পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন: মমতার ক্ষমতা এবার কি টিকবে
· Prothom Alo

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য বিধানসভার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে ২৩ ও ২৯ এপ্রিল। সেখানে বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ২০১১ সাল থেকেই এ রাজ্যের শাসনক্ষমতায় রয়েছেন।
Visit mwafrika.life for more information.
এবারের নির্বাচনে ২৯৪টি আসনে তৃণমূলের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। মমতার দল এই নির্বাচনে হেরে গেলে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে সবচেয়ে এগিয়ে থাকবেন বর্তমান বিরোধী দল নেতা শুভেন্দু অধিকারী। তিনি ২০১৯ সাল পর্যন্ত তৃণমূলে মমতার ডানহাত হিসেবেই পরিচিত ছিলেন।
পশ্চিমবঙ্গে সরকার গঠন বিজেপির জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা বোঝাতে গিয়ে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বলেছেন, এখন গোটা দেশে বিজেপি ও এনডিএর ২১টি সরকার রয়েছে। কিন্তু ২১টি সরকার গঠনের পরও সারা দেশে দলের কর্মী বা নেতা নরেন্দ্র মোদি খুশি নন। তাঁর মুখে সেদিনই হাসি ফুটবে, যেদিন বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে জিতবে। প্রশ্ন হলো, মোদির মুখের সেই হাসি কি এবার ফুটবে?
মমতার ‘জয় বাংলা’
এবারের নির্বাচনে মমতার প্রধান স্লোগান হলো ‘জয় বাংলা’। ২০২১ সালের পর তৃণমূল কংগ্রেস মাঝেমধ্যে এই স্লোগান ব্যবহার করলেও এবারই প্রথম তারা এটি দলীয়ভাবে গ্রহণ করেছে। এ নিয়ে শুভেন্দু অধিকারী বলেছেন, ‘জয় বাংলা’ ভারতের স্লোগান নয়, এটি বাংলাদেশের এবং এই স্লোগান ভারতে চলবে না। তবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজের সিদ্ধান্তে অনড় থেকে দৃঢ়ভাবে বলেছেন, তিনি ‘জয় বাংলা’ স্লোগান একবার নয়, হাজারবার বলবেন, লাখোবার বলবেন।
নরেন্দ্র মোদির বিজেপি ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান ব্যবহার করে থাকে। পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন কেন্দ্রীয় নেতার গলায় এখন ‘জয় শ্রীরাম’ ধ্বনির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ‘জয় মা কালী’। কিন্তু সাম্প্রদায়িক স্লোগানে পশ্চিমবঙ্গে খুব একটা সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে না বিধায় বিজেপিও অসাম্প্রদায়িক স্লোগান খুঁজছে। কিছুদিন আগে বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি নীতীন নবীন নিজেই পশ্চিমবঙ্গে এসে ‘জয় বঙ্গাল’ স্লোগান দিয়েছেন।
পশ্চিমবঙ্গ ও আসামের নির্বাচনে ‘বাংলাদেশ ফ্যাক্টর’মোদিদের বাঙালিয়ানা
পশ্চিমবঙ্গের মানুষ বেশ অসাম্প্রদায়িক এবং বাঙালি পরিচয়ের প্রতি সংবেদনশীল। তাই নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মোদির দলের নেতারা পশ্চিমবঙ্গে এসে বাঙালিয়ানা চর্চা শুরু করেছেন। বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব বাংলায় কথা বলে এবং বাংলার সংস্কৃতি ও ইতিহাস তুলে ধরে মন জয়ের চেষ্টা করছেন।
কিন্তু প্রতিবারই বাঙালিয়ানার ভুল চর্চা করে তাঁরা তৃণমূলকে সমালোচনার সুযোগ দিচ্ছেন এবং নিজেরাই হাসির পাত্র হচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি লোকসভায় বঙ্কিমচন্দ্রকে ‘বঙ্কিমদা’ এবং মাস্টারদা সূর্য সেনকে ‘মাস্টার’ সম্বোধন করে বেশ হাসির খোরাক হয়েছিলেন। অন্যদিকে অমিত শাহের মুখে ‘রবীন্দ্রনাথ সান্যায়’ উচ্চারণও খুব ভালো শোনায়নি।
