বহুজাতিক এক ব্যাংকের মুনাফার অর্থে বিদেশি বিনিয়োগে বড় লাফ
· Prothom Alo
দেশে এফডিআই বাড়লেও নতুন বিনিয়োগ এখনো সীমিত।
Visit milkshakeslot.com for more information.
বিনিয়োগ বাড়াতে অবকাঠামো ও নীতিগত স্থিতিশীলতা জরুরি।
দেশে কয়েক বছর ধরেই সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) আসার পরিমাণ ধারাবাহিকভাবে কমছিল। সেই অবস্থা কাটিয়ে এবার ইতিবাচক ধারায় ফিরেছে বিদেশি বিনিয়োগ। গত বছর দেশে এফডিআই ৩৯ শতাংশের বেশি বেড়েছে। পুনর্বিনিয়োগ ও আন্তকোম্পানি ঋণের ওপর ভর করেই মূলত বিদেশি বিনিয়োগে এ রকম বড় লাফ দেখা গেছে।
বিদেশি বিনিয়োগ নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, দেশে ২০২৫ সালে ১৭৭ কোটি ৪ লাখ মার্কিন ডলারের নিট এফডিআই এসেছে, যা ২০২৪ সালে ছিল ১২৭ কোটি ৪ লাখ ডলার। অর্থাৎ এক বছরে নিট এফডিআই বেড়েছে প্রায় ৫০ কোটি ডলার।
সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, গত বছর একটি বহুজাতিক ব্যাংক তাদের মুনাফার অর্থ বাংলাদেশ থেকে ফেরত নেয়নি। এ অর্থ তারা এ দেশেই পুনর্বিনিয়োগ হিসেবে দেখিয়েছে। এ ছাড়া সুদের হার বেশি থাকায় অনেক বিদেশি কোম্পানিও বাংলাদেশে তাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দিয়েছে, যা বিনিয়োগ আকারে দেখানো হয়েছে। মূলত এ দুটি কারণে বিদেশি বিনিয়োগে বড় প্রবাহ দেখা গেছে। তবে গত বছরের তুলনায় দেশে নতুন বিদেশি ইক্যুইটি ক্যাপিটাল বিনিয়োগ বেড়েছে।
টানা পতনের ধারা কাটল
জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়নবিষয়ক সংস্থা আঙ্কটাডের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ২০১৮ সালে নিট এফডিআইয়ের পরিমাণ ছিল ৩৬১ কোটি ৩০ লাখ ডলার। পরের বছরই প্রবাহ কমে হয় ২৮৭ কোটি ৪০ লাখ ডলার। এরপর করোনা মহামারি শুরু হলে বিদেশি বিনিয়োগে আরও ধাক্কা লাগে। যেমন ২০২০ সালে এফডিআই নেমে আসে ২৫৬ কোটি ৪০ লাখ ডলারে। পরের বছর তা কমে প্রায় অর্ধেকে নেমে আসে, যা পরিমাণে ১৫৭ কোটি ২১ লাখ ডলার।
এই নিম্নমুখী প্রবণতা পরবর্তী বছরগুলোতেও অব্যাহত ছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যে দেখা যায়, ২০২২ সালে এফডিআই ১৫১ কোটি ৭৬ লাখ ডলারে নামে, যা ২০২৩ সালে আরও কমে ১৪৬ কোটি ৪১ লাখ ডলার হয়। ২০২৪ সালেও পতন থামেনি। সেবার বিনিয়োগ কমে ১২৭ কোটি ৪ লাখ ডলারে নামে। কয়েক বছরের এমন ধারাবাহিক পতনের পর অবশেষে ২০২৫ সালে বিদেশি বিনিয়োগে বড় ধরনের ঘুরে দাঁড়ানোর প্রবণতা লক্ষ করা যায়।
রুপালী হক চৌধুরী, সভাপতি, এফআইসিসিআইবিনিয়োগ প্রবৃদ্ধির যে চিত্র দেখা যাচ্ছে, তা প্রকৃত বিদেশি বিনিয়োগ নয়। কারণ, ইক্যুইটি বিনিয়োগ তেমন বাড়েনি, যা আমাদের বেশি প্রয়োজন। পুনর্বিনিয়োগ হলে ব্যবসা বাড়বে, সেটি খারাপ নয়। তবে নতুন বিনিয়োগ বাড়ানো সবচেয়ে বেশি জরুরি। নতুন বিনিয়োগ বাড়াতে হলে লজিস্টিকস, অবকাঠামো সুবিধা, গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ ও নীতির ধারাবাহিকতা ঠিক করা দরকার২০২৫ সালের চার প্রান্তিকের (তিন মাস) তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, সর্বোচ্চ ৭৮ কোটি ৮২ লাখ ডলারের এফডিআই এসেছিল প্রথম প্রান্তিকে, অর্থাৎ জানুয়ারি-মার্চ সময়ে। এর পরের তিন প্রান্তিকে এফডিআই আসার পরিমাণ ৩০ কোটি ডলারের আশপাশে ছিল।
বিনিয়োগ বৃদ্ধির কারণ
