সুয়ারেজের ‘কামড়কাণ্ড’
· Prothom Alo
ম্যাচের বাকি আর মাত্র ১১ মিনিট। ইতালি–উরুগুয়ের জীবন-মরণ লড়াই। যে জিতবে, সে-ই জায়গা করে নেবে বিশ্বকাপের শেষ ষোলোতে। এমন সময় ফুটবল বিশ্ব থমকে গেল এক মুহূর্তের জন্য। ইতালিয়ান ডিফেন্ডার জর্জিও কিয়েলিনি গিয়ে রেফারির কাছে অভিযোগ করলেন, লুইস সুয়ারেজ তাঁকে কামড় দিয়েছেন। ধাক্কা নয়, ঘুসি নয়, দাঁত বের করে আক্ষরিক অর্থেই কামড় বসিয়ে দিয়েছেন কাঁধে। পায়ের জাদুতে মুগ্ধ করা সুয়ারেজের ‘মরণকামড়’ দেখেছিল সেদিন বিশ্ব।
Visit freshyourfeel.org for more information.
২০১৪ বিশ্বকাপের ঘটনা। ‘গ্রুপ ডি’ হয়ে উঠেছিল সত্যিকারের গ্রুপ অব ডেথ। কোস্টারিকা, উরুগুয়ে, ইতালি আর ইংল্যান্ডের গ্রুপ। তিন বিশ্বচ্যাম্পিয়নের মধ্যে কে পরবর্তী পর্বে যাবে, তা নিয়ে ছিল জল্পনা-কল্পনা। অথচ সবাইকে চমকে দিয়ে প্রথম দুই ম্যাচ জিতে আগেই পরবর্তী পর্ব নিশ্চিত করে কোস্টারিকা। গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে মুখোমুখি হয় উরুগুয়ে আর ইতালি। দুই দলের পয়েন্টই সমান ৩। যে জিতবে, সেই উঠবে পরবর্তী পর্বে।
ওয়াকা ওয়াকা গান, ভুভুজেলা বাঁশির সঙ্গে তিকিতাকার জয়োধ্বনিম্যাচের মাঝখানে পড়ে আছেন দুই খেলোয়াড়।ম্যাচে তখনো দুই দলের সমান সমান অবস্থা, ম্যাচ যদি ড্র হয় তবে গোল ব্যবধানে পরবর্তী পর্বের টিকিট কাটবে ইতালি। ৭৯ মিনিটে হুট করেই ইতালিয়ান ডিফেন্ডার জর্জিও কিয়েলিনিকে জাপটে ধরেন সুয়ারেজ। সবাই ভেবেছিল হয়তো ধাক্কাধাক্কি হচ্ছে, কিন্তু পরক্ষণেই দেখা গেল কিয়েলিনি যন্ত্রণায় কুঁকড়ে মাটিতে পড়ে গেছেন। সুয়ারেজও নিজের মুখ ধরে পড়ে আছেন। সবাই স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে দেখছেন, কী হয়েছে ডি-বক্সের ভেতরে। রেফারির চোখে কিছুই ধরা পড়েনি। কিয়েলিনি উঠে নিজের জার্সির কলার টেনে কাঁধের সেই টাটকা কামড়ের দাগ দেখালেন। অন্যদিকে সুয়ারেজ এমন এক নিষ্পাপ অভিনয় শুরু করলেন, যেন কিয়েলিনির কাঁধে লেগে তাঁর দাঁতেই বড় কোনো চোট লেগেছে!
দাঁতে চোট পাওয়ার অভিনয় করছেন সুয়ারেজ।ফুটবল বিশ্ব যেন মিনিটখানেকের জন্য স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল তখন। ফুটবল মাঠে অনেক রকম হাতাহাতির ঘটনা আছে। ম্যাচের মধ্যে মাথা দিয়ে ঢুস মেরে চমক লাগিয়ে দিয়েছিলেন জিনেদিন জিদান। কিন্তু কামড় দেওয়ার মতো ঘটনা আন্তর্জাতিক ফুটবলে দেখেনি কেউ কখনো। লুইস সুয়ারেজ সেটাই করে দেখিয়েছিলেন সেদিন। মজার ব্যাপার হলো, তখন ছিল না কোনো ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি। ফলে রিপ্লে দেখার সুযোগ হয়নি রেফারির। কিয়েলিনির দাবিকে উড়িয়ে দিয়ে ম্যাচ আবার শুরু করেন তিনি। কামড় দিয়ে কোনো কার্ডই দেখতে হয়নি লুইস সুয়ারেজকে, তিনি ম্যাচ শেষ করেছিলেন কোনো বাধা ছাড়াই। এক মিনিট পর ডিয়েগো গডিনের গোলে ১-০ গোলে জিতে পরবর্তী রাউন্ড নিশ্চিত করে উরুগুয়ে।
ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা দুই দলকে কাঁদিয়ে ইতিহাস গড়ল জার্মানিমাঠের সেই জয় ছাপিয়ে বড় হয়ে উঠেছিল সুয়ারেজের এই পাগলামি। রেফারি না দেখলেও টিভি পর্দায় কোটি কোটি মানুষ দেখেছিল সুয়ারেজের সেই দাঁত বসিয়ে দেওয়ার দৃশ্য। রেফারি মাঠে তাঁকে শাস্তি দিতে না পারলেও, ফিফা ভিডিও ফুটেজ দেখে সুয়ারেজকে ৯টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ এবং চার মাসের জন্য সব ধরনের ফুটবল থেকে নিষিদ্ধ করে। ফলে সেই বিশ্বকাপে আর তাঁর খেলা হয়নি।
রেফারিকে কামড়ের দাগ দেখাচ্ছেন কিয়েলিনি।মজার ব্যাপার হলো, সুয়ারেজের ক্যারিয়ারে এটিই প্রথম কামড় ছিল না। এর আগেও ডাচ লিগে এবং ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে খেলার সময় তিনি দুবার প্রতিপক্ষকে কামড়ে দিয়ে নিষিদ্ধ হয়েছিলেন। ডাচ লিগে তাঁর ডাকনাম হয়ে গিয়েছিল ‘ক্যানিবাল’। ইংলিশ লিগে তাঁকে অনেকে ‘ড্রাকুলা’ বা ‘ভ্যাম্পায়ার’ বলেও ডাকে। মজার ব্যাপার হলো, সেটাই ছিল বিশ্বকাপে ইতালির খেলা শেষ ম্যাচ। এরপর দুই বিশ্বকাপ পেরিয়ে গেলেও বিশ্বকাপ খেলার সুযোগ হয়নি আজ্জুরিদের। আর তাদের শেষ বিশ্বকাপ খেলার স্মৃতি স্মরণীয় হয়ে আছে সুয়ারেজের কামড়কাণ্ডে।
রাশিয়ায় ফরাসি বিপ্লব