কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে জ্বালানি তেলের বাজার কার নিয়ন্ত্রণে থাকবে

· Prothom Alo

তেলের খনি থেকে তথ্যের শক্তি

কয়েক দশক ধরে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের ক্ষমতা নির্ধারিত হতো তেলের মজুত, উৎপাদনক্ষমতা, পাইপলাইন, জাহাজ চলাচলের রুট এবং ভূরাজনৈতিক অবস্থানের ভিত্তিতে। যারা কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ, রপ্তানি করিডর এবং বিপুল পরিমাণ খনিজ জ্বালানি সম্পদ নিয়ন্ত্রণ করত, তাদেরকেই আন্তর্জাতিক জ্বালানিব্যবস্থার মূল চালিকা শক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হতো।

Visit afnews.co.za for more information.

তবে সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে পৃথিবী ধীরে ধীরে এমন এক নতুন যুগে প্রবেশ করছে, যেখানে তথ্য (ডেটা), অ্যালগরিদম এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) জ্বালানিশক্তির মূল কাঠামোর অংশ হয়ে উঠছে।

কোন দেশে তেলের মজুত বেশি, এটা সম্ভবত আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থাকবে না, বরং কোন পক্ষ জ্বালানি বাজারের ভবিষ্যৎ কার্যকরভাবে ও দ্রুততার সঙ্গে অনুমান করতে পারে—এটাই হয়ে উঠতে পারে জরুরি প্রশ্ন।

বড় বড় জ্বালানি কোম্পানি, বিনিয়োগ ব্যাংক, সার্বভৌম সম্পদ তহবিল এবং সরকার এখন ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি বিশ্লেষণ, তেলের দামের পূর্বাভাস, নিরাপত্তাসংকট মূল্যায়ন এবং জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খল পরিচালনা করার জন্য উন্নত অ্যালগরিদমের ওপর নির্ভর করছে।

এই নতুন বৈশ্বিক ব্যবস্থায় যে পক্ষ জ্বালানিসংক্রান্ত তথ্য যত দ্রুত এবং নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ করতে পারবে, বিশ্ববাজারে তাদের প্রভাব তত বেশি থাকবে। এআই এখন তেলবাহী জাহাজ ও কৌশলগত মজুতের স্যাটেলাইট ছবি থেকে শুরু করে আবহাওয়ার ধরন, সামরিক উত্তেজনা, সাইবার হামলা, সুদের হারের ওঠানামা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জনমত পর্যন্ত একসঙ্গে লাখ লাখ চলক বিশ্লেষণ করতে পারে।

জ্বালানি কূটনীতির রূপান্তর

এই পরিবর্তন প্রথাগত জ্বালানি কূটনীতির চেনা রূপকেও বদলে দিচ্ছে। অতীতে জ্বালানি খাতের বাজার রাজনৈতিক আলোচনা, ওপেক চুক্তি এবং ভূরাজনৈতিক জোটের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হতো। তবে বর্তমানে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ার একটি অংশ এআইয়ের হাতে চলে যাচ্ছে। 

কিছু আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বহুজাতিক কোম্পানি ইতিমধ্যেই এমন সব এআইভিত্তিক মডেল ব্যবহার করছে, যা কোনো নিরাপত্তাসংকট আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ পাওয়ার আগেই অনুমান করতে সক্ষম। এটা রাজনৈতিক কোনো ঘটনা ঘটার আগেই জ্বালানি বাজারে কৌশলগতভাবে নিজেদের সুবিধাজনক অবস্থানে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে।

এটি একটি মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপন করে: বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের ভবিষ্যৎ কি তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর হাতেই থেকে যাবে, নাকি ক্ষমতা ধীরে ধীরে প্রযুক্তি-সম্পর্কিত কোম্পানি এবং ডিজিটাল অবকাঠামোর মালিকদের দিকে চলে যাবে?

উপসাগরীয় দেশগুলো এই পরিবর্তনটি ধরতে পারছে বলেও মনে হয়। সৌদি আরব, আরব আমিরাত ও কাতার এআই অবকাঠামোতে বিপুল বিনিয়োগ করছে। এই বিনিয়োগগুলো নিছক অর্থনৈতিক বৈচিত্র্যকরণ কর্মসূচির অংশ নয়। এগুলো জ্বালানি রাজনীতির আগামী যুগে নিজেদের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব টিকিয়ে রাখার একটি কৌশলগত প্রচেষ্টাকেও নির্দেশ করে।

এআই, পরাশক্তিদের প্রতিযোগিতা ও জ্বালানি বাজার

একই সময়ে পরাশক্তিগুলোর মধ্যকার প্রতিযোগিতা এক নতুন ধাপে প্রবেশ করছে। যুক্তরাষ্ট্র তাদের প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব ও শীর্ষস্থানীয় এআই প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আধিপত্যের মাধ্যমে কৌশলগত অবস্থান ধরে রাখতে চাইছে। অন্যদিকে চীন মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ডিজিটাল অবকাঠামো প্রকল্প, নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিনিয়োগ
এবং প্রযুক্তিগত অংশীদারত্বের মাধ্যমে তাদের প্রভাব বিস্তার করছে।

এর ফলে জ্বালানি ভূরাজনীতির ভবিষ্যৎ এখন আর কেবল তেলের খনির সংখ্যা বা উৎপাদনের পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হচ্ছে না। এটি ক্রমে তথ্য প্রক্রিয়াকরণের ক্ষমতা, অ্যালগরিদমের সক্ষমতা ও প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমেও নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে।

এই উদীয়মান বাস্তবতা বড় ধরনের ঝুঁকিও তৈরি করছে। অস্পষ্ট বা জটিল অ্যালগরিদম–ব্যবস্থার হাতে ক্ষমতার এই ক্রমবর্ধমান কেন্দ্রীকরণ জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। এআই যদি জ্বালানি বাজারের শুধু পূর্বাভাস দেওয়াই নয়, বরং একে প্রভাবিত করার ক্ষমতাও অর্জন করে ফেলে, তবে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার একটি বড় অংশ রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিবর্তে বেসরকারি প্রযুক্তিগত কাঠামোর ভেতরে নেওয়া সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারে।

নতুন জ্বালানিব্যবস্থা

জ্বালানিবিশ্ব এমন এক যুগে প্রবেশ করছে, যেখানে তথ্য প্রক্রিয়াকরণের সক্ষমতা হয়তো তেলের মজুতের মতোই কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। কোন দেশে তেলের মজুত বেশি, এটা সম্ভবত আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থাকবে না; বরং কোন পক্ষ জ্বালানি বাজারের ভবিষ্যৎ কার্যকরভাবে ও দ্রুততার সঙ্গে অনুমান করতে পারে—এটাই হয়ে উঠতে পারে জরুরি প্রশ্ন।

  • ড. কামরান ইয়েগানেগি তেহরানের ‘সেন্টার ফর সায়েন্টিফিক রিসার্চ অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ অব দ্য মিডল ইস্ট’–এর গবেষক

    মিডল ইস্ট মনিটর থেকে অনূদিত

Read full story at source