হাওরের ধান নিয়ে আতঙ্কে কৃষকেরা, পাউবোর নতুন সতর্কবার্তা
· Prothom Alo
সুনামগঞ্জের হাওরে এবার বোরো ধান কাটার মৌসুমের শুরু থেকে নানাভাবে সংকটে পড়েছেন কৃষকেরা। অতিবৃষ্টিতে সৃষ্ট জলাবদ্ধতার পর শুরু হয় বজ্রপাত আতঙ্ক। মঙ্গলবার থেকে যুক্ত হয়েছে অকালবন্যার শঙ্কা। এর মধ্যেই নতুন সতর্কবার্তা দিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)।
Visit sport-tr.bet for more information.
পাউবো জানিয়েছে, সুনামগঞ্জের উজানে ভারতের চেরাপুঞ্জিতে ব্যাপক বৃষ্টি হওয়ায় বাড়ছে নদ-নদীর পানি। এ পরিস্থিতিতে ২৬ এপ্রিল থেকে সুনামগঞ্জে ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস আছে।
কৃষকেরা জানান, নানা শঙ্কা মাথায় নিয়ে হাওরে বোরো ধান কাটছেন তাঁরা। হাওরে পানি থাকায় অনেক স্থানে কম্বাইন হারভেস্টার চালানো যাচ্ছে না। আবার এখনো সব হাওরে ধান পাকেনি। এবার মৌসুমের শুরুতে বৃষ্টি না হওয়ায় ধান পাকতে সময় নিয়েছে বেশি।
নানামুখী সংকটে থাকা হাওরের কৃষকদের ধান কাটা বিষয়ে করণীয় নির্ধারণে আজ বুধবার সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরের প্রতিনিধি ও ব্যক্তিদের নিয়ে জরুরি বৈঠক করেছে সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসন। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সম্মেলনকক্ষে অনুষ্ঠিত বৈঠকে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান বলেছেন, কৃষকদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতার জন্য সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরের কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অন্য বছর এ সময়ে প্রায় ৪০ শতাংশ ধান কাটা হয়ে যায়, এবার হয়েছে ১৭ শতাংশ। তিনি বলেন, ‘সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে এ বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। কৃষকেরা ধান কাটতে পারবেন না, এটি আমাদের জন্য লজ্জার হবে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের যেখানে যে রকম উদ্যোগ নেওয়া দরকার, সেটি নিতে বলা হয়েছে।’
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার দেখার হাওরপারের ইছাগড়ি গ্রামের রেদোয়ান আলী (৪৮) জানান, এমনিতে পানিতে অনেক কৃষকের জমির ধান পচে গেছে। মানুষ যখন হাওরে ধান কাটা শুরু করেছে, তখন শনিবার এক দিনে বজ্রপাতে জেলায় পাঁচজনের মৃত্যু হয়। তিনি আরও বলেন, ‘এই আতঙ্কের মধ্যে এখন বলা হচ্ছে, বন্যা হবে। প্রায় প্রতিদিনই ঝড়বৃষ্টি হচ্ছে। মাঠে ঠিকমতো কাজও করা যায় না। কৃষকেরা দিশেহারা।’
বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার করচার হাওরপাড়ের কৃষক স্বপন কুমার বর্মণ (৬২) বলেন, হাওরের কৃষকেরা এক দশক ধরে ধান কাটায় অনেকটা যন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল। তাই শ্রমিক কম। কিন্তু এবার হাওরে পানি থাকায় শ্রমিকের দরকার পড়েছে। এটি এখন বড় সমস্যা।
শ্রমিকসংকট মোকাবিলায় ২০ থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত সুনামগঞ্জের সব বালুমহাল ও জেলার তাহিরপুর সীমান্তে থাকা তিনটি শুল্কস্টেশন বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এসব মহাল ও শুল্কস্টেশনে কাজে শ্রমিকদের ধান কাটায় যুক্ত হতে অনুরোধ করা হয়।
পাউবোর নতুন সতর্কবার্তা
সুনামগঞ্জের উজানে ভারতের চেরাপুঞ্জিতে বৃষ্টি বেশি হলে হাওর এলাকায় পাহাড়ি ঢল নামে। সুনামগঞ্জের বৃষ্টির চেয়ে ফসলের জন্য বেশি ঝুঁকি চেরাপুঞ্জির বৃষ্টি। সুনামগঞ্জে মঙ্গলবার সকাল নয়টা থেকে বুধবার সকাল নয়টা পর্যন্ত বৃষ্টি হয়েছে ৩৮ মিলিমিটার। চেরাপুঞ্জিতে গত দুই দিনে বৃষ্টি হয়েছে ৩৭৪ মিলিমিটার। এতে নামছে পাহাড়ি ঢল। যেকোনো সময় অকালবন্যা দেখা দিতে পারে। তাই মঙ্গলবার বিকেলে জমির ধান ৮০ শতাংশ পাকলেই দ্রুত কাটার নির্দেশনা দেয় পাউবো।
