সামাজিক সুরক্ষা ও তদারকি বাড়াতে হবে
· Prothom Alo

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি বাংলাদেশের অর্থনীতিতে যে বহুমাত্রিক প্রভাব তৈরি করেছে, সেটা বলাই বাহুল্য। যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই বিশ্ববাজার থেকে কাঁচামাল ও খাদ্যপণ্য আমদানি অনিশ্চিত হয়ে পড়ায় অনেক পণ্যের আমদানি খরচ ও উৎপাদন খরচ বেড়েছে। তার ওপর মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর আরও এক দফা পণ্য ও সেবার মূল্য বেড়েছে। এ অবস্থায় নিম্ন আয়ের মানুষ থেকে শুরু করে মধ্যবিত্তদের বড় একটা অংশ নতুন করে চাপে পড়েছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। সরকারকে অবশ্যই ইরান যুদ্ধ ও জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির অভিঘাত থেকে সাধারণ মানুষ যাতে কিছুটা স্বস্তি পায়, তার জন্য বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নিতে হবে।
Visit extonnews.click for more information.
প্রথম আলোর খবর জানাচ্ছে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই প্রায় সব পণ্যের দাম বেড়েছে। ফার্মের ডিম, ব্রয়লার মুরগি, গ্রীষ্মকালীন সবজি, মাছ, মোটা ও মাঝারি চাল, খোলা আটার মতো নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে। বাজারে দুই মাস ধরে ভোজ্যতেলের একটা সংকট যাচ্ছে। সরকার না চাইলেও কোম্পানিগুলো ডিলার পর্যায়ে বোতলজাত তেলের দাম বাড়িয়েছে।
সীমিত আয়ের মানুষের সংসার খরচের সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা এসেছে রান্নার গ্যাসের ক্ষেত্রে। এক মাসের মধ্যে দাম দুই দফা বেড়ে বর্তমানে এলপিজি সিলিন্ডারের দাম হয়েছে ১ হাজার ৯৪০ টাকা। দাম বাড়লেও খুব স্বাভাবিকভাবেই নির্ধারিত দামে বাজারে এলপিজি পাওয়া যাচ্ছে না। এরপর সরকার পরিবহন ব্যবসায়ীদের চাপে বাসভাড়াও বাড়িয়েছে। তবে অনেক ক্ষেত্রেই সরকার–নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি ভাড়া আদায় করা হচ্ছে।
একসঙ্গে নিত্যপণ্য ও সেবার মূল্যবৃদ্ধিতে সংসার খরচের অর্থসংস্থানে চরম বেকায়দা ও দুশ্চিন্তায় পড়েছেন বিপুলসংখ্যক মানুষ। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে তিন বছরের বেশি সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি চলছে দেশে। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন বলছে, তিন বছর ধরে খাদ্য মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি বিবেচনায় বাংলাদেশ লালতালিকাভুক্ত দেশ। মূল্যস্ফীতি ও খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার কারণে বাংলাদেশে নতুন করে দারিদ্র্য বাড়বে বলেও সতর্ক করেছে সংস্থাটি। ইরান যুদ্ধ এই সংকটকে আরও তীব্র করে তুলছে। বর্তমান পরিস্থিতি তারই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
আমরা মনে করি, অর্থনীতিবিদ সেলিম রায়হান যথার্থই বলেছেন, ‘জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি করাটা হয়তো খুব সোজা একটি পদ্ধতি, কিন্তু কঠিন কাজটা হলো অভিঘাতগুলো নিয়ে যাচাই-বাছাই করা এবং সে অনুযায়ী একটা পরিকল্পনার অধীনে সেটা বাস্তবায়ন করা।’ সরকারকে অবশ্যই ইরান যুদ্ধ ও জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে নাগরিকদের ওপর, বিশেষ করে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তের ওপর যেসব অভিঘাত এসে পড়ছে, তার একটি সামগ্রিক মূল্যায়ন করতে হবে। বিচ্ছিন্ন ও বিক্ষিপ্ত পদক্ষেপ নয়; সামষ্টিক পরিকল্পনার অধীন সামাজিক সুরক্ষা খাতের আওতা ও পরিধি বাড়াতে হবে। গ্রাম ও শহরাঞ্চলের স্বল্প আয়ের মানুষ যাতে কম দামে পণ্য পেতে পারে, তার জন্য টিসিবির পণ্য বিক্রি বাড়াতে হবে। এ বাস্তবতায় আসন্ন বাজেট হতে হবে সংকটকালীন অর্থনীতির বাজেট; প্রয়োজনে অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পগুলোকে বাদ দিয়ে সামাজিক সুরক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানো জরুরি।
অর্থনীতিবিদ ও বাজার–বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, উৎপাদন ও পরিবহন খরচ বৃদ্ধি এবং সরবরাহ–সংকটের কারণে কিছু পণ্যের দাম বেড়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী বর্তমান সংকটকে সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করে জিনিসপত্রের দাম বাড়াচ্ছেন। এ ছাড়া পণ্য পরিবহনে বিভিন্ন পরিবহন সমিতির নামে চাঁদাবাজিও জিনিসপত্রের দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে। সরকারকে অবশ্যই পরিবহন চাঁদাবাজি বন্ধ এবং বাজার তদারকি ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে হবে।
আমরা মনে করি, সরকার পরিকল্পিত ও সামগ্রিক পদক্ষেপ নিলে পণ্যমূল্য বৃদ্ধি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ার নতুন চাপ থেকে সাধারণ মানুষ কিছুটা হলেও স্বস্তি পেতে পারে।