বেলফোরের অন্যায়-অবিচারের ঘোষণায় যেভাবে মধ্যপ্রাচ্যে জন্ম নিল এক ‘বিষফোড়া’

· Prothom Alo

ঐতিহাসিক ফিলিস্তিন ভূমিতে সন্ত্রাস, হত্যা–নির্যাতন, উচ্ছেদ–দখলের মধ্য দিয়ে ১৯৪৮ সালের ১৪ মে স্বাধীন ইসরায়েল রাষ্ট্রের ঘোষণা দেন জায়নবাদী নেতা ডেভিড বেন গুরিয়ন। কীভাবে অন্যায়ভাবে ফিলিস্তিনিদের উৎখাত করে ১৯৪৮ সালের এই দিনে ইহুদি রাষ্ট্র ইসরায়েল প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তা নিয়ে আজকের এই ‘ফিরে দেখা’ আয়োজন।

Visit umafrika.club for more information.

‘উড়ে এসে জুড়ে বসা’ যাকে বলে। ফিলিস্তিন ভূমিতে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ঘটেছে তেমনটাই।

না, বাংলা ভাষার এই সরল বাগধারায় আসল পরিস্থিতির চিত্র পুরোপুরি ফুটে ওঠে না। তাহলে কী সেই আসল পরিস্থিতি?

হুট করে ফিলিস্তিনের বুকে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়নি। উগ্র ইহুদিবাদীদের দীর্ঘদিনের সুনিপুণ পরিকল্পনা, গভীর ষড়যন্ত্রের সফল বাস্তবায়ন ‘ইসরায়েল’।

এই পরিকল্পনা, ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ধর্মগ্রন্থ–আশ্রিত এক কল্পকাহিনি সামনে এনে তা বিশ্বাসযোগ্য, প্রতিষ্ঠিত করতে উঠেপড়ে নামে জায়নবাদীরা। এই মিথ প্রতিষ্ঠায় অন্যায়ভাবে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেয় ব্রিটিশরা। অপরাধের হলো শুরু, আর ফিলিস্তিনিদের সারার সূচনা।

পরের ইতিহাস পাপে–অপরাধে পূর্ণ। কী হয়নি? অন্যায়-অবিচার, অত্যাচার-নির্যাতন-নিপীড়ন, জোর-জুলুম, সন্ত্রাস, জবরদখল, ধ্বংসযজ্ঞ, উচ্ছেদ-বিতাড়ন, ধর্ষণ-লুটতরাজ, হত্যা-গণহত্যা।

এসবের মধ্য দিয়ে ১৯৪৮ সালের ১৪ মে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন ইসরায়েল রাষ্ট্রের ঘোষণা দেওয়া হয়।

এখানেই শেষ নয়। ইসরায়েলের চূড়ান্ত লক্ষ্য ঐতিহাসিক ফিলিস্তিন ভূমি থেকে ফিলিস্তিনিদের পূর্ণ বিনাশ। এ লক্ষ্য অর্জনে দশকের পর দশক ধরে ফিলিস্তিনি জাতিহত্যার মিশন চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল।

পুরাকথা ও অর্ধসত্যে দাঁড়িয়ে ইসরায়েল

জায়নবাদ

অস্ট্রীয় লেখক নাথান বারনবুম ১৮৯৫ সালে ‘জায়নিজম’ বা জায়নবাদ শব্দটি প্রবর্তন করেন। ‘নিজভূমিতে’ ইহুদিদের নিজস্ব রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জাতীয় আন্দোলনই হলো ‘জায়নবাদ’ (ইহুদি জাতীয়তাবাদ)।

এরপর ১৮৯৭ সালের আগস্টে সুইজারল্যান্ডের ব্যাসেলে প্রথম বিশ্ব জায়নবাদী সম্মেলন হয়। সম্মেলনের উদ্যোক্তা অস্ট্রিয়ার ইহুদি সাংবাদিক, নাট্যকার ও রাজনীতিক থিওডর হারজেল।

