আসামে কূপের গভীরে পাওয়া গেছে লালচে শরীরের চোখ ছাড়া মাছ

· Prothom Alo

তুমি হয়তো ভাবতেই পারবে না, আমাদের এই পরিচিত পৃথিবীর মাটির নিচে লুকিয়ে আছে এক রহস্যময় জগৎ। আলোহীন, নিঃশব্দ, প্রায় অচেনা এক পরিবেশ। আর সেই অন্ধকার জগতে বাস করে এমন এক মাছ, যার চোখ নেই, শরীর লালচে আর জীবনযাপন একেবারেই ভিন্ন।

Visit afsport.lat for more information.

সম্প্রতি ভারতের আসামে আবিষ্কৃত হয়েছে এমনই এক আশ্চর্য প্রাণী, যার বৈজ্ঞানিক নাম Gitchak nakana। ছোট্ট এই মাছ যেন বিজ্ঞান কল্পকাহিনির কোনো চরিত্র, কিন্তু বাস্তবেই এর অস্তিত্ব আছে। বিজ্ঞানীদের মতে, এ ধরনের প্রাণী আমাদের পৃথিবীর লুকানো জীববৈচিত্র্যের এক বিরল উদাহরণ, যেগুলো নিয়ে গবেষণা এখনো খুবই কম হয়েছে।

কোথা থেকে এল এ মাছ

ঘটনাটা শুরু হয় আসামের একটি গ্রামে। সাধারণ এক কূপ (কুয়া) থেকে হঠাৎ করে উঠে আসে অদ্ভুত দেখতে কয়েকটি মাছ। গ্রামের মানুষ প্রথমে বিষয়টাকে গুরুত্ব না দিলেও পরে বিজ্ঞানীদের নজরে আসে বিষয়টি।

গবেষণা করে দেখা যায়, এসব মাছ আসলে মাটির নিচের পানির স্তরে ভূগর্ভস্থ জলাধারে বাস করে। আমরা যেসব পুকুর, নদী বা হ্রদ দেখি, সেগুলোর মতো নয় এ পরিবেশ। এখানে নেই আলো, নেই স্বাভাবিক খাদ্যচক্র, নেই কোনো দৃশ্যমান পৃথিবী।

এসব জায়গায় পানি শিলার ফাঁক দিয়ে ধীরে ধীরে প্রবাহিত হয়। সেখানে অক্সিজেনও কম থাকে। তবু এ মাছ সেই কঠিন পরিবেশে টিকে আছে, যা বিজ্ঞানীদের কাছে বিস্ময়ের বিষয়।

কম পানির মাছ বেশি পানিতে গেলে লাফায় কেন

কেন মাছটা লালচে?

প্রথম দেখায় তোমার মনে হতে পারে, মাছটা বুঝি লাল রঙের। কিন্তু আসলে তা নয়।

এ মাছের শরীরে প্রায় কোনো রঙের পিগমেন্ট নেই। ফলে এর চামড়া প্রায় স্বচ্ছ। আর সেই স্বচ্ছ চামড়ার ভেতর দিয়ে দেখা যায় রক্তনালি। এ কারণেই বাইরে থেকে মাছটাকে লালচে মনে হয়।

অনেক গভীর সমুদ্রের প্রাণীর মধ্যেও এমন বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। আলো না থাকলে রঙের প্রয়োজন কমে যায়। তাই প্রকৃতি ধীরে ধীরে এসব বৈশিষ্ট্য বাদ দিয়ে দেয়। এ মাছও সেই নিয়মেরই একটি উদাহরণ।

চোখ না থাকলেও সমস্যা নেই

সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো, এ মাছের কোনো চোখ নেই। শুনতে অদ্ভুত লাগলেও এর পেছনে আছে শক্তিশালী বৈজ্ঞানিক কারণ। যেহেতু মাছটি পুরো জীবন কাটায় অন্ধকারে, সেখানে চোখ থাকার কোনো দরকারই পড়ে না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এদের চোখ বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

তাহলে এরা চলাফেরা করে কীভাবে?

এ মাছের শরীরে আছে লম্বা গোঁফের মতো অঙ্গ, যাকে বলা হয় বারবেল (barbel)। এ অঙ্গ দিয়ে এরা পানির মধ্যে স্পর্শ ও কম্পন অনুভব করে। অর্থাৎ এরা দেখে না, কিন্তু অনুভব করে চারপাশের জগৎকে।

এ অনুভূতি এত সংবেদনশীল যে পানির সামান্য নড়াচড়াও সে বুঝতে পারে। এতে করে খাবার খোঁজা, বাধা এড়িয়ে চলা, সবই সম্ভব হয় অন্ধকারের ভেতর।

কাদার মধ্যে মাগুর মাছ বেঁচে থাকে কীভাবে

অদ্ভুত শরীর, অদ্ভুত জীবন

এ মাছের শরীরে আরও কিছু অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এদের মাথার হাড় পুরোপুরি শক্ত নয়। আবার মস্তিষ্কের অংশ কিছুটা নরম টিস্যু দিয়ে ঢাকা থাকে। শরীর খুবই ছোট। মাত্র দুই সেন্টিমিটারের মতো।

সব মিলিয়ে এটা যেন একেবারেই অন্য জগতের প্রাণী। এমনকি এদের প্রজননপদ্ধতিও আলাদা। এ মাছ খুব বেশি ডিম দেয় না। তবে ডিমগুলো তুলনামূলক বড় হয়। এতে মাছের বাচ্চাদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বাড়ে। কারণ, কঠিন পরিবেশে টিকে থাকা সহজ নয়।

বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, এ মাছ ধীরে ধীরে বড় হয় এবং এর জীবনচক্রও অন্য অনেক মাছের তুলনায় আলাদা হতে পারে। তবে এ বিষয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন।

কত পুরোনো এ রহস্য?

গবেষকেরা মনে করেন, এ মাছ প্রায় দুই কোটি বছর ধরে আলাদা পরিবেশে বসবাস করছে।

ভাবতে পারো? যখন আমাদের পৃথিবীতে এত পরিবর্তন হয়েছে, তখনো এ ছোট্ট মাছ নিজের অন্ধকার জগতে টিকে থেকেছে।

কেন এই আবিষ্কার গুরুত্বপূর্ণ?

তুমি হয়তো ভাবছ, একটা ছোট মাছ আবিষ্কৃত হলো, এর এত গুরুত্ব কী?

আসলে এ আবিষ্কার দিয়ে আমরা বুঝতে পারি, আমরা এখনো পৃথিবীর সবকিছু জানি না।

মাটির নিচে, সমুদ্রের গভীরে, বরফের ভেতরে এমন অসংখ্য জায়গা আছে, যেখানে এখনো অজানা প্রাণী লুকিয়ে আছে।

এ মাছ দেখে আমরা জানতে পারি যে এরা প্রকৃতির সঙ্গে কতভাবে মানিয়ে নিতে পারে। আলো না থাকলেও, চোখ না থাকলেও এদের জীবন থেমে থাকে না।

এ ছাড়া এ ধরনের আবিষ্কার পরিবেশ সংরক্ষণের দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, আমরা যদি এসব অদৃশ্য বাসস্থান ধ্বংস করি, তাহলে এমন অজানা প্রজাতি চিরতরে হারিয়ে যেতে পারে।

সূত্র: নেচার ম্যাগাজিনকেন কিছু মাছ নিজের বাচ্চাকে খেয়ে ফেলে

Read full story at source