। এখানে তুমি নেই। তোমাদের খালের মতো খাল নেই, বটগাছ নেই। মাঝেমধ্যে মনে হয়, তোমার কাছে চলে যাই। পড়াশোনা ঠিকমতো কোরো। খাওয়াদাওয়া ঠিকমতো করবে, নইলে অসুখ করবে কিন্তু। আর আমাকে ভুলে যেয়ো না।
—শিউলিদিদি
চিঠিটার কাগজে ফুলের গন্ধ ছিল। আমি কতবার যে সেটা পড়েছিলাম, তার ঠিক নেই।
মা একদিন বলেছিলেন—কার চিঠি রে?
আমি বলেছিলাম—দিদির।
মা অবাক হয়েছিলেন।
আমি আর কিছু বলিনি।
তারপর সময় গেল।
চিঠি আর এল না।
কোথায় গেল, কেমন আছে—জানতেও পারলাম না।
জীবন বড় অদ্ভুত। একদিন যাদের ছাড়া পৃথিবীকে অচল মনে হয়, তারাই একসময় কুয়াশার মতো দূরে সরে যায়। তবে পুরোপুরি হারায় না।
আজ কত বছর কেটে গেছে।
আমি বড় হয়েছি। গ্রামের সেই পথও আর আগের মতো নেই। খালের জল কমে গেছে, সাঁকোর জায়গায় সেতু হয়েছে। বটগাছটা এখনো আছে, তবে আগের মতো ঘন নয়।
শরতের সকালে যখন কাশফুল দোলে কিংবা ভোরে শিশিরভেজা ঘাসে শিউলি ফুল পড়ে থাকে তখন মনে হয়, কেউ বুঝি পাশে এসে দাঁড়িয়েছে।
কানের ভেতরে ভেসে আসে খুব চেনা একটা গলা—এই যে ভাই, কত বড় হয়ে গেছ!
আমি কখনো কখনো থেমে যাই।
পেছনে তাকাই।
কেউ থাকে না।
শুধু বাতাসে কাশফুল দোলে। দূরে কোনো অচেনা পাখি ডেকে ওঠে।
আমার বুকের ভেতরে কোথা থেকে যেন এক পুরোনো বিকেল ফিরে আসে—ভেজা পথ, বটগাছ, খালের জল আর একটা মেয়ে, যে একদিন খুব সহজেই আমাকে ভাই বলে ডেকেছিল।
আজও ভাবি—মানুষ কি সত্যিই হারিয়ে যায়?
নাকি কিছু মানুষ খুব অল্প দিনের জন্য এসে, জীবনে চিরদিনের মতো থেকে যায়?
কখনো কখনো শিউলি ফুলের গন্ধে ঘুম ভেঙে গেলে মনে হয়—আমার শিউলিদিদি হয়তো দাঁড়িয়ে আছে।
হয়তো কোনো জানালার পাশে বসে আছে চুপচাপ।
কাউকে ভাই বলে ডাকলে এখনো বুঝি আমার কথাই মনে পড়ে তার।
ঢাকা
৩০/০৫/২০২৬ খ্রি.