তিন দিনব্যাপী এই সম্মেলনে গঠিত হয় জায়নবাদী সংস্থা। পরে যার নাম হয় বিশ্ব জায়নবাদী সংস্থা। একই সম্মেলনে ইহুদিদের জন্য একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার রূপরেখা গ্রহণ করা হয়।

এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে একটি কল্পকাহিনি নির্মাণ করেন জায়নবাদীরা। এর জন্য তাঁরা ইহুদি ধর্মগ্রন্থ হিব্রু বাইবেলের (তানাখ) আশ্রয় নেন। এই ধর্মগ্রন্থ–আশ্রিত কল্পকাহিনিকে প্রতিষ্ঠিত ও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে তাঁরা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। পরিকল্পনা বাস্তবায়নে তাঁরা নানা ধরনের তৎপরতা চালিয়ে যেতে থাকেন।

তিন বয়ান

জায়নবাদীদের কল্পকাহিনির মূল বয়ান মূলত তিনটি। এগুলো হলো—‘প্রতিশ্রুত ভূমি’, ‘মনোনীত সম্প্রদায়’ ও ‘ভূমিহীন মানুষের জন্য মনুষ্যহীন ভূমি।’

তানাখ অনুসারে, নবী আব্রাহামকে (মুসলিম সম্প্রদায়ের কাছে যিনি ইব্রাহিম (আ.) নামে পরিচিত) তাঁর বংশধরদের জন্য একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ঈশ্বর। এই ভূখণ্ড পুণ্যভূমি হিসেবে বংশপরম্পরায় সংরক্ষিত থাকবে।

ভৌগোলিকভাবে এই ভূমি সেখানেই, যেখানে আজকের ফিলিস্তিন ও ইসরায়েলের অবস্থান। তবে তানাখের অন্য বিবরণে মিসর থেকে ফোরাত নদীর তীর পর্যন্ত এই ভূমির সীমা।

ইহুদিদের বিশ্বাস, তাঁরা ঈশ্বরের মনোনীত জাতি। সেই হিসেবে তাঁরা ঈশ্বরের প্রতিশ্রুত ভূমিতেই বসবাস করে আসছিলেন। কিন্তু তাঁরা এই ভূমি থেকে বিতাড়িত হন। দুই হাজার বছরের বেশি সময় আগে ৭০ খ্রিষ্টাব্দে তাঁদের উৎখাত করে রোমানরা। তাঁরা উৎখাত হওয়ার পর যাঁরা সেখানে থেকেছেন, অর্থাৎ ফিলিস্তিনিরা, তাঁরা এই ভূমির মানুষ নন। উগ্র ইহুদিদের চিন্তাধারা কতটা অসুস্থ তার একটি নমুনা হচ্ছে, তারা ফিলিস্তিনিদের কোনো মানব সম্প্রদায় মনে করে না। এই হিসেবে তারা এই ভূমিকে ‘মনুষ্যহীন ভূমি’ মনে করে।

সুতরাং এই ‘মনুষ্যহীন ভূমির’ আসল মালিক ইহুদিরা। তাই এখান থেকে ফিলিস্তিনিদের উৎখাত করে ভূমির মালিকানা ফিরিয়ে নেওয়াই যথাযথ।

ইহুদিদের ‘নিজভূমিতে’ ফেরা, ‘নিজভূমির’ ওপর সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে জায়নবাদীরা জাতীয় আন্দোলন শুরু করে। তারা দাবি তোলে, ঐতিহাসিক ফিলিস্তিনের ভূমিতেই ইহুদিদের নিজস্ব রাষ্ট্র গড়তে হবে।

একচোখা দাজ্জাল মিডিয়া ও কোণঠাসা ফিলিস্তিন

বেলফোর ঘোষণা

১৫১৬ থেকে ফিলিস্তিন ছিল অটোমান সাম্রাজ্যের অধীনে। ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে অটোমানরা অক্ষশক্তির পক্ষে যোগ দেয়।