সেই বিতর্ক শেষ হওয়ার আগেই তৃণমূলকে নতুন অস্ত্র তুলে দেন নীতীন নবীন। বিজেপির কর্মী সম্মেলনে ভাষণ দিতে গিয়ে তিনি বললেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন! তিনি কবিগুরুর শান্তিনিকেতনকে ‘শান্তিনিকেতন সংস্থা’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
তিনি আরও দাবি করেন, কবিগুরু রাজ্যসহ গোটা দেশকে শিক্ষার নতুন পদ্ধতি দিয়েছিলেন, যার জন্য নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়া হয়েছিল। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একাধিকবার বিজেপি নেতৃত্বকে বাংলা ভাষার অপব্যবহার এবং বাংলার মনীষীদের অপমান বন্ধ করার আবেদন জানিয়েছেন।
মমতার টিকে থাকার ক্ষমতা
২০১১ সাল থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পশ্চিমবঙ্গে তিনটি রাজ্যসভা এবং তিনটি লোকসভা নির্বাচনের মুখোমুখি হয়েছেন। এর কোনোটিই তাঁর জন্য সহজ ছিল না। বারবার ধরে নেওয়া হয়েছিল মমতার পরাজয় অনিবার্য, কিন্তু প্রতিবারই তিনি খাদের কিনারা থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে আরও বেশি শক্তিধর হয়েছেন।
২০২১ সালের নির্বাচনের আগেই তিনি তিন প্রধান বিশ্বস্ত সহচরকে হারান। ভারতের রাজনীতির চাণক্য খ্যাত তাঁর প্রধান পরামর্শদাতা মুকুল রায় সারদা কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে বিজেপিতে যোগ দিতে বাধ্য হন। কলকাতার মেয়র শোভন চ্যাটার্জিও পারিবারিক কারণে তৃণমূল ত্যাগ করেন। সর্বশেষ শুভেন্দু অধিকারী নিজেই মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার সুযোগ দেখে মোদির দলে যোগ দেন।
২০২১ সালের নির্বাচনেই রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মমতাকে বাতিলের খাতায় ফেলে দিয়েছিলেন। একইভাবে ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে জনমত জরিপেও তিনি বিপুলভাবে পিছিয়ে ছিলেন। কিন্তু দুইবারই তিনি বড় ব্যবধানে জয়লাভ করেন।
ভারতের প্রায় প্রতিটি হিন্দু–অধ্যুষিত রাজ্য প্রধানমন্ত্রী মোদির ‘হিন্দুত্ব’ মন্ত্রে বশ হয়ে বিজেপিকে সরকারে পাঠিয়েছে। তবে উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদের বাণী গত পনেরো বছরে পশ্চিমবঙ্গের মানুষকে ভোলাতে পারেনি, বরং অনেক ক্ষেত্রে হিতে বিপরীত ফল দিয়েছে।
ভারতের প্রায় প্রতিটি হিন্দু–অধ্যুষিত রাজ্য প্রধানমন্ত্রী মোদির ‘হিন্দুত্ব’ মন্ত্রে বশ হয়ে বিজেপিকে সরকারে পাঠিয়েছে। তবে উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদের বাণী গত পনেরো বছরে পশ্চিমবঙ্গের মানুষকে ভোলাতে পারেনি, বরং অনেক ক্ষেত্রে হিতে বিপরীত ফল দিয়েছে।
মোদির দ্বিতীয় অস্ত্র ছিল বিরোধী রাজ্য সরকারগুলোর নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ এনে কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা দিয়ে সরকার পতন করানো। এভাবেই দিল্লির কেজরিওয়ালসহ বেশ কয়েকজন মুখ্যমন্ত্রীকে বিদায় নিতে হয়েছে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে সেই কৌশল কাজে লাগেনি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাধারণ চালচলন ও কাজকর্মের সঙ্গে ঠিক দুর্নীতিকে মেলানো যায় না।
