পটিয়ার ঐতিহ্যবাহী আমজু মিয়ার বলীখেলা
· Prothom Alo
‘ও ভাই আঁরা চাটগাঁইয়া নওজোয়ান,
ও ভাই আঁরা চাটগাঁইয়া নওজোয়ান,
দইজ্জার কূলত বসত গড়ি
শিনাদি ঠেহাই ঝড় তোয়ান’
মেজ্জান, বলীখেলা, সাম্পান, শুঁটকি, বেলা বিস্কুটের কথা উঠলে কোনো কথা নেই আঁরা চাটগাঁইয়া। এই শব্দগুলো এখন শুধু ঐতিহ্য বহন করে না, চট্টগ্রাম অঞ্চলের ইতিহাস ও লোকজ সংস্কৃতির অংশও বটে। চাটগাঁর মল্ল নামে খ্যাত বহু পরিবার আদিকালের হিন্দু-মুসলিম পরিবারে দেখা যায়। মল্ল শব্দের অর্থ কুস্তিগির, বলী হলো খালি হাতে কুস্তি ধরা।
Visit sport-tr.bet for more information.
গবেষক আবদুল হক চৌধুরীর মতে, ‘চট্টগ্রামের ২২টি মল্ল পরিবার ইতিহাস বিখ্যাত। এসব পরিবারের প্রায় সব কটিই পটিয়া থানায় অবস্থিত। যেমন পটিয়া আশিয়া গ্রামের আমান শাহ মল্ল, চাতরির চিকন মল্ল, জিরির ইদ ও নওয়াব মল্ল, পারিগ্রামের হরি মল্ল, হাইদগাঁওর অলি মল্ল, পেরালার নানু মল্ল ও মোজাহিদ মল্ল, গোরাহিত মল্ল, পটিয়ার হিলাল মল্ল, শোভদণ্ডির তোরপাচ মল্ল, নাইখাইনের বোতাত মল্ল, গড়লার ছুয়ান মল্ল। এই মল্ল হলো বলী বা কুস্তিগির।’
ব্রিটিশ আমল থেকে পটিয়ায় বলীখেলার আয়োজন হয়ে আসছে। সে সময় বিত্তবানেরা মাইকিং করে ঢাকঢোল পিটিয়ে বলীখেলার আয়োজন করতেন। সুনাম ও খ্যাতি অর্জনের জন্য অনেকে এ খেলার আয়োজন করতেন। ১৯০৯ সালের ২৬ এপ্রিল চট্টগ্রামে বকশিহাটের বদরপাতি এলাকার আবদুল জব্বার সওদাগর ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে যুবসমাজকে শারীরিকভাবে ঐক্যবদ্ধ করতে বলীখেলার আয়োজন করেন। জব্বারের বলীখেলা ধারাবাহিকভাবে আয়োজন হয় চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক লালদীঘি মাঠে।
পটিয়ার চরকানাই ও বাজি পুইজ্যার বলীখেলা উপজেলার সর্বশ্রেষ্ঠ। সত্তরের দশকে এ বলীখেলা ও মেলা বন্ধ হয়ে যায়। এর অপর নাম সফর আলী মুন্সীর বলীখেলা। যেদিন বলীখেলা হতো, সেদিন খেলা শেষে নানা প্রকারের বাজি পোড়ানো বা ফোটানো হতো, এ জন্য এটি বাজপুইজ্যার বলীখেলা নামেও পরিচিত ছিল।
বলীখেলার দিন-তারিখ ঠিক হলে হাটবাজারে ঢোল পিটিয়ে লোকজনের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হতো। কেউ কেউ কেরোসিনের টিন বা চামড়ার ঢোল পিটিয়ে গ্রামগঞ্জে বলীখেলার দাওয়াত করতেন।
বলীখেলার উদ্ভবের ইতিকথা–সম্পর্কিত বিবরণে কবি আলাদীন আলী নূর লিখেছেন, ‘কবি কালিদাসের জন্মভূমি পশ্চিম মালব, অর্থাৎ পটিয়ার মালিয়ারা থেকে এবং কবি আফজাল আলীর জন্মভূমি পূর্ব মল্লর, অর্থাৎ সাতকানিয়ার মল্ল বা মিলুয়া থেকে প্রথম মল্লক্রীড়ার অনুষঙ্গী হিসেবে বলীখেলার উদ্ভব হয় এবং তা সমগ্র চট্টগ্রামে জনপ্রিয়তা লাভ করে।’