১৯১৭ সালের ৩১ অক্টোবর মিত্রশক্তিভুক্ত ব্রিটিশ নেতৃত্বাধীন বাহিনী অটোমানদের কাছ থেকে বীরশেবা দখল করে নেয়। এর মধ্য দিয়ে সিনাই–ফিলিস্তিন অঞ্চলের অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জন করে তারা। ক্রমে অটোমান প্রতিরক্ষাব্যূহ ভেঙে পড়ে। ব্রিটিশ নেতৃত্বাধীন বাহিনী ধাপে ধাপে পুরো অঞ্চলটির নিয়ন্ত্রণ নেয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর অটোমান সাম্রাজ্যের পতন ঘটে।

তৎকালীন ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী আর্থার জেমস বেলফোর ১৯১৭ সালের ২ নভেম্বর জায়নবাদী নেতা ওয়াল্টার রথসচাইল্ডকে একটি চিঠি দেন।

ইংরেজিতে লেখা সংক্ষিপ্ত চিঠিটির মূল কথা ছিল মাত্র ৬৭ শব্দে। চিঠিতে লেখা হয়েছিল—‘মহামান্য (ব্রিটিশ) সরকার ফিলিস্তিনে ইহুদি জনগণের জন্য একটি জাতীয় আবাসভূমি প্রতিষ্ঠার বিষয়ে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে। আর এ লক্ষ্য অর্জনে তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাবে। তবে এই বিষয়টি পরিষ্কার, এমন কিছু করা হবে না, যা ফিলিস্তিনে অবস্থানরত অ-ইহুদি সম্প্রদায়ের নাগরিক ও ধর্মীয় অধিকার কিংবা অন্য কোনো দেশে বসবাসকারী ইহুদিদের বিদ্যমান অধিকার ও রাজনৈতিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন করতে পারে।’

ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড দখল করে যেভাবে গড়ে উঠল ইসরায়েল রাষ্ট্র

অর্থাৎ এই চিঠির মধ্য দিয়ে স্পষ্টভাবে নিশ্চিত করা হয়, ফিলিস্তিনে ইহুদিদের জন্য জাতীয় আবাসভূমি গড়ে তোলার লক্ষ্য অর্জনে প্রয়োজনীয় সবকিছুই করবে ব্রিটিশ সরকার।

এই চিঠি ইতিহাসে ‘বেলফোর ঘোষণা’ নামে পরিচিতি পায়। বেলফোরের ঘোষণাটি ছিল জায়নবাদের প্রতি ব্রিটিশ সরকারের খোলামেলা স্বীকৃতি। তাঁর এই ঘোষণা ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথ পরিষ্কার করে দেয়। ঘোষণাটি জায়নবাদীদের কাছে হয়ে ওঠে ফিলিস্তিনে ইসরায়েল রাষ্ট্র গঠনের অন্যতম ভিত্তি।

তখনকার ফিলিস্তিনে ৯০ শতাংশ বা তার বেশি ছিল আরব অধিবাসী। আরবদের বেশির ভাগই ছিলেন মুসলিম। এ ছাড়া সেখানে কিছু খ্রিষ্টান ও ইহুদি অধিবাসীর বসবাস ছিল। এই বাস্তবতায় ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে ইহুদিদের জন্য রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বেলফোর অন্যায়-অবিচার-অপরাধ করেছিলেন। তাঁর ঘোষণা মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাস, ভূরাজনীতিকে চিরতরে বদলের সূত্রপাত ঘটায়।

ব্রিটিশ শাসকের মদদ, সমর্থনের ধারাবাহিকতায় ইউরোপসহ অন্যান্য দেশ থেকে ইহুদিরা দলে দলে ফিলিস্তিনে আসতে শুরু করে।

