জামায়াতের মারদিয়া মমতাজকে ‘ট্রফি নেত্রী’ বলে ট্রল করার নেপথ্যে কী

· Prothom Alo

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের নবনির্বাচিত ৪৯ জন সদস্য শপথ নিয়েছেন। গতকাল রোববার রাতে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ জাতীয় সংসদের শপথকক্ষে তাঁদের শপথ পড়ান। বিএনপি জোট থেকে ৩৬ জন, জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১–দলীয় ঐক্য থেকে ১২ জন এবং স্বতন্ত্র জোট থেকে ১ জন সদস্য শপথ নেন।

Visit biznow.biz for more information.

শপথ অনুষ্ঠানে অংশ নিতে নবনির্বাচিত সদস্যরা জাতীয় সংসদে পৌঁছানোর সময় একটি ভিডিও ক্লিপ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ওই ভিডিওতে জামায়াতের মারদিয়া মমতাজকে সংসদ ভবনে ঢুকতে দেখা যায়। ভিডিওটির ক্যাপশনে লেখা হয়, ‘সংরক্ষিত নারী আসনের শপথ নিতে সংসদে জামায়াতের ট্রফি নেত্রী মারদিয়া মমতাজ!’

লিংক: এখানে

শপথ নিলেন সংরক্ষিত নারী আসনের ৪৯ এমপি

এই ভিডিও খুব দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত একটি পোস্ট প্রায় ৭০ হাজারবার দেখা হয় এবং তাতে ৪ হাজার প্রতিক্রিয়া পড়ে। মন্তব্যের ঘরে অনেকেই ‘ট্রফি’ শব্দটি ব্যবহার করে বিভিন্ন মন্তব্য করেন। যেমন হাসনাত বিন কালাম নামের এক ব্যবহারকারী লিখেছেন, ‘যাক, অবশেষে জাতীয় সংসদ তাহলে একটি ট্রফি পাইল।’

একই ভিডিও চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রদলের কর্মী পরিচয়ে রাকিব হোসেন নিজের ফেসবুক প্রোফাইলে শেয়ার করে একই ধরনের ক্যাপশন ব্যবহার করেন। তাঁর পোস্টটি প্রায় ২৮ হাজারবার দেখা হয় এবং এতে ১ হাজার ৪০০ প্রতিক্রিয়া পড়ে। সেখানেও মন্তব্যের ঘরে অনেকে দাবি করেন, মারদিয়া মমতাজ নাকি আগে সংসদের নারী সদস্যদের ‘ট্রফি’ বলে মন্তব্য করেছিলেন—এমন অভিযোগ তুলে তাঁকে ‘ট্রফি এমপি’ বলে আখ্যা দেওয়া হয়।

লিংক: এখানে

জুলাই আন্দোলনের ‘ট্রফি’ লন্ডনে গিয়ে বিএনপিকে দিয়ে আসেন অধ্যাপক ইউনূস: স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী

বিএনপির পক্ষে প্রচারণা চালানো ‘Next Bangladesh Network’ নামের একটি ফেসবুক পেজ থেকেও একই ভিডিও একই ধরনের ক্যাপশন দিয়ে শেয়ার করা হয়, যা এরই মধ্যে কয়েক হাজারবার দেখা হয়ে গেছে।

‘ট্রফি নেত্রী মারদিয়া মমতাজ’—এই কি-ওয়ার্ড ব্যবহার করে খোঁজ নিলে দেখা যায়, ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একই ধরনের দাবি ও ক্যাপশন ব্যবহার করে আরও বহু পোস্ট ছড়িয়ে আছে।

লিংক: এখানে

অনুসন্ধানে দেখা যায়, একটি ভিডিও ক্লিপকে কেন্দ্র করে নির্দিষ্ট একটি শব্দবন্ধ (ট্রফি নেত্রী) ব্যবহার করে ব্যঙ্গ বা সমালোচনার লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে মারদিয়া মমতাজকে।