জব্বার মিঞার বলীখেলা আর মেলায় ঘুরে বেড়ানোপটিয়ায় তুফান আলী মুন্সীর বলীখেলা ও টেগর পুনির বলীখেলার বেশ সুখ্যাতি ছিল। বৈশাখ মাসে এ খেলার আয়োজন করা হতো। পটিয়ায় প্রথম খেলার আয়োজন করেন পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের (পাইকপাড়া) পরির দিঘি এলাকার প্রয়াত তুফান আলী মুন্সী। পরির দিঘির দক্ষিণ পাড়ে তোফায়েল আলী মুন্সীর খেলা নামেও একসময় বলীখেলার প্রচলন ছিল। পরবর্তী সময়ে পরির দিঘির খেলা নামে যা পরিচিতি লাভ করে। পাকিস্তান আমলে পরির দিঘির বলীখেলা বিলুপ্ত হয়ে যায়।
পরবর্তীকালে চল্লিশের দশকের দিকে তাঁর ছেলে পটিয়া ইউনিয়ন পরিষদের তৎকালীন চেয়ারম্যান মনির আহমেদ বলীখেলার আয়োজন করতেন।
আর পঞ্চাশের দশকের দিকে পটিয়া ইউপি চেয়ারম্যান প্রয়াত আমজু সওদাগর এ খেলা নিজ নামে প্রবর্তন করেন। ফলে পটিয়ায় ‘আমজুর বলীখেলা’ নামে প্রচলন হয়। আমজু মিয়া সওদাগর মারা যাওয়ার পর তাঁর ছেলে আবু মুছা সওদাগর এ খেলার আয়োজন করতেন। বর্তমানে আমজু মিয়া সওদাগরের উত্তরসূরি এ খেলার আয়োজন করেন।
আমজু মিয়া সওদাগরের চাচাতো ভাই হাজি আবুল বশর (৭৩) বলেন, ‘১৯৫৫ সাল থেকে আমজু মিয়ার বলীখেলা উপভোগ করে আসছি। তবে তারও আগে বলীখেলার প্রচলন শুরু হয় পটিয়ায়। ছোটবেলায় দেখতাম, বলীখেলাকে কেন্দ্র করে বিশাল মেলা বসত এবং দূরদূরান্ত থেকে লোকের সমাগম হতো। ঢোল বাজা ব্যান্ড পার্টিসহ নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন হতো বাড়ির সামনের খোলা মাঠে। কী যে আনন্দ হতো তখন! কিন্তু এখন আর সেই আনন্দ নেই।’
সর্বশেষ ২০১৮ সালে আমজু মিয়ার ১১৫তম বলীখেলা ও বৈশাখী মেলার আয়োজন হয়। একসময় পটিয়ার ভাটিখাইন নিবাসী মরহুম আবদুল বারিক চৌধুরী ভাটিখাইন গ্রামে এ বলীখেলার আয়োজন করতেন। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁরই উত্তরসূরিরা বলীখেলার আয়োজন করতেন, যা আজ বিলুপ্ত।
পটিয়ায় আমজু মিয়ার বলীখেলা প্রতিবছর বৈশাখ মাসের মাঝামাঝিতে অনুষ্ঠিত হয়। পটিয়া বাসস্ট্যান্ডের দক্ষিণ পাশে বৈলতলী রোড–সংলগ্ন আমজু মিয়া সওদাগরের বাড়ির সামনে খোলা মাঠে বলীখেলার আসর বসত। আমজুর বলীখেলাকে কেন্দ্র করে বৈশাখী মেলারও আয়োজন হতো। মেলায় হরেক মাটির ও কাঠের তৈরি খেলনা, বাঁশ-বেত, পাট ও পাতার তৈরি আসবাব, রংবেরঙের ফুল, নাগরদোলা, নানা রকমের লোকজ শিল্পের পসরা নিয়ে বসতেন দোকানিরা। চট্টগ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে লোকজন এসে আমজু মিয়ার বলীখেলা উপভোগ করত, কিন্তু কালের বিবর্তনের এই বলীখেলাও আজ হারিয়ে যেতে বসেছে। চার বছর ধরে আমজু মিয়ার বলীখেলার আয়োজন হয় না।