১৯২০ সালে ইতালির সান রেমো বৈঠকে বেলফোর ঘোষণা কার্যকরের সিদ্ধান্ত হয়। আর তা কার্যকরের দায়িত্ব ব্রিটিশ সরকারকেই দেওয়া হয়। ফিলিস্তিনে আসা অভিবাসী ইহুদিরা নিজেদের অবস্থান শক্তপোক্ত করতে, দখলদারি জোরালো করতে, ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ-বাস্তুচ্যুত করতে একই বছর গঠন করে ‘হাগানাহ’ নামের একটি আধা সামরিক বাহিনী।

১৯২২ সালে লিগ অব নেশনসের কাছ থেকে অখণ্ড ফিলিস্তিনের ওপর ‘ম্যান্ডেট’ লাভ করে ব্রিটিশরাজ।

পিল কমিশন

ফিলিস্তিনে ইহুদিদের ব্যাপক আগমনে স্থানীয় ফিলিস্তিনি-আরবদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দেখা দেয়। শুরু হয় সংঘাত। ত্রিশের দশকে বড় ধরনের প্রতিবাদ-বিক্ষোভ-বিদ্রোহ করেন ফিলিস্তিনিরা। অবশ্য ব্রিটিশ সরকার তা কঠোরভাবে দমন করে।

ফিলিস্তিনি আরব ও ইহুদিদের মধ্যকার সংঘাতের কারণ অনুসন্ধানে উদ্যোগ নেয় ব্রিটিশ সরকার। তারা লর্ড রবার্ট পিলের নেতৃত্বে একটি কমিশন গঠন করে। এই কমিশনের প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় ১৯৩৭ সালে।

ফিলিস্তিনকে দুভাগে বিভক্ত করার এক অন্যায্য-অন্যায় সুপারিশ করে পিল কমিশন। সুপারিশ অনুযায়ী, বণ্টনটা হবে এভাবে—৭৫ শতাংশ আরবদের জন্য, বাকিটা ইহুদিদের। ফিলিস্তিনি আরবরা এই সুপারিশ প্রত্যাখ্যান করেন। তবে ভূমি বিভাজনের এই নীতি সমর্থন করে ইহুদিরা।

৭৭ বছর আগে ফিলিস্তিনিদের ওপর যেভাবে নেমে এসেছিল মহাবিপর্যয়

হলোকাস্টকে হাতিয়ার

১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়। যুদ্ধে জার্মান নাৎসি নেতা অ্যাডলফ হিটলারের নেতৃত্বে ইউরোপে ইহুদি নিধনযজ্ঞ চলে, যা ইতিহাসে ‘হলোকাস্ট’ নামে পরিচিত। বিভিন্ন ইতিহাসবিদ ও গবেষকের তথ্যমতে, নাৎসি বাহিনীর হাতে প্রায় ৬০ লাখ ইহুদি নিহত হন। এই ইহুদি নিধনযজ্ঞ পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে। সে সময় অনেক ইহুদি পালিয়ে ফিলিস্তিনে যান।

১৯৪২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বাল্টিমোরে অনুষ্ঠিত হয় জায়নবাদী সম্মেলন। এই সম্মেলনে ফিলিস্তিনে ইহুদি রাষ্ট্র গঠনের ঘোষণা গৃহীত হয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয় ১৯৪৫ সালে। যুদ্ধে পরাজিত হয় জার্মানি-জাপান-ইতালি অক্ষশক্তি। যুদ্ধ শেষে বিশ্বজুড়ে ইহুদিদের প্রতি সহানুভূতি তুঙ্গে ওঠে। এই প্রেক্ষাপটে হলোকাস্টকে সামনে আনেন জায়নবাদী নেতারা, তাঁদের আন্তর্জাতিক সমর্থকেরা। তাঁরা ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে ইহুদিদের নিজস্ব আবাসভূমি প্রতিষ্ঠার জোর যুক্তি দেন।