লিংক: এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, এখানে

কি–ওয়ার্ড সার্চ করে একটি ভিডিও পাওয়া যায়, যেখানে মারদিয়া মমতাজ নিজেই এই ‘ট্রফি’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন।

চলতি বছরের ১৩ জানুয়ারি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল জিটিভি তাদের ইউটিউব চ্যানেলে ‘সহজ রাজনীতি–টাইমলাইন বাংলাদেশ’ শিরোনামে ১ ঘণ্টা ২৫ মিনিট ৫০ সেকেন্ডের একটি আলোচনা অনুষ্ঠান প্রকাশ করে। অনুষ্ঠানটি উপস্থাপনায় ছিলেন কাজী জেসিন। আলোচক ছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক ড. নাহরিন আই খান, জামায়াতের মহিলা বিভাগের সদস্য মারদিয়া মমতাজ এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক তুহিন খান।

লিংক: এখানে

আলোচনা পর্বে ‘ট্রফি’ নিয়ে সাড়ে তিন মিনিট আলোচনা চলে। আলোচনার সূত্রপাত হয় সরাসরি আসনে জামায়াতের নারী প্রার্থী না থাকা নিয়ে।

কাজী জেসিন একপর্যায়ে মারদিয়া মমতাজকে প্রশ্ন করেন, যে জামায়াত এতবার বলল যে জুলাই সনদের ভিত্তিতে নির্বাচন চাই, সেই তারাই কেন একজন নারী প্রার্থীও মনোনয়ন দিতে পারল না?

বেসরকারি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মারদিয়া মমতাজ জবাবে বলেন, ‘এখানে একটা ব্যাপার নাহরিন আপা (সহ–আলোচক) যেটা বলছিলেন যে আমাদের আসলে এটা কোনো (রাজনৈতিক) দলের একলার দায় না। এটা আমাদের পুরো সমাজটারই একটা দৃষ্টিভঙ্গির বিষয় আছে। আমাদেরকে এখানে আস্তে আস্তে ট্রেইন করতে হবে মানুষকে। মানুষ আসলে টপ পজিশনগুলোতে মেয়েদেরকে দেখে অভ্যস্ত না। এটা আমি, আমি শিওর, আমি নিজে ইঞ্জিনিয়ার, আমি কাজ করেছি। এরপর আপা যাঁরা ফিল্ডে কাজ করেছেন, যদি কখনো কোনো ডেটা সংগ্রহের জন্য যান, দেখবেন যে এসব জায়গায় মানুষের এক্সেপট্যান্সের একটু ঝামেলা আছে।’

‘টপ পজিশনসে প্রচুর নারী কাজ করছে’– কাজী জেসিন এ কথা বলার পর মারদিয়া মমতাজ বলেন, ‘না না, আছেন, কিন্তু ভোটের জায়গাটা বোঝেন। একটা জায়গায় যখন আপনি ভোট দিতে যাবেন, আপনি শুধু চারতলা বাড়িতে যাবেন না, আপনি যখন সমর্থন সংরক্ষণের জন্য যাবেন, তখন আপনাকে প্রত্যেকটা ক্লাসের মানুষের সাথে মিশতে হবে এবং এটার জন্য প্রার্থী বলেন, দল বলেন, সিস্টেম বলেন—সবকিছুকে ট্রেইন করতে হবে এবং এটাতে সময় লাগবে।’