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, দেশে নতুন বিনিয়োগ, পুনর্বিনিয়োগ ও আন্তকোম্পানি ঋণ—এই তিন সূচকেই গত বছর বিদেশি বিনিয়োগে প্রবৃদ্ধি হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি এসেছে পুনর্বিনিয়োগ। ২০২৪ সালে যেখানে পুনর্বিনিয়োগ হিসেবে এফডিআই এসেছিল ৬২ কোটি ১৯ লাখ ডলার, সেখানে ২০২৫ সালে তা ২৫ শতাংশ বেড়ে ৭৮ কোটি ১৬ লাখ ডলারে উঠেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা প্রথম আলোকে জানান, গত বছর একটি বহুজাতিক ব্যাংক তাদের মুনাফার অর্থ নিজ দেশে ফেরত নেয়নি। এ অর্থ তারা পুনর্বিনিয়োগ হিসেবে দেখিয়েছে, যা এফডিআইয়ের পরিমাণ বাড়িয়েছে।
গত বছর আন্তকোম্পানি ঋণ হিসেবে এফডিআই বেড়েছে প্রায় ৩১৮ শতাংশ। ২০২৪ সালে এই খাতে বিদেশি বিনিয়োগ ছিল ১০ কোটি ৩৮ লাখ ডলার, যা গত বছর বেড়ে ৪৩ কোটি ৪১ লাখ ডলার হয়েছে। খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দেশে সুদের হার বেশি থাকায় ব্যাংক থেকে নতুন ঋণের খরচ বেড়েছে। এ কারণে অনেক বিদেশি কোম্পানি তাদের এ দেশীয় সহযোগী প্রতিষ্ঠানকে বড় অঙ্কের ঋণ দিয়েছে, যা বিদেশি বিনিয়োগ হিসেবে গণ্য হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, গত বছর নতুন করে আসা বিনিয়োগ বা ইক্যুইটি ক্যাপিটালের পরিমাণও সামান্য বেড়েছে। ২০২৪ সালে ৫৪ কোটি ৪৬ লাখ ডলারের নতুন বিদেশি বিনিয়োগ এসেছিল। ২০২৫ সালে এটি প্রায় ১ কোটি ডলার বেড়ে ৫৫ কোটি ৪৬ লাখ ডলার হয়েছে।
বিনিয়োগকারীরা যা বলছেন
বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী সদস্য নাহিয়ান রহমান বলেন, ২০২৫ সালে নিট এফডিআই প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়েছে। যদিও বেজলাইন ছোট, তবু নতুন ইক্যুইটি, পুনর্বিনিয়োগ ও আন্তকোম্পানি ঋণ—তিনটি সূচকেই প্রবৃদ্ধি হওয়া আশাব্যঞ্জক। বিশেষ করে বৈশ্বিকভাবে প্রায় ১০ শতাংশ ইক্যুইটি বিনিয়োগ কমার মধ্যেও বাংলাদেশে ইক্যুইটি তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে।
নাহিয়ান রহমান আরও বলেন, ‘পুনর্বিনিয়োগ ও আন্তকোম্পানি ঋণের প্রবৃদ্ধি ভবিষ্যতের জন্য ইতিবাচক ইঙ্গিত। আমরা পরিকল্পনা অনুযায়ী ধারাবাহিকভাবে কাজ করছি। গত বছরের বিনিয়োগ পাইপলাইন থেকে ইতিমধ্যে কিছু বাস্তবায়ন হয়েছে। ২০২৬ সালের মধ্যে এর একটি বড় অংশ বাস্তবে রূপ নেবে। তবে আমাদের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ভোলাটিলিটি মাথায় রেখে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া অব্যাহত রাখতে হবে।’
অবশ্য বিদেশি বিনিয়োগে প্রবৃদ্ধির এই চিত্র প্রকৃত বিনিয়োগ বাড়ার বার্তা দিচ্ছে না বলে মনে করেন বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সংগঠন ফরেন ইনভেস্টর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফআইসিসিআই) সভাপতি রুপালী হক চৌধুরী। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধির যে চিত্র দেখা যাচ্ছে, তা প্রকৃত বিদেশি বিনিয়োগ নয়। কারণ, ইক্যুইটি বিনিয়োগ তেমন বাড়েনি, যা আমাদের বেশি প্রয়োজন। পুনর্বিনিয়োগ হলে ব্যবসা বাড়বে, সেটি খারাপ নয়। তবে নতুন বিনিয়োগ বাড়ানো সবচেয়ে বেশি জরুরি। নতুন বিনিয়োগ বাড়াতে হলে লজিস্টিকস, অবকাঠামো সুবিধা, গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ ও নীতির ধারাবাহিকতা ঠিক করা দরকার।’
রুপালী হক চৌধুরী আরও বলেন, বাংলাদেশ সস্তা শ্রম ছাড়া অন্যান্য সুবিধার দিক থেকে প্রতিযোগী দেশের তুলনায় পিছিয়ে। দেশের অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। সে জন্য আগে অন্য অসুবিধাগুলো দূর করতে হবে।