ইসরায়েল রাষ্ট্রের পক্ষে জোরালো অবস্থান তুলে ধরেন যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যান। হিটলারের হাত থেকে বেঁচে যাওয়া এক লাখ ইহুদিকে অতিদ্রুত ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে স্থান দেওয়া হোক, এমনটা তিনি তখনই চেয়েছিলেন।

ইসরায়েল রাষ্ট্রের ঘোষণা

ব্রিটিশ সরকার একপর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, তারা আর ফিলিস্তিন শাসন করবে না। বিষয়টি জাতিসংঘের হাতে তুলে দেয় তারা। জাতিসংঘ ১৯৪৭ সালের ২৯ নভেম্বর ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে দুটি রাষ্ট্র গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়। একটি ইহুদিদের রাষ্ট্র (৫৫ শতাংশ)। অপরটি ফিলিস্তিনি আরবদের (৪৫ শতাংশ)। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গৃহীত এই পরিকল্পনায় জেরুজালেমকে আন্তর্জাতিক নগরের মর্যাদা দেওয়া হয়। পরিকল্পনাটি মেনে নেন ইহুদিরা। তবে তা প্রত্যাখ্যান করেন আরবরা।

নিজভূমি থেকে ফিলিস্তিনিদের তাড়ানোর ছক তৈরি করেন জায়নবাদীরা। তাঁরা ‘প্ল্যান ডি’ নামের পরিকল্পনা নেন। এই পরিকল্পনার নেতৃত্বে ছিলেন জায়নবাদী নেতা ডেভিড বেন গুরিয়েন। তিনি পরে ইসরায়েলের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হন।

ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা: অপরাধের শত বছর, অন্যায়ের ৮০, পাপের ৬৯

পরিকল্পনাটির লক্ষ্য ছিল—হত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট ও সন্ত্রাসের মাধ্যমে ফিলিস্তিনি আরবদের নিজভূমি থেকে বিতাড়িত করা। ১৯৪৮ সালের ১০ মার্চ পরিকল্পনাটি চূড়ান্ত হয়। তখন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ঝাঁপিয়ে পড়ে হাগানাহ, স্টার্ন গ্যাংসহ ইসরায়েলি সন্ত্রাসবাদী সশস্ত্র সংগঠনগুলো।

ইহুদিদের হামলা, নির্যাতন, নিপীড়ন ও হত্যার শিকার হতে থাকেন স্থানীয় ফিলিস্তিনিরা। তাঁরা প্রাণ বাঁচাতে নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন।

১৯৪৮ সালের ১৪ মে মধ্যরাতে ফিলিস্তিনে ব্রিটিশ ম্যান্ডেট (শাসন) শেষ হওয়ার সময় নির্ধারিত ছিল। ঠিক তার কয়েক ঘণ্টা আগে সেদিন বিকেলে তেল আবিবে বেন গুরিয়ন আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন ইসরায়েল রাষ্ট্রের ঘোষণা দেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান সঙ্গে সঙ্গে ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেন। এর মধ্য দিয়ে ফিলিস্তিনিদের ওপর আনুষ্ঠানিকভাবে মহাবিপর্যয় নেমে আসে।

১৯৪৮ সালের মার্চ থেকে অক্টোবর পর্যন্ত সময়ে অন্তত সাত লাখ ফিলিস্তিনি শরণার্থী হন। তাঁরা আশপাশের আরব দেশে আশ্রয় নেন। জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত অনুসারে, এই ফিলিস্তিনিদের নিজভূমিতে ফেরার কথা ছিল। কিন্তু তাঁরা আর কখনোই ফিরতে পারেননি। অন্যদিকে যাঁরা ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে রয়ে যান, তাঁরা হয়ে পড়েন ‘নিজভূমে পরবাসী’।