এরপরই মারদিয়া বলেন, ‘দেখেন, এই যে পাঁচ পারসেন্ট (জুলাই সনদে দলগুলোর ৫ শতাংশ আসনে নারীদের মনোনয়ন দেওয়ার কথা ছিল), এটা ফিলাপ করার জন্য হয়তো কিছু “ট্রফি প্রার্থী” বসানো কোনো ব্যাপার ছিল না। জামায়াতের কি মানুষজন নাই? জামায়াতের প্রত্যেক নেতৃবৃন্দ, কর্মীদের ছেলেমেয়েরা, ওয়াইফরা শিক্ষিত প্রফেশনে আছেন। তাহলে কিছু “ট্রফি” বসানো যেত। কিন্তু আমার কাছে মনে হয়েছে যে তাঁরা সময় নিতে চান। এই যে প্রস্তুতি, রুট লেভেল থেকে নারীকে উঠিয়ে নিয়ে আসা এবং তাঁকে তো রিপ্রেজেন্ট করতে হয় আসলে মানুষের সমস্যাগুলো…’

কাজী জেসিন তখন বলেন, ‘আমরা তো শুনি জামায়াতে প্রচুর নারী কর্মী আছে এবং রুট লেভেল প্রচুর নারী কর্মী আছে। তাহলে তারা কেন উঠে আসছে না?’

জবাবে মারদিয়া মমতাজ বলেন, ‘সময় লাগবে, কিন্তু ঢাকা শহরে তিনজন মহিলা কমিশনার সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হয়ে ফুল মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেছেন। আছে ঢাকা শহরে তিনজন। হ্যাঁ, তো সংখ্যাটা খুব কম। কিন্তু আমি বলছি না যে নাই। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে যে তাঁরা সংসদ নির্বাচনের আগে এটার ব্যাপারে প্রস্তুতি নিতে চান এবং তাঁদের এ ব্যাপারে প্রস্তুতি আছে।’

এরপর তাঁর কথায় আবার ট্রফি শব্দটি আসে। তিনি বলেন, ‘জাস্ট জাস্ট কিছু ট্রফি দেওয়ার বদলে হয়তো এমন মানুষ উঠিয়ে নিয়ে আসবেন, যাঁরা সংসদে সত্যিকারভাবে তাঁর এলাকাকে বা তাঁর কমিউনিটিকে রিপ্রেজেন্ট করবেন। এটার জন্য আসলে অপেক্ষা করতে হবে।’

এরপর নাহরিন খান ‘ট্রফি’ শব্দটির এখানে ব্যবহার নিয়ে আপত্তি তুলে বলেন, ‘আপা (মারদিয়া মমতাজ) নারী নেতৃত্বকে এই মুহূর্তে একটা শব্দ দিয়ে বলেছেন “ট্রফি”, হুইচ ইজ ভেরি অবজেকশনেবল। কারণ, বাংলাদেশের অন্যান্য দলে যেসব নারীরা আজকে ইলেকশন করছে, তারা “ট্রফি” নয় এবং মানে নারীকে ওই যে শফিক রহমান লিখেছেন না, ৩০টি গয়নার বাক্স বা কিছু একটা।’

পরে মারদিয়া মমতাজ নিজের বক্তব্যের ব্যাখ্যায় বলেন, ‘আমার কথা ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হলে আমার কিছু করার নাই। ডেফিনেটলি আমি ওইটা বুঝাই নাই।’

তাঁর পাল্টায় নাহরিন খান বলেন, ‘এটা আসলে ভুলভাবে ব্যাখ্যা না আপা। আমি মনে করি, প্রত্যেকটি শব্দের চয়ন একটু চিন্তা করে আমাদের মতো নারীদেরকেই করতে হবে।’

তখন মারদিয়া মমতাজ বলেন, ‘আমি এটা (শব্দচয়ন) স্বজ্ঞানেই করেছি, শুধু ৫ শতাংশ কোটা ফিলাপের জন্যই দেওয়া না। আমরা প্রস্তুতি নিয়ে আসতে চাই। এটা যদি কোনো দল বলে, তাকে সময় সময় দেওয়া উচিত, দ্যাটস ইট।’

আলোচনার এই অংশ ২৯ জানুয়ারি জিটিভি নিউজ চ্যানেলের ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশ করা হয়।

লিংক: এখানে

Read full story at source