রাজনৈতিকভাবে মমতার বিরোধীদের অনেকেই তাঁকে ব্যক্তিগত শ্রদ্ধা করেন। শুভেন্দু অধিকারী বিজেপিতে যোগ দেওয়ার পর মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে গেলে সাংবাদিকদের প্রথম প্রশ্ন ছিল, তিনি মমতাকে পা ছুঁয়ে প্রণাম করেছিলেন কি না। সরাসরি উত্তর না দিয়ে শুভেন্দু শুধু বলেছিলেন, তিনি শিষ্টাচার রক্ষা করেছেন। তবে এবার ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য মমতাকে আরও বড় পরীক্ষা দিতে হবে। ১৫ বছর সরকারে থাকার পর জনগণের কাছে আবার ভোট চাওয়া খুব সহজ কথা নয়।
নির্বাচনী হালচাল
তৃণমূল ও বিজেপি উভয় পক্ষই তাদের প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করেছে। তৃণমূলে এবার মনোনয়নে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। আগের তিনটি নির্বাচনে মমতা সব সময় পুরোনো ও ত্যাগী নেতাদের অগ্রাধিকার দিলেও এবার তা দেননি। তিনি এবার পারফরম্যান্স বা কর্মদক্ষতা বিচারে মনোনয়ন দিয়েছেন। ফলে আগের বিধানসভার এক-তৃতীয়াংশ তৃণমূল সদস্য এবার বাদ পড়েছেন।
প্রতিবারই মমতা টালিগঞ্জের নতুন তারকাদের মনোনয়ন দিয়ে চমক আনেন। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য প্রিন্ট লিখেছিল, মমতা সংকটের সময় গ্ল্যামার জগতের সাহায্য নেন। তবে এবার সেটি ঘটছে না। তৃণমূলের তালিকায় এবার নতুন কোনো তারকা নেই, বরং পুরোনোদের মধ্য থেকেই মনোজ তিওয়ারি, চিরঞ্জিত চক্রবর্তী ও কাঞ্চন মল্লিক বাদ পড়েছেন। বলা যায়, এবার মমতা সত্যিকারের যোদ্ধাদের নিয়ে লড়াইয়ে নেমেছেন।
নির্বাচনে সবার নজর থাকবে ভবানীপুর ও নন্দীগ্রাম—এই দুটি কেন্দ্রে। ভবানীপুর মমতার নিজস্ব কেন্দ্র এবং সেখানে তাঁর বিপক্ষে লড়ছেন খোদ শুভেন্দু অধিকারী। অন্যদিকে শুভেন্দু অধিকারীর নিজস্ব কেন্দ্র নন্দীগ্রামে তৃণমূলের হয়ে লড়ছেন পবিত্র কর, যিনি কিছুদিন আগেও শুভেন্দুর ঘনিষ্ঠ সহচর ছিলেন। পাশাপাশি বিজেপি বেশির ভাগ কেন্দ্রে তাদের পুরোনো কর্মীদের নিয়ে প্রার্থী তালিকা সাজিয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের ফলাফল বাংলাদেশের জন্য কী প্রভাব ফেলবেপশ্চিমবঙ্গের মোট জনগণের প্রায় ৩০ শতাংশ মুসলমান, যাঁরা মূলত মমতার অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির কট্টর সমর্থক। এর ফলে মমতা ২০ থেকে ২৫ শতাংশ হিন্দু ভোট টানতে পারলেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে যেতে পারেন। অন্যদিকে উত্তরাঞ্চলের আলিপুরদুয়ার, জলপাইগুড়ি, কোচবিহার, দিনাজপুরসহ একাধিক জায়গায় বিজেপি গত কয়েকটি নির্বাচনে ভালো ফল করায় এটি তাদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। মমতাও উত্তরাঞ্চলে নিজ দলকে নতুন করে সাজাতে চেষ্টা করছেন।
এই বিধানসভা নির্বাচনে যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে তা আগেই বলে দেওয়া যায়। তবে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের ধারণা, মমতার জনপ্রিয়তায় বড় কোনো ভাটা পড়েনি এবং তৃণমূল গতবারের চেয়ে বেশি আসন পেতে পারে। নির্বাচনী প্রচারণাও দ্রুত গতি পাচ্ছে। সিএনএন নিউজ ১৮ চ্যানেলের সাম্প্রতিক এক জরিপে তৃণমূলের প্রাধান্যই দেখা গেছে।
জরিপ অনুযায়ী, ৪৮ দশমিক ৫ শতাংশ ভোটার আবারও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে মুখ্যমন্ত্রী দেখতে চান এবং ২৯৪টি আসনের মধ্যে মমতার দল ১৮৪ থেকে ১৯৪টি আসন পেতে পারে। তবে এটি কেবল শুরু; ধারণা করা হচ্ছে আগামী তিন সপ্তাহে এসব হিসাব–নিকাশ আরও অনেক ওঠানামা করবে।
সালেহ উদ্দিন আহমদ শিক্ষক, লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
ই-মেইল: [email protected]
*মতামত লেখকের নিজস্ব