বলীখেলা নিয়ে চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজের বাংলা বিভাগের সাবেক অধ্যাপক আবদুল আলিম বলেন, ‘যে খেলায় নির্মল আনন্দ আছে, যে খেলায় সর্বস্তরের মানুষ নির্মল আনন্দ খুঁজে পায়, সেটার নামই বলীখেলা। ১৯৬৯-৭০ সালের কথা, ছেলেবেলায় নির্মল আনন্দ খুঁজে পেতাম আমজু মিয়ার বলীখেলায়। প্রতীক্ষায় থাকতাম কখন বৈশাখ মাস আসবে, কখন বলীখেলা শুরু হবে। বলীখেলার চেয়ে বেশি আনন্দ পেতাম মেলায়। ঢোলের তালে তালে শুরু হতো বলীখেলা। খেলার মাঠের চারদিকে হাজার হাজার লোক দাঁড়িয়ে-বসে তা উপভোগ করত। বাঁশির আওয়াজ, উপচে পড়া মানুষের ভিড়, চিৎকার চেঁচামেচি, সন্ধ্যায় আতশবাজির উৎসব—আহা কী নির্মল আনন্দ!’
লেখক ও গবেষক বাংলা একাডেমির ফেলো মুহাম্মদ শামসুল হক বলেন, ‘১৯৭০ সালের পূর্ব থেকে পটিয়ায় বলীখেলার প্রচলন ছিল। তুফান আলী মুন্সীর বলীখেলা, পরির দিঘির বলীখেলা, ভাটিখাইনের বারেক চেয়ারম্যানের বলীখেলাসহ আরও বেশ কয়েকটি বলীখেলা বিলুপ্ত হয়ে গেছে। সত্তরের দশক থেকে পটিয়ায় বলীখেলার আয়োজন করে আসছে আমজু মিয়া সওদাগরের পরিবার। বলীখেলা মানুষের মিলনমেলায় পরিণত হতো। মানুষের মধ্যে একটা হার্দিক সেতুবন্ধন রচনা হতো। এটা ছিল অনেকটা নির্মল বিনোদনের মতো। এখন সেই বিনোদন নেই।’
আমজু মিয়া সওদাগরের দৌহিত্র চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা যুবদলের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ও ক্রীড়াবিদ শাহজাহান চৌধুরী বলেন, ‘ছোটবেলায় দাদাদের কাছ থেকে শুনেছি, ব্রিটিশদের তাড়ানোর জন্য যুবসমাজকে শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ করতে বলীখেলার প্রচলন শুরু হয়। সেই থেকে বলীখেলা ধারাবাহিকভাবে আয়োজন হয়ে আসছে। দাদা আমজু মিয়া সওদাগর মারা যাওয়ার পর আমার বাবা তৎকালীন চেয়ারম্যান মুসা সওদাগর ও চাচা আনোয়ারুল আলম চৌধুরীসহ পরিবারের সদস্যরা মিলে বলীখেলার আয়োজন করত। ইনশা আল্লাহ, আগামীতে বড় পরিসরে এই বলীখেলা পটিয়া স্কুল মাঠে আয়োজন করার প্রত্যাশা রাখি।’
বলীখেলা চট্টগ্রামের নিজস্ব লোকসংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। আকাশ-সংস্কৃতি এবং ডিজিটালের জাঁতাকলে বলীখেলা যেন হারিয়ে না যায়। ঢাকঢোল পিটিয়ে আতশবাজি উৎসবে আগামীকাল শনিবার ১১৭তম আমজু মিয়ার বলীখেলার আসর বসতে যাচ্ছে।
উপদেষ্টা, পটিয়া বন্ধুসভা