পাউবো জানায়, এবার সুনামগঞ্জ চৈত্র মাসের শুরু থেকেই বৃষ্টি হচ্ছে। অতিবৃষ্টিতে বিভিন্ন হাওরে জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। উজানে বৃষ্টি হলে সুনামগঞ্জে পাহাড়ি ঢল নামে। এতে সুরমা, কুশিয়ারাসহ অন্যান্য নদ-নদীতে পানি বাড়ে। তাই যেকোনো সময় পাহাড়ি ঢল নামতে পারে। হাওর এলাকায় দেখা দিতে পারে অকালবন্যা। ক্ষতি হতে পারে ফসলের। তাই জমির ধান ৮০ শতাংশ পাকলেই কাটতে হবে।
বুধবার পাউবো আরেকটি সতর্কবার্তা জারি করে৷ তাতে বলা হয়, ২৬ এপ্রিল থেকে সুনামগঞ্জে ভারী বৃষ্টি হতে পারে।
সুনামগঞ্জ পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মামুন হাওলাদার প্রথম আলোকে বলেছেন, ‘একই সময়ে যদি উজানেও ভারী বৃষ্টি হয়, তাহলে অকালবন্যা দেখা দিতে পারে। আমরা এই আশঙ্কা ধরেই কৃষকদের দ্রুত ধান কাটার পরামর্শ দিচ্ছি।’
কোনো ফসল রক্ষা বাঁধে ঝুঁকি আছে কি না, জানতে চাইলে মামুন হাওলাদার বলেন, ‘দেখার হাওরে উতারিয়া বাঁধের কিছু অংশ পানিনিষ্কাশনের জন্য কেটে দেওয়া হয়েছিল। এখন সেখান দিয়ে পানি হাওরে প্রবেশ করছে। আমরা চেষ্টা করছি সেটি বন্ধ করার। কিন্তু বুধবার দুপুর পর্যন্ত সেটা সম্ভব হয়নি। অন্য কোনো বাঁধে এখনো ঝুঁকি তৈরি হয়নি।’
বাঁধের কাজ নিয়ে ক্ষোভ
সুনামগঞ্জের হাওরের ফসল রক্ষায় এবার ১৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ৭১০টি প্রকল্পে ৬০২ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার করা হয়েছে। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সম্মেলনকক্ষে বুধবার দুপুরে অনুষ্ঠিত সভায় বাঁধের কাজে অনিয়ম ও গাফিলতির অভিযোগ তুলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন অনেকে।
জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি ও জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য মোহাম্মদ আবদুল হক বলেন, পাউবো কর্মকর্তা বাঁধ নির্মাণের নামে সরকারি টাকা লুটপাট করেন। এখান বাঁধের কাজের অনিয়ম ঢাকতেই কৃষকদের তাগাদা দিচ্ছেন কাঁচা ধান কেটে ফেলার জন্য।
২০১৭ সালে হাওরে ফসলডুবির পর বাঁধ নির্মাণে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগে করা একটি মামলার বাদী আবদুল হক।
অবশ্য বাঁধের কাজে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন পাউবোর নির্বাহী প্রকৌমলী মামুন হাওলাদার।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমানের সভাপতিত্বে সভায় অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য দেন স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক অসীম চন্দ্র বণিক, জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মতিউর রহমান খান, হাওর বাঁচাও আন্দোলনের জেলা সভাপতি ইয়াকুব বখত প্রমুখ।
৮০ শতাংশ ধান এখনো জমিতে
সুনামগঞ্জের হাওর এলাকায় এবার চৈত্র মাসের শুরু থেকে প্রথমে হালকা পরে ভারী বৃষ্টি হওয়ায় বিভিন্ন হাওরে জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। অনেক হাওরের ধান পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। কোথাও কোথাও ধান তলিয়ে গেছে। হাওরগুলোর নিচু অংশে জমে আছে বৃষ্টির পানি। জেলার বেশ কয়েকটি হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধ কেটে পানিনিষ্কাশনের চেষ্টা করেছেন কৃষকেরা। আবার কোথাও কোথাও নিজেদের উদ্যোগ পাম্প বসিয়ে পানিনিষ্কাশনের চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু খুব একটা ফল হয়নি।
কৃষকেরা বলছেন, হাওরে একসময় দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ধান কাটার শ্রমিক আসতেন। আবার স্থানীয়ভাবেও ধান কাটার শ্রমিক ছিলেন। দিন দিন বাইরের শ্রমিকের আসা একেবারে কমে গেছে। আবার ধান কাটার যন্ত্র চালু হওয়ায় স্থানীয় শ্রমিকেরাও আর আগের মতো ধান কাটেন না।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সুনামগঞ্জের ১৩৭টি হাওরে এবার ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। ধানের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা আছে প্রায় ১৪ লাখ মেট্রিক টন।
তবে বুধবার পর্যন্ত হাওরে ৩ হাজার ৮০০ হেক্টরের মতো জমির ধান কাটা হয়েছে৷ এখনো হাওরের জমিতে কৃষকের ৮০ শতাংশের ওপরে ধান রয়েছে। সেই ধান নিয়েই এখন চিন্তিত কৃষকেরা।