ভারতে বিরোধীরা কঠিন প্রশ্নের মুখে

· Prothom Alo

ভারতের গণতান্ত্রিক বিরোধীদের জন্য এটি এক কঠিন আত্মসমালোচনার মুহূর্ত। এটি তাদের নতুন করে ভাবার সময়। নিজের সামনে কঠিন সত্যগুলো তুলে ধরার সময়। অস্বস্তিকর প্রশ্ন করার সময়।

দুই বছর আগে লোকসভা নির্বাচনের অপ্রত্যাশিত ফল যে সুযোগ তৈরি করেছিল, তা সংকুচিত হতে হতে এখন কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। তার ধারাবাহিকতায় পশ্চিমবঙ্গ দখল বিজেপির সর্বময় ক্ষমতা অর্জনের অভিযানে এক বড় পদক্ষেপ।

Visit afsport.lat for more information.

একই সঙ্গে এটি ভারতের নির্বাচনী প্রক্রিয়ার যে সামান্য বিশ্বাসযোগ্যতা বাকি ছিল, তার জন্যও বড় ধাক্কা। বিরোধীরা যদি নতুন করে রাজনীতি কল্পনা না করে, কৌশল না বদলায় এবং তাদের নির্বাচনী যন্ত্রপাতিকে নতুনভাবে গড়ে না তোলে, তাহলে গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতা প্রায় শেষ হয়ে যাবে।

যদি কোনোভাবে নির্বাচনী ময়দানে ভারসাম্য না ফেরানো যায় এবং ন্যায্যতার একটি ন্যূনতম ধারণাও পুনরুদ্ধার না হয়, তাহলে নির্বাচন আর জনগণের ইচ্ছা প্রকাশের ক্ষেত্র হিসেবে কাজ না–ও করতে পারে। আর তা শুধু বিরোধীদের জন্য নয়, শাসকদের জন্যও অশুভ সংকেত।

কেরালা ও তামিলনাড়ুর ফল যেন এই কঠিন সত্যকে আড়াল করেনি। কেরালায় যা হয়েছে, তা আসলে ক্ষমতার পালাবদলের একটি স্বাভাবিক চক্রের পুনরাবৃত্তি। পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা এবং বাম সরকারের প্রতি জমে থাকা অসন্তোষ শেষ পর্যন্ত সেখানে ফল দিয়েছে।

এর সুফল পেয়েছে ইউডিএফ। বিলম্বিত পরিবর্তনের কারণে তাদের জয়ের ব্যবধান কিছুটা বেড়েছে। বিজেপি ভোট বাড়াতে পারেনি। এতে বিরোধীরা কিছুটা স্বস্তি পেতে পারে, কিন্তু শাসক শক্তির প্রবল গতির সামনে এই স্বস্তি ক্ষণস্থায়ী। বরং সংখ্যালঘু ভোটের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ভবিষ্যতে ইউডিএফের জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে।

তামিলনাড়ুতে থালাপতি বিজয়ের দলের উত্থান যতই নাটকীয় হোক, তা অন্য কোথাও অনুকরণযোগ্য নয়। সেখানে দ্রাবিড় রাজনীতির ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে, কিন্তু ডিএমকের রাজনৈতিক মডেল থেকে আলাদা একটি বিকল্পের প্রয়োজন ছিল।

ডিএমকের আধিপত্য ও আত্মতুষ্টি সেই শূন্যতা তৈরি করে। এআইএডিএমকে সেই জায়গা নিতে পারেনি। কারণ, তাকে বিজেপির সহযোগী হিসেবে দেখা হচ্ছিল। এটি রাজ্যের রাজনৈতিক সংস্কৃতির সঙ্গে যায় না।

ফলে সেই শূন্যতা পূরণ করেছেন একজন চলচ্চিত্র তারকা, যিনি এমজিআরের পথ অনুসরণ করে নতুন আকর্ষণ তৈরি করেছেন।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তিনি ডিএমকেকে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী বললেও বিজেপিকে আদর্শগত প্রতিপক্ষ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন এবং নিজেকে পেরিয়ার, কামারাজ ও আম্বেদকরের অনুসারী হিসেবে তুলে ধরেছেন। এই জায়গাটি তামিলনাড়ুর জন্য বিশেষ।

আসামে বিরোধীরা কোনো অজুহাতের আড়ালে লুকাতে পারে না। সত্য হলো—নির্বাচন কমিশন সীমা পুনর্নির্ধারণ করে সাম্প্রদায়িক ভিত্তিতে বিজেপির সুবিধা তৈরি করেছে। এটি ভারতের নির্বাচনী ইতিহাসে নজিরবিহীন। সেখানে ভোটের আগেই বিজেপি প্রায় ১০টি আসন নিজেদের ঝুলিতে তুলে নেয়।

এই কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে বিরোধীদের। ভারতের নির্বাচন কি এখন ন্যূনতম গ্রহণযোগ্যতার সীমার নিচে নেমে গেছে? নির্বাচনের ফল যদি পূর্বনির্ধারিত বা প্রভাবিত মনে হয়, তাহলে বিরোধীরা কীভাবে তা মেনে নেবে, আবার ময়দানও ছাড়বে না? কোথায় তারা সীমারেখা টানবে—যদি এখন না টানে, পশ্চিমবঙ্গের পরও না টানে, তবে কবে?

রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী প্রকাশ্যে ‘মিয়া’ সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ছড়িয়েছেন, অথচ নির্বাচন কমিশন ও সর্বোচ্চ আদালত নীরব থেকেছেন। কিন্তু এসব সত্ত্বেও বিরোধীদের রাজনৈতিক লড়াইয়ের ইচ্ছার অভাব স্পষ্ট। দুর্নীতির অভিযোগ, জুবিন গার্গের মৃত্যু—এসব ইস্যু থাকা সত্ত্বেও তারা নিজেদের সংগঠিত করতে পারেনি। এটি ছিল কীভাবে একটি নির্বাচন হারাতে হয়, তার ‘টেক্সটবুক’ উদাহরণ।

পশ্চিমবঙ্গে বিরোধীদের এই দুর্বলতা ছিল না। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে কেউই সহজে পথ ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ করতে পারে না। তাঁর কৌশল ছিল। ছিল লড়াইয়ের ক্ষমতা এবং ছিল একটি কার্যকর সংগঠন। বিরোধীরা ঐক্যবদ্ধ না হলেও বামদের আলাদা লড়া তাঁর জন্য সুবিধাজনকই হয়েছে। কংগ্রেসও তৃণমূলকে বড় ক্ষতি করতে পারেনি। ফলে পশ্চিমবঙ্গ হয়ে ওঠে বিরোধীদের জন্য এক পরীক্ষার ক্ষেত্র। এটি দেশের সব বিরোধী নেতাই উদ্বেগ নিয়ে দেখেছেন।

তবে সত্যিটা এড়িয়ে যাওয়া যাবে না। এত বড় ফল পরিবর্তনের পেছনে ছিল সরকারের প্রতি জন–অসন্তোষ, যা যথাযথভাবে বোঝা হয়নি। মানুষের ক্ষোভ মূলত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ওপর নয়। তাদের ক্ষোভ ছিল মমতার স্থানীয় নেতাদের এবং শাসনের মানের বিরুদ্ধে। অন্য রাজ্যে একই বা তার চেয়েও খারাপ শাসনব্যবস্থা শাস্তি পায়নি, কিন্তু এখানে বিজেপি এবং তাদের ঘনিষ্ঠ মিডিয়া সেই সুযোগ কাজে লাগিয়েছে।

বিরোধীদের উচিত নিজেদের শাসনের রেকর্ড নিয়ে সৎভাবে ভাবা। এটি শুধু পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। পাঞ্জাব, কর্ণাটক, তেলেঙ্গানা ও হিমাচলেও এটি সমানভাবে প্রযোজ্য।

সবশেষে সবচেয়ে অস্বস্তিকর সত্যটি স্বীকার করা দরকার। পশ্চিমবঙ্গের ফল কেবল জনমতের সরল প্রতিফলন নয়। এই জয়ে কেন্দ্রীয় সরকার ও নির্বাচন কমিশনের সক্রিয় ভূমিকা ছিল।

২০২৪ সালের ধাক্কার পর বিজেপি সংগঠনের দিক থেকে দুর্বল ছিল, কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকার ও সমর্থক মিডিয়া তাদের পুনরুজ্জীবিত করে। কেন্দ্র পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে আর্থিকভাবে চাপে রাখে, এক শ দিনের কাজ ও প্রধানমন্ত্রীর আবাস যোজনার মতো প্রকল্প বন্ধ করে দেয়। নির্বাচন কমিশন বিজেপির তীব্র সাম্প্রদায়িক প্রচারকে উপেক্ষা করে।

সবচেয়ে বড় বিষয়, অন্য কোনো রাজ্যের তুলনায় এখানে অভূতপূর্বভাবে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। ৯০ লাখ নাম বাদ দেওয়ার মধ্যে ২৭ লাখই পশ্চিমবঙ্গের, যাঁদের অনেকেই নাগরিকত্বের প্রমাণ জমা দিয়েছিলেন।

স্বাধীন তদন্তে দেখা গেছে, এই বাদ দেওয়া ছিল লক্ষ্যভিত্তিক ও অন্যায্য। এটি মোট ভোটের প্রায় ৪ দশমিক ৩ শতাংশ। বিজেপির জয়ের ব্যবধান ৪ দশমিক ৬ শতাংশ। তাহলে প্রশ্ন ওঠেই, এই ২৭ লাখ মানুষ ভোট দিতে পারলে ফল কী হতো?

এই কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে বিরোধীদের। ভারতের নির্বাচন কি এখন ন্যূনতম গ্রহণযোগ্যতার সীমার নিচে নেমে গেছে? নির্বাচনের ফল যদি পূর্বনির্ধারিত বা প্রভাবিত মনে হয়, তাহলে বিরোধীরা কীভাবে তা মেনে নেবে, আবার ময়দানও ছাড়বে না? কোথায় তারা সীমারেখা টানবে—যদি এখন না টানে, পশ্চিমবঙ্গের পরও না টানে, তবে কবে?

  • যোগেন্দ্র যাদব স্বরাজ ইন্ডিয়ার সদস্য এবং ভারত জোড়ো অভিযানের জাতীয় সমন্বয়ক

  • ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত

Read full story at source