শত বছর আগে যে চিঠি ফিলিস্তিনিদের জন্য মহাবিপর্যয় ডেকে এনেছে

প্যালেস্টাইন সেন্ট্রাল ব্যুরো অব স্ট্যাটিস্টিকসের তথ্যমতে, বিশ্বজুড়ে এখন ফিলিস্তিনিদের মোট সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৫৫ লাখ। তাঁদের মধ্যে প্রায় ৮১ লাখ প্রবাসে বসবাস করছেন। আর প্রায় ৭৪ লাখ বসবাস করছেন ঐতিহাসিক ফিলিস্তিনে।

ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে থাকা ফিলিস্তিনিরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ইসরায়েলি দখলদারি, উচ্ছেদ, জেল-জুলুম, হামলা-নির্যাতন, সন্ত্রাস, হত্যাযজ্ঞসহ মানবিক বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে এক ভয়াবহ জীবন পার করছেন।

বিগত ৭৮ বছরে চারটি আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ হয়। প্রতিটি যুদ্ধে আরবরা পরাজিত হন। আর ফলাফল হিসেবে ফিলিস্তিনিরা ক্রমেই নিজভূমিতে কোণঠাসা হয়ে পড়েন। অন্যদিকে এই সময়কালে ইসরায়েলের রাজনৈতিক-সামরিক শক্তি বহুগুণ বেড়েছে। সম্প্রসারিত হয়েছে দখলদারি ও সামরিক আগ্রাসন। সর্বোপরি ফিলিস্তিনি জাতি হত্যার পরিধি, কৌশল ও ভয়াবহতা আরও বিস্তৃত হয়েছে।

ফিলিস্তিন-ইসরায়েল সংঘাত: ৫০ বছর পর আরেক ‘ইয়ম কিপুর’ যুদ্ধ

গাজা দখলের পাঁয়তারা

ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর নির্বিচারে নৃশংস হামলা শুরু করে ইসরায়েল। গাজায় এই ইসরায়েলি হামলায় প্রায় ৭৩ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। আহত ১ লাখ ৭২ হাজার ফিলিস্তিনি। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, গাজার মোট জনসংখ্যার প্রায় ৯০ শতাংশ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। সব ধরনের প্রায় ৮১ শতাংশ স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গাজার ৫০ শতাংশের বেশি হাসপাতাল অকার্যকর।

উপত্যকার প্রায় সব স্কুল ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত। সব মিলিয়ে গাজা পরিণত হয়েছে এক ধ্বংসস্তূপে। সেখানে ভয়াবহ মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি এমনই যে এখন গাজাকে বলা হচ্ছে ‘মর্ত্যের নরক’।

গাজার অর্ধেকের বেশি ভূখণ্ড এখন ইসরায়েলি বাহিনীর দখলে। পুরো গাজা দখলের পাঁয়তারা করছে ইসরায়েল।

ইসরায়েলি আগ্রাসন শুধু ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে সীমাবদ্ধ নয়। ইরান, লেবানন, সিরিয়া, ইরাক, ইয়েমেনসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ইসরায়েল প্রকাশ্য বা গোপনে হামলা-আগ্রসন চালিয়ে যাচ্ছে। পাপ, অপরাধ, সন্ত্রাস, দখলদারি, রক্তখেলার মধ্য দিয়ে জন্ম নেওয়া ইসরায়েল মধ্যপ্রাচ্যের এক ‘বিষফোড়া’। এই বিষফোড়ার ভুক্তভোগী পুরো মধ্যপ্রাচ্য, এমনকি সারা বিশ্ব।

তথ্যসূত্র:

*আল-জাজিরা, দ্য গার্ডিয়ান, বিবিসি, রয়টার্স, আনাদলু, প্রথম আলো।

*ইয়ান ক্যারল, ইসরায়েল অ্যান্ড প্যালেস্টাইন: দ্য কমপ্লিট স্টোরি (২০১৮ কিন্ডল ই-বুক সংস্করণ)।

নাকবা দিবস: মহাবিপর্যয় থেকে মুক্তি পায়নি ফিলিস্তিনিরানাকবা দিবস: আরও বড় মহাবিপর্যয়ের মুখোমুখি ফিলিস্তিনিরা

Read full story at source